kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

সাদাকালো

এ কী রায় ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের?

আহমদ রফিক

১৪ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



এ কী রায় ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের?

যা আশঙ্কা করা গিয়েছিল শেষ পর্যন্ত ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের রায়ে তা-ই প্রকাশ পেল। অযোধ্যায় বিতর্কিত জমিতে রামমন্দির নির্মাণের রায়ই দেওয়া হলো সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারপতির পক্ষ থেকে। ভারতীয় মুসলমানদের জন্য সান্ত্বনা পুরস্কার অন্যত্র মসজিদ নির্মাণের অধিকারমূলক নির্দেশ সরকার প্রদত্ত পাঁচ একর জমিতে।

যুক্তি হিসেবে রায়ে বলা হয়েছে মসজিদের নিচে মাটির গভীরে অন্য কিছুর উপস্থিতির প্রমাণ পেয়েছে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া তাদের খননকাজে। তবে রায়ে এ কথাও স্বীকার করা হয়েছে যে সেসব যে কোনো মন্দিরের ভগ্নাবশেষ তারও প্রমাণ মেলেনি। তাহলে? 

ভারতবর্ষ এক প্রাচীন ভূমি। এ উপমহাদেশে বহু ভাষাভাষী মানুষ প্রাচীনকালে এসেছে, চলে গেছে, অনেকে থেকেছে বসতি স্থাপন করেছে। বহু ভাষা, বহু জাতিসত্তা ও বহু সংস্কৃতির অবস্থান এই ভারতীয় উপমহাদেশে।

কাজেই আর্য, বৌদ্ধ, মুসলিমসহ বহু ধর্মীয় সংস্কৃতির স্থাপত্যের দেশ ভারতবর্ষ। এই ভূমির গভীরে তাদের তৈরি স্থাপত্য নিদর্শন থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। সে ক্ষেত্রে পরবর্তীকালের নির্মিত স্থাপত্যের (মন্দির বা মসজিদ) ভূগভীরে অন্যত্র কারো নির্মিত স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষের প্রমাণ মিলতেই পারে।

সুপ্রিম কোর্টের রায়ে যেহেতু স্বীকার করা হয়েছে, ধ্বংস করা বাবরি মসজিদের নিচে প্রাপ্ত নিদর্শনগুলো মন্দিরের প্রমাণ বহন করে না, সে ক্ষেত্রে তাঁরা ধরে নেন কিভাবে যে ওখানে রামমন্দির ছিল। বিষয়টি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে না হয় আরো খনন করা হতো, আরো সময় নিয়ে চেষ্টা করে দেখা যেত মন্দিরের কোনো নিদর্শন পাওয়া যায় কি না।

প্রথম কথা মন্দিরের নিদর্শন পাওয়া যায়নি। দ্বিতীয় কথা, পাওয়া গেলেও সেসব যে রামমন্দিরের ভগ্নাবশেষ, তাও তো প্রমাণসাপেক্ষ। একটি বিষয় সম্ভবত বিচারপতিদের মনে বরাবরই উপস্থিত ছিল যে মুসলমান আমলে মন্দির ভেঙে অনেক ক্ষেত্রে মসজিদ তৈরি করা হয়েছে, তাই মসজিদের ভিত্তির গভীরে কিছু পাওয়ার অর্থই মন্দির।

দুই.

দীর্ঘ আড়াই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা বাবরি জমির অধিকার নিয়ে আইনি লড়াইয়ের আপাত অবসান হলেও রায়টি বিতর্কের অবসান ঘটাতে পারেনি; বরং নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সূক্ষ্ম যুক্তিতর্কের বিচারে কিছু প্রশ্ন উঠে আসে, যা বিতর্কের চরিত্রগুণসম্পন্ন।

রায় ঘোষণার পরপরই মুসলমানদের পক্ষের আইনজীবী জিলানি বলেন, ‘এ রায় অন্যায্য’। তাঁরা রায় পর্যালোচনার জন্য আবেদন করার চিন্তা করছেন। অন্যদিকে হিন্দুপক্ষের আইনজীবী বরুণ কুমার সিনহা বলেছেন, এ রায় ঐতিহাসিক। আর ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী যথারীতি এ রায়কে স্বাগত জানিয়ে সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।

ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি সোনিয়া গান্ধীও সুপ্রিম কোর্টের রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন এবং আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

সুপ্রিম কোর্টের রায়ের মূল বক্তব্যটি আমরা এর আগে উল্লেখ করেছি। তাতে রায়ের পক্ষে আরো কিছু কথা বলা হয়েছে। তাতে স্পষ্টই বলা হয়েছে, সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড তাদের দাবি প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।

অন্যদিকে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তথ্য-উপাত্যের ওপর নির্ভর করে বিতর্কের ফায়সালা হিসেবে ধ্বংস করা বাবরি মসজিদের জমিতে (২.৭৭ একর) রামমন্দির নির্মাণ এবং অযোধ্যাতেই অন্যত্র পাঁচ একর জমিতে মসজিদ নির্মাণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে এ কথাও বলা হয়েছে যে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনাটি ছিল বেআইনি। এর প্রতিকারের ব্যবস্থা অবশ্যই করতে হবে। কী প্রতিকার? ভুলে যাওয়া ঠিক হবে না যে ওই ঘটনার জেরে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় কয়েক হাজার লোকের মৃত্যু ঘটেছে।

তিন.

মন্দির-মসজিদ নিয়ে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় ভারতে হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়ের নিরীহ মানুষের কম রক্ত ঝরেনি। সর্বোপরি বিষয়টি মন্দির-মসজিদের ধর্মীয় প্রেক্ষাপটের বলেই স্পর্শকাতর, সম্প্রীতি সেখানে সহজে ঠাঁই করে নিতে পারছে না। এবং পারেনি।

ঘটনার অতীত প্রেক্ষাপটের দিকে তাকালে দেখা যায় ষোড়শ শতকের প্রথম দিকে (১৫২৮ খ্রি.) মোগল সম্রাট বাবরের সেনাপতি মীর বাকি অযোধ্যায় যে মসজিদ নির্মাণ করেন, তা বাবরি মসজিদ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। এ কালের ইতিহাস গবেষকদের একাংশে এমন মতামত রয়েছে যে এখানে মন্দির ভেঙে মসজিদটি তৈরির ঐতিহাসিক প্রমাণ মেলেনি।

কিন্তু হিন্দুদের বিশ্বাস, অযোধ্যায় ধর্মীয় অবতার রামের জন্মস্থান এবং রাজত্বের স্থানও বটে। ধর্মীয় উপাসনাস্থান ও উপাসনার রকমফেরের ভিন্নতায় বাবরি মসজিদকে কেন্দ্র করে অযোধ্যায় সেই ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে স্থানীয় হিন্দু-মুসলমান বিরোধিতার সূচনা। শাসক ইংরেজ অগ্রণী হয়ে বিবদমান দুই ভাইকে বেড়া দিয়ে উপাসনাস্থল ভিন্ন করে দেয়, মসজিদের ভেতর ও বাইরে।

ভেতরে মুসলমান, বাইরে হিন্দু। কাজেই এ পাশাপাশি বিভাজনে অসন্তুষ্ট হিন্দুসমাজে স্বাধীন ভারতের রক্ষণশীল হিন্দু সংগঠন ভেতরে রামস্মৃতি স্থাপন করে। মুসলমানদের আপত্তি। স্থানটি হয়ে উঠে সরকারিভাবে বিতর্কিত। আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে ‘বিশ্ব হিন্দু পরিষদের মতো চরম উগ্রপন্থী হিন্দু সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে সেখানে প্রথমে উপাসনা, পরে রামমন্দির প্রতিষ্ঠার দাবি ক্রমাগত তীব্র হতে থাকে।

১৯৯২ সালে এর চরম পরিণতি কংগ্রেস শাসনামলে, প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাওয়ের রাজত্বকালে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, শিবসেনা, বিজেপি প্রভৃতি কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের উপস্থিতিতে বাবরি মসজিদের স্থাপত্যটি ধ্বংস করা হয়। এর আগে করা হয়েছিল রামমন্দিরের শিলান্যাস। এ ধ্বংসলীলায় নির্বিকার কংগ্রেস শাসন।

একুশ শতকের সূচনায় গোটা সময়জুড়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত বাবরি মসজিদের মালিকানা নিয়ে এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায় (ভাগাভাগি) থেকে শুরু করে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত লাগাতার আইনি লড়াই চলে। কখনো স্থিতাবস্থা, কখনো তার মধ্যেই বাস্তবে চরমপন্থীদের অগ্রাধিকার সুবিধা। সেই সঙ্গে তাদের প্রচার রামমন্দির নির্মাণের পক্ষে। ধর্মীয় অনুভূতি উসকে দেওয়া, বিরূপতা, সহিংসতার মধ্যে ১৯৯২ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাংলাদেশকেও স্পর্শ করে।

উচ্চ আদালতের তাত্ক্ষণিক রায়ও তখন বিতর্ক তৈরি করে ২০০২ সালে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের রামমন্দির নির্মাণের ঘোষণা, করসেবকদের ফিরতি পথে ট্রেন হামলার সূত্রে কুখ্যাত গুজরাট দাঙ্গায় হাজার দুই মানুষের মৃত্যু। অন্যদিকে ২০১০ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায়ে আবারও অসমতা-বিতর্কিত স্থানটি ত্রিধাবিভক্ত হলো ঠিকই, কিন্তু ধ্বংসপ্রাপ্ত মসজিদ অংশ দেওয়া হলো হিন্দুদের। প্রবল আপত্তি মুসলমান সংগঠনের।

২০১০ সাল থেকে ২০১৯। এলাহাবাদ থেকে দিল্লি। হাইকোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্ট। অসন্তুষ্ট উভয় পক্ষেরই আপিল সুপ্রিম কোর্টে। এবার আশঙ্কা পূরণ হিন্দুপক্ষের যদিও শর্তসাপেক্ষে। হাইকোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্টে এসে হাতের কড়িটিও হারাল ভারতীয় মুসলমান পক্ষ। হারাল বাবরি মসজিদ চত্বর ও জমির অধিকার। অবশ্য ক্ষতিপূরণ বাবদ পাঁচ একর জমি অন্যত্র মসজিদ নির্মাণের জন্য।

‘এ কী রায় দিলেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট? এরা কি না ন্যায়বিচারের প্রতীক?’ রায়ের ঘোষণা শুনে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ স্থানীয় এক পরিচিতজনের। জবাবে বলি, ‘কেন, পাঁচ একর জমি? এটাই বা কম কিসের?’ ঠিক সে সময় এখানে উপস্থিত এক ভারতীয় (পশ্চিমবঙ্গীয়) বন্ধুর প্রতিক্রিয়া : ‘ধর্মের প্রশ্নটা বাদ দিয়েই ষোড়শ শতাব্দীর একটি প্রত্নতাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে বাবরি মসজিদটিকে রক্ষা করা উচিত ছিল ভারতীয় শাসনযন্ত্রের। আর একই কারণে সেই স্থানেই মসজিদ নির্মাণের নির্দেশ দিতে পারতেন বর্তমানে সুপ্রিম কোর্ট।’

তার কথার সঙ্গে যোগ করি, ‘রামমন্দির নিয়ে এতই যেখানে আবেগ, তো কাছাকাছি পাশাপাশি একটি মন্দির তৈরির অধিকারও দেওয়া যেত সুপ্রিম কোর্টের রায়ে। তাদের রায়ের বয়ানে তো এটাও স্পষ্ট যে ওই একই স্থানে মাটির গভীরে যে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন মিলেছে, সেগুলো যে মন্দিরের তেমন প্রমাণও মেলেনি। তাহলে কেন একপক্ষের প্রতি অধিক সহানুভূতি দেখিয়ে ন্যায়নীতির প্রতীক ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট নিজেকে বিতর্কিত করল?’ তবু সর্বশেষ কথা : ত্রিধাবিভক্ত উপমহাদেশে এ নিয়ে কোনো অশান্তি নয়—শান্তি, শান্তি, শান্তি।

 

লেখক : কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা