kalerkantho

সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় ধরে রাখতে হবে

বিধান চন্দ্র দাস

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় ধরে রাখতে হবে

‘সুন্দরবন শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বের সম্পদ’—সম্প্রতি কথাটি বলেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্ল আর. মিলার। তিনি গত ২৬ থেকে ২৮ জানুয়ারি ২০২০ সুন্দরবন সফর শেষে মোংলার জয়মনিরঘোলে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে সুন্দরবনকে বিশ্ব সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করেন। অতীতেও বিদেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি সুন্দরবন ভ্রমণ করেছেন এবং এই বনের অনিন্দ্যসুন্দর রূপ দেখে অভিভূত হয়েছেন।

সুন্দরবনকে দেখে অথবা এর সম্পর্কে শুনে বিদেশিরা যে কতটা অভিভূত কিংবা কৌতূহলী হয়ে উঠেন তার কিছু অভিজ্ঞতা আমার আছে। আমার কয়েকবার সুযোগ হয়েছে বিদেশিদের নিয়ে সুন্দরবন ভ্রমণ করার। প্রতিবারেই দেখেছি সুন্দরবন ঘুরে দেখার পর বিদেশিদের মুখে তৃপ্তির হাসি। চোখে তাঁদের খুশির ঝিলিক। এই বন সম্পর্কে তাঁদের মুখ থেকে উচ্ছ্বসিত প্রশংসাও শুনেছি। সব থেকে মজার ব্যাপার, বিদেশে আমি যখন সুন্দরবন সম্পর্কে বক্তৃতা করেছি, তখন কোথাও কোথাও আমার বক্তব্যের কোনো কোনো অংশের স্লাইড কিংবা ভিডিও ক্লিপ শ্রোতাদের মধ্যে কেউ কেউ কপি করে নিয়েছেন। অসংখ্য প্রশ্ন করেছেন সুন্দরবন সম্পর্কে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্য, জার্মানি, চীন, ঘানায় সুন্দরবন সম্পর্কে আমার বক্তৃতার পর এই ঘটনা ঘটতে দেখেছি। এ কথাগুলো বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে এই যে সুন্দরবন নামের এই প্রাকৃতিক বনভূমির রয়েছে মানুষকে আকর্ষণ করার এক জাদুকরী ক্ষমতা। 

সূর্যোদয় অথবা সূর্যাস্তের সময় সুন্দরবনের খালের মধ্যে জোয়ার কিংবা ভাটার বহমান পানির মৃদু শব্দ, দুই পাশের ঝোপঝাড় আর উঁচু বৃক্ষের মাঝে আলো-আঁধারি খেলা, নানা প্রকার পাখির ডাক ও তাদের যাওয়া-আসার দৃশ্য সুন্দরবনকে করে তোলে মোহনীয়। মেঘমুক্ত উজ্জ্বল আকাশে উঁচু কোনো জায়গা থেকে সুন্দরবনকে দিগন্ত ছোঁয়া সবুজ ঢেউ খেলানো এক চাদর বলে মনে হয়। পূর্ণ জোয়ারে মনে হয় যেন কোনো সমুদ্রবন। আর শেষ ভাটায় অসংখ্য উন্মুক্ত শ্বাসমূলের শৈল্পিক বয়নবিন্যাসে এই বনভূমির কর্দমাক্ত পৃষ্ঠা হয়ে উঠে শিল্পময়। ক্ষণে ক্ষণে পাল্টে যায় সুন্দরবনের চেহারা। কখনো একক বন, কখনো দ্বীপময়, কখনো উন্মুক্ত নদী চর, আবার কখনো জল থইথই। কোথাও নির্জন, আবার কোথাও গুঞ্জরিত।

জানা-অজানা অসংখ্য জীবের আবাসভূমি এই সুন্দরবন। বাঘ, হরিণ, বানর, পাখি, কুমির, ডলফিনজাতীয় বিভাময় প্রাণীদের সঙ্গে এখানে বাস করে অসংখ্য ছোট কিংবা ক্ষুদ্র প্রাণী, যেমন—অজস্র প্রজাতির পতঙ্গ, মাকড়সা, শামুক, ঝিনুক, কাঁকড়া, তারা মাছ ইত্যাদি। সুন্দরী, বাইন, কেউড়া, গরানের মতো উঁচু বৃক্ষ যেমন এখানে আছে, তেমনি আছে গোলপাতা, হরগোজা, ফার্ন, চরগাঁদার মতো ঝোপঝাড়যুক্ত কিংবা গালিচাময় উদ্ভিদ প্রজাতি। প্রাণী আর উদ্ভিদ ছাড়াও অসংখ্য অণুজীবের বসবাস এই ম্যানগ্রোভ বনে।

সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রও বৈচিত্র্যময়। মোট চার ধরনের বাস্তুতন্ত্রের (স্থলজ, মিঠা পানি, উপকূলীয় ও সামুদ্রিক) সমাহার ঘটেছে এই বনে। প্রাণী, উদ্ভিদ তথা জীবকুল আর পানি, মাটি ও অন্যান্য পদার্থের সম্মিলিত উপস্থিতিতে এখানকার জীবতাত্ত্বিক ও বাস্তুতাত্ত্বিক পরিবেশ হয়ে উঠেছে অবিরাম গতিশীল। বদ্বীপ গঠন প্রক্রিয়াও এখানে বহমান। জড় ও জীবের অপূর্ব মেলবন্ধনে সুন্দরবনের বাস্তুতত্ত্ব হয়ে উঠেছে অনন্যসাধারণ। এই বনের নির্জনতা, দুর্গমতা, ভারসাম্যতাসহ অন্যান্য বৈশিষ্ট্য থাকার কারণে এখানে বসবাসকারী যেকোনো জীব প্রজাতির স্বস্থানিক সংরক্ষণ সম্ভব।

সুন্দরবনের এসব অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণে ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্র ১৯৯৭ সালে সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। কোনো স্থানকে বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্র স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য তাদের মোট ১০টি শর্তের মধ্যে যেকোনো একটি শর্ত পূরণ করা প্রয়োজন হয়। কিন্তু সুন্দরবন—বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্র প্রণীত একটি শর্তের জায়গায় দুটি শর্ত অর্থাৎ ‘৯’ নম্বর (স্থলজ, মিঠা পানি, উপকূলীয় ও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র এবং উদ্ভিদ ও প্রাণী সম্প্রদায়ের বিবর্তন ও বিকাশে বাস্তুতাত্ত্বিক ও জীবতাত্ত্বিক তাৎপর্যপূর্ণ অবিরাম প্রক্রিয়াসংবলিত অসামান্য উদাহরণ হতে হবে) ও ‘১০’ নম্বর (খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ প্রাকৃতিক বাসস্থান হতে হবে, বিজ্ঞান অথবা সংরক্ষণের দৃষ্টিকোণ থেকে বৈশ্বিকভাবে মূল্যবান হুমকিগ্রস্ত প্রজাতিসহ জীববৈচিত্র্যের স্বস্থানিক সংরক্ষণ যেখানে সম্ভব হবে) শর্ত দুটি সন্তোষজনকভাবে পূরণ করতে সক্ষম। সে কারণেই বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্র সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। তবে কেন্দ্রের নিয়মানুযায়ী কোনো ভুক্তিই স্থায়ী নয়। তালিকাভুক্ত যেকোনো স্থানের বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্র প্রণীত শর্ত অর্থাৎ বৈশিষ্ট্য নষ্ট হয়ে গেলে তাকে প্রথমে ‘বিপদাপন্ন স্থান’ হিসেবে ঘোষণা করা হয় ও তা পূরণ করার জন্য সময় দেওয়া হয়। এরপর নির্দিষ্ট সেই সময়ের মধ্যে তা পূরণ করতে ব্যর্থ হলে তখন সেই স্থানকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। বর্তমানে পৃথিবীতে এক হাজার ১২১টি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মধ্যে ৫৩টি স্থানকে বিপদাপন্ন বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এ পর্যন্ত দুটি স্থান (ড্রেসডেন এল্ব্য উপত্যকা, জার্মানি ও আরবীয় কৃষ্ণসাগর অভয়ারণ্য, ওমান) বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকা থেকে বাদ পড়েছে।

বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্রের অফিশিয়াল উপদেষ্টা (প্রাকৃতিক স্থান) আইইউসিএন (ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার) গত বছর ৭ জুন সুন্দরবনকে বিপদাপন্ন ঘোষণা করার সুপারিশ করেছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে সুন্দরবন বিপদাপন্ন বলে ঘোষিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। অবশ্য শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের দেওয়া ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হয়ে বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটি তাদের ৪৩তম অধিবেশনে (৩০ জুন থেকে ১০ জুলাই ২০১৯, বাকু, আজারবাইজান) সুন্দরবনকে বিপদাপন্ন বলে ঘোষণা করেনি। এই অধিবেশনে বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটি তাদের সিদ্ধান্তে সুন্দরবন সংরক্ষণে বাংলাদেশ সরকারের নেওয়া কিছু পদক্ষেপকে (ভারত-বাংলাদেশ যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন, মিঠা পানির প্রবাহ বৃদ্ধির উদ্যোগ, স্থানিক পর্যবেক্ষণ ও প্রতিবেদন তৈরি, ব্যাঘ্র কর্মপরিকল্পনা তৈরি, ব্যাঘ্রসংখ্যা বৃদ্ধিকরণ কর্মসূচি, অভয়ারণ্যর পরিমাণ বৃদ্ধি, বদ্বীপ পরিকল্পনা গ্রহণ) স্বাগত জানিয়েছিল। বাস্তুতাত্ত্বিক অভিঘাত মূল্যায়ন করে ভবিষ্যতে পশুর নদে ড্রেজিং করার বিষয়টি নিশ্চিত করায় তা প্রশংসিত হয়েছে। 

তবে ওই সিদ্ধান্তে কিছু বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সেগুলোর ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্যও অনুরোধ করা হয়েছে। যেমন—সুন্দরবনের ওপর বড় আকারের শিল্প প্রকল্পগুলোর পরিবেশগত অভিঘাত যাতে তৈরি না হয় তার জন্য ‘প্রশমন ব্যবস্থা’ নিশ্চিত করা, উজানের শিল্প-কলকারখানার পরিবেশগত মূল্যায়ন অব্যাহত রাখা, সুন্দরবনে তেল কিংবা অন্যান্য বিপজ্জনক পদার্থের ছড়িয়ে পড়াজনিত দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ ও দুর্ঘটনা-পরবর্তী সময়ে মূল্যায়ন ও ব্যবস্থা গ্রহণ ইত্যাদি। সিদ্ধান্তের ১১ নম্বর অনুচ্ছেদে এ বিষয়গুলো সুন্দরবন সংরক্ষণসংক্রান্ত অগ্রগতি ১ ফেব্রুয়ারি ২০২০-এর মধ্যে বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্রে পাঠানোর জন্য অনুরোধ করা হয়। সেই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ একটি অগ্রগতি প্রতিবেদন ৩০ জানুয়ারি ২০২০ বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্রে জমা দিয়েছে।

সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় ধরে রাখতে হলে তার বাস্তুতান্ত্রিক বৈচিত্র্য ও তার সঙ্গে উদ্ভিদ ও প্রাণী তথা জীবকুলের গতিশীল মিথস্ক্রিয়া অব্যাহত রাখাসহ সেখানকার স্বস্থানিক সংরক্ষণ বৈশিষ্ট্যও বজায় রাখা প্রয়োজন। বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্র তালিকাভুক্ত প্রাকৃতিক কোনো স্থানের জীব প্রজাতি মারাত্মকভাবে হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলে সেই স্থানকে বিপদাপন্ন ঘোষণা করার প্রক্রিয়া শুরু করে। সেই কারণে সুন্দরবনের জীবকুল সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। আর তা করতে হলে সুন্দরবনে বসবাসকারী সব জীবকুল সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান থাকা দরকার। আমাদের স্বীকার করতেই হবে যে এ ব্যাপারে আমাদের ঘাটতি থেকে গেছে। সুন্দরবনের বড় বড় কিছু উদ্ভিদ ও প্রাণী ছাড়া এর বেশির ভাগ জীব, বিশেষ করে এর বিশাল অমেরুদণ্ডী প্রাণী বৈচিত্র্যের চিত্র আমাদের অজানা। প্রকৃতপক্ষে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ চরিত্র বজায় রাখার জন্য বিশাল অমেরুদণ্ডী প্রাণিকুল খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। কাজেই সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় স্থায়ীভাবে ধরে রাখার জন্য সামগ্রিক ব্যবস্থা গ্রহণের মধ্যে এই বনের অমেরুদণ্ডী প্রাণিকুলের বৈচিত্র্য, প্রাচুর্য, প্রজনন, বিকাশ তথা জীবন সম্পর্কে জানার বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। 

লেখক : অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা