kalerkantho

শুক্রবার । ২২ নভেম্বর ২০১৯। ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

মন্দির নির্মাণের লড়াই করেছে কংগ্রেসও!

বাহার উদ্দিন

৭ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মন্দির নির্মাণের লড়াই করেছে কংগ্রেসও!

কামেশ্বর চৌপাল। বয়স পশ্চিম দিকে ঝুঁকছে। দলিত পরিবারের সন্তান। উত্তর প্রদেশে, গেরুয়া রাজনীতির অন্দরে ও বাইরে এটাই কি তাঁর পরিচয়? না। ১৯৮৯ সালের ৯ নভেম্বর, তিনিই রামমন্দিরের শিলান্যাস অনুষ্ঠানে, বিতর্কিত জমিতে প্রথম ইটটি পুঁতেছিলেন। ওই স্মৃতি, ওই গৌরব তাঁর কাছে এখনো অম্লান। সর্বভারতীয় একটি টিভি চ্যানেলে একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেছেন, রাম ছাড়া রুটি নেই। রাম বাস্তব সত্য এবং দেশের প্রাণস্পন্দন।

আমি রামচন্দ্রের ভাবাবেগ সমাজের কাছে নিয়ে যেতে চেয়েছি। সমাজ বলতে বৃহেক বোঝাতে চাই। হিন্দু-মুসলিম, শিখ, খ্রিস্টানসহ সব মানুষকে, ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে। সত্য কথা বলতে কী, সব সরকার, এমনকি কংগ্রেসও রামমন্দিরের জন্য লড়াই করেছে।

ভূতপূর্ব প্রধানমন্ত্রী পি ভি নরসিমা রাওয়ের জমানায় শিলান্যাস অনুষ্ঠান হয়েছিল। রাজীব গান্ধী রুদ্ধ মন্দিরের দরজা খুলে দিয়েছিলেন।

আমি নরসিমা আর রাজীবের প্রচেষ্টা লক্ষ করেছি। সমাজ ওই ভাবাবেগকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেনি।

রামমন্দির নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায় ঘোষণার প্রাক্কালে কামেশ্বরের বয়ানের তাৎপর্য যথেষ্ট। মন্দির নিয়ে কংগ্রেসের কৌশলপ্রিয় ভূমিকা এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব। ইতিহাস কাউকে রেহাই দেয় না। কংগ্রেসেরও নিস্তার নেই। দেশভাগের গোড়ার দিকে রাম-বাবরি সমস্যার সাম্প্রদায়িক জটিলতা দেখে মন্দির-মসজিদের দরজা বন্ধ করার নির্দেশ জারি করতে বাধ্য হয়েছিলেন উদ্বিগ্ন জওয়াহেরলাল নেহরু। নানা মহলের উসকানি সত্ত্বেও এই স্থিতি বজায় থাকে। শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীও আমল দেননি ধর্মীয় আবেগকে। ইন্দিরার মৃত্যুর পর পরিস্থিতি বদলে যায়। শুরু হয় রাম-জানকী যাত্রা, সঙ্ঘ পরিবারের উদ্যোগে।

প্রধানমন্ত্রী রাজীব দুটি ভুল করলেন। শাহবানু মামলার ঐতিহাসিক রায়কে নাকচ করে মুসলিম উইমেন প্রটেকশন বিল পাস করিয়ে নিলেন সংসদে। সংখ্যার জোরে। তাঁর বিরুদ্ধে যখন মুসলিম তোষণের অভিযোগ উঠল, ঠিক তখনই পাল্টা হিন্দু তোষণ শুরু হলো। উত্তর প্রদেশের কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রীর অঙ্গুলি হেলনে রুদ্ধ মন্দির খুলে দিয়ে রামপূজা চালু হলে বাবরি কমিটি পথে নামল। এই সুযোগে সাম্প্রদায়িকতার বাহক হিসেবে রামচন্দ্রকে তুলে ধরল সাম্প্রদায়িক রাজনীতি। পরিস্থিতি আর প্ররোচনা সামাল দিতে গিয়ে লাগাম আলগা করে দেয় কংগ্রেস। কংগ্রেসের আরেক ভুল কৌশল আর শিথিলতার ফাঁক দিয়ে রামমন্দির আন্দোলনকে দেশজুড়ে ছড়িয়ে দেয় কয়েকটি সংগঠন।

দেশের নানা প্রান্ত থেকে ইট অযোধ্যায় ঢুকতে থাকল। ঝড় উঠল ফয়জাবাদে, মন্দির উহা বনেগা ভাই বনেগা। জিস আদমিকে খুন মে রাম কা লহর নেহি, খুন নেহি উহ পানি হ্যায়। নিনাদিত স্লোগানে, দম্ভের হুমকিতে কেঁপে উঠল অযোধ্যা। ১৯৮৯ সালের ৯ নভেম্বর তুমুল উৎসাহে বিতর্কিত জমিতে মন্দিরের শিলান্যাস হয়ে গেল। নিশ্চুপ পুলিশ আর আধা সেনা।

শিলান্যাস রোখার পূর্ব প্রস্তুতি নেয়নি প্রশাসন।

বরং প্রশ্রয় দিয়েছে এবং শিলান্যাসের সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্র কৈফিয়ত পেশ করে বলেছে, বিতর্কিত জমিতে ইট পোঁতেননি রামভক্তরা। ঠিক সেদিনই খবর ফাঁস করে আজকাল-এর তখনকার এই প্রতিনিধি সবার আগে জানিয়ে দেন, বিতর্কিত জমিতেই শিলান্যাস হয়েছে।

বিবিসির কিংবদন্তি মার্ক টালি ছড়িয়ে দিলেন একই খবর। কংগ্রেস খবরটি যথারীতি অস্বীকার করে যায়। বিজেপিও ফায়দা তুলতে থাকে। পরের ঘটনাপ্রবাহ সবার জানা।

রথযাত্রায় বেরিয়ে পড়লেন লালকৃষ্ণ আদবানি। বাড়ল উসকানি। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর, কেন্দ্র রাজ্যের প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়ে ইন্দো-শারকি স্থাপত্যের শেষ নিদর্শন, ভগ্নপ্রায় বাবরি মসজিদকে ধ্বংসস্তূপ বানিয়ে তোলে সমাজের একাংশের উগ্রতা। উগ্রতার বিস্তার দেখেও সতর্ক হয়নি কংগ্রেস। বরং প্রকারান্তরে প্রশ্রয় দিয়েছে। শিলান্যাস অনুষ্ঠানের প্রথম ইট পোঁতার নায়ক রামেশ্বর যা বলেছেন, তা পুরোপুরি ভুল নয় (কংগ্রেসও মন্দির গড়ার লড়াই করেছে)। তাঁর  বিবৃতির ব্যাখ্যা, অপব্যাখ্যা হতে পারে। কিন্তু আংশিক সত্যতা অস্বীকার করা অসংগত। অনৈতিহাসিক।

 

লেখক : ভারতীয় সাংবাদিক, আরম্ভ পত্রিকার সম্পাদক

[email protected]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা