kalerkantho

মঙ্গলবার । ৫ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৪১

হোক না দৃষ্টান্তমূলক সিটি নির্বাচন

সারওয়ার-উল-ইসলাম

১৭ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



হোক না দৃষ্টান্তমূলক সিটি নির্বাচন

এবারের ঢাকা দুই সিটির নির্বাচন জমে উঠতে শুরু করছে, আপাতদৃষ্টিতে তাই মনে হচ্ছে।

প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই পাড়া-মহল্লায় বেশ জোরের সঙ্গেই প্রার্থীরা প্রচারণায় মেতে উঠেছেন। মনে হচ্ছে যেন বিরোধী দলের প্রার্থীরাও খানিকটা সাহসের সঙ্গে ভোট চাইতে শুরু করেছেন। সরকারের পক্ষ থেকেও কিছুটা নমনীয় ভাবও পরিলক্ষিত হচ্ছে। এটা খুবই আশার কথা।

নির্বাচনে হারজিত থাকবেই। সেটা যেন ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের সিদ্ধান্তেই হয়—এই মনোভাব যাতে শেষ পর্যন্ত দুই দলের থাকে বিশেষ করে সরকারি দলের ভেতর থাকে—এমনটাই আশা করছেন সাধারণ মানুষ।

এবার মনে হচ্ছে যেন অনেক দিন পর উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণ হবে। কোনো প্রকার বিশৃঙ্খল পরিবেশ দুই দলের প্রার্থীদের মধ্যে নেই।

তবে এর মধ্যে যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলো ঘটবে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে দুই দলের প্রার্থীদেরই। সেটা হচ্ছে অতি উৎসাহী কর্মী-সমর্থকদের স্বেচ্ছাচারী মনোভাব। প্রার্থী জানবেনও না তাঁর কোনো কর্মী-সমর্থক তাঁর কাছে ভালো সাজার জন্য অপরপক্ষের প্রার্থীর বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে একটা বিশৃঙ্খলা করে নির্বাচনী পরিবেশ নষ্ট করবে।

এই অতি উৎসাহী গোষ্ঠী সব সময় সুযোগ খোঁজে—কিভাবে একটা উল্টাপাল্টা কিছু করে গণ্ডগোল বাধিয়ে নিজের গুরুত্ব কিছু বাড়ানো যায় প্রার্থীর কাছে। কিন্তু এই গুরুত্ব বাড়াতে গিয়ে এলাকার পরিবেশ নষ্ট হয়, পাশাপাশি এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশি ধরপাকড় থেকে শুরু করে ঝটিকা আক্রমণ, কখনো তা খুনখারাবির দিকে চলে যায়। কিছু নেতাকর্মী, কর্মী-সমর্থক এলাকা ছাড়া হয়। সব মিলিয়ে ভোটকেন্দ্রে ভোটারের উপস্থিতি আশানুরূপ হয় না।

উত্তরে বিএনপি মেয়রপ্রার্থী তাবিথ আউয়ালের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে এরই মধ্যে একদিন আওয়ামী লীগের আতিকুল ইসলামের নেতা-কর্মীদের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে।

আতিক তাবিথকে ভাতিজা বলেও সম্বোধন করেছেন। দুজনই দুজনের বাড়িতে গিয়ে ভোট চাওয়ার কথা বলেছেন। দক্ষিণেও তাপস আর ইশরাক বেশ জোরেশোরেই নেমেছেন। তাঁরাও ভোট চেয়েছেন দুজন দুজনের কাছে। বেশ উৎসবমুখর বা সৌহার্দপূর্ণই মনে হচ্ছে।

মেয়র প্রার্থীর চেয়ে কাউন্সিলর প্রার্থীদের নিয়ে ভয়ের আশঙ্কাটা বেশি। তাঁরা খুবই মারমুখী হয়ে থাকেন। কারণ এলাকার প্রভাব একটা বড় ফ্যাক্টর। যে কাউন্সিলর গত পাঁচ বছর এলাকার কাউন্সিলর ছিলেন তিনি জানেন কোথায় কোথায় তাঁর অবৈধভাবে টাকা আয়ের পথ আছে। তাঁর নেতাকর্মীরা কোথায় কোথায় ফুটপাতে দোকান বসিয়ে চাঁদাবাজি করেছে, তার ভাগও কিছুটা হলেও তাঁর কাছে আসত। কিভাবে ঠিকাদারদের কাজ দিয়ে কমিশন পাওয়া যেত, সেই লোভের জায়গাগুলো বেশ বড় হয়ে দেখা দেয় এই নির্বাচনের সময়টাতে। যদি কোনো কারণে এবার তাঁর কাউন্সিলর পদ চলে যায় তাহলে নতুন যিনি আসবেন তাঁর দখলে চলে যাবে সব কিছু। টাকা আয়ের সব পথ বন্ধ হয়ে যাবে। এলাকার প্রভাব-প্রতিপত্তিও যাবে। থানা-পুলিশও সমীহ করে কথা বলবে না। বিচার-সালিসে তাঁর ডাক পড়বে না। এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সম্মানিত পদ হারাবেন।

এসব কথা যখনই কোনো কাউন্সিলরের মাথায় চলে আসে তখনই তিনি মরিয়া হয়ে উঠেন আরেকবার কাউন্সিলর হওয়ার জন্য। আর তখনই তিনি কোনো কিছুকে পরোয়া না করেই সন্ত্রাসী কাজ করতে উদগ্রীব হয়ে যান। কারণ যদি এলাকায় মাদক ব্যবসায়ী থেকে থাকে, প্রতি মাসে যে মাসোহারা পাওয়া যায় থানা-পুলিশকে দিয়ে তাঁর ভাগে যা আসে তাও বিপুল পরিমাণ টাকা। সুতরাং দু-চারজনকে জখম করে হলেও তাঁকে ভয়ভীতি দেখাতে হবে বিরোধীপক্ষকে। তখনই শুরু হয় যত বিপত্তি। কেন্দ্র দখল থেকে শুরু করে বস্তির ভোট কেনা শুরু হয়ে যায়। নির্বাচনের আগের রাতে চলে টাকা ছোড়াছুড়ি। কে কত টাকা দিয়ে ভোট কিনতে পারেন, চলে সেই প্রতিযোগিতাও।

এসব কাউন্সিলরের কেউ কেউ এবারও দলীয় মনোনয়ন পেয়েছে। নানাভাবে লবিং করে টাকা ছিটিয়ে মনোনয়ন বাগিয়ে এনেছেন। সরকারকে এই প্রার্থীদের ব্যাপারে বিশেষ নজর রাখতে হবে। হোক না দু-চারটি কাউন্সিলর পদ হাতছাড়া। আসুক না বিরোধী দলের কাউন্সিলর। এলাকার উন্নয়নে তিনিও তো পারেন ভূমিকা রাখতে, যদি তাঁকে সরকারি সব ধরনের সাপোর্ট দেওয়া হয়। তাঁর দ্বারা এলাকার উন্নয়ন হলে তো সেটার কৃতিত্ব সরকারের পক্ষেই যাবে। আসল কথা হচ্ছে—আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন হলেই দেশের উন্নয়ন সম্ভব।

সরকারের সদিচ্ছা আর জনগণের প্রতি তাদের ভালোবাসা থাকলেই এবারের নির্বাচন একটি দৃষ্টান্তমূলক নির্বাচন হতে পারে, কোনো সন্দেহ নেই।

তবে একটি সুন্দর পরিচ্ছন্ন ভোট হবে কি হবে না—সে জন্য আমাদের ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে—এ রকম জ্ঞানগর্ভ কথা বলার চেয়ে আমাদের যাঁরা সুধীসমাজ আছে, তারাও এই নির্বাচন যাতে সুষ্ঠু হয় সে ব্যাপারে সরকারকে পরামর্শ দিতে পারে। যাঁদের আমরা দেখে থাকি গণভবনের রাষ্ট্রীয় কোনো অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে যেতে।

একটি সুষ্ঠু সিটি করপোরেশন নির্বাচন করে বর্তমান সরকার দেখিয়ে দিক না তারা অন্যবারের চেয়ে এবার একেবারেই আলাদা। ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার জন্য সরকারকে নানা রকম প্রচার-প্রচারণার বুদ্ধি-পরামর্শ দিতে পারে সুধীসমাজ। হয়ে যাক না একটা সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা। কে হারে কে জেতে। সরকার সত্যিকার অর্থেই যাচাই করে দেখুক না জনগণ কতটা তাদের পছন্দের জায়গায় রেখেছে।

আমরা সুষ্ঠু ও সুন্দর পরিবেশে নির্বাচন দেখতে চাই। হোক না বিএনপি প্রার্থী কিংবা আওয়ামী লীগের প্রার্থীর বিজয় বা পরাজয়। জনগণের অধিকার আছে ভোট দেওয়ার, পছন্দের প্রার্থী নির্বাচনের—এর থেকে বঞ্চিত করা কি গণতন্ত্রকে নির্বাসনে পাঠানো নয়? বঙ্গবন্ধু তো সারা জীবন এই গণতন্ত্রের জন্যই লড়েছেন।

 

লেখক : ছড়াকার ও সাংবাদিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা