kalerkantho

মঙ্গলবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১২ রবিউস সানি     

মানসিক চাপ ও সংকট থেকে মুক্তি

ড. নিয়াজ আহম্মেদ

৪ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মানসিক চাপ ও সংকট থেকে মুক্তি

নগরজীবনের নানা ব্যস্ততা আর সংগ্রামী জীবন আমাদের মানসিক চাপ ও সংকটের মধ্যে ফেলে দেয়। শিক্ষা, চাকরি, বিশেষ করে একান্নবর্তী পরিবার এবং প্রচণ্ড যানজট আমাদের চাপকে আরো বাড়িয়ে দেয়। এর সঙ্গে প্রবলভাবে যুক্ত হচ্ছে না-পাওয়ার ব্যর্থতা ও বেদনা আর পাওয়ার অনিশ্চয়তা। কারো কারো মধ্যে চাপ, অস্থিরতা এবং সংকট এতটা হয়ে দেখা দেয় যে সেখান থেকে বের হয়ে আসতে পারে না। চাপ ও সংকট মোকাবেলা করার সক্ষমতা ও সমাযোজন কৌশল জানা থাকা, আগে থেকে সচেতন হওয়া এবং মোকাবেলা করার চেষ্টা বড় বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে। মানসিক চাপ ও সংকট এক রকম সহজাত। এগুলো অনেক সময় হঠাৎ করে আসে আবার দীর্ঘ সময়ব্যাপী কোনো বঞ্চনা, অভাববোধ কিংবা কোনো জটিল রোগের কারণে হতে পারে।

মানসিক চাপ ও সংকট আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকার পেছনে শিশু বয়সের সামাজিক ও মানসিক বিকাশের পরিপূর্ণতার অভাব অনেকটা দায়ী। শৈশবে সামাজিক চাহিদা ও প্রত্যাশা অনুযায়ী আচরণ করার সক্ষমতা অর্জন করা বা রীতি-নীতি আয়ত্ত ও অনুসরণ করা উচিত। যদি তা ভালোভাবে অনুশীলন না করা হয়, তাহলে এর প্রভাব পরবর্তী জীবনে প্রতিফলিত হয়। শিশু যখন এমন আচরণ করতে শিখবে, যা সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে অনুমোদনীয় এবং গ্রহণযোগ্য, তখন সে স্বাভাবিক ও সুস্থ হয়ে বেড়ে উঠছে বলে ধরে নেওয়া হয়। এমন সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠার পেছনে দলের প্রভাব অপরিসীম। তবে শিশুদের বিভিন্ন বয়সের চাহিদা পূরণ, শিক্ষণ ও অনুকরণে পরিবারের ভূমিকা অগ্রগণ্য। আর এ ক্ষেত্রে শিশুদের দৈহিক বিকাশ যেমন প্রভাব বিস্তার করে, তেমনি বংশগতি ও পরিবেশের ভূমিকা রয়েছে। শিশু যখন কৈশোরে পদার্পণ করে তখন তার নিজস্ব চিন্তাচেতনা ও বুদ্ধির বিকাশ পরিপূর্ণ ও পরিপক্ব হয়। শৈশবের বিকাশকে ত্বরান্বিত ও প্রভাবিত করে পরবর্তী জীবনের প্রতিটি স্তরে। পরিপূর্ণ বিকাশে বাধা ও ক্রটিপূর্ণ ব্যক্তিত্ব গঠন প্রকারান্তরে প্রতিরক্ষা কৌশল অবলম্বনের জন্য বড় বাধা। ব্যর্থতাকে কেউ কেউ কোনো গঠনমূলক সামাজিক কাজে নিজেকে যুক্ত করে ঢাকতে পারে। আবার নিজের রাগ বা আগ্রাসনকে দমানোর জন্য খেলাধুলায় যুক্ত করা যেতে পারে।

ব্যক্তিত্ব বিকাশের প্রথম স্তরে শিশুদের মধ্যে মৌলিক বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। শিশুদের মৌলিক চাহিদা যদি ভালোভাবে পূরণ করা হয়, তাহলে তাদের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ তৈরি হয়। নচেৎ শিশুরা সবাইকে সন্দেহের চোখে দেখে। এ সময় মা ও শিশুর সম্পর্ক সুন্দর ও নিবিড় হওয়া বাঞ্ছনীয়। ধীরে ধীরে নিজেদের মধ্যে স্বাধীনতা, ইচ্ছা, শ্রমশীলতা এবং নিজ সম্পর্কে ধারণা পাকাপোক্ত, আত্মবিশ্বাস, উত্তম ও স্বাধীনভাব অর্জিত হয়। সমাজে তার স্থান ও ভূমিকা এবং নিজে চিন্তা করার সামর্থ্য অর্জিত হয়। প্রতিটি ক্ষেত্রে শিশু বিকাশের জন্য মা-বাবা ও পরিবারের ভূমিকা অগ্রগণ্য।

সামাজিক ও মানসিক বিকাশ সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক হলে চাপ ও সংকট মোকাবেলার সক্ষমতা শৈশব থেকেই অর্জিত হয়। কিন্তু অধুনা সমাজে একান্নবর্তী পরিবার, বাবা কিংবা মা নিয়ে পরিবার, এমনকি যৌথ পরিবার সর্বোপরি একটি প্রতিযোগিতামূলক সমাজে প্রতিনিয়ত সংকট, অস্থিরতা ও বিকাশে বিপত্তি বিরাজ করছে। যার যা ভূমিকা পালন ও শিশুদের চাহিদা ও প্রয়োজন পূরণে সজাগ ও সচেষ্ট থাকতে আমরা যেন ব্যর্থ। কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারলে আমরা চাপ ও সংকট মোকাবেলা করতে পারি। আমাকে প্রথমেই ভাবতে হবে আমি কোন কোন চাপ বা সংকটের মধ্যে আছি। কোনোভাবেই অবহেলা করা ঠিক নয়। আমাদের হয়তো পেশাগতভাবে চাপ কিংবা সংকট মেকাবেলা করার কৌশল জানা নেই। তবে সহজভাবে আমি কারো সঙ্গে, বিশেষ করে পরিচিতজনের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করতে পারি। আলোচনায় আমার নিজের মধ্যে থাকা আবেগের পরিপূর্ণ বহিঃপ্রকাশ ঘটবে এবং দূরীভূত হবে। যত দ্রুত এ কাজটি করা সম্ভব হবে, তত দ্রুত ক্ষতির দিকে থেকে সরে আসতে পারবে। কার্যকারণ সম্পর্কেও খুঁজে বের করতে হবে। পরিবারের পক্ষ থেকেও উৎসাহ দেওয়া দরকার। সংকটে পতিত হলে দৃঢ়তাসূচক মনোভাব পোষণ করা প্রয়োজন। উৎসাহ ও সহযোগিতামূলক মনোভাব ও আত্মবিশ্বাস থাকা চাই। যদি কোনোভাবেই চাপ ও সংকট মোকাবেলা করা সম্ভব না হয়, তখন পেশাদার কাউন্সিলরের পরামর্শ গ্রহণ করা যেতে পারে।

 

লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা