kalerkantho

সোমবার । ১৮ নভেম্বর ২০১৯। ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

সড়ক দুর্ঘটনা আর নয়

মালিহা এম কাদির

২২ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সড়ক দুর্ঘটনা আর নয়

আজ ‘জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা দিবস’। আশা করছি যে বিগত দুই বছরের মতোই নানা আয়োজন ও কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে দেশজুড়ে তৃতীয়বারের মতো পালিত হচ্ছে এ দিবস। জেলা ও উপজেলার পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারিভাবে নানা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে গ্রহণ করা হচ্ছে নানা কর্মসূচি। সবারই এক লক্ষ্য—সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে এনে সড়ককে সবার জন্য নিরাপদ করে তোলা। পথে আমাদের সবাইকেই চলতে হয়, তাই সড়ক নিরাপত্তায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো সমন্বিত উদ্যোগ গড়ে তোলা। সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সচেতনতার মাধ্যমে সবার সমন্বিত উদ্যোগের ফলই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় পাওয়া।

 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) একটি পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ১৩ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটে সড়ক দুর্ঘটনায়। আহত হয় পাঁচ কোটি মানুষ। তাদের বাকিটা জীবন পঙ্গুত্ব কিংবা অন্য কোনো শারীরিক বিকলাঙ্গতা নিয়ে কাটাতে হয়। বৈশ্বিকভাবে মানুষের মৃত্যুর কারণ হিসেবে সড়ক দুর্ঘটনার অবস্থান সপ্তম। কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে, আশঙ্কা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে এটি তৃতীয় অবস্থানে চলে আসবে। এটা কি বিশ্বাস করা যায় যে বর্তমানে বিশ্বে প্রাণঘাতী রোগ এইডস কিংবা যক্ষ্মার চেয়েও সড়ক দুর্ঘটনায় বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটে? এ দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি শিকার হয় আমাদের নতুন প্রজন্ম। পাঁচ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মৃত্যুর কারণ হিসেবে সড়ক দুর্ঘটনা অন্যতম। বৈশ্বিকভাবে সড়ক দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটে আফ্রিকায় আর দ্বিতীয় অবস্থানেই রয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া।

গত জুনে বেসরকারি সংগঠন নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটি (এনসিপিএসআরআর) সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে তাদের জরিপ ও পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ২২টি জাতীয় দৈনিক, ১০টি আঞ্চলিক পত্রিকা এবং আটটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও নিউজ এজেন্সির তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। যার তথ্যানুযায়ী দেশব্যাপী বিভিন্ন মহাসড়ক, জাতীয়, আন্তজেলা এবং আঞ্চলিক সড়কে ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মের মধ্যে নিহত হয়েছেন এক হাজার ৮৯০ জন এবং আহত হয়েছেন তিন হাজার ৫৪৩ জন। নিহতদের মধ্যে ২৪২ জন নারী এবং ৩১২ জন শিশু রয়েছে!

২০১৫ সালের জাতিসংঘের সম্মেলনে ২০৩০ সালে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে বেশ কিছু উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহতা বিবেচনায় এ বিষয়েও বিশেষ লক্ষ্য নির্ধারিত হয়। যার মধ্যে রয়েছে : ২০২০ সালের মধ্যে বৈশ্বিকভাবে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও হতাহতের সংখ্যা অর্ধেকে কমিয়ে আনা এবং ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও টেকসই পরিবহন ব্যবস্থার সুযোগ তৈরি করা। এ ক্ষেত্রে নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও বিশেষভাবে সক্ষমদের অগ্রাধিকার প্রদান করা।

ডাব্লিউএইচওর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে উন্নত দেশের তুলনায় যানবাহন অর্ধেক, অথচ বৈশ্বিক সড়ক দুর্ঘটনা এসব দেশেই বেশি ঘটে। সড়কে রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, নিরাপদ সড়ক আইনের সঠিক প্রয়োগ না করা, শ্রমঘণ্টা না মেনে মোটরযান চালানো, বেপরোয়া গতি, অতিরিক্ত যাত্রী বা ওজন বহন, অননুমোদিত ওভারটেকিং ও ট্রাফিক আইন না মানাকে সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অথচ প্রতিটি ক্ষেত্রেই সাধারণ সচেতনতাই এমন দুর্ঘটনা রোধ করতে পারে।

সচেতনতা দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কত বড় ভূমিকা রাখতে পারে তা এ তথ্যের মাধ্যমেই বোঝা যাবে; শুধু সঠিক ও মানসম্পন্ন হেলমেট ব্যবহার মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারাত্মক আঘাতের ঝুঁকি হ্রাস করতে পারে ৪২ শতাংশ পর্যন্ত এবং মাথায় আঘাতের ঝুঁকি হ্রাস করতে পারে ৬৯ শতাংশ পর্যন্ত। সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে মোটরসাইকেল চালক, আরোহী ও পথচারীদের বিশেষভাবে সতর্ক হতে হবে। চালকদের সড়ক আইন মেনে চলতে উল্টো পথে যাওয়া যাবে না, হেলমেট ব্যবহার করতে হবে, নির্দিষ্ট গতিতে মোটরবাইক চালাতে হবে এবং চালক বেশি জোরে চালালে পেছনে আরোহীকে তাঁকে সাবধান করতে হবে। প্রয়োজনে নেমে যেতে হবে। এ ছাড়া শিশুদের মোটরসাইকেলে না ওঠানো সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাসে কার্যকর ভূমিকা রাখে। শিশুদের মোটরসাইকেলে ওঠানো থেকে বিরত রেখে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার ঝুঁকি ৬০ শতাংশ কমানো সম্ভব। ডাব্লিউএইচওর প্রতিবেদন অনুযায়ী ১০ বছর কিংবা ১৩৫ সেমির নিচে শিশুদের মোটরবাইকে উঠতে দেওয়া উচিত নয়। বিশ্বের ৮৪টি দেশে এ নিয়ে আইন রয়েছে।

আবার পথচারীদের নিয়মিত ফুটওভারব্রিজ ব্যবহার করতে হবে, প্রধান রাস্তা দিয়ে না হেঁটে ফুটপাত ব্যবহার করতে হবে এবং হঠাৎ করে দৌড় দিয়ে রাস্তা পার হওয়া যাবে না। পাশাপাশি আমাদের বাস থামানোর জন্য যত্রতত্র সিগন্যাল দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। হর্ন দেওয়ার বিষয়েও চালকদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন। হর্নের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার একদিকে যেমন শব্দ দূষণের কারণ, তেমনি অন্য চালকের এটি দ্রুত যাওয়ার উৎসাহ দেয়, যা সড়ক দুর্ঘটনার কারণ। তাড়াহুড়া করতে গিয়ে ঘণ্টায় যদি এক কিলোমিটার গতিও বাড়ে, তবে তা দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ৪ থেকে ৫ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়।

সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টা। এ ক্ষেত্রে সবারই করণীয় রয়েছে। সরকারের করণীয় আছে, রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠানের করণীয় আছে, বিআরটিএর করণীয় আছে, তেমনি আবার ব্যক্তি মালিকানাধীন বাস প্রতিষ্ঠানের করণীয় রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, দেশের সুনাগরিক হিসেবে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে আমাদের সাধারণ জনগণের সচেতন হওয়া। আমাদের হাতে অনেক কিছুর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, আমাদের এর সদ্ব্যবহার করতে হবে। আমাদের সচেতনতাই পারে এ ক্ষেত্রে সর্বোত্তম ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করতে। এর জন্য আমাদের দেশজুড়ে গণপ্রচারণা চালাতে হবে। আমরা সহজের পক্ষ থেকে ‘সেইফটি সবার জন্য ক্যাম্পেইন’ নিয়ে কাজ করছি এবং সবার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ সাড়া পাচ্ছি। চালক, আরোহী ও পথচারী—সবাই এ প্রচারণার মাধ্যমে নিরাপদ সড়ক নিয়ে জানতে পারছেন। সামনে আমরা আরো এগিয়ে যেতে সহজ রাইড থেকে নতুন প্রতিপাদ্য নিয়ে আসছি ‘আপনি সবার আগে’। কেননা, আমরা মনে করি যাত্রী ও রাইডারদের নিরাপত্তা আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত ছাড়াও এর অন্যান্য নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। যেমন—সড়ক দুর্ঘটনার সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে আমাদের অনেকেরই স্পষ্ট ধারণা নেই। সম্প্রতি, ব্লুমবার্গের অর্থায়নে বিশ্বব্যাংকের করা একটি গবেষণায় ওঠে এসেছে যে সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাস করা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর জন্য দীর্ঘ মেয়াদের অর্থনৈতিক সুফল বয়ে নিয়ে আসতে পারে। যেসব দেশ নিরাপদ সড়ক নিশ্চিতে বিনিয়োগ করবে না, তারা প্রতি ২৪ বছরে জিডিপিতে পার ক্যাপিটা আয় ৭ থেকে ২২ শতাংশ কম করবে। তাই সরকার, নীতিনির্ধারক, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সংস্থা ও সাধারণ জনগণ সবাইকে সচতন হতে হবে।

সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে এগিয়ে আসতে হবে আমাদের সবাইকে। আমরা বিশ্বাস করি, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বেঁচে যাবে হাজার হাজার মানুষ, সঙ্গে দেশও এগিয়ে যাবে প্রবৃদ্ধির দিকে।

 

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সহজ

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা