kalerkantho

রবিবার । ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১০ রবিউস সানি ১৪৪১     

খাদ্য অপচয় রোধ করার সময় এখনই

অনলাইন থেকে

১ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



খাদ্য অপচয় (বা খাদ্য বিনষ্টকরণ) ব্যাপক জন-উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে—সুখবর। অনাবৃষ্টি, দুর্ভিক্ষ, নির্বনায়ন—এসবের চেয়ে খাদ্য অপচয়ের বিষয়ে গুগলে বেশি খোঁজ করা হচ্ছে। এ প্রবণতাকে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ২০১১ সালের প্রতিবেদনের প্রতি ‘শুভদৃষ্টি’ বলা যেতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে উৎপাদিত খাদ্যের এক-তৃতীয়াংশ কখনোই খাওয়া হয় না অর্থাৎ নষ্ট হয়।

আট বছর পর এখন বলা যেতে পারে, অগ্রবর্তী হওয়ার, সচকিত হওয়ার এখনই সময়। কারণ খাদ্য অপচয়ের মাত্রা টনক নাড়ানোর পর্যায়ে পৌঁছেছে। এ বিষয়ে দৃঢ় ঐকমত্য তৈরি হওয়া সত্ত্বেও আমরা এখনো প্রচুর কথা বলে যাচ্ছি, করছি সামান্যই।

ভেবে দেখা যাক : বিশ্বজনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক বাস করে এমন এক দেশ জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমালার ১২.৩ ধারা অনুযায়ী জাতীয় লক্ষ্য নির্ধারণ করল। ১২.৩-এ ২০৩০ সালের মধ্যে খাদ্য অপচয় অর্ধেকে নামিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ১৫ শতাংশ লোক বাস করে এমন এক দেশ খাদ্য অপচয় কমাতে কিছু একটা পরিকল্পনা করল। আর ১২ শতাংশ লোক বাস করে এমন দেশ এখনো ভাবছে, কী করে বিষয়টির হিসাব-কিতাব করতে হয় (সচেতনতা ও করণীয়র মাত্রা কী তা বোধগম্য)।

লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করে বিশ্বকে সহায়তা করতে এফএও জুতসই কার্যকর উপায় অবলম্বনের জন্য ম্যাপিং করছে, যাতে আমরা সত্যিকার অর্থেই খাদ্য অপচয় কমাতে পারি।

প্রথমত, আমরা খাদ্য অপচয় সূচক প্রণয়ন করেছি। এর সাহায্যে দেশগুলো ফসল কাটা ও সংরক্ষণ, পরিবহন ও প্রক্রিয়াকরণের সময় কী পরিমাণ খাদ্য নষ্ট হচ্ছে তা পরিমাপ করতে পারবে। এতে অবশ্য খুচরা পর্যায়ের অপচয় বিবেচনা করা হয়নি। এখন অপচয়ের গড়মাত্রা ১৪ শতাংশ। এটাকে অপচয় হ্রাসের অগ্রগতি দেখার জন্য মনিটরিং প্রক্রিয়ার বেঞ্চমার্ক ধরা হয়েছে। অপচয়ের নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে—বাড়িয়ে বা কমিয়ে বলার প্রবণতা সৃষ্টি করে (এ বিষয়টি সূচকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি)। অপচয় কিভাবে ক্ষুধার্ত ও দরিদ্রদের ভোগায় সে বিষয়ক আপ্তধারণা এড়িয়ে যাওয়া উচিত। কারণ কানসাসের কোনো রেফ্রিজারেটরের না-খাওয়া মাংস কিনশাসার কোনো কাজে লাগে না।

উল্লেখ্য, খাদ্যের অপচয় প্রায়শ সেখানেই ঘটে, যেখানে ক্ষুধার্ত দশা বেশি বিরাজ করে। বাস্তবে অপচয় সবচেয়ে বেশি হয় মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায়, যেখানে অপুষ্টির উপস্থিতি ৫০ শতাংশ—বিশ্বের অন্য যেকোনো জায়গার চেয়ে বেশি (বিভিন্ন এলাকার অপচয়হারে দৃষ্টি দিলে কৃষকরা কী উৎপাদন করে তার হদিস মিলতে পারে। ক্রান্তীয় অঞ্চলের বেশির ভাগ এলাকায় একটি জরুরি খাদ্যের নাম কাসাভা। মৃদু তাপমাত্রার এলাকায় এটা আলুর চেয়ে দ্রুত নষ্ট হয়। ফল ও সবজির বেলায়ও তা-ই ঘটে।)।

অব্যবহৃত খাদ্য পরিবেশের ওপর বিশাল কালো ছায়া ফেলে। খাদ্য-শৃঙ্খলের কথা ভেবে খাদ্য অপচয় হ্রাসে যত দ্রুত মনোযোগ দেওয়া যাবে তত কার্যকরভাবে ভূমি ও জলের ওপর চাপ মোকাবেলার পথ পাওয়া যাবে। ভোক্তা ও খুচরা বিক্রেতাদের খাদ্য অপচয় কমানোর কথা ভাবলে গ্রিনহাউস গ্যাস বিকিরণ কমানোর সর্বোত্তম উপায় পাওয়া যাবে।

এফএওর ২০১১ সালের হিসাবে ক্যালরি বা অর্থনৈতিক মূল্যের চেয়ে পরিমাণের দিকেই নির্দেশ করা হয়েছে। আমরা আগের চেয়ে বেশি জানি বটে, কিন্তু পর্যাপ্ত জানি না।

শস্যদানার অপচয় হয় ৭ থেকে ২১ শতাংশ পর্যন্ত; আফ্রিকার সাব-সাহারা অঞ্চলে আম বা টমেটোর অপচয় হয় ০.৫ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত। যে নতুন সূচক প্রণয়ন করা হয়েছে তাতে সব দেশই তার খাদ্য-শৃঙ্খলের কোথায় বাধা পড়ছে, ক্রিটিক্যাল লস-পয়েন্ট কোনোটি তা শনাক্ত করতে পারবে এবং যে ব্যবস্থা নিলে সর্বোত্তম ফল পাওয়া যাবে সেটি ঠিক করতে পারবে। দেশভেদে ব্যবস্থা ভিন্ন হবে এবং সুবিবেচনাপ্রসূত বিনিয়োগ লাগবে।

ক্রান্তীয় অঞ্চলে সংরক্ষণ ও সহায়তামূলক ব্যবস্থা অবশ্য প্রয়োজনীয়। একই সঙ্গে প্রযুক্তি, জ্ঞান, প্রণোদনা ও সংগত নীতিকাঠামো লাগবে। উত্তর আমেরিকায় যে বিষয়টি বেশি বিবেচ্য তা হচ্ছে খুচরা বিক্রেতা ও ভোক্তাদের আচরণ, যা যথাযথ করার জন্য দরকার দরিদ্রদের জন্য বণ্টণ কর্মসূচি এবং নিয়ন্ত্রিত ভাগাড় ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।

সংখ্যা দিয়ে সব বলা যায় না—অনিরাপদ খাবার ফেলে দিতে হবে। সুষ্ঠু-সবল খাদ্য-ব্যবস্থা ও কৃষকদের আয় কিছু শিথিলতার ওপর নির্ভর করে। চরম পদক্ষেপ নেওয়ার চেয়ে বাস্তবিক হ্রাসকরণ পদ্ধতি তুলনামূলক ভালো।

প্রকৃত সফল উপায় সেটিই যেটি মেনে চললে সুবিধাজনক ও লাভজনক সহ-ফল পাওয়া যায়। দ্রুত নষ্ট হয়ে যেতে পারে এমন ফল, সবজি ও প্রাণিজাত খাবার মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট-সমৃদ্ধ, কাজেই স্থানীয় খাদ্যব্যবস্থায় এগুলোর জোগানের উপায় সন্ধান করলে ধনী-দরিদ্র সব দেশেই মানবস্বাস্থ্যের উপকার হবে।

 

সূত্র : নিউ দিল্লি টাইমসে প্রকাশিত এফএওর অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন বিভাগের মহাপরিচালক কু দঙ্গিউ এবং সহকারী মহাপরিচালক মাক্সিমো তোরেরো কুল্লেনের নিবন্ধ

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা