kalerkantho

শনিবার । ৯ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৭ জমাদিউস সানি ১৪৪১

মনের কোণে হীরে-মুক্তো

ন্যায়াচরণ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে অতি-জাতীয়তাবাদ যায় না

ড. সা’দত হুসাইন

২৫ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ১১ মিনিটে



ন্যায়াচরণ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে অতি-জাতীয়তাবাদ যায় না

দেশপ্রেম একটি মহৎ গুণ। দেশপ্রেমিক সমাজে শ্রদ্ধার পাত্র। তাঁকে লোকজন শ্রদ্ধা করে, ভালোবাসে। তাঁর মঙ্গল কামনা করে। তাঁর বক্তব্য মন দিয়ে শোনে। তাঁকে কাছে পেলে মানুষ কৃতার্থ বোধ করে। দেশপ্রেমিকদের মধ্যে কেউ কেউ জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়। সমাজের সাধারণ মানুষ দেশপ্রেম এবং জাতীয়তাবাদের মধ্যে তেমন একটা পার্থক্য খুঁজে পায় না। তারা ধরে নেয়, যে ব্যক্তি দেশকে ভালোবাসবে জাতীয়তাবাদ তাকে শক্তভাবে আকর্ষণ করবে—এটাই স্বাভাবিক। দেশপ্রেম বলতে শুধু দেশের মাটি-পানি, মাঠ-ঘাট, বনবাদাড়, গ্রামগঞ্জ, শহর-বন্দরকে ভালোবাসা বোঝায় না। দেশপ্রেম বলতে দেশের প্রকৃতি, প্রাণী এবং মানুষ সবাইকে ভালোবাসা বোঝায়। তবে দেশপ্রেমের মধ্যে অন্যদেশ, জাতি, গোষ্ঠী, অঞ্চল-এলাকাকে বিরূপ মনোভাব, ঘৃণা কিংবা বৈষম্যের দৃষ্টিতে দেখার উপাদান নাই। দেশপ্রেম বলতে নিজের দেশকে ভালোবেসে, দু-একটি সত্যিকার অর্থে শত্রু দেশ ব্যতিরেকে, অন্য সব দেশ ও জাতিকে সুদৃষ্টিতে দেখার প্রবৃত্তিকে বোঝায়।

জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হওয়া দেশপ্রেমের মতোই একটি ভালো গুণ। পার্থক্য হচ্ছে জাতীয়তাবাদে নিবেদিত ব্যক্তির কাছে তার নিজের দেশ বা জাতির স্থান সবার ঊর্ধ্বে। অন্য দেশ বা জাতির প্রতি তার বিদ্বেষ না থাকলেও তাদের গুরুত্ব নিজ দেশ বা জাতির সমান নয়। এই উপলব্ধি সময়-বিশেষে দেশ-জাতির প্রতি সাধারণ আনুগত্য ছাড়িয়ে এক ধরনের গর্ববোধ ও অহংকারে পর্যবসিত হয়। আশপাশের লোকজন এই মানসিকতাকে প্রশ্রয় দেয়, কখনো বা উসকানি দেয়। বিশ্বমানবতার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও দায়বদ্ধতা থেকে জাতীয়তাবাদে আসক্ত ব্যক্তি ও গোষ্ঠী ধীরে ধীরে সরে আসে। My country, right or wrong স্লোগান দিয়ে তারা অন্য দেশ ও জনগোষ্ঠীকে অবজ্ঞা ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতে শুরু করে। তাদের ন্যায্য অধিকারকে অবমূল্যায়ন করতে কুণ্ঠাবোধ করে না। নিজের দেশ, জাতি ও গোষ্ঠীর জন্য অন্যায় সুবিধা আদায়ের মধ্যে তারা খারাপ কিছু দেখে না; বরং সুবিধা আদায়ের জন্য তারা এক ধরনের গর্ববোধ করে, প্রশংসা পাওয়ার দাবি করে। যেভাবে হোক নিজের দেশ ও জাতির জন্য বাড়তি সুবিধা আদায় তাদের দৃষ্টিতে একটা বাহাদুরির কাজ। এমন কাজ তাদের সমাজে উঁচুস্তরে অধিষ্ঠিত করবে, এটি তাদের বদ্ধমূল বিশ্বাস। সমাজও তাদের স্বার্থে সম্পন্ন অন্যায্য-অনৈতিক কাজের স্বীকৃতি দিয়ে জাতীয়তাবাদী হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিবর্গের বিশ্বাসকে সুদৃঢ় করে তোলে।

জাতি-রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে দেশপ্রেম এবং জাতীয়তাবাদ অনেকটা সমার্থক হয়ে দাঁড়ায়। এখানে দেশের জনগণের মধ্যে কোনোরূপ বিভাজন থাকে না। দেশকে ভালোবাসার মানে দাঁড়ায় দেশের সমগ্র জনগণকে ভালোবাসা। জনগণের  একাংশের সঙ্গে অন্য অংশের বৈষম্যের অবকাশ না রাখা। দেশের আয়তন যখন অনেক বড় হয়, দেশে যখন বিভিন্ন গোত্র, জনগোষ্ঠী,  সম্প্রদায়, স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের এলাকা, ভাষাভাষী লোক থাকে, তখন জাতি বলতে অনেকে তার নিজস্ব বৃহৎ জনগোষ্ঠী বা একই ভাষার লোককে বোঝায়। বাকিদের সে সংখ্যালঘু, আদিবাসী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ইত্যাদি হিসেবে গণ্য করে। এ ধরনের লোকের জাতীয়তাবাদী চিন্তা দেশপ্রেমের সঙ্গে সমার্থক নয়। যেসব দেশে অনেক জাতি বাস করে, সেসব দেশের একটি প্রদেশ বা অঞ্চল হয়তো বা একটি বিশেষ জাতির লোক নিয়ে গঠিত। সেই বিশেষ জাতির জাতীয়তাবোধ এবং দেশপ্রেম আলাদা হতে পারে। জাতিগত কারণে এক প্রদেশের লোকের সঙ্গে অন্য প্রদেশের লোকের বৈরিতা সৃষ্টি হতে পারে। এর মধ্যে এক প্রদেশ কর্তৃক অন্য প্রদেশকে শোষণ করার কাহিনি থাকলে বৈরিতা তীব্র আকার ধারণ করে। জাতীয়তাবোধে উদ্বুব্ধ ব্যক্তিরা নিজ জাতি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে অন্যায় বা অনৈতিক আচরণ করাকে দোষের কাজ মনে করে না; বরং একে গৌরবের কাজ মনে করে। অনিয়ম করে হলেও নিজের জাতির লোকের উপকার করতে পারায় এক ধরনের তৃপ্তি অনুভব করে।     

আজকাল জাতীয়তাবাদকে ভৌগোলিক সীমারেখার বাইরে নিয়ে ধ্রুপদি সংজ্ঞার কিছুটা বিচ্যুতি টানা হচ্ছে। এখন আদর্শিক অনুভূতির ওপর ভিত্তি করে জাতীয়তাবাদকে এক ধরনের নতুন রূপে উড়ানো হচ্ছে। যেমন ধর্মীয় সমাজচিন্তা, রাষ্ট্রচিন্তাকে জাতীয়তাবাদের সমতলে প্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টা চলছে। একই ধর্মীয় বিশ্বাসে নিবেদিত ব্যক্তিরা নিজেদের সমজাতীয়তাবাদভুক্ত লোক মনে করে। এই গোত্র-চেতনায় উদ্বুদ্ধ ব্যক্তিরাসহ গোত্রীয় লোকদের স্বার্থে অন্যায়-অনিয়ম করতে দ্বিধাবোধ করে না। এরূপ কাজ করতে তারা গর্ব অনুভব করে। তারা মনে করে, সমজাতীয় লোকের প্রতি তারা দায়িত্ব পালন করেছে মাত্র।

জাতীয়তাবোধ জাতি-রাষ্ট্রের জন্য, নিজ গোত্র ও নিজ অঞ্চলের জন্য উপকারী এবং উপযোগী হলেও ন্যায়াচরণ, মানবাধিকার এবং গণতান্ত্রিক আদর্শের সঙ্গে কতদূর সংগতিসম্পন্ন সে নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সময়-বিশেষে জাতীয়তাবোধ অতিজাতীয়তাবোধে রূপান্তরিত হয়। কট্টর জাতীয়তাবাদীরা তখন অন্য জাতি, সম্প্রদায় এবং গোত্রের প্রতি বিদ্বেষ ভাবাপন্ন হয়ে পড়ে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তারা ন্যায়াচরণের প্রতি গুরুত্ব দেয় না। কেউ ন্যায়াচরণ-সংক্রান্ত বিষয়টি উত্থাপন করলে হয় তাকে বাক্য সন্ত্রাসের মাধ্যমে দাবিয়ে দেওয়া হয় অথবা নানা ছলে পুরো বিষয়টিকে এড়িয়ে যাওয়া হয়। যেকোনো  উপায়ে জাতি, গোত্র, সম্প্রদায়ের অনুকূলে সিদ্ধান্ত নিয়ে তারা নিজেরা যেমন এক ধরনের তৃপ্তি অনুভব করে, তেমনি তাদের জাতি, গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের লোকেরা তাদের বাহ্বা দিতে থাকে। তাকে যোগ্য নায়কের উচ্চাসনে প্রতিষ্ঠিত করে। অথচ পুরো কাজটি ন্যায়াচরণের পরিপন্থী। নিজের জাতি-গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়কে অন্যায়ভাবে সুযোগ-সুবিধা দিতে অন্য জাতি-গোষ্ঠী, সম্প্রদায়কে তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করে। অবশ্য তাদের জাতি-গোষ্ঠী, সম্প্রদায় যদি আগে বঞ্চনার শিকার হয়ে থাকে তবে তাদের জন্য বাড়তি সুবিধার ব্যবস্থা রেখে প্রথমে নিয়ম-নীতি স্বচ্ছভাবে পরিবর্তন করতে হবে। পরিবর্তিত নীতির আলোকে পূর্বে বঞ্চিত নিজ জাতি-গোষ্ঠী, সম্প্রদায়কে বাড়তি সুবিধা দিলে তা অন্যায় হবে না। চুপিসারে প্রচলিত নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে নিজ জাতি-গোষ্ঠীকে বাড়তি সুবিধা দিলে তা যে অনৈতিক এবং দুর্নীতিমূলক কাজ হবে তাতে সন্দেহ নেই।

অতি জাতীয়তাবোধ সময়-বিশেষে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ (Compatible) না-ও হতে পারে। বিশুদ্ধ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বলে যে একজন ভোটার অবারিতভাবে অন্যদের কাছে ভোট প্রার্থনা করতে পারেন। ভোটাররা তাঁদের পছন্দমতো প্রার্থীকে ভোট দেবেন। যাঁকে বেশি ভোটার পছন্দ করবেন তিনিই হবেন জনমানুষের প্রতিনিধি। বিশুদ্ধ নির্বাচন প্রক্রিয়া অনুসৃত হলে টেকনিক্যাল আপত্তি তুলে ভোটপ্রার্থী ভোটারকে নির্বাচন প্রক্রিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে ধর্ম, বর্ণ, জাতি-গোষ্ঠী, সম্প্রদায় এর ধুয়া তুলে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় একজন ভোটপ্রার্থীকে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন করা ঠিক হবে না। অথচ অনেক দেশে নানারূপ শর্ত প্রয়োগ করে এবং যোগ্যতার বাড়তি মানদণ্ডের বিপরীতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও মূল্যায়ন করে এক শ্রেণির ভোটারকে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের অনুপযুক্ত ঘোষণা করা হয়। প্রযুক্ত কোনো কোনো শর্ত জনপ্রিয় হয়ে থাকে। সে জন্য এরূপ শর্ত প্রয়োগের বিরুদ্ধে গণপ্রতিবাদ হয় না। তাই বলে এরূপ শর্তকে গণতান্ত্রিক ভাবাদর্শের (Spirit) সঙ্গে সমাঞ্জস্যপূর্ণ বলা যাবে না। খ্যাতিমান রাষ্ট্রচিন্তক কামিল দারবিশ মনে করেন বিশুদ্ধ গণতন্ত্রের একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে (অতি) জাতীয়তাবাদ। জাতীয়তাবাদ তার আবেগময় আবেদন নিয়ে অনেক লোককে এত বেশি মোহাবিষ্ট করে যে তারা যুক্তি সহকারে তাদের জাতি-গোষ্ঠী, সম্প্রদায় বহির্ভূত ব্যক্তিদের নির্মোহভাবে, যৌক্তিক বিবেচনায় মূল্যায়ন করতে পারে না। যেহেতু তারা ভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর, সুতরাং তারা অগ্রহণযোগ্য; তাদের প্রার্থী হওয়ার বা ভোট প্রার্থনা করার অধিকার নেই। এমন চিন্তাধারার কারণে দেশে-বিদেশে কিছু উপযুক্ত ব্যক্তি হয় নির্বাচন প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়েছেন, না হয় নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় দুর্লঙ্ঘ প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছেন। কোনো কোনো দেশে অতি জাতীয়তাবাদের প্রকোপে নিরীহ ভোটার (নাগরিক) সন্ত্রাসী আক্রমণের শিকার হয়েছেন। সেসব স্থানে বিশুদ্ধ গণতন্ত্র বিপন্ন হয়ে পড়েছে।

অতি জাতীয়তাবাদ ও এর প্রাসঙ্গিক চিন্তা-চেতনা এবং আদর্শিক তৎপরতা মানবাধিকারের বিপক্ষে কাজ করছে। মানুষ হিসেবে প্রত্যেক নাগরিকের কিছু অধিকার রয়েছে। এই মৌলিক অধিকারগুলো বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। জাতিসংঘের মানবাধিকার কনফারেন্সের দলিলে এ অধিকারগুলো সুস্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ আছে। জাতি-ধর্ম, গোত্র-বর্ণ, সম্প্রদায়-নির্বিশেষে এ অধিকারগুলো সবার জন্য অলঙ্ঘনীয়ভাবে সংরক্ষিত। ভিন্ন দেশি বা অন্য সম্প্রদায়ের দোহাই দিয়ে কোনো মানুষকে মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। করলে বিশ্ব মানব সম্প্রদায় কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী ব্যক্তি, গোষ্ঠী এমনকি রাষ্ট্রও জবাবদিহির আওতায় এসে পড়বে। সন্তোষজনক জবাব না পেলে লঙ্ঘনকারী ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও প্রতিষ্ঠানের ওপর শাস্তি আরোপ করা যেতে পারে।

কট্টর জাতীয়তাবাদীরা নিজের জাতি-সম্প্রদায়ের প্রতি অতি ভালোবাসা কিংবা মমত্ববোধ দেখাতে গিয়ে ভিন্ন জাতি-ধর্ম, সম্প্রদায়ের প্রতি অস্বাভাবিক বিদ্বেষ পোষণ করতে থাকে। বিদ্বেষ পর্যায়ক্রমে নিপীড়ন ও নির্মমতায় পর্যবসিত হয়। ভিন্ন জাতি-ধর্ম-বর্ণ, সম্প্রদায়ের লোকের মানবাধিকার হরণ করে তাদের বঞ্চনার শেষ প্রান্তে ঠেলে দেওয়া বা নৃশংসভাবে নিশ্চিহ্ন করাকে তারা জাতীয় কর্তব্য বলে মনে করে। তাদের বিদ্বেষ প্রসূত নিষ্ঠুর আচরণে অন্য জাতি-সম্প্রদায়ের জীবনে যে দুর্বিষহ যন্ত্রণা-বঞ্চনা নেমে আসে তা বিদ্বেষকারী কট্টর জাতীয়তাবাদীদের মোটেই স্পর্শ করে না। আক্রান্ত জাতিকে সন্ত্রাসী তৎপরতা, বঞ্চনা এবং নিষ্ঠুর প্রক্রিয়ায় নিশ্চিহ্ন করে তারা এক ধরনের পৈশাচিক আনন্দ উপভোগ করে। বাঙালি হিসেবে আমরা এ ধরনের হিংসা ও নিষ্ঠুর সন্ত্রাসের শিকার হয়েছিলাম। লাখ  লাখ বাঙালিকে খুন করা হয়েছিল, মা-বোনকে যৌন নির্যাতন করা হয়েছিল, তাঁদের সম্ভ্রম নষ্ট করা হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধে জয়ী হয়ে আমরা কিছুটা প্রতিশোধ নিতে পেরেছিলাম। কিন্তু যে অমূল্য জীবন এবং মান-ইজ্জত হারিয়ে গেছে, তা আর ফিরে পাওয়া যাবে না। তার জন্য দোষীকে উপযুক্ত শাস্তিও দিতে পারব না। জাতি হিসেবে এ দুঃখ আমাদের থেকেই যাবে।

একবিংশ শতাব্দীর প্রাক্কালে প্রত্যাশা করেছিলাম যে নতুন শতাব্দীতে আমরা ন্যায়াচরণ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং মানবাধিকার চর্চার পূর্ণাঙ্গ বিকাশ দেখতে পাব। মানবতার শান্তিময় প্রকাশ পৃথিবীকে একটি নিরাপদ আনন্দময় আবাসস্থলে পরিণত করবে। ব্যক্তি, গোষ্ঠী, জাতি মানবিক সম্পর্কের কবোষ্ণ ফল্গুধারায় অবগাহন করে সন্তৃপ্ত জীবন উপভোগ করবে। শান্তির অমৃত প্রসাদ (Peace Dividend) আমাদের এক আনন্দলোক থেকে উচ্চতর আনন্দলোকে নিয়ে যাবে। মানুষ মানুষের জন্য শুধু শান্তি এবং আনন্দের উৎস হিসেবে বিরাজ করবে। পৃথিবীর পরিচয় হবে শান্তিধাম বা আনন্দলোকরূপে।

আমাদের সে আশা পূরণ হলো না। সহস্রাব্দীর বা শতাব্দীর শুরুতে জাতিগত, গোষ্ঠীগত এবং ধর্মভিত্তিক হানাহানিতে পরিবেশ বিষিয়ে উঠল। প্রাক্তন যুগোস্লাভিয়ার ভগ্নাংশ জনপদ থেকে শুরু করে আফগানিস্তান, ইরাক, মধ্যপ্রাচ্য. এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার বহু দেশে জাতি-ধর্ম-বর্ণভিত্তিক বিদ্বেষ এবং সাম্প্রদায়িক হানাহানিতে জনপদ বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। দেশ থেকে বিতাড়িত উদ্বাস্তুর সংখ্যা বেড়ে চলছে। সশস্ত্র দুর্বৃত্ত এবং নিরাপত্তা বাহিনীর নৃশংসতায় হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। নিজের দেশ ছেড়ে প্রাণ বাঁচাতে পাশের দেশে পালিয়ে গেছে। সেখানে রাষ্ট্রচ্যুত হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। হন্তারক গোষ্ঠী বা সে দেশের সরকার নির্বিকার চিত্তে জাতিগত নিশ্চিহ্নকরণ প্রক্রিয়া দেখছে, পরোক্ষভাবে নৃশংস কর্মকাণ্ড সমর্থন করছে। গণহত্যা, মানুষের মৃত্যু কিংবা অমানবিক নিপীড়ন শাসক গোষ্ঠী এবং ক্ষমতাধর চক্রকে বিন্দুমাত্র স্পর্শ করছে না। বরং নৃশংস নিপীড়ন ও হত্যায় তারা এক ধরনের বিকৃত আনন্দ (Sadist Pleasure) খুঁজে পাচ্ছে।

গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রচলিত রাখতে বাংলাদেশ সাংবিধানিকভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ। একই সঙ্গে মানবাধিকারের প্রতিও আমরা প্রকাশ্য ঘোষণাক্রমে শ্রদ্ধাশীল। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন করে স্বাধীনতাপূর্বকালে এবং মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আমাদের ওপর যে নির্যাতন চালানো হয়েছিল তা কোনো দিন আমরা ভুলতে পারব না। আমাদের পাশের দেশের রোহিঙ্গাদের জাতিগতভাবে নিশ্চিহ্ন করার অভিযান চলছে। সেই বর্বর অভিযানের অভিঘাত এসে পড়ছে আমাদের ওপর। বাংলাদেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশ্বাঙ্গনে আমরা এর জোর প্রতিবাদ করছি। রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার আদায়ের জন্য আন্তর্জাতিক ফোরামে দাবি তুলছি। তাদের পক্ষে বিশ্বজনমত সৃষ্টির জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। কিছু সফলতা পেয়েছি সন্দেহ নেই। এ প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে আমরা বদ্ধপরিকর, যদিও সমস্যার আশু সমাধানের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।

এ পর্যায়ে বাংলাদেশি হিসেবে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে, যাতে অতি জাতীয়তাবাদ, আঞ্চলিকতাবাদ, গোষ্ঠী, সম্প্রদায়প্রীতি কিংবা ভাবনাতাড়িত আবেগের অজুহাতে আমরা যেন কোনো জাতি বা গোষ্ঠীর প্রতি অন্যায় আচরণ না করে বসি। আরো মনে রাখতে হবে জাতীয়তাবাদের কোনো খর্বাকৃতি সংস্করণের ফাঁদে পড়ে আমরা যেন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে বিসর্জন না দিই। অতি জাতীয়তাবাদ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপূরক হয় না। প্রকৃতপক্ষে এই দুই অনুভব সহযাত্রী হতে পারে বলে মনে হয় না।

লেখক : সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা