kalerkantho

রবিবার । ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১০ রবিউস সানি ১৪৪১     

পার্বত্য শান্তিচুক্তি ও অশান্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম

শক্তিপদ ত্রিপুরা

২ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



পার্বত্য শান্তিচুক্তি ও অশান্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম

পার্বত্য চট্টগ্রাম আবার অশান্ত হয়ে উঠছে। অশান্তির মূল কারণ হলো পার্বত্য শান্তিচুক্তির অবাস্তবায়ন। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যকার ‘পার্বত্য শান্তিচুক্তি’ সম্পাদিত হয়। শান্তিচুক্তি সম্পাদনের আজ ২২ বছর পূর্তি হতে চলেছে, তথাপি পার্বত্য শান্তিচুক্তির মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ বিধানগুলো আজ অবধি বাস্তবায়িত হতে পারেনি। আমরা সবাই জানি যে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণ, জুম্ম জাতিগুলোর অস্তিত্ব রক্ষা এবং তাদের নিজ নিজ ভাষা-সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সুরক্ষার ভিত্তিতে মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপনের জন্য স্বশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রথমে গণতান্ত্রিক ও পরবর্তী সময়ে সশস্ত্র সংগ্রাম গড়ে তোলে। সশস্ত্র সংগ্রামরত অবস্থায় সাতবার বৈঠকের পর শেখ হাসিনা সরকার আঞ্চলিক পরিষদসংবলিত স্বশাসন প্রদানে সম্মত হলে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি চুক্তি স্বাক্ষরে সম্মত হয়। আঞ্চলিক পরিষদসংবলিত স্বশাসনের মধ্যে রয়েছে আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের কাছে আইন-শৃঙ্খলা, পুলিশ, ভূমি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি ও পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম অধ্যুষিত অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণসহ ২২টি বিষয়ের ওপর ক্ষমতা ও দায়িত্ব হস্তান্তর করা। পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম অধ্যুষিত অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণের অংশ হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামে অপাহাড়ি বা অজুম্ম বসতি নিয়ন্ত্রণ, পার্বত্য অঞ্চলের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ক্ষমতা আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তর ও সংরক্ষণ, পার্বত্য চট্টগ্রামে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী বাসিন্দাদের নিয়ে ভোটারতালিকা প্রণয়নপূর্বক পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা ও অস্থায়ী সেনাক্যাম্প ও অপারেশন উত্তরণ প্রত্যাহার করা এবং পাহাড়িদের বেদখলকৃত ভূমি ফেরত প্রদান করা ছিল অন্যতম। এসব বিষয় পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জাতিগুলোর অস্তিত্ব সুরক্ষা এবং তাদের উন্নয়ন ও অধিকার প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সম্পর্কিত। পার্বত্য শান্তিচুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামে স্বশাসন ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। এ জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চুক্তি সম্পাদনকালে এই চুক্তিকে ‘শান্তিচুক্তি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন এবং তিনি এর ব্যাখ্যা হিসেবে বলেছিলেন, যেহেতু পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এই চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে, সে কারণে এই চুক্তির নাম ‘শান্তিচুক্তি’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হলো। শান্তিচুক্তির ২২ বছর পূর্তির প্রাক্কালে প্রশ্ন রাখতে চাই, শান্তিচুক্তি সম্পাদনের মধ্য দিয়ে কি পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে? আজ পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রতিনিয়ত রক্ত ঝরছে। পাহাড়ি জনগণের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলা প্রতিনিয়ত পরিচালনা করা হচ্ছে। পাহাড়িদের শত-হাজার একর ভূমি বেদখল করা হচ্ছে। পাহাড়ি মানুষের ওপর মামলা, হামলা, হত্যা, গুম অব্যাহতভাবে চলছে। তাদের কেয়াং-মন্দির ভেঙে ফেলা হচ্ছে, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চলছে। তারা নিরাপত্তার কারণে দেশ ছেড়ে বিদেশে পালাচ্ছে। এসবই প্রমাণ করে যে পার্বত্য চট্টগ্রামে আজ কোনো শান্তি নেই, নেই কোনো জীবনের নিরাপত্তা। পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ার কারণেই পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ও স্বশাসন প্রতিষ্ঠা পেতে পারেনি। পাহাড়ি মানুষের জীবন ও জীবিকার নিশ্চয়তা নিশ্চিত হয়নি। শেখ হাসিনা সরকার পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন না করে বর্তমানে শান্তিচুক্তিবিরোধী কার্যকলাপে লিপ্ত হয়েছে। সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামে স্বশাসন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি জুম্ম অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণত করার বিপরীতে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণত করে অপাহাড়িদের কাছে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সব ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে চলেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের আইন-শৃঙ্খলা, সাধারণ প্রশাসন, উন্নয়ন ইত্যাদি ক্ষেত্রে সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ ও কর্তৃত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব কার্যকলাপ পার্বত্য শান্তিচুক্তি ও মুক্তিযুদ্ধ চেতনার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। একটি গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও শোষণমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। সে কারণে এই যুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের আদিবাসী-বাঙালি ও সব ধর্মের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছিল। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান রচনা করা হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে এই সংবিধানে বাংলাদেশের আদিবাসী মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ভূমি ও শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠা পায়নি। সে কারণে এই সংবিধান সত্যিকার অর্থে অসাম্প্রদায়িক হয়ে উঠতে পারেনি। শাসকগোষ্ঠীর সাম্প্রদায়িক মানসিকতার কারণে ১৯৭২ সালের সংবিধান সত্যিকার অর্থে একটি অসাম্প্রদায়িক সংবিধান হিসেবে রচিত হতে পারেনি। খুবই বেদনাদায়ক যে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদিতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িকতা সংকুচিত হচ্ছে। দেশ আজ রাজনীতিক কর্তৃক পরিচালিত না হয়ে ব্যবসায়ী ও সামরিক-বেসামরিক আমলা কর্তৃক পরিচালিত হচ্ছে। যার কারণে পার্বত্য শান্তিচুক্তি যেমন বাস্তবায়িত হতে পারছে না, তেমনি দেশে গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িকতা বিকশিত হতে পারছে না। সেই একই কারণে নারী, কৃষক-শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা পেতে পারছে না।

জুম্ম জনগণের কাছে আজ এটি পরিষ্কার যে সরকার আর পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন করবে না; বরং সরকার জাতিগত নির্মূলীকরণের কার্যক্রম জোরদার করে চলেছে। সে কারণে জুম্ম জনগণ, বিশেষত যুবসমাজ সংগ্রাম করে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের শপথ গ্রহণ করেছে। এরই মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম আবারও অশান্ত রূপ পরিগ্রহ করেছে। আগামী দিনে এটি দাবানলের রূপ পেতে পারে, যদি না সরকার দ্রুততার সঙ্গে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করে। সরকার যদি শান্তিচুক্তি ও শান্তিচুক্তির আলোকে প্রণীত আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে পার্বত্য চট্টগ্রামকে জুম্ম অধ্যুষিত অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণে আন্তরিক হয় এবং এই বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণের অংশ হিসেবে সেটেলারদের পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে সম্মানজনকভাবে পুনর্বাসনের উদ্যোগ গ্রহণ করে, পার্বত্য চট্টগ্রামে গণতন্ত্র ও বেসামরিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ নির্বাচনের জন্য স্থায়ী বাসিন্দাদের ভোটার তালিকা প্রণয়ন করে, আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের কাছে সব ক্ষমতা ও দায়িত্ব হস্তান্তর করে, তাহলে পার্বত্য চট্টগ্রামের দাবানলের পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের সুযোগ রয়েছে। কোনো শাসকগোষ্ঠী যদি সাধারণ জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে, তাহলে সেই শাসগোষ্ঠীকে অবধারিতভাবে তার করুণ পরিণতি বরণ করে নিতে হয়। আমরা ইতিহাসে তা বারবার দেখেছি। পাকিস্তান আমলে দেখেছি, বাংলা ভাষা ও পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার কারণে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীকে করুণ পরিণতি বরণ করে নিতে হয়েছিল। একইভাবে আমরা বাংলাদেশ ও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ইতিহাসেও তা লক্ষ করেছি। নিষ্পাপ সাধারণ জনগণের করুণ আর্তনাদ ও শ্বাস-প্রশ্বাসে শাসকগোষ্ঠীর দম্ভ চূর্ণ হয়ে যায়। পৃথিবীতে এ ধরনের দৃষ্টান্ত আমরা বারবার দেখেছি। শাসকগোষ্ঠী জুম্ম জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, এই বিশ্বাসঘাতকতা ভালো ফল বয়ে আনবে না। তাই এখনো সময় আছে, দ্রুততার সঙ্গে শান্তিচুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করুন। নইলে দাবানল ও করুণ পরিণতি থেকে কেউ রক্ষা পাবে না।

পার্বত্য চট্টগ্রামে অশান্তির কারণ হিসেবে বিবিসি সাতটি কারণ উল্লেখ করেছে। এগুলো হলো : ১. চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়া। ২. আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্য জেলা পরিষদ নির্বাচন না হওয়া। ৩. ভূমি সমস্যা সমাধান না হওয়া। ৪. সেনাবাহিনীর উপস্থিতি। ৫. পাহাড়িদের বিভেদ। ৬. বাঙালিদের বসতি ও অবিশ্বাস। ৭. পিছিয়ে পড়া উন্নয়ন ও দুর্গম এলাকা। বিবিসিও মনে করে যে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়া, চুক্তি ও চুক্তির আলোকে প্রণীত আইন মোতাবেক আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত না করা, ভূমি কমিশনকে কার্যকর করে ভূমি কমিশনের আইন অনুসরণ করত পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথা-রীতি অনুসারে ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তির মধ্য দিয়ে পাহাড়িদের বেহাত হওয়া ভূমি ফেরত না দেওয়া, অস্থায়ী সেনাক্যাম্প ও অপারেশন উত্তরণ প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনা কর্তৃত্ব প্রত্যাহার না করা, পার্বত্য চট্টগ্রামের পিছিয়ে পড়া ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ না করা এবং শাসকগোষ্ঠীর ভাগ করো শাসন করো পলিসির কারণে আজ যে পাহাড়িরা বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত, এসব বিষয়কে বিবিসি পার্বত্য চট্টগ্রামের অশান্তির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ফের অশান্ত হয়ে উঠছে। সরকার যদি অতি দ্রুত চুক্তি বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ না করে, তাহলে পরিস্থিতি চুক্তিপূর্ব পরিস্থিতির চেয়ে আরো কঠিন, জটিল ও ভয়ংকর রূপ লাভ করবে এবং এ ধরনের পরিস্থিতির পরিণতি কারো জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে না। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী পাহাড়ি-বাঙালির কল্যাণ ও শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং দেশের গণতন্ত্র ও সমৃদ্ধির স্বার্থে পার্বত্য শান্তিচুক্তির দ্রুত ও কার্যকর বাস্তবায়ন একান্তই কাম্য।

লেখক : সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা