kalerkantho

রবিবার । ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১০ রবিউস সানি ১৪৪১     

ঢাকার বায়ুদূষণ ও মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি

ধরিত্রী সরকার সবুজ

৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ঢাকার বায়ুদূষণ ও মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি

বায়ুদূষণ পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা এয়ারভিজ্যুয়ালের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী ২৪ নভেম্বর রবিবার সকাল ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত বেশির ভাগ সময় ঢাকা ছিল বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহর। এরপর কয়েক ঘণ্টার জন্য মঙ্গোলিয়ার রাজধানী উলানবাটোর দূষণের দিক থেকে ঢাকার ওপরে উঠে যায়। কিন্তু রাত সাড়ে ৮টার পর উলানবাটোরের চেয়ে ঢাকার বায়ুদূষণ ইনডেক্স বেশি হয়। এয়ারভিজ্যুয়ালের তথ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ সময়ই দূষিত বায়ুর শহর হিসেবে ঢাকা এক নম্বরে থাকছে।

সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য মানুষের যেমন খাদ্য-বস্ত্রের প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন একটি বাসযোগ্য পরিবেশের। নির্মল বায়ু সুস্থ জীবনের পূর্বশর্ত। দেশে শিল্পায়ন ও নগরায়ণের প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অবকাঠামো নির্মাণ, যান্ত্রিক যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধিসহ অর্থনৈতিক কার্যক্রম বৃদ্ধি পাওয়ায় বায়ুদূষণের মাত্রাও বেড়ে চলেছে। ইটভাটার ধোঁয়া ঢাকার বাতাসকে দূষিত করছে মারাত্মকভাবে। শীত মৌসুমে স্বল্প বৃষ্টিপাত ও শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে স্বাভাবিকভাবেই বায়ুদূষণ বেড়ে যায়। বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড এবং সালফারের মতো ক্ষতিকর গ্যাসের পরিমাণ বাড়ছে। ঢাকাসহ বড় বড় শহরগুলোতে বায়ুদূষণজনিত স্বাস্থ্যহানি ও মৃত্যুর হার দিন দিন বাড়ছে। শুধু বাতাসই নয়, পানি, মাটি, শব্দের মতো পরিবেশের অন্যান্য উপাদানের দূষণের ফলে নগরবাসী স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।

অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের ফলে বাংলাদেশের পরিবেশ মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শহরের দরিদ্র মানুষ ও শিশুরা। বায়ু, পানি ও কর্মক্ষেত্রের পরিবেশের দূষণ এবং শিশুদের ওপর ভারী ধাতু সিসার প্রভাবে বছরে ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদন অর্থাৎ জিডিপির প্রায় ২.৭ শতাংশ। ঢাকাকে বৃত্তাকারে ঘিরে রাখা নদীগুলো আজ দখল ও দূষণে জর্জরিত। শিল্প-কারখানা ও গৃহস্থালির বর্জ্য নদীগুলোর পানিকে মানুষের ব্যবহার ও জলজ জীবের বেঁচে থাকার জন্য অযোগ্য করে তুলেছে। বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও বালু নদকে সঠিক চেহারায় ফিরিয়ে আনার কোনো বিকল্প নেই।

পরিবেশ অধিদপ্তর দেশের ১১টি শহরের বায়ুর মান পর্যবেক্ষণ করে। এ পর্যবেক্ষণ থেকে দেখা যায়, ঢাকা, গাজীপুর, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল, সাভার, ময়মনসিংহ এবং রংপুরের বায়ুর মান বেশ খারাপ। খুলনা, কুমিল্লার বায়ুর মানও খারাপ। চট্টগ্রাম ও সিলেটের বায়ুর মান অপেক্ষাকৃত ভালো। রাজধানীর সাতটি এলাকায় এয়ারভিজ্যুয়ালের পর্যবেক্ষণ থেকে পাওয়া যায়, ঢাকার কারওয়ান বাজারে বায়ুর মান সবচেয়ে খারাপ। এরপর রয়েছে মোহাম্মদপুর ও গুলশান এলাকা। উত্তরা, মিরপুর ও নর্দা এলাকার অবস্থান তারপর। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, কোনো একটি শহরের বায়ুর মানের সূচক ২০০-এর বেশি হলে তাকে খুবই অস্বাস্থ্যকর বিবেচনা করা হয়। ঢাকার বেশির ভাগ অংশের বায়ুর মান সূচক নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত ২০০-এর ওপরেই থাকে।

২০১৬ সালে পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ প্রকল্পের আওতায় ঢাকার বায়ুদূষণের উৎস ও ধরন নিয়ে নরওয়ের ইনস্টিটিউট অব এয়ার রিসার্চ একটি জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। জরিপের তথ্য বলছে, নভেম্বর মাসে ঢাকার চারপাশে প্রায় এক হাজার ইটভাটা চালু হয়, যা বায়ুদূষণের জন্য ৫৮ শতাংশ দায়ী। সেপ্টেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত অবকাঠামো নির্মাণ ও মেরামতের কাজও চলে দুর্বার গতিতে, যা ধুলাদূষণের জন্য মারাত্মকভাবে দায়ী। বাতাসে অধিক পরিমাণ ধুলা, ভাসমান বস্তুকণা, কার্বন ডাই-অক্সাইড বা কার্বন মনোক্সাইডের উপস্থিতি পারিপার্শ্বিক অঞ্চলের তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।

২০১৯ সালের মার্চ মাসে পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিশ্বব্যাংক কর্তৃক প্রকাশিত একটি গবেষণা থেকে দেখা যায়, দেশে বায়ুদূষণের প্রধান তিনটি উৎস হচ্ছে ইটভাটা, যানবাহনের কালো ধোঁয়া এবং নির্মাণকাজ। বায়ুদূষণ মোকাবেলায় আমাদের প্রধান কাজ দূষণের উৎস বন্ধ করা। দ্বিতীয় কাজ হচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃক্ষরোপণ করে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলা।

২০১৭ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাংক কর্তৃক প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের শহরাঞ্চলের পরিচ্ছন্নতা ও স্থিতিশীলতা উন্নয়নের সুযোগ বৃদ্ধিকরণ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিগত ৪০ বছরে ঢাকা শহরের প্রায় ৭৫ শতাংশ জলাভূমি হারিয়ে গেছে এবং জলাভূমি ভরাট করে বিভিন্ন এলাকায় বহুতল ভবন নির্মাণের কারণে রাজধানীর অনেক অংশ বন্যার সময় প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে আছে।

মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড বায়ুদূষণের প্রধান কারণ। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে বায়ুতে বিভিন্ন ধরনের গ্যাস নির্গত হয়, ইটভাটার ধোঁয়া, কলকারখানা ও যানবাহন থেকে ক্ষতিকর গ্যাস নির্গত হয়, গাছপালা পোড়ানো, যেখানে সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলা, থুথু, মলমূত্র ফেলা—এসব কারণে প্রতিনিয়ত বাতাস দূষিত হচ্ছে।

বায়ুদূষণ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। ফুসফুসের ক্যান্সার, শ্বাসজনিত রোগ, হৃদেরাগসহ বিভিন্ন রোগের কারণ বায়ুদূষণ। বায়ুদূষণের ফলে বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এসিড-বৃষ্টি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসিড-বৃষ্টির ফলে জীবের ক্ষতি হতে পারে বা জীব মারা যেতে পারে।

পরিবেশদূষণের কারণে জীবজন্তুর আবাসস্থল নষ্ট হচ্ছে। খাদ্যশৃঙ্খল ধ্বংস হচ্ছে। ফলে অনেক জীব পরিবেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। দূষণের কারণে বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বাড়ছে। পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে মেরু অঞ্চলের বরফ গলে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বেড়ে যাচ্ছে। সে কারণে পৃথিবীর অন্যান্য নিচু অঞ্চলের পাশাপাশি বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের কিছু অংশ পানির নিচে ডুবে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ঢাকার আবাসিক এলাকাকে নিরবচ্ছিন্ন আবাসিক এলাকা হিসেবে থাকতে দেওয়া হচ্ছে না। আবাসিক এলাকার ভবনগুলোতেই গড়ে উঠছে স্কুল, কলেজ, রেস্তোরাঁ, বিউটি পার্লার, জেনারেল স্টোর, এমনকি ডায়াগনস্টিক সেন্টার। ঢাকা শহরে অনেক মানুষের বাস। প্রতিদিন অনেক মানুষ ঢাকা শহরে আসে বিভিন্ন কাজের প্রয়োজনে। বিপুলসংখ্যক নগরবাসীর তুলনায় রাজধানীতে বিনোদনকেন্দ্র বা সবুজ পার্কের সংখ্যা বেশ কম। ঢাকা শহরে যে কয়টি পার্ক আছে তার মধ্যে জনগণের কাছে সবচেয়ে সুপরিচিত সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও রমনা পার্ক। প্রতিদিন অনেক ক্লান্ত মানুষ যেমন একটু বিশ্রামের জন্য ছুটে আসে, তেমনি অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও রমনা পার্কে আসে বিনোদনের জন্য। প্রতিদিন ভোরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও রমনা পার্ক জেগে উঠে পাখির কূজনের পাশাপাশি বিভিন্ন বয়সী ব্যায়াম বা হাঁটাপ্রেমী মানুষের পদচারণে। কিন্তু দেড় কোটি মানুষের এই শহরে প্রয়োজন অনেক পার্ক, উদ্যান বা খোলা জায়গা।

বৃক্ষরাজি, গাছপালা, উদ্ভিদ প্রকৃতিকে সুস্থ, সুন্দর, স্নিগ্ধ রাখে। প্রাকৃতিক পরিবেশের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখতে গাছপালা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উদ্ভিদ তার খাদ্য তৈরির জন্য কার্বন ডাই-অক্সাইড ব্যবহার করে বিধায় যত বৃক্ষরাজি থাকবে বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ ততই কমবে। কিন্তু রাজধানীতে আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন, রাস্তাঘাট বানাতে গিয়ে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন উপকরণের জোগান দিতে গিয়ে ঢাকা শহরের গাছপালা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। রাজধানীর পরিবেশ, তাপমাত্রা নাগরিকের স্বাস্থ্যের জন্য মোটেই সুখকর নয়। ঢাকা শহরের পার্ক, উদ্যানগুলোতে গাছপালার সংখ্যা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের সময় গাছপালা যতটা বাঁচিয়ে রাখা যায় তার চেষ্টা করা দরকার। শহরের প্রতিটি মানুষকে তাদের বাড়ির আশপাশের জায়গাগুলোতে বৃক্ষরোপণে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। ব্যক্তির মধ্যে বৃক্ষপ্রেম, উৎসাহ, সৃজনশীলতা থাকলে বাড়ির ছাদেও সুন্দর বাগান গড়ে তোলা সম্ভব। বাড়ির সৌন্দর্য বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এসব গাছপালা ঢাকার পরিবেশ ভালো রাখবে, তাপমাত্রা সহনশীল রাখবে এবং রাজধানীবাসীর সুস্থ জীবনযাপনেও ভূমিকা রাখবে।

 

লেখক: পরিবেশবিষয়ক লেখক। ইংল্যান্ডের গ্রিনিচ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘এনভায়রনমেন্টাল কনজারভেশন’ বিষয়ে মাস্টার্স

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা