kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ জানুয়ারি ২০২০। ৭ মাঘ ১৪২৬। ২৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

শুভ জন্মদিন

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী সাহিত্যে ও সক্রিয়তায়

হাবীবুল্লাহ সিরাজী

১২ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী সাহিত্যে ও সক্রিয়তায়

অমর একুশের গানের রচয়িতা আর রাজনৈতিক কলাম লেখকের পরিচয়ের নিচে যেন চাপা পড়ে গেছে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর সাহিত্যিক সত্তা। যদিও কবিতা-গল্প-উপন্যাসে সেই পঞ্চাশের দশক থেকে তিনি বাংলাদেশের সাহিত্যে যোজনা করে চলেছেন নতুন পলি। বিস্ময়াবহ হলেও সত্য, একুশের গানের মূল কবিতারূপ যাঁর হাত থেকে উচ্ছৃত সেই কবির এখন পর্যন্ত একমাত্র কবিতাগ্রন্থ সময়ের ঘড়ি প্রকাশিত হয়েছে ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে। ৩৪টি কবিতায় গুচ্ছিত এই গ্রন্থ; বিভিন্ন সময় কবিতাগুলো প্রকাশিত হয়েছে হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত একুশে ফেব্রুয়ারি (১৯৫৩) সংকলন, সাপ্তাহিক সৈনিক (১৯৫২), লোকশক্তি (১৯৭২), দিলরুবা (১৯৫১), পূর্বদেশ (১৯৭১), মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ ও আবু হেনা মোস্তাফা কামাল সম্পাদিত পূর্ববাংলার কবিতা (১৯৫৪), জয় বাংলা (১৯৭১)-সহ সমকালীন বিভিন্ন সংবাদ-সাময়িকপত্রে। প্রকাশসূচি থেকে জানা যাচ্ছে প্রত্যন্ত পিরোজপুরেও যেমন লেখা হয়েছে বিভিন্ন কবিতা, তেমনি সুদূর জার্মানির আউসবুর্গেও কবির আকাশে কবিতার পাখি মেলেছে ডানা। ভূমিকা-কথনে কবি বলেন—

কৈশোর থেকে যৌবন এবং যৌবন থেকে বার্ধক্য, এই ত্রিকালের স্বর এ কবিতাগুলোতে উচ্চারিত। ব্যক্তিভাবনার সঙ্গে সমাজচিন্তা এবং রাজনৈতিক ভাবনাও রয়েছে এই বহমান কালের কবিতাগুলোয়। আছে কৈশোরের বিদ্রোহের সঙ্গে যৌবনের প্রেমবিরহের সংলাপের মিলন। দীর্ঘকাল ধরে কবিতা লিখেছি। কিন্তু আমার কোনো কবিতার বই বের হয়নি। সেদিক থেকে এটিই আমার প্রথম কবিতার বই। কবি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠার জন্য নয়; সময়ের সন্ধি পেরিয়ে একজন মানুষের যে প্রবহমান ও ক্রমপরিবর্ধিত জীবনের ধ্বনি, তাকে বেঁধে রাখার জন্য এই কবিতাগুলোর গ্রন্থনা। কবিতা নয়, সময়ের ঘড়ি হিসেবেই কবিতাগুলোকে বিবেচনা করলে খুশি হব।

এই সংকলনভুক্ত কিছু কবিতা আজ যেন শুধু আর কবির ব্যক্তিগত রচনায় সীমাবদ্ধ নয়; এরা হয়ে উঠেছে জাতির অঘোষিত শিল্পভাষ্য। ‘একুশের গান’ কবিতার অল্প কয়েক চরণই আমরা ফিরে ফিরে শুনি, তবে এই কবিতাটির পূর্ণাবয়ব যেন শিল্প ও সময়ের যুগলবন্দি হয়ে বেজে উঠে চিরায়ত শিল্পসুরে।

এ ছাড়া আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর ‘আমাদের মিলিত সংগ্রাম—মৌলানা ভাসানীর নাম’ কবিতাটিও ব্যক্তিকেন্দ্রিক আবেদনের ঊর্ধ্বে আজ এক শিল্প-সমুত্তীর্ণ কবিতার নাম। 

একাধিক কবিতা লিখেছেন তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে নিয়ে, লিখেছেন তিনি প্যাট্রিস লুমুম্বাকে নিয়েও। মানুষের মুক্তির মিছিলে দেশে কি বিদেশে যাঁরাই ছিলেন ইতিহাসে সম্মুখ-মোহনায় তাঁরা ভাস্বর হয়েছেন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর কবিতার কালিতে। কবি নজরুল থেকে শামসুর রাহমানও তাঁর কবিতার বিষয় হয়ে এসেছেন; যোগ করেছেন বিষয়াতীত বিভূতি। তবে শুধু সময়-সমাজ ও রাজনীতিজাগর কবিতাই নয়, হৃদয়ের একান্ত বিষয়-আশয়ও ভাষারূপ লাভ করেছে তাঁর কবিতায়।

আমাদের প্রত্যাশা আবারও তিনি কবিতায় সক্রিয়-সচল হোন; তাঁর কবিতার অবয়বে ফুটে উঠুক আমাদের ব্যক্তিক ও সমষ্টিক হৃদয়ছবি।

২.

কবিতা এবং গানের পাশাপাশি বাংলা কথাসাহিত্যেও আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী এক স্মরণীয় নাম। আজ থেকে ছয় দশক আগে ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত তাঁর দুটি গল্পগ্রন্থ কৃষ্ণপক্ষ এবং সম্রাটের ছবিকে এ দেশের কথাসাহিত্যে বাঁকবদলের বিন্দু বলা চলে। বিশেষত ‘সম্রাটের ছবি’ গল্পে স্বাধীন স্বদেশে বহমান ঔপনিবেশিক বাস্তবতাকে যে চারুদক্ষতায় লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন, তা এককথায় অসাধারণ। তাঁর উপন্যাস চন্দ্রদ্বীপের উপাখ্যান, নাম না জানা ভোর, নীল যমুনা, শেষ রজনীর চাঁদ বিষয়বৈচিত্র্য ও আঙ্গিকসংস্থানে বাংলাদেশের উপন্যাস সাহিত্যে অসামান্য সংযোজন হয়ে উঠেছে। নদীবিধৌত দক্ষিণ বাংলার মানুষের চিরায়ত দুঃখী এবং সংগ্রামী মুখ ভাস্বর হয়েছে গাফ্ফার চৌধুরীর কথা-কলমে। শিশুসাহিত্যে তিনি অনন্য; ‘ডানপিটে শওকত’, ‘আঁধার কুঠির ছেলেটি’ ও ‘ভয়ঙ্করের হাতছানি’ তাঁর শিশু-কিশোর সংবেদী লেখক-মানসের প্রমাণক। কয়েক খণ্ডে প্রকাশিত তাঁর আত্মজীবনী ধীরে বহে বুড়িগঙ্গা এবং সওগাত পত্রিকা ও মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের স্মৃতি বাংলাদেশের উত্থান-পতনময় সামাজিক-রাজনৈতিক-সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক দলিল। বঙ্গবন্ধুর মহান ও ট্র্যাজিক জীবন নিয়ে লেখা নাটক পলাশী থেকে ধানমণ্ডি তাঁর অঙ্গীকার ও সাফল্যের গায়ে যোগ করেছে নতুন পালক। আর যদি বলা হয় বাংলায় কলাম-সাহিত্যকে জনপ্রিয় করেছেন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, তাহলেও মোটেও অত্যুক্তি হবে না।

৩.

এভাবে একুশের ঐতিহাসিক গান রচনা, অসাধারণ সব সাহিত্যকর্মের পাশাপাশি একটি ধর্মনিরপেক্ষ যুক্তিবাদী মানবিক বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে কলমযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। আদর্শের প্রশ্নে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর নিরাপস অবস্থান সমকালে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। মৌলবাদ ও সাম্প্র্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তিনি এক অসমসাহসী যোদ্ধা। বিশ্বব্যাপী যাঁরাই বাংলা ভাষাকে ভালোবাসেন, লালন করেন; তাঁদের অন্তরে তিনি এক আলোকবর্তিকা হিসেবে পথনির্দেশ করে যাবেন।

১২ ডিসেম্বর ২০১৯ আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী জীবনের ৮৫ বসন্ত পূর্ণ করলেন। এই খাঁটি বাঙালিকে সব বাঙালির পক্ষ থেকে শুভ জন্মদিন জানাই।

 

লেখক : কবি, মহাপরিচালক, বাংলা একাডেমি

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা