kalerkantho

সোমবার । ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ১ পোষ ১৪২৬। ১৮ রবিউস সানি                         

পেঁয়াজের ঝাঁজ ও বাজারে অস্থিরতা

ড. মো. আনিসুজ্জামান

১৮ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



পেঁয়াজের ঝাঁজ ও বাজারে অস্থিরতা

বাজারে পেঁয়াজের মূল্য কেজিপ্রতি ২০০ টাকা ছাড়িয়েছে। আমার ফেসবুক ফ্রেন্ড এবং সহকর্মী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজলা গেটসংলগ্ন বাজার থেকে এক কেজি পেঁয়াজ ১৯০ টাকায় কিনে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন। রাজশাহী শহরের সাধুর মোড় বাজারে রাস্তার একপাশে বিক্রি হচ্ছে ২২০ টাকা কেজি, অন্য পাশে ২৫০ টাকা। সংসদে পেঁয়াজের মূল্য নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় বলেছেন, পেঁয়াজের বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কেজিপ্রতি কত মূল্যে তিনি নিয়ন্ত্রণ করেছেন, তা নির্দিষ্ট করে বলেননি। পেঁয়াজের বাজারমূল্য জামায়াত-বিএনপি নিয়ন্ত্রণ করছে, এই বক্তব্য বেমানান হবে। সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট ব্যবসায়ী এবং বাজার কারবারিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে পেঁয়াজ। নতুন পেঁয়াজ বাজারে আসার আগ পর্যন্ত পেঁয়াজের ঝাঁজ কমবে বলে মনে হয় না। কার্গো বিমানে পেঁয়াজ আসছে। দেখা যাক বাজারে তার কী প্রতিক্রিয়া পড়ে। তবে এ কথা আজ মানতেই হবে, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং সরকারের তথ্যভাণ্ডারের দুর্বলার কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রিত ক্ষুদ্র আয়ের মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থাপনায় তথ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তথ্যসমৃদ্ধ বিশ্বই উন্নত বিশ্ব। সামন্ততান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় ভূমির কর্তৃত্বের ওপর ব্যক্তি মানুষের এবং রাষ্ট্রের আভিজাত্য নির্ভর করত। ভূমি দখলের প্রবণতা তখন সম্মান এবং গৌরবের হাতিয়ার ছিল। বিশ্ব জয় মানে ছিল ভূমির ওপর কর্তৃত্ব। আলেকজান্ডার, চেঙ্গিস খান, অটোমান সম্রাট সুলতান সুলেমান ভূমি দখল করে বিশ্ব জয়ের স্বপ্ন দেখতেন। শিল্প বিপ্লবের পর ভূমি দখলের চেয়ে বাজার দখল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বাজারের প্রয়োজনে কাঁচামাল সংগ্রহ এবং উৎপাদিত পণ্যের বাজার দখল ছিল সাম্রাজ্যবাদী নীতির প্রধান কৌশল। অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্র হলো উন্নত বিশ্বের দাবিদার। প্রযুক্তির ওপর দখলদারির ভিত্তিতে উন্নত এবং তৃতীয় বিশ্বে বিভক্ত হয়ে যায় পৃথিবী। মানুষের সামাজিক মর্যাদা নির্ধারিত হয় প্রযুক্তির ব্যবহারের দক্ষতার ওপর। একবিংশ শতকে যন্ত্রনির্ভর প্রযুক্তির ওপর সম্পদের মালিকানার ধারণার পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমানে বলা হচ্ছে, তথ্যভাণ্ডারসমৃদ্ধ রাষ্ট্রই উন্নত রাষ্ট্র। তথ্য সংগ্রহের জন্য যেকোনো উপায়ে মানুষকে অন্তর্জালের আওতায় নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে। মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য চলে যাচ্ছে গ্লোবাল বিশ্বে। আমেরিকা আর আফ্রিকার দূরত্ব কমেছে কিন্তু তথ্যভাণ্ডর উভয়ের সমান নয়। যেকোনো উপায়ে উন্নত বিশ্ব তথ্যভাণ্ডার গড়ে তুলছে। তৃতীয় বিশ্বের তথ্যভাণ্ডার উন্নত বিশ্বের নিয়ন্ত্রণে।

বংলাদেশে প্রতিবছর কী পরিমাণে পেঁয়াজ উৎপাদন হয়? দেশে পেঁয়াজের চাহিদা কত? কোন দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি করা যায়? কোন দেশে পেঁয়াজের ফলন ভালো হয়েছে? কোথায় থেকে দেশের প্রয়োজনীয় চাহিদার পেঁয়াজ আমদানি করলে বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণে থাকবে ইত্যাদি তথ্য সংগ্রহ করা কোনো কঠিন কাজ নয়। সরকারের তথ্যভাণ্ডার পেঁয়াজের বাজার নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারত। পেঁয়াজের উৎপাদন এবং চাহিদার প্রকৃত তথ্য সরকারের হাতে থাকলে এমন হওয়ার কথা ছিল না। তথ্য-প্রযুক্তির যুগে পেঁয়াজ মজুদ করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। দেশের মানুষ সরকারের ওপর দায় চাপাচ্ছে, কখনো বা ব্যবসায়ীদের ওপর। যার ওপরই দায় চাপুক, পেঁয়াজ কারবারিরা অল্প সময়ের ব্যবধানে বিপুল পরিমাণ অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন। এই অর্থ যে দেশে থাকবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।

সরকারের তথ্যভাণ্ডারের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। দুর্বল তথ্যভাণ্ডারের সুযোগ নিয়ে কখনো বাড়বে ডাল বা রসুনের দাম। মহাকাশে আমাদের স্থান হয়েছে। সমুদ্রসীমা বেড়েছে। বিশ্বে বাংলাদেশের সম্মান-মর্যাদার উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু সরকার সামান্য পেঁয়াজের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে অক্ষম—এ কথা বিশ্বাসযোগ্য নয়। পেঁয়াজের বাজার নিয়ন্ত্রণকারীরা সরকারের লোক অথবা সরকার সমর্থিত ব্যবসায়ী। দেশে কী পরিমাণ পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে তার হিসাব সরকারের তথ্যভাণ্ডারে না থাকলেও ব্যবসায়ীদের হাতে রয়েছে। কিছুদিন আগে এক সেমিনারে নওগাঁ জেলার এক চাল ব্যবসায়ী বিশ্বের কোথায় কোথায় ধান উৎপাদন হয় এবং কী পরিমাণে হয় তার হিসাব দিয়েছিলেন। শুধু তা-ই নয়, বাংলাদেশ কোন কোন দেশ থেকে চাল আমদানি করে, কোথায় খরা হয়েছে, কোথায় ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে ইত্যাদি তিনি এক নিঃশ্বাসে বলেছিলেন। ব্যবসায়ীদের চেয়ে সরকারের জনবল বেশি দক্ষ বলেই আমার বিশ্বাস।

১৯৮৬ সালে জাতীয় নির্বাচনে নৌকা মার্কায় ভোট চাওয়ার সময় আমাদের শেরপুর অঞ্চলে দুটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছে। প্রথমত, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে দেশে দুর্ভিক্ষ হবে? দ্বিতীয়ত, ধর্ম থাকবে কি না? বর্তমানে দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। ধর্ম নষ্ট হয়নি। দেশের আনাচেকানাচে সরকারি উদ্যোগে মসজিদ নির্মাণ করা হচ্ছে। মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের অর্জনের কথা বলে শেষ করা যাবে না। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছে। বিদ্যুৎ লাইনের সক্ষমতা বেড়েছে। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে। মঙ্গা ইতিহাসে পরিণত হয়েছে। আরো বহু বহু অর্জন আছে। কিন্তু নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের বাজার মাঝেমধ্যেই সীমিত আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকে না। নির্ধারিত আয়ের মানুষের কষ্ট হয়। ফলে সরকারের জনপ্রিয়তা হ্রাস পায়।

এ বছর বোরো মৌসুমে কৃষক ধানের ন্যায়্য মূল্য পায়নি। পেঁয়াজের মূল্যও কৃষক পায়নি। কৃষক এবং স্বল্প মজুদদারদের হাত থেকে পেঁয়াজ চলে যাওয়ার পর মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। কৃষক পেঁয়াজ বিক্রি করেছে ১৫ থেকে ২০ টাকা কেজি। সেই কৃষকই এখন কিনে খাচ্ছে ২০০ টাকা কেজি। নতুন পেঁয়াজ আসার ঠিক আগে সরকারি উদ্যোগে আমদানি চাষিদের আবার ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত করবে না তো।

কালের কণ্ঠে প্রকাশিত দুটি খবরের উদ্ধৃতি তুলে ধরা যাক। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিসংখ্যানে গড়বড় থাকলেও এত বড় সংকটময় পরিস্থিতি হওয়ার কথা নয়। তাঁদের মতে, এক শ্রেণির আমদানিকারক সিন্ডিকেট পেঁয়াজ আমদানির সুযোগ তৈরি করতেই কৃত্রিমভাবে এ সংকট তৈরি করেছে। কারো কারো মতে, সরকারের সামগ্রিক পূর্বপরিকল্পনার অভাবেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ভোক্তাদের অভিযোগ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের লোকজনের সঙ্গে আঁতাত করে ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজে এই মুনাফাকাণ্ড ঘটাচ্ছেন। খুচরা ব্যবসায়ীদের অনেকের মতে, আমদানিকারকরাই পেঁয়াজের দাম বাড়িয়েছেন। কৃষি বিশেষজ্ঞদের কারো কারো মতে, সরকারের তরফ থেকে পেঁয়াজ নিয়ে কখনো খুব গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। কৃষকরা নিরুৎসাহ হচ্ছে পেঁয়াজ চাষাবাদে।

কালের কণ্ঠে প্রকাশিত আরেকটি খবরে বলা হয়েছে, পেঁয়াজের দামের আগুন ছড়িয়ে পড়ছে চালের বাজারেও। বিপুল উৎপাদন এবং পর্যাপ্ত মজুদের মধ্যেও চিকন চালের দাম সপ্তাহের ব্যবধানে পাঁচ থেকে সাত টাকা বেড়েছে। আর মোটা চালের দাম বেড়েছে কেজিতে দুই থেকে তিন টাকা। কল্যাণকামী সরকারের জনপ্রিয়তায় ধস নামাতে অর্থাৎ বাজার নিয়ে অশুভ খেলা শুরু হয়ে গেছে। সময় থাকতে সব ব্যবস্থা না নিলে সরকারকেই এর মূল্য দিতে হবে।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা