kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ২৬ চৈত্র ১৪২৬। ৯ এপ্রিল ২০২০। ১৪ শাবান ১৪৪১

স্মরণ

রাষ্ট্রদূত সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী চিরদিন আমাদের মধ্যে থাকবেন

এ কে এম আতিকুর রহমান

৩ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



রাষ্ট্রদূত সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী চিরদিন আমাদের মধ্যে থাকবেন

গত ৩০ ডিসেম্বর ২০১৯ সকাল সাড়ে ১১টায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্র ক্যাডারের অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতদের অ্যাসোসিয়েশনের কার্যকরী পরিষদের একটি সভা ছিল। আমি ওই পরিষদের একজন সদস্য হওয়ায় সকাল ১০টার মধ্যেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্দেশে বাসা ছাড়ি। যানজট তেমন একটা প্রকট না হওয়ায় সাড়ে ১০টায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পৌঁছে যাই। সভা শুরু হতে প্রায় এক ঘণ্টা বাকি থাকায় ঢুকে পড়লাম মহাপরিচালক প্রশাসনের কক্ষে। বসতে না বসতেই টেলিফোন এলো। টেলিফোন ছেড়েই ডিজি সাহেব আমাকে জানালেন যে রাষ্ট্রদূত সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী গুরুতর হৃদেরাগে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন, তাঁকে এখনই সচিবের কাছে যেতে হবে। আমিও বের হয়ে যে কক্ষে আমাদের সভাটি হবে সেখানে চলে গেলাম। ওখানে তখন আমাদের দুজন অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত ছিলেন। তাঁদের সংবাদটি দিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে বাকি সদস্যরা এসে পড়লেন এবং সবাই ওই সংবাদটি জেনে গেলেন। তবে সভা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রায় এগারোটা চল্লিশের দিকে জানা গেল যে তিনি আর নেই। জানামতে, গত ২৪ ডিসেম্বর ২০১৯ তাঁকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।        

এই তো মাত্র দুই সপ্তাহ আগেও তিনি ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। রাষ্ট্রদূত মোয়াজ্জেম আলীর সঙ্গে মন্ত্রণালয়ে বা দূতাবাসে কখনো আমার কাজ করার সুযোগ ঘটেনি। তবে তাঁকে দেখেছি, কখনো কথা বলেছি। আর সৈয়দ মুজতবা আলীর ভাইপো হওয়ায় তাঁর প্রতি অন্য রকম শ্রদ্ধাবোধ কাজ করত। কারণ মুজতবা আলীর সব বই-ই আমাদের পড়া। যা হোক, মোয়াজ্জেম স্যারের সঙ্গে আমার শেষ দেখা হয় আমার খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধু ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিজয় গোখলে এক বছর আগে যখন ঢাকা সফরে আসেন তখন পররাষ্ট্রসচিব প্রদত্ত মধ্যাহ্ন ভোজে। ভারতে কর্মরত রাষ্ট্রদূত মোয়াজ্জেম আলীও তখন এসেছিলেন।

আমাদের মহান স্বাধীনতাসংগ্রামে তাঁঁর অবদানের কথা আমরা সবাই কমবেশি অবগত। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে তিনি কর্মস্থল ওয়াশিংটনে অবস্থিত পাকিস্তান দূতাবাস ছেড়ে বের হয়ে আসেন। আমেরিকাজুড়ে আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের সমর্থন আদায়ের জন্য তিনি নিরলস কাজ করে যান। প্রবাসী বাঙালিদের ছাড়াও আমেরিকার প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থনের ভিত্তি শক্তিশালী করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। নিজেকে পরিণত করেন একজন কূটনৈতিক মুক্তিযোদ্ধায়। 

রাষ্ট্রদূত মোয়াজ্জেম আলীর জন্ম সিলেটে, ১৯৪৪ সালের ১৮ জুলাই। তিনি ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসে যোগদান করেন। তিনি বাংলাদেশ দূতাবাস ওয়ারস, জাতিসংঘ, নয়াদিল্লি, জেদ্দা, ভুটান, ইরান ও ফ্রান্সে কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করেন। যত দূর মনে পড়ে, বাংলাদেশের একজন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা তাঁর ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম দিনই আরো কয়েকজন সচিবের সঙ্গে রাষ্ট্রদূত মোয়াজ্জেম আলীকেও পররাষ্ট্রসচিবের পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। সম্ভবত তাঁকে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে অধ্যক্ষ পদে বদলি করা হয়েছিল। যা হোক, তিনি ২০০১ সালে অবসরে চলে যান। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০১৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।

আরেকটি বিষয় এখানে উল্লেখ না করলেই নয়, একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে জাতিসংঘের স্বীকৃতি বিশ্বসমাজে বাংলাদেশকে যে সম্মানজনক স্থানে অধিষ্ঠিত করেছে, তার পেছনে রাষ্ট্রদূত আলীর প্রশংসনীয় অবদান রয়েছে। তখন ফ্রান্সে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে কর্মরত থাকায় ইউনেসকোর সঙ্গে তিনি প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। তাঁর জোরালো ভূমিকার ফলে এ বিষয়ক আমাদের প্রচেষ্টায় সাফল্য অর্জন সহজতর হয়েছিল।  

তিনি ছিলেন একজন সদালাপি, ধৈর্যশীল ও অমায়িক স্বভাবের মানুষ। তিনি যেমন দায়িত্ব ও কর্তব্যসচেতন ছিলেন, তেমনি কৌতুক করতেও কার্পণ্য করতেন না। কনিষ্ঠ সহকর্মীদের খুবই স্নেহ করতেন এবং তাঁদের প্রশিক্ষণের প্রতি গুরুত্ব দিতেন। নিরহংকার এ মানুষটির সাহচর্য যাঁরা পেয়েছেন তাঁরাই জানেন তিনি মানুষ হিসেবে কত ভালো ছিলেন। তিনি কারো সাহায্যে এগিয়ে যেতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করতেন না। তাঁর কাছে সহযোগিতা চেয়ে কেউ নিরাশ হয়েছেন বলে শুনিনি। তাঁর কোমল হৃদয়ের স্পর্শ যাঁরা পেয়েছেন তাঁরা কখনো তা ভুলতে পারবেন না। আমার বিশ্বাস, সেই বন্ধুবৎসল মানুষটিকে হারিয়ে সবাই আজ শোকাহত। এটি সত্য যে তাঁরা সেই প্রিয় মানুষটির দেখা আর পাবেন না। তবে তিনি সবার মধ্যে তাঁর নিজস্ব মহিমায় বেঁচে থাকবেন।

নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রদূত সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী একজন অত্যন্ত উঁচুমানের কূটনীতিক ছিলেন। যেসব সহকর্মী তাঁর সঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বা আমাদের দূতাবাসে কাজ করেছেন, তাঁদের সবাই তাঁর কূটনৈতিক দক্ষতা ও বিচক্ষণতার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। বাংলাদেশের বৈদেশিক সম্পর্ক উন্নয়ন ও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা কিছুতেই উপেক্ষা করা যায় না। তিনি ছিলেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী একজন দেশপ্রেমিক সফল কূটনীতিক। তাই নবীন কূটনীতিকদের চলার পথে তাঁর কর্মজীবন সব সময়ই অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে রইবে।   

কবিগুরুর কথা দিয়ে শেষ করতে চাই—

‘এ অনন্ত চরাচরে স্বর্গমর্ত ছেয়ে

সবচেয়ে পুরাতন কথা, সবচেয়ে

গভীর ক্রন্দন—যেতে নাহি দিব। হায়,

তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়।’

নতুন বছরের প্রথম দিনটিতেই শত বেদনার আচ্ছাদনে আমরা তাঁকে বিদায় জানালাম। তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেও তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের অনেক স্মৃতি এবং ঘটনা আমাদের স্মৃতিতে বহুদিন রয়ে যাবে। আমরা তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি। মহান আল্লাহ তাঁকে বেহেশত নসিব করুন এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের এই গভীর বেদনা সহ্য করার শক্তি দান করুন। 

লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা