kalerkantho

শনিবার । ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৯ রবিউস সানি ১৪৪১     

মাটি ক্ষয় বন্ধ হওয়া প্রয়োজন

বিধান চন্দ্র দাস

৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



মাটি ক্ষয় বন্ধ হওয়া প্রয়োজন

পৃথিবীতে প্রতি পাঁচ সেকেন্ডে একটি ফুটবল মাঠের সমপরিমাণ জায়গার মাটি ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে পৃথিবীর প্রায় ৩৩ শতাংশ মাটির স্বাস্থ্যের অবনয়ন ঘটেছে ও আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে পৃথিবীতে ৯০ শতাংশ মাটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। বলা হচ্ছে যে কোনো জায়গায় দুই-তিন সেমি মাটি তৈরি হতে প্রায় এক হাজার বছর সময়ের প্রয়োজন হয়। প্রভাবশালী বিজ্ঞান জার্নাল, ‘নেচার’ জানিয়েছে, ক্রমবর্ধমান মাটি ক্ষয়প্রক্রিয়া স্বাস্থ্যময় মাটির জন্য সব থেকে বড় হুমকি। পৃথিবীতে মাটি ক্ষয়জনিত সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করায় ২০১৫ সালে জাতিসংঘের মহা উন্নয়ন পরিকল্পনা ‘অ্যাজেন্ডা ২০৩০’ বা এসডিজির ১৫ নম্বর অভীষ্টের সঙ্গে মরুকরণ প্রক্রিয়ার মোকাবেলা, ভূমির অবক্ষয় রোধ ও ভূমি সৃষ্টি প্রক্রিয়ার পুনরুজ্জীবন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

মাটি ক্ষয় বলতে সাধারণত মাটির ওপরের উর্বর অংশ সরে যাওয়া বোঝায়। পানি, বাতাস ও ভূমিকর্ষণ—প্রধানত এই তিন কারণে মাটির উর্বর উপরিভাগ সরে যায় ও মাটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মাটিক্ষয় প্রক্রিয়াটি ভূ-প্রাকৃতিক নিয়মে ধীরগতিতে সম্পন্ন হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মানুষের কারণেই এই প্রক্রিয়া দ্রুততর গতিতে সংঘটিত হয়ে থাকে। বর্তমানে মানুষের নানা রকম কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে বনভূমি উজাড়, তৃণভূমি ধ্বংস, ঢালযুক্ত জমিচাষ, মাত্রাতিরিক্ত পশুচারণ, ভূমি সমতলকরণ, চাষাবাদে যন্ত্রের অধিক ব্যবহার ইত্যাদির কারণে মাটি ক্ষয় প্রক্রিয়া বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্যও মাটি ক্ষয় প্রক্রিয়া সংঘটিত হচ্ছে।

কৃষি উৎপাদন, পানির গুণমান ও পরিবেশের ওপর মাটিক্ষয়ের নেতিবাচক ভূমিকা লক্ষ করা যায়। মাটি ক্ষয়ের কারণে কৃষিজমিতে আর্দ্রতা ঘাটতি, পানি নিষ্কাশনক্ষমতা হ্রাস, গভীরে শিকড় পৌঁছুতে না পারা ও পানির অনুপ্রবেশ প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। এর ফলে জমির পুষ্টিগুণও লোপ পায়। আসলে ভূ-উপরিস্থিত মাটিতে জৈবপদার্থের পরিমাণ বেশি থাকে ও সেখান থেকে গাছ তার বৃদ্ধির জন্য পুষ্টি সংগ্রহ করে। জৈবপদার্থ থাকার কারণেই মাটির ছিদ্রতা তৈরি হয় ও এই ছিদ্রের সাহায্যে গাছের শিকড় মাটির গভীরে সহজে প্রবেশ করতে পারে। ছিদ্রতার কারণেই মাটির পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। কিন্তু মাটিতে জৈবপদার্থের পরিমাণ কমে গেলে মাটির ছিদ্রতা কমে যায় ও গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। মাটি ক্ষয় প্রক্রিয়ায় অপসারিত মাটি কণা পানির মধ্যে গিয়ে স্তর তৈরি করে ও মজুদ পানি ভাণ্ডারে দূষণ ঘটায়। এর ফলে জলজপ্রাণির জীবন ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। মাটি ক্ষয়ের কারণে জলপথে বাঁধা তৈরি হয় ও অবকাঠামো ধ্বংস হয়।

বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী মাটির সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রথম ১০টি হুমকির মধ্যে মাটি ক্ষয় অন্যতম। এই প্রতিবেদনে আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকায় মাটি ক্ষয় প্রক্রিয়া ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই তিনটি মহাদেশে কোনো কোনো জায়গায় প্রতি হেক্টর জমিতে বছরে ৮ থেকে ৫০ টন কিংবা তারও বেশি মাটি ক্ষয় হচ্ছে বলে বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে। বিশেষ করে দক্ষিণ আফ্রিকা, ইরান ও আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী এলাকায় সব থেকে বেশি বায়ুঘটিত মাটি ক্ষয় হচ্ছে বলে বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। অন্যান্য অঞ্চলেরও মাটি ক্ষয় প্রক্রিয়া সেখানকার কৃষি ও পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে।

মাটি ক্ষয় প্রক্রিয়াকে অতীতে সেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। চলতি শতকেই বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহল নড়েচড়ে বসে। মাটি ক্ষয় সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা তৈরি করতে আন্তর্জাতিক মৃত্তিকা বিজ্ঞান ইউনিয়ন ২০০২ সালে প্রতিবছর ৫ ডিসেম্বর বিশ্ব মৃত্তিকা দিবস হিসেবে পালনের সুপারিশ করে। বিশ্বখাদ্য ও কৃষি সংস্থা এই সুপারিশ গ্রহণ করে ও ২০১৩ সালে জাতিসংঘের ৬৮তম সাধারণ পরিষদ ৫ ডিসেম্বরকে বিশ্ব মৃত্তিকা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। সেই থেকে প্রতিবছর ৫ ডিসেম্বর জাতিসংঘের কর্মসূচি হিসেবে বিশ্ব মৃত্তিকা দিবস পালন করা হচ্ছে। এবারের বিশ্ব মৃত্তিকা দিবসের প্রতিপাদ্য করা হয়েছে, ‘বন্ধ করো মৃত্তিকা ক্ষয়, রক্ষা করো ভবিষ্যৎ’ (স্টপ সয়েল ইরোশন, সেভ আওয়ার ফিউচার)। অস্বীকার করার উপায় নেই যে আমাদের ভবিষ্যৎ তথা অস্তিত্ব নির্ভর করছে আমাদের চারপাশে কতটুকু উর্বর মাটি আছে তার ওপর।

বাংলাদেশে প্রধানত পানির কারণে মাটি ক্ষয় হয়ে থাকে। বেশ কয়েকটি গবেষণা প্রবন্ধে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। বলা হচ্ছে যে বাংলাদেশে পানির দ্বারা মাটি অবনয়নের কারণে প্রায় ২৫ শতাংশ কৃষি প্রভাবিত হচ্ছে। তবে অন্যান্য কারণেও আমাদের দেশে মাটি ক্ষয় হয়ে থাকে। বাংলাদেশের মাটি ক্ষয় প্রক্রিয়াকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়, যেমন—পরতে পরতে ভূমিক্ষয় (শিট ইরোশন), জলনালিকা (রিল) ও নালা ক্ষয় (গালি ইরোশন), ভূমিধস, নদীতটীয় ভূমিক্ষয়, উপকূলীয় ভূমিক্ষয় ইত্যাদি। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে দেশের পাহাড়ি এলাকার প্রায় ৭৫ শতাংশ মাটিতে ক্ষয় প্রবণতা অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বর্তমানে ত্রুটিপূর্ণ জুম চাষের ফলে পাহাড়ি এলাকার মাটি ক্ষয় হচ্ছে। এ ছাড়া পাহাড়ি এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে ভবন নির্মাণ, বিশেষ করে পর্যটন স্পটগুলোতে যত্রতত্র হোটেল ও দোকান তৈরির ফলেও সেখানকার মাটি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একটি গবেষণা প্রবন্ধে বলা হয়েছে যে বাংলাদেশের পাহাড়ি এলাকায় বছরে প্রতি হেক্টর জমিতে ১০ থেকে ১২০ টন মাটি ক্ষয় হচ্ছে।

বাংলাদেশের পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঘটনা প্রায় প্রতিবছরই ঘটছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম বিভাগে কোনো কোনো বছর ভূমিধসের ঘটনায় শতাধিক মানুষের মৃত্যুও হয়েছে। এসব এলাকায় পাহাড়ি ঢালে ঘরবাড়ি তৈরি ও ত্রুটিপূর্ণ কৃষিকাজের ফলে সেখানকার মাটির উপরিভাগ আলগা হয়ে যায় ও বর্ষার সময় ধস নামে। নদীর তীর ভাঙনও বাংলাদেশে প্রতিবছর সংঘটিত হচ্ছে। একটি জরিপে দেখা গেছে যে বাংলাদেশে মোট নদী দৈর্ঘ্যের মধ্যে দুই থেকে তিন হাজার কিমি নদীর তীর দীর্ঘকাল ধরে ভাঙনপ্রবণ। দেশে নদীর তীর ভাঙনের ফলে বছরে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হয়। বাস্তুচ্যুত হয় বহু মানুষ। এ ছাড়া উপকূলীয় ভূমিক্ষয়ের কারণেও বাংলাদেশে উপকূলীয় এলাকায় মানুষের জীবনে দুর্দশা নেমে আসে। বিগত ২০০ বছরে ভাঙা ও গড়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের তটরেখা বরাবর, বিশেষ করে মেঘনা মোহনায় বিশাল পরিবর্তন সংঘটিত হয়েছে।

এ বছর বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা মাটি ক্ষয় রোধের জন্য বেশ কিছু সুপারিশ প্রণয়ন করেছে। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ক্ষয়প্রবণ এলাকায় ভূমি ব্যবহার সীমিতকরণ। মাটির অতি প্রয়োজনীয় উপাদান জৈব কার্বন রক্ষার্থে বনভূমি ধ্বংস না করা ও তৃণভূমিকে কৃষিভূমিতে রূপান্তর বন্ধ করার বিষয়ে সুপারিশ করা হয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় পানির স্রোতবেগ কৃত্রিম বাধা তৈরি করে কমানোর কথা বলা হয়েছে। পাহাড়ের গায়ে ধাপ তৈরি করার ব্যাপারেও সুপারিশ করা হয়েছে।

মাটি ক্ষয়প্রবণ এলাকায় কার্পেট উদ্ভিদ জাতীয় শস্যচাষকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। উপকূলীয় এলাকায় ম্যানগ্রোভ জাতীয় উদ্ভিদের ঘন ও চওড়া বন উপকূলীয় ভাঙনের বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। বর্তমানে বিশ্বের ১২০টি দেশে মাটি ক্ষয়রোধ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, খাড়া ঢাল ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি কাজে ‘বিন্না ঘাস’ (ভেটিভার ঘাস) নামের একটি উদ্ভিদকে কাজে লাগানো হচ্ছে। বাংলাদেশেও ঘাস নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে ও মাটি ক্ষয়ের বিরুদ্ধে আশাব্যঞ্জক ফলাফল পাওয়া গেছে। এই ঘাসের সব থেকে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে প্রায় সব ধরনের মাটিতেই এটি বেঁচে থাকে ও বংশ বৃদ্ধি করতে পারে। বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রকাশনায়ও ‘বিন্না ঘাস’কে মাটি ক্ষয়রোধে কার্যকর বলে অভিহিত করা হয়েছে। বাংলাদেশে মাটি ক্ষয় রোধের সম্ভাব্য পদ্ধতিগুলো বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

 

লেখক : অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা