kalerkantho

সোমবার। ২৭ জানুয়ারি ২০২০। ১৩ মাঘ ১৪২৬। ৩০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

স্বৈরাচারের পতন, না স্বৈরাচারীর

মুশতাক হোসেন

৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



স্বৈরাচারের পতন, না স্বৈরাচারীর

১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর স্বৈরশাসক এরশাদ ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ বন্দুকের জোরে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারকে সরিয়ে জেনারেল এরশাদ অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেন। ২৩ মার্চ ১৯৮২ সালে রাতের বেলা এরশাদ যখন রাষ্ট্রপতির শয়নকক্ষে রাষ্ট্রপতি সাত্তারকে বন্দুকের নল ঠেকাতে যান, তখন তাঁর সঙ্গে তৎকালীন বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনী প্রধানও ছিলেন। তাঁদের সহযোগিতা করেন রাষ্ট্রপতির কার্যালয় ও মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ আমলারা। নেপথ্য থেকে বিএনপি বিরোধী রাজনৈতিক মহলের কেউ কেউ ‘এরশাদ ক্ষমতা দখল করলে আপত্তি নেই’—এমন মনোভাবও দেখান। অবৈধ ক্ষমতা দখলের পরে বিএনপিবিরোধী পত্রিকা বিশেষের সম্পাদকীয় কোনো দলবিশেষের এরশাদের কাঁধে চড়ে রাজনৈতিক-প্রশাসনিক ব্যবস্থা সংস্কারের স্বপ্ন দেখা ইত্যাকার কর্মকাণ্ড সেই গোপন সমঝোতার ইঙ্গিত বহন করে। ১৯৮৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও একতরফা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ‘বিজয়ী’ হয়ে সরকার গঠনের পর এরশাদ সামরিক উর্দি বদলে বেসামরিক পোশাক পরেন। কিন্তু তাঁর ক্ষমতার উৎস থেকে যায় সামরিক বাহিনী। রাষ্ট্রপতি সশস্ত্র বাহিনীর অধিনায়ক, এ অধিকার কাজে লাগিয়ে এরশাদ সামরিক বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করতেন ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন দমনে তাঁর এ নিয়ন্ত্রণক্ষমতা কাজে লাগাতেন।

এরশাদবিরোধী গণ-অভ্যুত্থান জেগে উঠে ২৭ নভেম্বর ১৯৯০ ডা. মিলনকে হত্যার মুহূর্ত থেকেই। তখন মোবাইল টেলিফোন, ফেসবুক, বেসরকারি টেলিভিশন—এগুলো কিছুই ছিল না। তড়িত্গতিতে খবর পাওয়ার মাধ্যম ছিল বিদেশি বেতার, বিশেষ করে বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা, আকাশবাণী ইত্যাদি। ডা. মিলনকে হত্যা করা হয় সকাল ১১টার দিকে। এরপর বিবিসি প্রচারের সময় হচ্ছে সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিট, আর ভয়েস অব আমেরিকা রাত ১০টা। কিন্তু ডা. মিলন হত্যার ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ঢাকা মহানগরীসহ গোটা বাংলাদেশ বিদ্রোহে উত্তাল হয়ে উঠল। মুখে মুখেই এ হত্যাকাণ্ডের খবর দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে। হাজার হাজার মানুষ জাতীয় প্রেস ক্লাব ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ অভিমুখে বন্যার পানির মতো ছুটে এলো। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. কবির আহমেদের নেতৃত্বে সব চিকিৎসক সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগ করে অসহযোগ আন্দোলনের সূচনা করেন। এরশাদ সরকার পূর্বপরিকল্পনা মোতাবেক কারফিউ ও জরুরি আইন জারি করে। উদ্দেশ্য ছিল অন্যবারের মতো এবারও আন্দোলনকে ‘ঠাণ্ডা’ করে রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে নরম-গরম নীতি প্রয়োগ করে, বিভেদ সৃষ্টি করে আবার পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া। এবার তার ফল হলো উল্টো। জরুরি অবস্থা জারির সঙ্গে সঙ্গে সরকার কঠোর সংবাদ নিয়ন্ত্রণ চাপিয়ে দেয়। সাংবাদিকরা তাত্ক্ষণিকভাবে জাতীয় প্রেস ক্লাবে মিলিত হয়ে এরশাদ পতন অবধি সংবাদপত্র ধর্মঘট আহ্বান করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বন্ধ করে দেওয়া হয়, হল-হোস্টেল ছাড়তে বলা হয়। বিকেল ৪টা থেকে কারফিউ জারি করা হলেও সন্ধ্যা পর্যন্ত রাস্তায় মানুষের বিক্ষোভ ও জটলা ছিল। কারফিউ অমান্য করে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে হলে, পাড়ায়-মহল্লায় বিক্ষোভ মিছিল চলে অনেক রাত পর্যন্ত। এমনকি কোনো কোনো এলাকায় ছাত্র-জনতা মশাল মিছিল বের করে। রাস্তায় ব্যারিকেড দেওয়া হয়। এর মধ্যেও পুলিশ গুলি চালায়। হাতিরপুলে গুলি চালিয়ে বাবুল নামে একজন যুবলীগ কর্মীকে হত্যা করে পুলিশ। ঢাকার হাতিরপুলে বাবুল স্মরণে একটা স্মৃতিস্তম্ভ বহুদিন টিকে ছিল। এটা এখন আর দেখা যায় না। ময়মনসিংহ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের দুই ছাত্র ফিরোজ ও জাহাঙ্গীর ডা. মিলন হত্যার প্রতিবাদে রাজপথে নেমে ২৮ নভেম্বর ১৯৯০ শহীদ হন।

পত্রিকা বন্ধ থাকায় ছাত্র-জনতা সরাসরি কর্মসূচির খবর পেতেন না। বিদেশি বেতারই ছিল তড়িত্গতিতে খবর পাওয়ার মাধ্যম। তবে তিন জোট ও সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের বিভিন্ন কর্মসূচির খবরাখবর বুলেটিন আকারে সাংবাদিকরা প্রকাশ করতেন। এমনি একটি বুলেটিন প্রকাশিত হয়েছিল ১ ডিসেম্বর ১৯৯০ সালে। পাঁচ, সাত ও আটদলীয় ঐক্যজোটের যৌথ আহ্বান ও নির্দেশাবলির শিরোনাম ছিল ‘আহ্বান ও নির্দেশাবলি নম্বর-১’। প্রথম আহ্বানে বলা হয়—‘গণবিরোধী খুনি এরশাদের তথাকথিত জরুরি আইন, কারফিউ, ১৪৪ ধারা প্রভৃতি উপেক্ষা করে দেশের সর্বত্র শহরে-বন্দরে, হাটে-বাজারে, পাড়ায়, রাজপথে লাখো মানুষের সমাবেশ ও মিছিল অব্যাহত রাখুন। প্রতিদিন সর্বত্র জঙ্গি মিছিল সংগঠিত করুন এবং গণ-আন্দোলনকে তীব্র থেকে তীব্রতর করুন।’ দ্বিতীয় আহ্বানে বলা হয়—‘স্বৈরাচারী খুনি সরকারের সব কাজকর্ম অচল করার লক্ষ্যে সব সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার অফিস-আদালতগুলোর যাবতীয় কাজকর্ম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখুন। সব অফিস-আদালতের সর্বস্তরের কর্মচারীরা অনির্দিষ্টকালের জন্য কাজে যোগদান থেকে বিরত থাকুন। ২ ও ৩ ডিসেম্বরের মধ্যে সব সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা নিজ নিজ বেতন উঠিয়ে নিন। তবে অফিসে-আদালতে কর্মবিরতি অব্যাহত রাখুন। বেতনাদি উঠানোসহ ব্যাংক লেনদেনের সুবিধার্থে এই দুই দিন ব্যাংকগুলো খোলা রাখুন। কিন্তু ২ ও ৩ ডিসেম্বর এই দুই দিনও সর্বত্র সমাবেশ ও বিক্ষোভ অব্যাহত রাখুন।’ তৃতীয় আহ্বান ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—‘অবৈধ খুনি এরশাদ সরকারের সঙ্গে সব উপায়ে পূর্ণ অসহযোগিতা করুন।’ গোটা দেশ তখন অসহযোগের চূড়ান্ত পর্বে।

এরশাদ পতনের পরের বছর থেকে এ দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ছাত্রসংগঠন দিনটিকে স্বৈরাচার পতন দিবস নামে স্মরণ ও পালন করে আসছে। তবে দিবসটি পালন করার তীব্রতা আগের চেয়ে কমে গেছে। কারণ সংসদীয় রাজনীতির হিসাব-নিকাশে এরশাদের দল জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্যেদের সংখ্যা সরকার গঠনে প্রভাব রাখতে সক্ষম ছিল। বিশেষ করে ১৯৯৬ সালের জুন মাসে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এমনি এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। জাতীয় পার্টির সমর্থন পেয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনে নিশ্চয়তা লাভ করে। তবে জাতীয় পার্টি যদি সরাসরি সমর্থন না-ও দিত, জেএসডির একমাত্র সংসদ সদস্য আ স ম আবদুর রবের সমর্থন নিয়েও আওয়ামী লীগ টায় টায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে পারত। তবে সেটা ছিল অনিশ্চয়তায় ভরা।

রাজনীতির অঙ্গনের বাইরে প্রশাসনে, অর্থনীতিতে যাঁরা এরশাদের দুর্নীতি-অপকর্মের উৎসাহী সহযোগী ছিলেন, তাঁদের অবস্থানেরও কোনো অদল-বদল হয়নি পরবর্তী সরকারগুলোর সময়ে। এরশাদ পতনের আগে ও পরপরই পাঁচদলীয় ঐক্যজোটের আহ্বান ছিল তিন জোটের যুক্তভাবে নির্বাচন করা ও যুক্ত সরকার গঠন করে স্বৈরাচারের সব রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তিকে নষ্ট করে স্বাধীন দেশের উপযোগী গণতান্ত্রিক জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তি গড়াতে হাত দেওয়া, যা স্বাধীনতার পরপরই করা দরকার ছিল। এ লক্ষ্য তিন জোটের রূপরেখায়ও লেখা হয়েছিল। রূপরেখাসংবলিত ঘোষণার প্রথম বাক্যটিই ছিল—‘স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের দুঃশাসনের কবল থেকে মুক্তিকামী জনগণ এরশাদ সরকারের অপসারণের দাবিতে এবং দেশে একটি স্থায়ী গণতান্ত্রিক ধারা ও জীবন পদ্ধতি কায়েম এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধ পুনঃ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চলমান গণ-আন্দোলনে সব শ্রেণি ও পেশার মানুষ এক বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছে। (২১-১১-১৯৯০)।’ সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য এরশাদের দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা ও এর চিহ্নিত নেতাদের যেন কোনো দলে জায়গা না দেওয়া হয় সে দাবি তোলে এবং সুনির্দিষ্টভাবে নাম উল্লেখ করে একটি কালো তালিকা জনসমক্ষে প্রকাশ করে। এসব দাবি ও লক্ষ্য পূরণ তো দূরের কথা, আন্দোলনের বিভক্ত শক্তির একাংশ পালাক্রমে যখন সরকারে, অপর অংশ তখন বিরোধী দলে। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা ও ক্ষমতা দখল—উভয় উদ্দেশ্যে পতিত এরশাদের রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক সহযোগীদের ক্ষমতা-অর্থ ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর জন্য ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাপ্রত্যাশী উভয় দলই প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হলো। ফলে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের গণতান্ত্রিক চেতনা ও সহমর্মিতা লাটে উঠল। স্বৈরাচারী ও স্বৈরাচারব্যবস্থা উভয়ই অক্ষত থাকল। শুধু তা-ই নয়, এ সুযোগে ২০০১-০৬ সময়ে একাত্তরের ঘাতক ও সাম্প্রদায়িক শক্তিও পুনর্জীবিত হয়ে রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদার হলো। এভাবেই স্বৈরাচার ও সাম্প্রদায়িকতার নব অধিষ্ঠান ঘটল। যুদ্ধাপরাধের বিচারপ্রক্রিয়া ও ধর্মীয় জঙ্গিবাদী সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দমনের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক শক্তি কোণঠাসা হলেও রাজনৈতিক শক্তি সমাবেশের অভাবে স্বৈরাচারের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করা যায়নি।

আজ স্বৈরাচার পতনের ২৯তম বার্ষিকীতে আমাদের চাওয়া—অসংখ্য শহীদ ও নির্যাতিতের রক্ত-অশ্রু-ঘামের বিনিময়ে অর্জিত গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা যেন আর ছিন্ন না হয়। স্বৈরাচারী ও স্বৈরাচারের পতনের দিন হিসেবে যেন ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০ বাংলাদেশের ইতিহাসে শেষ দিবস হয়।

 

লেখক : স্থায়ী কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ জাসদ।

ডাকসুর সাবেক সাধারণ সম্পাদক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা