kalerkantho

সোমবার । ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ১ পোষ ১৪২৬। ১৮ রবিউস সানি                         

দিল্লির চিঠি

এনডিএতে বিজেপির আধিপত্য

জয়ন্ত ঘোষাল

১৮ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



এনডিএতে বিজেপির আধিপত্য

মহারাষ্ট্রের মতো ভারতের এক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে বিজেপির সঙ্গে শিবসেনার জোট ভেঙে গেল। জোট ভেঙে যাওয়া সব সময়ই রাজনৈতিক সেট ব্যাক বা ধাক্কা বলেই পরিগণিত হয়। বিজেপির প্রাচীনতম শরিক পাঞ্জাবের আকালি দল। শিবসেনা হলো দ্বিতীয় প্রাচীন সঙ্গী, আর শিবসেনা ও বিজেপির মতাদর্শগতভাবেও খুবই ঘনিষ্ঠ। বলা হতো, শিবসেনা হলো বিজেপির ‘ন্যাচারাল অ্যালাই’ অর্থাৎ স্বাভাবিক জোট সঙ্গী। দুজনের হিন্দুত্ব মতাদর্শের ধব্জাধারী। তাই ১৯৮৯ সালে যে জোট হয়েছিল, তা ২০১৯ সালে যদি সত্যি সত্যিই ভেঙে যায়, তবে তা বিজেপির জন্য সুখদায়ক ঘটনা কিভাবে বলা যায়? কিন্তু এই জোট ভাঙার ঘটনায় রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া কী হবে? এই জোট বিচ্ছেদের জন্য বিজেপির দোর্দণ্ড প্রতাপ নেতা দলের সভাপতি অমিত শাহর রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতায় কি চিড় ধরল? শিবসেনার কাণ্ডারি উধ্বব ঠাকরে তো বিচ্ছেদের কারণ দর্শাতে গিয়ে এ কথা বলেছেন যে অতীতে ভোটের আগে এক একান্ত আলোচনায় অমিত শাহ তাঁকে কথা দিয়েছিলেন যে এবার রাজ্য সরকারের কাণ্ডারি হবে শিবসেনা। পাঁচ বছরে আড়াই বছর শিবসেনা মুখ্যমন্ত্রিত্ব করবে এবং তার পরবর্তী পাঁচ বছর বিজেপি রাজত্ব করবে। কিন্তু বিজেপি এ ধরনের প্রতিশ্রুতির কথা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। দুজনের মধ্যে এই আলোচনা হয়েছে বলে বলা হয়েছে। অতএব এ দুজনই জানেন কে সত্যি বলছেন, আর কে সত্যি বলছেন না। নরেন্দ্র মোদিকেও নাকি এ কথা জানানো হয়নি—এমন অভিযোগও শিবসেনার পক্ষ থেকে করা হয়েছে।

এই বিচ্ছেদও যে হঠাৎ আচমকা হয়েছে এমন নয়। পাঁচ বছর ধরে উধ্বব এবং তাঁর ‘সামনা’ পত্রিকা তীব্র ভাষায় নরেন্দ্র মোদির সমালোচনা করেছে। আর এখন কংগ্রেস শিবসেনাকে সমর্থন করায় বিজেপির অসুবিধা হবে কি? কারণ এত দিন বিজেপি শিবসেনা ছিল হিন্দুত্বপ্রেমী, আর কংগ্রেসও প্রতিপক্ষ ছিল সংখ্যালঘু ভোটব্যাংকের ধারক। এখন তো সেই হিন্দুত্ব ভোটে কংগ্রেসরও দাবি।

আজ হঠাৎ মনে পড়ে গেল বহু বছর আগের এক ঘটনা। লালকৃষ্ণ আদভানি দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। অটল বিহারি বাজপেয়ি দেশের প্রধানমন্ত্রী। মুম্বাই শহরে ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচ হওয়ার কথা। কিন্তু শিবসেনার তত্কালীন সুপ্রিমো বাল ঠাকরে ঘোষণা করেছেন যে তিনি কিছুতেই এই ম্যাচটা হতে দেবেন না। শিব সৈনিকরা স্টেডিয়ামে ঢুকে পিচ খুঁড়তে শুরু করে দিয়েছে, যাতে ম্যাচটাই খেলা অসম্ভব হয়ে যায়। বাজপেয়ি এ ঘটনায় খুবই ক্ষুব্ধ। তিনি আদভানিকে ডেকে বললেন, এই ম্যাচটা তো নিছক ক্রিকেট ম্যাচ নয়, এটা শুধু ভারত-পাকিস্তানের সম্পর্ককে পুনরুদ্ধার করা নয়, এ হলো গোটা দুনিয়ার কাছে ভারতের সম্মান তথা কূটনৈতিক মর্যাদা রক্ষার প্রশ্ন। বাজপেয়ি আদভানিকে বললেন, আপনি বালা সাহেবকে বুঝিয়ে ঠাণ্ডা করুন। আদভানি ফোন করলেন বালা সাহেবকে। অনড় বালা সাহেব তাঁকে মাতশ্রীতে, মানে ওর বাসভবনে আসতে অনুরোধ জানালেন। আদভানি বৈঠকে বসে তাঁকে নরম করলেন, যাতে ক্রিকেট ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয়। শিবসেনার এই বাগী চরিত্র। শুধু এ ঘটনার মাধ্যমে নয়, এমন বহু ঘটনার কথা মনে পড়ে যখন শিবসেনা পেশি প্রদর্শন করে বিজেপির শান্তি ছিনিয়ে নিয়েছে বারবার। সেদিন আর আজকের মধ্যে অনেক ফারাক। সেদিন বিজেপির আজকের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না। তখন বাজপেয়িকে শরিক দলের সমর্থন নিয়েই সরকার চালাতে হতো। একে বলা হয় জোট সংস্কৃতি। আর আজ নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি একাই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতাসীন হয়েছে। ২০১৪ সালের পর ২০১৯-এ মোদির দ্বিতীয় ইনিংসেও জনপ্রিয়তা এবং দলীয় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অটুট। তাই এবার মহারাষ্ট্রের ভোটের ফল প্রকাশের পর যখন দেখা গেল বিজেপি রাজ্যে একা সরকার গড়তে পারছে না, তখন উধ্বব ঠাকরে ঘোষণা করেন যে অমিত শাহকে মাতশ্রী আসতে হবে সরকার গঠন নিয়ে আলোচনার জন্য। শিবসেনাকে মুখ্যমন্ত্রীর পদ দিতে হবে এবং আড়াই বছর শিবসেনা, আড়াই বছর বিজেপি অর্থাৎ ৫০:৫০ সরকার গড়ার প্রস্তাব দেন উধ্বব। এমনকি এ কথাও বলেন যে অমিত শাহ অতীতে শিবসেনাকে এই আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু এর প্রতিক্রিয়া কী হলো? দেখা গেল, অমিত শাহ আপাত নিরুত্তাপ। চুপচাপ দিল্লিতে বসে থাকলেন। তিনি কিন্তু শিবসেনাকে ম্যানেজ করার জন্য মুম্বাই গেলেন না। একেই বলা হয় স্নায়ুর যুদ্ধ। ‘ব্রিংকম্যানশিপ’। এই স্নায়ুর শক্তিতে অমিত শাহ যে বলীয়ান, সেটা আজ আমরা হঠাৎ দেখছি এমন নয়। এ তো অমিত শাহর রাজনৈতিক ডিএনএ। রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়ে গেল। কিন্তু কংগ্রেস এনসিপি শিবসেনার মুখ্যমন্ত্রিত্ব মেনে নেবে—এমন একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিরোধী প্রতিপক্ষ অনেক বেশি সময় নিচ্ছে। যুক্তি দিয়ে আপনি এ প্রশ্ন তুলতে পারেন, যখন কর্নাটকে বিজেপি সরকার গঠনের বিষয় আসে, তখন কত দিন সময় রাজ্যপাল দেন আর আজ মহারাষ্ট্রে কেন যথেষ্ট সময় দিলেন না? কারণ কংগ্রেসও তো শিবসেনার সঙ্গে দর-কষাকষি করছে। এককথায় ৫৬টি আসন পাওয়া শিবসেনার মুখ্যমন্ত্রিত্ব কংগ্রেস কেন মেনে নেবে? কে উপমুখ্যমন্ত্রী হবেন? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কার হাতে থাকবে? স্পিকার কে হবেন—এসব নিয়েও ত্রিশক্তির মধ্যে আলোচনা করতে হবে।

তবে কংগ্রেসের পক্ষে মূল লড়াইটা হলো এখন একদিকে মতাদর্শ, অন্যদিকে ক্ষমতার কৌশল। ওমপ্রকাশ চৌতালা একদা বলতেন, আমরা তীর্থযাত্রী নই। রাজনৈতিক নেতা। ক্ষমতার জন্য এসেছি, তীর্থ করতে আসিনি। কংগ্রেস নেতাদের মধ্যেও এখন এই বিতর্ক শুরু হয়েছে। সিপিএমের মতো কংগ্রেসেও এখন কেরল লবির বিদ্রোহ হয়েছে মহারাষ্ট্রের রণকৌশল নিয়ে। একে অ্যান্টনির নেতৃত্বে কেরল কংগ্রেস বলেছে, মতাদর্শ ক্ষমতার চেয়ে অনেক বড়, তাই যেনতেন প্রকারে সরকার গড়া চলবে না। বিজেপির সবচেয়ে পুরনো কিন্তু আকালি দল। শিবসেনা নয়। ১৯৮৯ সালে বিজেপির সঙ্গে শিবসেনার সন্ধি হয়। বিজেপি নেতা প্রমোদ মহাজন উদ্যোগেই বালা সাহেবের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়। ভুলে গেলে চলবে না, শিবসেনা কিন্তু ইন্দিরা গাঁধীর জরুরি অবস্থাকে সমর্থন করে। একদা মুম্বাইয়ের এক পুনর্নির্বাচনে শিবসেনা কংগ্রেসকে সমর্থন করে। আবার সম্প্রতি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কংগ্রেস প্রার্থী প্রতিভা পাটিল এবং প্রণব মুখোপাধ্যায়কে শিবসেনা সমর্থন করে, বিজেপি বা এনডিএর প্রার্থীকে সমর্থন না করে। কাজেই শিবসেনার কংগ্রেসকে সমর্থন করার অতীত রেকর্ড আছে। কংগ্রেস কিন্তু কখনো শিবসেনাকে সমর্থন করেছে—এমনটা মনে পড়ে না। তা ছাড়া কংগ্রেস শিবসেনার মতো মহারাষ্ট্রকেন্দ্রিক আঞ্চলিক দল নয়, জাতীয় দল। কংগ্রেসের মতো এক সর্বভারতীয় দল আজ যতই দুর্বল হয়ে যাক না কেন, কংগ্রেসকে একটা জাতীয় মতাদর্শ মেনে চলতেই হয়। নেহরু গান্ধীর কংগ্রেসের পক্ষে সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে আপস করা কিন্তু সহজ কাজ নয়। শিবসেনা বিগত নির্বাচনে রাহুল গান্ধী সম্পর্কে কী কী মন্তব্য করেছেন তা আমি বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি না। ‘সামনা’ শিবসেনার দৈনিক মুখপত্র এবং উধ্বব ঠাকরে নিজে মন্তব্য করেছেন, রাহুল গান্ধীকে লাথি মেরে ভারতের রাজনীতি থেকে তাড়িয়ে  দেওয়া উচিত। এ মন্তব্যের পরও শিবসেনা কংগ্রেসের সমর্থন নিয়ে সরকার গড়তেই পারে। রাজনীতিতে কোনো পূর্ণচ্ছেদ হয় না। সে তো সামনা পত্রিকায় নরেন্দ্র মোদি সম্পর্কেও গত পাঁচ বছরে কী কী ছাপা হয়েছে তা-ও তো আমাদের সবারই মনে আছে। রাজনীতিতে ভোটের সময় যেসব কথা বলা হয়, ভোটের পর তা মনে না রাখাই দস্তুর। হিন্দিতে একটা লোককথা জনপ্রিয়। রচনাটি হলো, হাতির দুই রকমের দাঁত থাকে। একটা দাঁত হলো খাওয়ার জন্য, আর অন্যটি হলো দেখানোর জন্য। তা রাজনৈতিক নেতাদেরও দুই প্রকার দাঁত থাকে। তাই শিবসেনা রাহুল সম্পর্কে কী মন্তব্য করেছেন, ভোটের পর বিজেপিকে মোকাবেলার জন্য সেসব কথা যদি দুই পক্ষই ভুলে যায়, তবে তা অস্বাভাবিক কোনো কাণ্ড নয়।

বিজেপি কাশ্মীরে মেহেবুবার পিডিপির সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে সরকার গঠন করেছে আবার তা ভেঙেও গেছে। কংগ্রেসকে খতম করার জন্য বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংহকে সমর্থন করেছে বিজেপি এবং কমিউনিস্টরা, একই সঙ্গে। বাজপেয়ি আর জ্যোতি বসুর যৌথভাবে জনসভায় থাকার ছবি আজও ঐতিহাসিক। এসব  কোয়ালিশন সরকার গড়ার ছবি আজ ইতিহাস। কিন্তু এ কথাও মানতে হবে যে এসব জোট কিন্তু ভারতীয় রাজনীতিতে স্থায়ী হয়নি। একটা কথা জোট রাজনীতিতে খুবই জনপ্রিয়, সেটি হলো ‘ন্যাচারাল অ্যালাই’  (natural alli)| এনডিএতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস ছিল কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে  প্রায় ৩০ শতাংশ মুসলমান ভোট। এই মুসলমান ভোটব্যাংক মমতার কোর ভোটব্যাংক। কাজেই মমতা এনডিএতে থাকলেও তা স্বাভাবিক মিত্রশক্তি নয়। বিজেপি আর শিবসেনা কিন্তু স্বাভাবিক জোট। বীর সাভারকার থেকে রাম মন্দির হিন্দুত্বের কোর ইস্যু হলো দুই দলের প্রধান উপজীব্য। শিবসেনা আঞ্চলিক আর বিজেপি জাতীয় দল।

কিন্তু এখন বিজেপি দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর এনডিএর বদলে বিজেপির একদলীয় আধিপত্য কায়েম করেছে। বিজেপি প্যান ইন্ডিয়ায় শাসক দল হয়ে সর্বত্র বিস্তৃত হতে চাইছে। পশ্চিম, দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল ভারতে যেখানে বিজেপির দাপট নেই, সেই সাংগঠনিক নন-বেস এরিয়ায়ও বিজেপিকে নিয়ে যেতে তৎপর মোদি এবং অমিত শাহ। এই ইচ্ছার মধ্যে কোনো অন্যায় নেই। শুধু এ প্রয়াসে শিবসেনার আঞ্চলিক সমস্যা হচ্ছে। শুধু শিবসেনা কেন পাঞ্জাবে অকালি বা বিহারে নীতিশ কুমারের জেডিইউর সমস্যা হচ্ছে। তাই ভোটে আসন কম পাওয়া নিয়েও সমস্যা হয়েছে। কেন্দ্রে যথেষ্ট মন্ত্রী না থাকা বা নির্ধারক শক্তির ভূমিকা জাতীয় ও রাজ্য  স্তরে কমতে থাকা এসব শরিক সমস্যা তো হচ্ছেই। মনে করুন পশ্চিমবঙ্গে জ্যোতি বসুর দোর্দণ্ড প্রতাপ সিপিএম রাজত্বে আরএসপি, ফরওয়ার্ড ব্লক বা সিপিআইয়েরও এ সমস্যা হয়েছিল। বামফ্রন্টের সিপিএমের দাদাগিরির মতোই আজ এনডিএতে বিজেপির প্রভুত্ব।

এই আধিপত্যকামিতার অ্যান্টি থিসিস হয়ে উত্থিত পাল্টা সরকার গড়ার প্রয়াস। এনসিপি কংগ্রেসের সমর্থন নিয়ে ৫৬টি আসনের শিবসেনা সরকার গড়তে চাইছে। এখন এই জোটের সমস্যা একটাই  যে ইঞ্জিন আর কারা বগি বা ওয়াগন—সেটাই বোঝা দুষ্কর। তাই শিবসেনা কংগ্রেসে-এনসিপির সমর্থন নিয়ে এখন সরকার গড়তে পারে; কিন্তু সেই সরকার স্থায়ী হবে কি?

লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠ’র

বিশেষ প্রতিনিধি

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা