kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২ রজব জমাদিউস সানি ১৪৪১

আসাদ আমাদের অহংকার

বাহালুল মজনুন চুন্নু

২০ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



আসাদ আমাদের অহংকার

‘আমাদের দুর্বলতা, ভীরুতা, কলুষ আর লজ্জা/ সমস্ত দিয়েছে ঢেকে একখণ্ড বস্ত্র মানবিক;/আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা’—কবি শামসুর রাহমানের এই ছত্রগুলোই বর্ণনা করে শহীদ আসাদের ত্যাগ, মহিমা ও কৃতিত্ব। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে আসাদ এক গুরুত্বপূর্ণ নাম। পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়েছিলেন ছাত্রনেতা মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান আসাদ। এবং তাঁর এই আত্মত্যাগ বাঙালি জাতিকে মুক্তির সংগ্রামে প্রবলভাবে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেছিল, যা গণ-অভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন, স্বাধীনতার সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ গঠনে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ প্রভাবকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল। তাই তো তিনি পরিণত হয়েছেন বাঙালির সংগ্রাম ও রক্তাক্ত ইতিহাসের অতীব তাৎপর্যপূর্ণ একটি অধ্যায়ে। তিনি শহীদ হয়েছিলেন ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে তাই বাঙালি প্রতিবছর শ্রদ্ধাভরে পালন করে শহীদ আসাদ দিবস।

আসাদ ছিলেন একজন ছাত্রনেতা, একজন আদর্শবান সংগঠক এবং একজন নিবেদিত দেশপ্রেমিক যোদ্ধা।  ১৯৪২ সালের ১০ জুন জন্মগ্রহণ করেছিলেন নরসিংদী জেলার শিবপুর উপজেলার ধানুয়া গ্রামে। স্কুল শিক্ষক মা-বাবার ছয় সন্তানের চতুর্থ সন্তান আসাদ ছোটবেলা থেকেই ছিলেন লেখাপড়ায় অত্যন্ত মনোযোগী। স্কুলে পড়াকালীনই তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন শিক্ষা কমিশনবিরোধী আন্দোলনে। রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনায় তিনি ছিলেন প্রগতিশীল। সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও ঔপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সোচ্চার। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু পুঁথিগত বিদ্যা অর্জনে নিজেকে ব্যাপৃত রাখেননি, তিনি বেছে নিয়েছিলেন শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে সংগ্রামের ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ কঠিন এক পথ। প্রতিবাদী চেতনায় শাণিত আসাদের মাঝে ছিল দেশপ্রেম, ছিল মমতাময়ী মাটির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক। রাজপথে লড়াইয়ের পাশাপাশি তিনি নরসিংদীর রায়পুরা, মনোহরদী ও শিবপুরে সাধারণ কৃষকদের নিয়ে গঠন করেছিলেন কৃষক সমিতি। গরিব ও অসহায় ছাত্রদের শিক্ষার অধিকার বিষয়ে তিনি ছিলেন সদাই সজাগ। তাই তিনি শিবপুর নৈশ বিদ্যালয় নামে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং শিবপুর কলেজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়ে আর্থিক তহবিল গড়ে তুলেছিলেন। তবে তাঁর অধিক পরিচিতি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ঘিরেই। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে রাজপথের লড়াইয়ে তিনি ছিলেন নির্ভীক একজন সৈনিক। 

১৯৬৯ সালের জানুয়ারি মাসে দেশের ছাত্রসমাজ আইয়ুবের স্বৈরশাসন উত্খাতের জন্য আন্দোলনকে দিনদিনই বেগবান ও বিস্তৃত করেছিল। ডাকসুর ভিপি তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে ছাত্রসমাজ যূথবদ্ধভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিল। তাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে আসাদও নেমে এসেছিলেন রাজপথে। পাকিস্তানবিরোধী গণ-আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের বিভিন্ন কর্মতৎপরতায় যুক্ত ছিলেন তিনি। ৪ জানুয়ারি ছাত্রদের ১১ দফা এবং বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা দাবির সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করেন ছাত্র সংগঠনের নেতারা, যাতে প্রধান ভূমিকা রাখেন শহীদ আসাদ। ১৭ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ের বটতলায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে ছাত্ররা দেশব্যাপী সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ডাক দেন এবং পুলিশ ও ইপিআর বাহিনী কর্তৃক ছাত্র-জনতার ওপর বর্বর নির্যাতন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পবিত্রতা লঙ্ঘনের প্রতিবাদে ২০ জানুয়ারি সারা প্রদেশব্যাপী পূর্ণ হরতাল পালনের আহ্বান জানানো হয়। এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে ছাত্র-জনতার সক্রিয় সহযোগিতায় সেদিন পূর্ণ হরতাল পালিত হয়। সে দিন ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা ছিল। তথাপি ছাত্ররা মিছিলযোগে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সমবেত হন। বেলা ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় অনুষ্ঠিত এক সংক্ষিপ্ত ছাত্রসভা এবং তারপর প্রায় ১০ হাজার ছাত্রের এক বিরাট মিছিল ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে পা বাড়ায় পুলিশ, ইপিআর বাহিনীর লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাসকে উপেক্ষা করে। মিছিলটি পোস্ট গ্র্যাজুয়েট মেডিক্যাল ইনস্টিটিউটের (তৎকালীন) কাছাকাছি এলে পুলিশ তার ওপর লাঠিপেটা করে। ফলে মিছিল দ্বিখণ্ড হয়ে যায়। মিছিলের এক অংশ মেডিক্যাল কলেজের সামনের রাস্তা ধরে চানখাঁর পুলের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। পুলিশ তাদের বাধা দেয়। আসাদ ও তাঁর সহযোগী বিক্ষোভকারী ছাত্ররা সেখানে অবস্থান নিয়ে স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকেন। দুপুর ২টার দিকে মূল ঘটনাস্থলের অনতিদূরে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পূর্ব দিকের ফটকের পাশের ফুটপাতে খুব কাছ থেকে আসাদকে লক্ষ্য করে এক পুলিশ অফিসারের গুলিবর্ষণে আসাদের বক্ষ বিদীর্ণ হয়। মাটিতে লুটিয়ে পড়া আসাদকে তাঁর সঙ্গীরা হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

আসাদের মৃত্যু সংবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে শহরে নেমে আসে শোকের ছায়া। অপ্রত্যাশিত এই মর্মান্তিক সংবাদ শোনার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন স্থান থেকে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা মেডিক্যাল কলেজের দিকে ছুটে আসে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ প্রাঙ্গণে উত্তোলন করা হয় একটি কালো পতাকা। স্বতঃস্ফূর্তভাবে বের হয় বিরাট শোক মিছিল। আসাদের মৃত্যুতে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম কমিটি গোটা পূর্ব বাংলায় তিন দিনব্যাপী শোক ঘোষণা করে। পরের দিন ২১ জানুয়ারি হরতাল পালিত হয় এবং পল্টন ময়দানে গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে লক্ষাধিক লোক নগ্নপদে মৌন মিছিল বের করে রাজপথ প্রদক্ষিণ করে। প্রতিদিন সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালন, কালো ব্যাজ ধারণ, ২৩ তারিখ মশাল মিছিল ও ২৪ তারিখে দেশব্যাপী হরতাল পালিত হয়। কর্মসূচির শেষ দিনটি একটি স্বতঃস্ফূর্ত গণ-অভ্যুত্থানে রূপান্তরিত হয়। ছাত্র-জনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আইয়ুব গেটের আইয়ুবের নামফলক নামিয়ে আসাদের নাম সংযোজন করে। আমি তখন ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র। ঢাকার এই আন্দোলনের দাবানল সেখানেও পৌঁছে গিয়েছিল। আমি অন্য ছাত্রনেতাদের সঙ্গে সেই আন্দোলনে সক্রিয় ছিলাম। আসাদের মৃত্যু আমাকে শুধু শোকাহতই করেনি, পাকিস্তানি স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলনে উজ্জীবিতও করে তুলেছিল। 

আসাদের আত্মাহুতির মধ্য দিয়ে অধিকার হারা জনতার মুমূর্ষু অন্তর যেন মুত্যুঞ্জয়ী শক্তির বিজলি স্পর্শে জেগে ওঠে। আসাদের মৃত্যু গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নতুন শক্তি সঞ্চার করেছে, ভীত সংকুচিত ক্রীতদাসদের দূরে হটিয়ে দিয়ে সংগ্রামী জনতার হাতে আন্দোলনের নেতৃত্ব তুলে দিয়েছে। আসাদের মৃত্যু আন্দোলনের মশাল জ্বালানোর প্রথম স্ফুলিঙ্গ, যার মধ্য দিয়ে গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। স্বাধীনতা আন্দোলনের সুদীর্ঘ পথ পরিক্রমায় উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান একটি মাইলফলক। এই অভ্যুত্থান হলো শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে, স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে, বিদেশি প্রভুত্বের বিরুদ্ধে, সব প্রকার অনাচার, অন্যায় আর লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে একযোগে সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহ; যার ফলে পতন ঘটে আইয়ুব খানের। স্বৈরশাসনের নাগপাশ থেকে শোষিত-বঞ্চিত দেশকে মুক্ত করতে উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান যে ভূমিকা রেখেছিল, জাতির জীবনে তা অবিস্মরণীয়। আসাদের শহীদ হওয়া এই অভ্যুত্থানকে সফল করে তুলতে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিল।

আমাদের ইতিহাসের ভাঁজে ভাঁজে রয়েছে রক্তে লেখা আত্মদান আর বিজয়ের গৌরবগাথা, রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের জেল-জুলুম আর নির্যাতন ভোগের ক্ষতচিহ্ন। দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের আনন্দ-বেদনার স্মৃতিতে মোড়ানো জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস। আর এই ইতিহাসের উজ্জ্বল নাম শহীদ আসাদ। তিনি যুগ যুগ বেঁচে থাকবেন সংগ্রামে-মিছিলে, স্বাধীনতার রূপরেখায়, শিল্পীর ক্যানভাসে, বইয়ের প্রচ্ছদে, খবরের শিরোনামে, পোস্টার, ফেস্টুনে, প্রিয়জনের চিঠির পাতায়, কবির কবিতায়। আসাদ আমাদের অহংকার, আমাদের চেতনার পরতে পরতে সংগ্রামের দৃপ্ত অঙ্গীকাররূপে চির ভাস্বর হয়ে রয়েছেন, থাকবেন চিরকাল।

 

লেখক : সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা