kalerkantho

সোমবার । ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১১ রবিউস সানি ১৪৪১     

শুভ জন্মদিন

পাঠকের হুমায়ূন

ড. এম আবদুল আলীম

১৩ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



পাঠকের হুমায়ূন

বই পাঠের সঙ্গে বাঙালির প্রথম কবে পরিচয় ঘটেছিল, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তবে নানা রকম কেচ্ছা-কাহিনি, রাক্ষস-খোক্কস, দৈত্য-দানবের গল্পের সঙ্গে এ দেশের মানুষের পরিচয় বহু পুরনো। কখনো শুনে শুনে, কখনো তাত্ক্ষণিক জীবনাভিজ্ঞতা থেকে রসদ সংগ্রহ করে তারা একে অপরকে নির্মল আনন্দ দিতে কিংবা নীতি-উপদেশ ও জীবনচলার পাথেয় হিসেবে শিক্ষা দিতে কেচ্ছা-কাহিনির পাশাপাশি তৈরি করত বিচিত্র গল্প, ধাঁধা, ছড়া ও প্রবাদ-প্রবচন। একটা সময় ছিল, দিনের কোলাহল থেমে গেলে বাড়িতে বাড়িতে বসত গল্পের আসর। শিশু-কিশোর, বালক-যুবা, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা—সবাই যোগ দিত সেই আসরে। কাজের অবসরেও বসত আষাঢ়ে গল্পের আসর। রাজা-উজির, হাতি-ঘোড়া মারার পাশাপাশি রসিয়ে রসিয়ে নানা গল্প বলা হতো সেসব আসরে। কালক্রমে মুখে মুখে রচিত সেসব গল্প-কাহিনি সংগৃহীত হয় এবং লাভ করে লোকসাহিত্যের মর্যাদা।

বিচিত্র উপকরণে লিখে সেসব সংরক্ষণ করা হতো। যত দূর জানা যায়, এগারো শতকের দিকে এ অঞ্চলে কাগজের প্রচলন করেন সুলতান মাহমুদ গজনী। তারপর সেই কাগজের সঙ্গে এসে জোটে কালি ও কলম আর তাতে হিলহিলিয়ে উঠা মানবমনের বিচিত্র ভাব স্থায়ীরূপে ধরে রাখা হয়। ধর্ম প্রচারক, বণিক ও শাসকদের হাত ধরে পৃথিবীর নানা দেশের বিচিত্র ভাবের কাহিনি আসে বাংলা মুল্লুকে। এ দেশীয় পুরাণ কাহিনির সঙ্গে যুক্ত হয় আরব্য মুল্লুকের হাজার রজনীর বিচিত্র কাহিনি। সেসব কাহিনিতে থাকে চমকের পর চমক; যুদ্ধের ময়দানে লাখে লাখে, কাতারে কাতারে সৈন্য মরার বর্ণনা শুনতে শুনতে বিমোহিত বাঙালি হঠাৎ যখন গুনতিতে জনাতিন-চার পাওয়ার বর্ণনা শোনে, তখন আনন্দ যেন তাদের আর ধরে না। আবার ঘোড়ায় চড়িয়া মর্দার হাঁটিয়া চলার কেচ্ছাও তাকে কম আনন্দ দেয়নি। এই যে গল্প-কাহিনি-গাথায় হঠাৎ চমক সৃষ্টি করে বাড়তি আনন্দ দিয়ে পাঠক-শ্রোতাকে বিমোহিত করার প্রবণতা, তার রেওয়াজ এ দেশে খুব পুরনো। অগণিত লেখক-সাহিত্যিকের হাত ঘুরে শরৎ এবং হুমায়ূনে এসে তা নতুন মাত্রা লাভ করে।

বিশেষ করে গল্পের ভেতর চমকের পর চমক সৃষ্টি করে পাঠককে বিমোহিত করে রাখায় বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তি লেখক হুমায়ূন আহমেদের জুড়ি মেলা ভার। সেই ‘নন্দিত নরকে’ কিংবা ‘আগুনের পরশমণি’ থেকে শুরু করে ‘জোসনা ও জননীর গল্প’, ‘বাদশা নামদা’র কিংবা ‘দেয়াল’ পর্যন্ত শত শত গ্রন্থ রচনা করে তিনি পাঠককে আনন্দ দিয়েছেন। কী জাদু ছিল তাঁর লেখনীতে, যা দিয়ে পাঠককে বুঁদ করে রেখেছেন?

হ্যাঁ, সত্যিই জাদুকরী প্রতিভা ছিল হুমায়ূন আহমেদের। ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক, চলচ্চিত্র, গান, রম্যরচনা, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি, শিশুতোষ যা-ই সৃষ্টি করেছেন—প্রকাশক-পাঠক সবাই তা সাগ্রহে লুফে নিয়েছেন। কী ছিল তাঁর সেই জাদুর রহস্য? এর মূলে প্রধানভাবে ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত জীবনের বিচিত্র অনুষঙ্গ থেকে উপকরণ সংগ্রহ করে তাদের সামনে নতুন ভঙ্গিতে উপস্থাপন করা। তাতে আনন্দ যেমন থাকত, তেমনি থাকত বিষাদ। সর্বোপরি চমকের পর চমক। তিনি বাঙালির গৌরবের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যেমন কাহিনি সাজিয়েছেন, তেমনি সাজিয়েছেন সমকালীন সমাজ ও জীবনের ছোট ছোট ঘটনা নিয়ে। লেখনীর সম্মোহনী শক্তিতে লাখ লাখ তরুণের কণ্ঠে হুমায়ূন যেমন অনায়াসে তুলে দিয়েছেন—‘তুই রাজাকার’ স্লোগান, তেমনি অদম্য সাহস নিয়ে লিখেছেন ‘হলুদ হিমু ও কালো র‌্যাব’-এর কাহিনি। কখনো কখনো পাঠককে তিনি বাস্তবজীবনের জটিলতা থেকে মুক্ত করে নিয়ে গেছেন এক দুর্জ্ঞেয় রহস্যের জগতে, যে জগৎ ছিল অপার আনন্দে ভরা। অনেক সময় পাঠকের সামনে তিনি হাজির রঙ্গ-ব্যঙ্গের বিচিত্র ভাব-ভাবনার ডালি সাজিয়ে।

হুমায়ূনের পাঠকনন্দিত হওয়ার আরো একটি কারণ ছিল, তা হলো তাঁর কৌতুকপ্রিয়তা, শালীনতাবোধ এবং পরিমিত রুচিবোধ। তাঁর নাটক ও সিনেমা যেমন সব শ্রেণির দর্শক একসঙ্গে বসে দেখে আনন্দ পেত এবং পায়, তেমনি এক টেবিলে বসে তাঁর বই পড়তে পারে মাতা-কন্যা এবং পিতা-পুত্র। পরিবারের কর্তা থেকে গৃহপরিচারিকা—সবাই একই সঙ্গে তাঁর নাটক দেখলেও তাতে সৃষ্টি হয় না কোনো অস্বস্তির পরিবেশ। সর্বোপরি স্বাধীন বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত জীবনের অভ্যন্তরে যে হতাশা ও শূন্যতা বাসা বেঁধেছিল এবং তাদের মনে গুমড়ে গুমড়ে থাকা যে বেদনাবোধ, তা থেকে উত্তরণে তারা নতুন কিছুর প্রত্যাশায় ছিল, হুমায়ূন আহমেদ ঘটালেন সেই নতুন জীবনের বর্ণিল রূপায়ণ। অর্থাৎ অবক্ষয়িত মধ্যবিত্ত সমাজের ভেতর থেকে উৎসারিত নানা যন্ত্রণায় চারদিকে যে শাসরুদ্ধকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল, তা থেকে মুক্তি পেতে নতুন প্রজন্ম এক নির্মল আনন্দের ভোজে হুমায়ূন সাহিত্যে ডুব দিয়েছিল। তা ছাড়া নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা যে স্বপ্নে বিভোর, যে জীবন যাপন তাদের হাতছানি দিয়ে ডাকে, হুমায়ূন আহমেদ সেই জীবনের ভাষ্যকার। তাঁর সৃষ্ট পাত্র-পাত্রীদের মধ্যে তিনি নতুন প্রজন্মের স্বপ্নের সম্মিলন ঘটিয়েছেন। আর এ কারণেই হুমায়ূন সাহিত্য তাঁদের এত প্রিয়।

হুমায়ূন আহমেদের পাঠকনন্দিত হওয়ার আরো একটি কারণ ছিল, সেটা হলো তাঁর বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি ছিলেন বিজ্ঞানের ছাত্র-শিক্ষক। সে হিসেবে নিজের মধ্যে সৃষ্টি করেছিলেন এক বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ শক্তি আর তার সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন কল্পনার সম্মোহন। এই দুয়ের সম্মিলনে তিনি যে জগৎ নির্মাণ করেছিলেন, তা নতুন প্রজন্মকে আচ্ছন্ন করেছিল। হুমায়ূনের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো, নতুন প্রজন্মকে তিনি বইমুখী করেছিলেন। তারা মুখিয়ে থাকত হুমায়ূনের নতুন বইয়ের অপেক্ষায়। বইমেলায় তাঁর বই কিনতে তারা হুমড়ি খেয়ে পড়ত। তাঁর মতো পাঠকমুগ্ধকারী জাদুকরী প্রতিভার লেখক বাংলা সাহিত্যে বিরল। তিনি যেন সেই হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা, যাঁর লেখনীর মোহন বাঁশির সুরে নতুন প্রজন্মের তরুণ-তরুণীরা তাঁর পিছু পিছু ছুটেছে।

হুমায়ূন আহমেদ কয়েক বছর হলো গত হয়েছেন; কিন্তু পাঠকের মনে তিনি সদা জাগরুক হয়ে আছেন। এখনো অমর একুশে গ্রন্থ মেলায় তাঁর বই কিনতেই তারা ভিড় জমায় বেশি। আরো অনেক দিন পাঠকমনে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত থাকবেন তিনি। সুরুচির প্রশ্নে, স্বস্তির প্রশ্নে এবং নির্মল আনন্দের প্রশ্নে পাঠকের হৃদয় থেকে হুমায়ূনের আবেদন কোনো দিন কমবে না।

 

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ

পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা