kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জানুয়ারি ২০২০। ১৪ মাঘ ১৪২৬। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪১     

রাজনৈতিক দলে দায়বদ্ধতা ও সাম্প্রতিক হালচাল

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

১৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



রাজনৈতিক দলে দায়বদ্ধতা ও সাম্প্রতিক হালচাল

বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এখন নতুন করে বেশ কিছু ভাঙনের প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। জাসদ রব, ওয়ার্কার্স পার্টি, এলডিপি, কল্যাণ পার্টি ইত্যাদি দলে ভাঙন ঘটেছে। আবার বড় দল হিসেবে বিএনপির কোনো কোনো নেতা দল থেকে পদত্যাগ করেছেন, অনেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছেন, কেউ কেউ রাজনীতি ছেড়ে ব্যবসা-বাণিজ্যে মনোযোগ দিয়েছেন। জামায়াত আগের মতো কোনো হুংকার দিচ্ছে না, তবে নীরবে সক্রিয় হচ্ছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ পরিবেশিত হচ্ছে। বাম রাজনৈতিক দলগুলো এখন সাধারণ মানুষের আলোচনা থেকে হারিয়ে গেছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ আগামী মাসে জাতীয় সম্মেলন করতে যাচ্ছে। এর কিছু অঙ্গ সংগঠন এরই মধ্যে সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠন করতে যাচ্ছে। তবে আওয়ামী লীগে পদ-পদবি পাওয়ার জন্য কিছুদিন আগেও যেভাবে বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠী বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল, তাদের এখন আর সেভাবে সক্রিয় হতে দেখা যাচ্ছে না। কারণ দলীয় সভানেত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করায় অনেকেই এখন থমকে দাঁড়িয়েছেন। তবে তাঁরা দলের পদ-পদবি পেতে মরিয়া হয়ে তাকিয়ে আছেন ওপরের দিকে। রাজনীতিতে এখন পদ-পদবি ছাড়া কেউ যেন কিছু ভাবতে চান না, পারছেনও না। পদ-পদবির লোভে অনেকেই নানা নামে নানা ধরনের সংগঠন গড়ে তুলেছেন। এসব সংগঠনের আদৌ কোনো কার্যক্রম আছে কি না তাও কেউ বলতে পারবেন না। এমনকি প্রতিষ্ঠিত বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলোরও সাংগঠনিক কোনো কার্যক্রম গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত কোথাও খুব একটা দেখা যায় না। দলের পদ-পদবিধারীরা ঢাকার কেন্দ্রীয় অফিসে নিয়মিত আসেন, আড্ডা দেন, দলের কোনো কেন্দ্রীয় কর্মসূচি থাকলে তাতে নিজের সমর্থকদের নিয়ে মহড়া দেন। কিন্তু দলের তৃণমূল পর্যন্ত তাঁর কোনো যোগাযোগ আছে কি নেই বা কোনো ধরনের জবাবদিহি করার ব্যবস্থা আছে কি নেই—সেটিও খুব একটা বোঝা যাচ্ছে না।

বিশেষত ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন পরিচয় দিয়ে দেশে লাখ লাখ মানুষ গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত এত দিন দাপিয়ে বেড়িয়েছিলেন। অনেকে বিলবোর্ড টাঙিয়ে নিজেদের পরিচয় দেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। এঁদের অনেকে ঠাট্টা করে বিলবোর্ড নেতা বলে অভিহিত করতেন। জনগণের সঙ্গে এঁদের কোনো সম্পর্ক আছে—এটি প্রমাণ করা খুবই কঠিন ব্যাপার ছিল। অন্তত গত ৩০ বছরের রাজনীতির ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে এমন লোকেরাই বড় বড় রাজনৈতিক দলের নেতা হিসেবে স্থানীয়ভাবে, এমনকি জাতীয়ভাবেও পরিচিত হওয়ার সুযোগ করে নিয়েছেন। আওয়ামী লীগের মতো দীর্ঘ পোড় খাওয়া রাজনৈতিক দলের নেতা ও কর্মী হওয়া একসময় ছিল বেশ ত্যাগ ও সংগ্রামের বিষয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ত্যাগী ও আদর্শের প্রতি নিষ্ঠাবান নেতাকর্মীদের সংখ্যা কত আছে তা খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে। দলের শীর্ষ পর্যায় থেকেই বলা হচ্ছে দলের হাইব্রিড অনুপ্রবেশকারী, সুবিধাবাদী, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী, জামায়াত-বিএনপির সমর্থকদের প্রবেশ ঘটেছে। শুধু প্রবেশ-অনুপ্রবেশই নয়—এদের অনেকেই আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবিতে আসীন হয়েছেন। বিষয়গুলো এখন আর মোটেও গোপন নেই। সে কারণেই আওয়ামী লীগ এখন শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছে। আগামী জাতীয় সম্মেলনে কারা দলটির গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হবেন সেটি দেখতে সম্মেলন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

বিএনপি দীর্ঘদিন ক্ষমতায় নেই। এখন দলের শীর্ষ পর্যায়ের কিছু নেতা জাতীয় প্রেস ক্লাবভিত্তিক কিছু কর্মসূচি ও বক্তৃতা দিয়ে বেড়াচ্ছেন। কর্মীদের একটি অংশ তাতে যোগ দিচ্ছেন। বাকিরা নিষ্ক্রিয় হয়ে আছেন। তবে দেশে আওয়ামীবিরোধী এবং শেখ হাসিনাবিরোধী অনেকেই বিএনপির শুভানুধ্যায়ী—তাঁরা বিএনপির সমর্থক হিসেবে দিন গুনছেন। সুযোগ পেলে তাঁদের ভূমিকা দেখা যেতে পারে। এসব বিবরণ সবারই জানা। কিন্তু যে কারণে দেশের রাজনীতির এই বিবর্ণ চিত্রটি তুলে ধরা—সেটির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশের রাজনীতিতে সত্যিই আদর্শ, দায়বদ্ধতা, সৎ, ত্যাগী ও নিষ্ঠাবান নেতাকর্মীর সংখ্যা এখন কতটা আছে তা খুবই মনোযোগ দিয়ে ভাবলে হতাশ হওয়া ছাড়া তেমন কোনো আশাবাদী হওয়ার কারণ নেই। কেননা, আমাদের রাজনীতিতে পঁচাত্তরের পর থেকে যাঁরা প্রবেশ করেছেন, তাঁদের বেশির ভাগই ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি ও দলকে বিবেচনা করেছেন। দেশ ও জনগণের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও অন্যান্য চাহিদা পূরণে রাজনীতি ও দল করার ইচ্ছা নিয়ে যুক্ত হওয়া মানুষের সংখ্যা ক্রমেই হ্রাস পেয়েছে। 

দেশে একসময় বামপন্থার কদর ছিল। সেটি আশির দশকের পর চরম সংকটে পড়তে থাকে। বাম দলগুলো ভেঙে তছনছ হতে থাকে। কারণ যাঁরা বাম দলগুলোর পদ-পদবি অলংকৃত করেছিলেন, তাঁদের অনেকেই বিপ্লববাদী রাজনীতির কথা বললেও বিশ্বরাজনীতির বাস্তবতা ও বাংলাদেশের বাস্তবতায় তাঁদের করণীয় নির্ধারণে মোটেও যোগ্যতার পরিচয় দিতে পারেননি। বেশির ভাগ নেতাই একে অপরের বিরুদ্ধে ‘আদর্শচ্যুতির’ অভিযোগ এনে নতুন দল গঠন করেছেন। এভাবে জনে জনে দল গঠন করে তাঁরা নিজেদের নেতা হিসেবে পরিচয় দিলেও তাঁদের রাজনীতি জনগণের কাছে মোটেও গ্রহণ করার মতো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি। সুবিধাবাদ তাঁদের মধ্যেও কতটা প্রবেশ করেছে, তা অনেকেরই দল ত্যাগ, ডানপন্থার বিএনপি, জাতীয় পার্টি ইত্যাদি দলে যোগদান, মন্ত্রী হওয়া কিংবা দলের পদ-পদবি পেয়ে নেতা হিসেবে নতুনভাবে আবির্ভূত হওয়ার ডিগবাজি থেকেই বোঝা যায়। বর্তমানে যেসব ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র দল নতুন করে ভাঙনের মুখে পড়েছে, সেগুলো নিতান্তই ব্যক্তিগত স্বার্থ, দলে পদ-পদবি টিকিয়ে রাখা, সেই পদ-পদবি দিয়ে নির্বাচনের আগে বিশাল জোট গঠন করা, নির্বাচনে একটি আসন পাওয়ার জন্য নিজের পোস্টারটি ধরে রাখা। এর বেশি কিছু এই ভাঙনের মধ্যে আছে বলে মনে হয় না। যাঁরা এসব দলের জন্ম দিয়েছেন কিংবা ভাঙন সৃষ্টি করে নতুন দলের নেতা হয়েছেন তাঁদের দায়বদ্ধতা ব্যক্তিগত পাওয়া না-পাওয়ার বাইরে খুব বেশি কিছু আছে বলে মনে হয় না।

আমাদের এখানে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত অনেকেই নতুন দল গঠন করেছেন, রাজনীতি করেছেন; কিন্তু বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে পেরেছেন বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর একনিষ্ঠ নেতারা, যাঁরা ২৩ বছরের সংগ্রাম ও কর্মসূচি দিয়ে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত করেছিলেন। এঁরা সংখ্যায় খুব বেশি নন। কিন্তু তাঁদের পেছনে কোটি কোটি মানুষ যুক্ত হয়েছিল এবং নেতৃত্বের ওপর আস্থা রাখার কারণেই দেশ স্বাধীন করতে পেরেছিলেন। এখন আমরা যাঁদের রাজনীতিতে দেখছি, তাঁদের কয়জন রাজনীতির দায়বদ্ধতা বোঝেন, জানেন এবং দায়বোধ থেকে নিজেদের রাজনীতিতে যুক্ত করছেন?

দেশে রাজনীতি আছে, অসংখ্য দল আছে; কিন্তু জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং দায়বোধ থেকে নিজেকে উৎসর্গ করার রাজনীতি করছেন এমন নেতাকর্মীর সংখ্যা খুব বেশি দেখা যাচ্ছে না। আদর্শ, দায়বদ্ধতা, জনগণ ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়বোধের দল ও নেতৃত্ব আমাদের বড়ই জরুরি। সেটি শুধু আদর্শিক রাজনীতির প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই গঠিত বা বেড়ে উঠতে পারে।

লেখক : অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা