kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৭ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৫ জমাদিউস সানি ১৪৪১

দিল্লির চিঠি

বাংলাদেশের অর্থনীতির বিকাশে নয়া মাইলস্টোন পদ্মা সেতু

জয়ন্ত ঘোষাল

২৭ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বাংলাদেশের অর্থনীতির বিকাশে নয়া মাইলস্টোন পদ্মা সেতু

শেখ হাসিনা একটা মস্ত বড় কাজ করে ফেললেন। অবশেষে পদ্মা সেতু নির্মাণকাজ কার্যত শেষ হতে চলেছে। শতকরা ৮০ ভাগ কাজ শেষ। বিমানের গবাক্ষ থেকে তিনি এই নির্মাণের ছবি তুলছেন নিজেরই মোবাইলে। সারাক্ষণ চারদিকে নেতিবাচক খবর শুনতে শুনতে কান ক্লান্ত, দেখতে দেখতে চোখ ক্লান্ত। এমন একটা সময় দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হতে চলেছে। একাত্তর সালের যুদ্ধের সময় যেভাবে পাকিস্তান সেনা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সেতু ও অন্য সব পরিকাঠামো ধ্বংস করেছিল, তা ঢাকার মানুষ কোনো দিনও ভুলতে পারে না। মেঘনা সেতু আর আজকের পদ্মা সেতু বাংলাদেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের যোগাযোগব্যবস্থাকে কিভাবে ধরে রাখতে পারে তা-ও তো কারো অজানা নয়।

ঢাকা থেকে একদা খুলনা যাওয়ার সময় স্টিমার যাত্রার অভিজ্ঞতা হয়েছিল। সে যাত্রা সুখকর ছিল না। বিশাল এক দোতলা স্টিমার। কিন্তু সেখানে যেভাবে দেশের গণদেবতা থিক থিক করছিলেন, যেভাবে বসেছিলেন তা দেখে মন বেদনাতুর হয়ে যায়। ক্যান্টিনের মারামারি, তারপর পদ্মার তীরে সারিবদ্ধ ট্রাক আর বাস, ব্রিজ না থাকায় মাঝে রেলপথও ছিল, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষারত, কার্যত একটা দিনই অতিবাহিত হয়ে গেল। সাংবাদিক হিসেবে সেটা একটা দারুণ অভিজ্ঞতা ছিল বটে; কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের এই দুর্দশা দেখে খুব খারাপ লেগেছিল।

তখন থেকেই শেখ হাসিনা পদ্মা নদীর ওপর সেতুটি নির্মাণে সচেষ্ট ছিলেন। কিন্তু কাকে দিয়ে এই সেতুটি করানো হবে, তা নিয়েও কম বিতর্ক হয়নি। মালয়েশিয়া নাকি চীন—সংবাদমাধ্যমে সে বিতর্কও চলল অনেক দিন। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমও যথেষ্ট উদারবাদী। ভারতের সংবাদমাধ্যমে যতটা মোদি সরকারের বিরোধিতা হয়, ঢাকায় হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা তার চেয়ে কম নয়; বরং বেশিই দেখি তো। পদ্মা সেতুর দুর্নীতি টেন্ডার নিয়ে তখন ঢাকার সংবাদপত্রগুলোতে প্রচুর লেখালেখি। ভারতের সংবাদমাধ্যমেও তখন পদ্মা সেতু নিয়ে লেখালেখি হয়। বিশ্বব্যাংক নাকি এই সেতু নির্মাণের জন্য টাকা দিতেই রাজি নয় এসব বিতর্কে। সে সময়টা শেখ হাসিনার জন্যও এ বিষয়ে যথেষ্ট প্রতিকূল ছিল। তবু তিনি ধীরে ধীরে এই প্রতিকূলতা থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছেন। এরপর দিল্লির একটি সংবাদপত্রে হঠাৎ পড়লাম, এই সেতুটি নাকি নির্মাণ করে দিচ্ছে চীন। বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জানতে চাইলাম। তখন জানলাম এই সেতু নির্মাণে চীনের কিছু ইঞ্জিনিয়ার কাজ করেছেন বটে; কিন্তু চীনা সংস্থার প্রযুক্তিগত কাজ করার মানে কাজটা চীনের করে দেওয়া নয়। আবার ভারত যখন কোনো দেশের কাছ থেকে ঋণ নেয়, তখন সেটা তাকে শোধ করতে হয়, ঋণের অর্থ মানে কিন্তু দাসখত লিখে দেওয়া নয়। ভারত তো আইএমএফ থেকে ঋণ নিয়েও শোধ করেছে, তাতে তো ভারতকে সার্বভৌমত্ব বন্ধক রাখতে হয়নি। বিশ্বব্যাংক যখন পদ্মা সেতুর জন্য অর্থ সাহায্য দেওয়া বন্ধ করে, তখন হাসিনা সরকারের মনে হয়েছিল, এ ঘটনার পেছনে কিছু কর্মকর্তার বড় ষড়যন্ত্র আছে। তখন শেখ হাসিনা বলেছিলেন, সব ষড়যন্ত্র বন্ধ করে দিয়ে এই সেতু আমরা বানাবই, আর এই সেতু আমরা নির্মাণ করব নিজেদের সামর্থ্যেই। শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে হাসিনা এই পদ্মা সেতুর কাজ সমাপ্ত করতে যাচ্ছেন; আর চীন নয়, রাশিয়া নয়—এই সেতুটি নির্মাণ করছে সার্বভৌম বাংলাদেশ সরকারই।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রেসসচিবের বিবৃতিটিও পড়লাম। যখন পদ্মা সেতুর কাজ শেষ হতে চলেছে, তখন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ পালন হতে চলেছে মহাসমারোহে ঢাকায়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এখনো সরকারিভাবে নিশ্চয়তা না জানালেও আমি প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সচিবালয় থেকে যা শুনেছি, তাতে মোদির ঢাকা সফর প্রায় নিশ্চিত। মোদি যখন নিজেই যেতে আগ্রহী, তখন আর তাঁকে বাদ সাধবে কে?

পদ্মা সেতু হলো একটি মাল্টিপারপাস রোড রেল ব্রিজ। এখন বঙ্গবন্ধু নামাঙ্কিত যমুনার ওপর যে সেতু সেটিই সর্ববৃহৎ; কিন্তু পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্পূর্ণ হলে এটিই হবে সবচেয়ে বড়। মুন্সীগঞ্জ, লৌহজং থেকে শরীয়তপুর-মাদারীপুরে সংযোগ স্থাপন হবে। ফলে দক্ষিণ ও পশ্চিম ভাগ যুক্ত হবে উত্তর-পূর্ব বাংলাদেশের সঙ্গে। প্রায় তিন হাজার ১৮৪ কিলোমিটার সড়ক, অ্যাপ্রোচ রাস্তাই হবে ১২ কিলোমিটার।

২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে এই সেতুর কাজ শেষ হয়ে যাবে—এমনটাই প্রত্যাশা। এই বহুমুখী সেতুটি বাংলাদেশ ব্রিজ অথরিটি দ্বারাই নির্মাণ হচ্ছে। ৪২টি পিলার হচ্ছে এই সেতুটিতে।

যেকোনো সভ্যতা, যেকোনো দেশের উন্নয়ন দাঁড়িয়ে আছে সে দেশের পরিকাঠামোর পরিস্থিতির ওপর। আজ পৃথিবীর প্রতিটি দেশ কোনো না কোনো একটি বড় স্থাপত্যের নিদর্শনকে ব্র্যান্ড হিসেবে তুলে ধরে। ফ্রান্সে আইফেল টাওয়ার অথবা জাপানের বুলেট ট্রেন। ভারতেও বুলেট ট্রেন তৈরির চেষ্টা করছেন নরেন্দ্র মোদি। করছেন জাপানি প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে। দেখুন না হাওড়া ব্রিজ দেখলে কলকাতার কথাই তো সবাই মনে করেন, তা-ই না। বাংলাদেশের অর্থনীতি যে অগ্রগতির পথে এত বাধা, এত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও সে কথা তো আজ গোটা দুনিয়ার অর্থনীতিবিদরা স্বীকার করছেন। পদ্মা সেতু নির্মাণ বাংলাদেশের এই উজ্জ্বল ছবিটিকেই গোটা দুনিয়ার সামনে তুলে ধরবে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে এর চেয়ে বড় শ্রদ্ধাঞ্জলি আর কী হতে পারে?

তবে উন্নয়নকামী রাষ্ট্রে বিদেশি রাষ্ট্র যখন আর্থিক সহয়তা দিয়ে পরিকাঠামো গড়ে তুলতে সাহায্য করে, তখন সে ভূমিকার সঙ্গে কূটনীতির মারপ্যাঁচ যুক্ত হয়ে যায়। অধুনা চীন এখন মিয়ানমার থেকে শ্রীলঙ্কা-পাকিস্তান তো বটেই সর্বত্র, বিশেষত সীমান্তবর্তী বন্দর বা সীমা-সড়ক নির্মাণকাজে ব্যাপকভাবে আর্থিক অনুদান দিচ্ছে। এটা চীনের নয়া expansanism-এর বৈশিষ্ট্য। ভারত এ কাজে চীনের মতো সক্রিয় নয়। সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিবশঙ্কর মেনন একদা আমাকে বলেছিলেন, এ ব্যাপারে চীনের যে অগ্রাধিকার আছে, আমাদের নেই। প্রথমত আমাদের চেয়ে চীনের আর্থিক রাজকোষ, বিদেশি মুদ্রা ভাণ্ডার বেশি শক্তিশালী। দ্বিতীয়ত মেনন বলেছিলেন, মনমোহন সিংহ জামানায় যখনই ভারত বাংলাদেশ-মিয়ানমার-শ্রীলঙ্কা বা নেপাল সীমান্তে সড়ক করার জন্য অর্থ সাহায্যের প্রস্তাব আনত, তখনই ভারতের গ্রামীণ উন্নয়ন মন্ত্রী বলতেন, দেশের ভেতরেই কত শত শত গ্রামের কাঁচা রাস্তা পাকা হলো না। পূর্ত দপ্তর টাকা চাইছে। নিজের দেশের ভেতর রাস্তা আর সেতুর পরিকাঠামো না বানিয়ে অন্য দেশে পরোপকার করতে যাব কেন? ভারতের এ অনীহায় চীন আরো এগিয়ে আছে।

তবে আমি বলব, বাংলাদেশের মতো এত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রটিকে নিয়ে চীন আর ভারতের যখন দড়ি টানাটানি হচ্ছে, তখন পদ্মা সেতুর কূটনীতি নিয়েও শেখ হাসিনা পরিণত মনস্কতা প্রদর্শন করেছেন। পাকিস্তানও চীনের পেছনে দাঁড়িয়ে পুরো ঘটনাপ্রবাহটি দেখছে। ঢাকার পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতকে কয়েক বছর আগে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়। অভিযোগ উঠেছিল যে ওখানে থেকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত ঘন ঘন জামায়াতের সঙ্গে বৈঠক করছেন। সম্প্রতি ঢাকায় আবার পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে কাজ শুরু করেছেন। এ অবস্থায় শেখ হাসিনা চীনা কন্ট্রাক্টর ও বাস্তুবিদদের সাহায্য নিলেও পদ্মা প্রকল্পটি চীনা সরকারের ওপর তুলে দেননি। তবু চীনের ভূমিকা নিয়ে অনেকের প্রশ্ন আছে। আবার ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত বলছেন, বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক চলতি সময়ে সবচেয়ে ভালো।

ভারত করেনি কিন্তু চীন পুরো সেতু নির্মাণের ব্যয়ভার বহন করতে চেয়েছিল। শেখ হাসিনা সে প্রস্তাবে রাজি হননি। তাই আজ পদ্মা সেতুর নির্মাণ বাংলাদেশের নয়া আধুনিক জাতীয়তাবাদের গরিমার সঙ্গে যুক্ত হবে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে পদ্মা সেতু বাংলাদেশের অর্থনীতির বিকাশ হবে এক নয়া মাইলস্টোন।

লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠ’র বিশেষ প্রতিনিধি

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা