kalerkantho

সোমবার । ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ৪ ফাল্গুন ১৪২৬। ২২ জমাদিউস সানি ১৪৪১

করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে হতে হবে যত্নবান

ইয়াং তিয়ান

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



উহানের নতুন করোনাভাইরাস আতঙ্ক ছড়িয়েছে। হুবেই প্রদেশে কয়েক কোটি মানুষকে রীতিমতো বন্দি করে রাখা হয়েছে। এরই মধ্যে এ রোগে মৃতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে। আক্রান্ত প্রায় অর্ধ লাখ মানুষ। এদের বেশির ভাগই চীনের এই প্রদেশটির বাসিন্দা। তবে কানাডা, সিঙ্গাপুর ও রাশিয়া থেকেও সংক্রমণের খবর পাওয়া গেছে। এই ভাইরাস ঠিক কতটা সংক্রামক ও প্রাণঘাতী তা আমরা এখনো জানি না। কত দূর পর্যন্ত ছড়িয়েছে তাও আমাদের জানা নেই। এই ভাইরাস নিয়ন্ত্রণযোগ্য কি না তাও জানা হয়নি। এ দফায় চীনের ক্ষমতাসীনরা থাকা শক্তিশালী মানুষেরা কিছু মৌলিক প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে।

পাশাপাশি আরেকটি বিষয়ও আমাদের নজরে পড়ছে, চীনের মানুষদের ব্যাপারে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া আতঙ্ক। পেশা বা জীবনের খাতিরে বহু চীনা নাগরিক প্রবাস জীবনযাপন করে। দেশের বাইরে তারা বড় ধরনের বৈষম্যের শিকার হচ্ছে।

চীনের সংকট মোকাবেলার সক্ষমতা আমরা দেখেছি ২০০৮ সালে সিচুয়ানের ভূমিকম্পের পর। এবারও তারা বিস্ময়কর দ্রুততায় হাসপাতাল নির্মাণ করে ফেলেছে। কিন্তু তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে চিকিৎসাকর্মী এবং সরঞ্জামের ক্ষেত্রে। অসুস্থদের ন্যূনতম সেবা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় কর্মকর্তাদের ব্যর্থতা যতই স্পষ্ট হয়েছে ততই বেড়েছে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ। বিশেষ করে এই ভাইরাস সম্পর্কে সতর্ককারী চিকিৎসক লি ওয়েনলিঙের মৃত্যু পরিস্থিতিকে আরো উত্তপ্ত করে তোলে। এই চিকিৎসকের মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করেছিল পুলিশ। 

চীনের জনগণের মধ্যে কিছু ক্ষোভ রয়েছে। এই ক্ষোভের কারণে প্রতিবারই আড়াল করার প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু ঘটনা প্রকাশ করার পরিবর্তে তা লুকিয়ে ফেলা হয়। কর্তৃপক্ষ স্থানীয় কর্মকর্তাদের করোনাভাইরাস আক্রান্তদের সংখ্যা প্রকাশ করতে বললেও চীনের সাংবাদিক ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর কড়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। করোনাভাইরাসের বিস্তার পুরো দেশের মানুষকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। শারীরিকভাবে আক্রান্ত না হলেও মানসিক ও অর্থনৈতিকভাবে কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সবাই। প্রশ্ন উঠেছে কর্তৃপক্ষের মানসিকতা নিয়ে। অনেকেই মনে করেন, শি চিনপিংয়ের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা, প্রযুক্তির ওপরে আদর্শকে স্থান দেওয়ার প্রবণতা খারাপ খবরকে আড়াল করার সংস্কৃতিকেই আরো জোরদার করেছে। এ কারণেই ব্যক্তিগত বার্তা দেওয়ার জন্য ডা. লিকে শাস্তি পেতে হয়েছে। ওই বার্তায় অন্য চিকিৎসকদের কাছে এই ভাইরাসের বিস্তার নিয়ে আলোচনা করেছিলেন তিনি। 

চীনের ব্যবস্থা অত্যন্ত কঠোর। তবে এর কার্যকারিতা কতটুকু তা এখনো স্পষ্ট নয়। সাম্প্রতিক খুব ধীরগতিতে হলেও আক্রান্তের সংখ্যা কমছে। এই প্রবণতাকে স্বাগত জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। প্রতিবেশী দেশগুলোও এ ক্ষেত্রে দুর্দান্ত পদক্ষেপ নিয়েছে। তারা চীনের সঙ্গে সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞই স্বাস্থ্য সচেতনতার দিকে নজর দিতে বলেছেন। এ বিষয়টি হয়তো রোগ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। তবে অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করা কঠিন। আমাদের মানবিক বোধ ও বিবেচনা নিয়ে কাজ করতে হবে। প্রতিক্রিয়া হতে হবে যথার্থ। কাজ করতে হবে বিবেচনা বোধ থেকে।

পাশাপাশি এটাও মনে রাখতে হবে, চীন থেকে এ রোগ ছড়ালেও সব চীনাই কালপ্রিট নয়। অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে এরই মধ্যে সংবাদ শিরোনাম হয়েছে ‘চীনের ভাইরাস’, ‘চীনের শিশুরা ঘরেই থাকুক’। ফ্রান্সেও একই ধরনের সতর্কতা জারি করা হয়েছে। যেন ওই সব দেশে থাকা পূর্ব এশিয়ার মানুষ পশ্চিমাদের জন্য বড় ধরনের স্বাস্থ্য হুমকি তৈরি করেছে। যদিও স্থানীয় সরকার বারবারই বলছে, সাধারণ মানুষের করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় নেই বললেই চলে।

শুধু চীনারা নয়, এশীয় বংশোদ্ভূত অনেকেই এই সংকটের শিকার। চীনারা ‘বাদুড়ের স্যুপ খায়’—এই গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর ককেশীয় এক বিক্ষোভ সভায় এক ব্যক্তি একটি পোস্টার নিয়ে হাজির হন। সেখানে লেখা ছিল, ‘চীন, নড়াচড়া করে এমন যেকোনো কিছুই খাওয়া বন্ধ করো’।

করোনাভাইরাসের খবর আসার আগ পর্যন্ত পূর্বে ভ্রমণে যাওয়া মানেই ছিল সি-ফুড বাজারে যাওয়া। আর পুরো অভিজ্ঞতা ইনস্টাগ্রামে দেওয়ার মতো অভিজাত একটি বিষয় ছিল। তখন হয়তো বাদুড়ের স্যুপ খাওয়াটাও একটা সম্মানজনক বিষয় ছিল। যেকোনো আড্ডায় এই গল্প বলাই ছিল গর্বের বিষয়। কত অনুষ্ঠানে যে সাপ-বাদুড় রান্নার রেসিপি দেওয়া হয়েছে তার কোনো হিসাব নেই। এখন এই বিষয়গুলোকেই চীনের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

যেকোনো দেশই তাদের জনগণকে রক্ষায় এ ব্যাপারে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেবে। তবে তা যেন আর কাউকে হেয় করা না হয়।

 

লেখক : অস্ট্রেলিয়ায় গার্ডিয়ানের সাংবাদিক

সূত্র : উপসম্পাদকীয়, গার্ডিয়ান

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা