kalerkantho

ভারতের রাজনীতি ও অর্থনীতি কোন পথে

সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ভারতের রাজনীতি ও অর্থনীতি কোন পথে

শুরু হয়েছিল গত বছর ৫ আগস্ট। তারপর এসে গেল এনআরসি, সিসিএ, এনপিসি—এই তিনটি আইনই মোদি সরকার সংসদে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে পাস করিয়েছে। যদিও বিজেপি ২০১৯ সালের নির্বাচনে মাত্র ৩৬ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। আর বিরোধীরা পেয়েছিল ৬৪ শতাংশ ভোট। এই সংখ্যাতত্ত্বকে তুলে ধরে সাবেক রাষ্ট্রপতি এবং প্রবীণ রাজনীতিবিদ মোদি সরকারকে তুলাধোনা করেছেন। প্রণব বাবু তাঁর বক্তব্যে বলেছেন, বিজেপি ৫১ শতাংশও ভোট পাননি, সুতরাং এই বিল সংসদে পাস করানোর কোনো অধিকারই তাঁদের নেই।

কলকাতায় ছিলেন দুই বাঙালি নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেন ও অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়। অমর্ত্য সেন ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ পত্রিকায় এক দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখে মোদি সরকারের কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, এই আইনগুলো হলো দেশের হিন্দু-মুসলমানের সঙ্গে বিবাদ সৃষ্টি করা এবং গণতন্ত্রকে ধ্বংস করা। আর অভিজিৎ আরেক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, দিল্লির ক্ষমতাসীন গেরুয়া সরকারের ভারতের ঐতিহ্য ও ইতিহাস সম্পর্কে কোনো জ্ঞান নেই। ওরা শুধু ধর্মের নামে মধ্যযুগীয় বর্বরতা কায়েম করতে সচেষ্ট। তিনি আরো বলেছেন, মোদি সরকার গণতন্ত্র বোঝে না। বোঝে শুধু স্বৈরতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র। অর্থনৈতিক বিষয় ভূরি ভূরি মিথ্যা কথা বলে যাচ্ছে, যা দেশের পক্ষে ভয়ংকর। ওই দুই নোবেল বিজয়ী মনে করেন, ভারতকে মোদি সরকার যেভাবে ধ্বংসের মুখে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, তা ভারতবাসী মেনে নেবে না। এ সবই হলো মোদি সরকারের ভোটব্যাংকের চালাকি। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ভারতবর্ষে হিন্দু-মুসলমান বিভাজনের যে ঘটনা চলছে তার বিরুদ্ধে রাজ্যে রাজ্যে চলছে বিক্ষোভ, ধরনা এবং গান্ধীর আদর্শ অর্থাৎ অহিংস সত্যাগ্রহের মাধ্যমে প্রতিবাদ মিছিল এবং উত্তর প্রদেশে এর প্রতিবাদে অনশনও হয়েছে।

প্রতিবাদ শুরু হয় গত বছরের আগস্ট মাসেই। আর এই প্রতিবাদ শুরু করেন দিল্লির জওয়াহেরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা। জেএনইউর ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আর এক বাঙালি ছাত্রী ঐশী ঘোষ। শুধু ভারত নয়, পৃথিবীর ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্দেশে বলেছেন, আপনারা আমাদের দেশের গণতন্ত্র ও সংবিধানকে বাঁচাতে আমাদের পাশে দাঁড়ান। তাঁর ডাকে সারা দিয়ে বিশ্বের তাবড় তাবড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা রাস্তায় নেমে পড়েছেন। দিল্লির জেএনইউ থেকে শুরু করে আমেরিকার হার্ভার্ড, এমআইটির ছাত্র-ছাত্রীরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন। ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ, অক্সফোর্ড বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা এখন রাস্তায়। অস্ট্রেলিয়া, জাপান, জার্মান, ইতালি ও নিউ ইয়র্কের রাষ্ট্রপুঞ্জের সামনে বিক্ষোভ দেখাচ্ছে, তার ঢেউ এসে পড়েছে ব্রাসেলসের রাষ্ট্রপুঞ্জের আরেকটি দপ্তরের সামনে। দিল্লির জামিয়া মিলিয়ার ছাত্র-ছাত্রীরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখালে অমিত শাহর পুলিশ তাঁদের ওপর লাঠি ও গুলি চালিয়েছে। তাঁদের অনেককে গ্রেপ্তার করে রেখেছেন পুলিশ হেফাজতে। ৮ ফেব্রুয়ারি শনিবার দিল্লির বিধান সভার নির্বাচন। এই নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে বিজেপির সাবেক মন্ত্রী ও বর্তমান সদস্য অনন্ত জেগড়ে গান্ধীজিকে আক্রমণ করে বলেছেন, মহাত্মা গান্ধী ছিলেন টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট ম্যাচের মতো ব্রিটিশদের বন্ধু, ব্রিটিশদের সঙ্গে সব সময় আঁতাত করে চলেছেন। গত ৩০ জুন ছিল গান্ধী হত্যার ৭২ বছর। আর গান্ধীকে হত্যা করেছিলেন আরএসএসের নেতা নাথুরাম গডসে, গান্ধী হত্যার দিনে গান্ধী সম্পর্কে এ মন্তব্য গোটা দেশকে প্রবল নাড়া দিয়েছে। আর দিল্লির নির্বাচনী প্রচারে বিজেপি নেতারা বারবার বলেছেন, বিজেপিবিরোধীদের গুলি করে মারো। সেদিনই কেরলের এক জনসভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে রাহুল গান্ধী তীব্র ভাষায় আক্রমণ করে বলেছেন, মোদি ও নাথুরাম গডসে একই আধুলির দুই পিঠ। রাহুলের বক্তব্য ছিল আরো স্পষ্ট। রাহুল কেরলের সংসদ সদস্য। তিনি সেখানে বলেছেন, নাথুরাম গডসের হিংস্রতা, ক্রোধ ও ঘৃণা নরেন্দ্র মোদির মধ্যেও রয়েছে। গডসে কাউকেই বিশ্বাস করতেন না, ভালোবাসতেন না, কারো কথা ভাবতেন না। একই অবস্থা আমাদের প্রধানমন্ত্রীর। তিনি শুধু নিজেকে ভালোবাসেন, নিজেকে বিশ্বাস করেন। দেশের কোটি কোটি মানুষের কথা শোনার তাঁর সময় নেই। এদিন গান্ধীজির ৭২তম প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি এ কথা বলেছেন।

গান্ধীজি সব মানুষের বক্তব্যের মধ্যে সত্যের সন্ধান করতেন। এটাই ভারতের সংস্কৃতি ও পরম্পরা। আমাদের দেশের মহান ব্যক্তিরাই মানুষের মধ্যে সত্যকে জানিয়ে দেওয়ার অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। কিন্তু আজ এক অজ্ঞ ব্যক্তি এই পরম্পরাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন। নরেন্দ্র মোদির মধ্যে মানুষের জন্য ঘৃণা ও ক্রোধই অবশিষ্ট রয়েছে। তিনি মানুষের সঙ্গে শক্তির সন্ধান রাখেন না। গডসে যখন গান্ধীজিকে গুলি করেন, তখন তিনি গান্ধীজির চোখের দিকে তাকাতে পারেননি। কারণ গডসে ছিলেন এক মিথ্যুক, আর মিথ্যুকরা কখনো সত্যের দিকে তাকাতে পারে না।

রাহুল গান্ধী বলেন, নতুন নাগরিক আইনের দ্বারা নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপি দেশকে ভাগ করতে চাইছে এবং ঘৃণার বাতাবরণ তৈরি করছেন। তিনি প্রশ্ন করেন, আমি ভারতীয় কি না তা মোদি বলে দেবেন, কে ভারতীয় আর কে ভারতীয় নয়, এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব তাঁকে কে দিয়েছেন বলেও প্রশ্ন তোলেন। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ চালিয়ে যেতে হবে। একইভাবে আমাদের গডসে ও মোদির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে হবে। এতেই আমাদের একদিন জয়লাভ হবে।

শুধু গেরুয়া বাহিনী সরকারই নয়, স্বয়ং ভারতের রাষ্ট্রপতি কোবিন্দকে দিয়ে বলানো হয়েছে, গান্ধীজি চেয়েছিলেন ভারত থেকে সংখ্যালঘু মুসলমানদের তাড়িয়ে দিতে। সেই কাজই এখন তাঁর সরকার করছে। রাষ্ট্রপতি ইতিহাস জানেন না। গান্ধীজির বক্তব্য উদ্ধৃত করে কংগ্রেস সংসদ সদস্য শশী থারু বলেছেন, গান্ধীজির বক্তব্য বিকৃত করা হয়েছে। গান্ধীজি বলেছিলেন, ভারত থেকে যদি সব মুসলমানকে তাড়ানো হয়, তবে দেশ চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাবে। শশী থারু অভিযোগ তোলেন, ১৯৪৭ সালে ভারতের জমি ভাগ হয়েছিল। ২০২০-এ মোদি ভারতের অন্তরাত্মা ভাগ করছে। তিনি বলেন, ‘এরা হিন্দু বনাম মুসলিম দেশদ্রোহী বনাম দেশভক্ত, হিন্দিভাষী বনাম অহিন্দিভাষীতে দেশের বিভাজন করছে। এই সরকারই আসলে টুকরা টুকরা গ্যাংয়ে পরিণত হয়েছে।

কুনাল কামরায় উড়ানে নিষেধাজ্ঞার প্রসঙ্গে থারু বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির বক্তৃতায় স্ট্যান্ডআপ ইন্ডিয়ার কোনো উল্লেখ নেই। কারণ সরকার স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ানদের নিষেধাজ্ঞায় ব্যস্ত।’ এসপির অখিলেশ যাদব ও জেডিইউর রাজীব রঞ্জন সিংহ দাবি তোলেন জনগণনার জাতিভিত্তিক গণনা করা হোক।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, নির্বাচনে জয়লাভ করার জন্য মোদি ও পশ্চিমবঙ্গের দিদি একই পথের পথিক। দিল্লির নির্বাচনে প্রচারে গিয়ে দিল্লির সংসদ সদস্য প্রভাস ভার্মা ভোটারদের সতর্ক করে বলেছেন, শাহিনবাগে যাঁরা ধরনায় আছেন, নির্বাচন মিটে গেলে তাঁদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে মা-বোনকে ধর্ষণ করা হবে। তাঁর এই বক্তব্যের প্রতিবাদ ১৭৫ সংস্থা, যাঁরা বেশির ভাগই মহিলা। তাঁরা প্রধানমন্ত্রীকে একটি চিঠি দিয়েছেন—ভার্মার উক্তির জন্য নির্বাচন কমিশন ৯৬ ঘণ্টা তার প্রচার বন্ধ রেখেছিলেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায়, ১৯২৪ সালে অ্যাড্লফ হিটলার লিখেছিলেন, ‘PROPAGANDA IS A TRULY TRERRIBLE WEAPON IN THE HANDS OF AN EXPERT.’

ভারতের আর্থিক অবস্থা এখন তলানীতে গিয়ে ঠেকেছে। সাম্প্রতিক ২০২০-২০২১-এর বাজেট দেখে জওয়াহেরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপিকা জয়তি ঘোষ একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে বলেছেন, ভারত অর্থনীতির দিক থেকে দেউলিয়ার পথে এগোচ্ছে। তাই দেশের মূল্যবান সম্পদ অম্বানি ও আদানি গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়ার ইঙ্গিত স্পষ্ট। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন এ ব্যাপারে একটা স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন। বাজেটে বলা হয়েছে, এয়ার ইন্ডিয়া, হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম, জীবনবীমা করপোরেশন, কোল ইন্ডিয়া, রেলওয়ে, এনএসপিসি, এনটিপিসি। একমাত্র এয়ার ইন্ডিয়া ছাড়া সবই লাভজনক প্রতিষ্ঠান। আর এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে তিলে তিলে ৬০ বছর ধরে গড়ে তুলেছে কংগ্রেস সরকার। সুতরাং একদিকে গেরুয়া বাহিনীর ভোটব্যাংকের খেলা, অন্যদিকে দেশের কোটি কোটি যুবক-যুবতীকে বেকার রাখা।

 

লেখক : পশ্চিমবঙ্গের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা