kalerkantho

সোমবার । ১৮ নভেম্বর ২০১৯। ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে করণীয়

ড. নিয়াজ আহম্মেদ

২১ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে করণীয়

সাম্প্রতিক সময়ে কিশোর গ্যাংয়ের কর্মকাণ্ড একটি আলোচিত বিষয়। সম্প্রতি গ্যাং বা দলবদ্ধ অপরাধের বিষয়টি সামনে আসে বরগুনায় আলোচিত রিফাত হত্যাকাণ্ডে জড়িত নয়ন বন্ডের ‘০০৭ বন্ড’ নামে ফেসবুকের গ্রুপের নাম থেকে। যে গ্রুপের সদস্যদের দ্বারা রিফাত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। এখন পত্র-পত্রিকার বিভিন্ন অনুসন্ধানী রিপোর্টের মাধ্যমে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে বিভিন্ন নামে অসংখ্য গ্যাংয়ের নাম প্রকাশ পেয়েছে। পুলিশের কঠোর নজরদারি ও অভিযানের মাধ্যমে ইতিমধ্যে অনেক গ্রুপের সদস্যদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। বিষয়টি সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত হলেও অতীতেও এমন দলবদ্ধতা ছিল। তবে এর ধরন, প্রকৃতি ও গ্যাংয়ের কর্মকাণ্ড বড় বড় অপরাধের সঙ্গে তেমন যুক্ত ছিল না। শুধু তা-ই নয়, এর কারণ ও ফলাফল এবং সমাজে এর প্রভাবও ভিন্নভাবে দেখা যেত। আমাদের কাছে এখন এক আতঙ্ক ও ভয়ের কারণ এমন সব গ্রুপের নাম। ছোটখাটো অপরাধই শুধু নয়, তাদের সংঘবদ্ধতা হত্যা ও খুনের মতো জঘন্য অপরাধের সঙ্গে যুক্ত। আমরা কমবেশি সবাই এর দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছি।

কিশোরদের সংঘবদ্ধতা সব সময় ছিল। তারা পাড়া-মহল্লায় বিভিন্ন ক্লাব ও সংগঠনের মাধ্যমে নিজেদের সংঘবদ্ধতাকে প্রকাশ করত। খেলাধুলা, গান-বাজনা, নাটকসহ বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কাজ করে তারা অবসর সময় কাটাত। এ কাজের মাধ্যমে তারা বয়স্কদের প্রশংসাও অর্জন করত। নিজেদের কায়িক পরিশ্রমের বিনিময়ে তারা এ কাজ করত। কারো কাছ থেকে জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করত না। দ্রুত নগরায়ণ তাদের অবসর সময় কাটানোর পরিবেশ ও প্রতিবেশকে ধ্বংস করে দিয়েছে, ফলে অবসর সময় কাটানোর উপাদানের মধ্যেও পরিবর্তন এসেছে। পরিবার ও সমাজ-কাঠামোর পরিবর্তন এবং খেলাধুলা ও অন্যান্য বিনোদন মাধ্যমের অনুপস্থিতি ও সংকুচিত হওয়ার কারণে এক ধরনের গ্যাপ তৈরি হচ্ছে। সুষ্ঠু ও সুন্দর অবসর বিনোদনের ঘাটতি পূরণ হচ্ছে কৃত্রিম পরিবেশ ও আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির মাধ্যমে। পুরো পরিবার ও সমাজ যখন এর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, তখন শিশুদের দোষ দিয়েই বা কী লাভ! আমাদের অভিভাবকদেরও  অনেকটা ব্যস্ততার কারণে ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে সময় কাটানো ও সঙ্গ দেওয়ার সময় নেই কিংবা কেউ কেউ প্রয়োজনও বোধ করছি না। ফলে সন্তানদের আধুনিক বিভিন্ন প্রযুক্তির সঙ্গে প্রয়োজনে ও অপ্রয়োজনে যুক্ত হওয়ার প্রবণতা এবং অবসর সময় কাটাতে হচ্ছে। এখন প্রযুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন গ্রুপ তৈরি হচ্ছে। গ্রুপের ভালো-মন্দ বোঝার মতো ক্ষমতা কিশোরদের মধ্যে না-ও থাকতে পারে। উঠতি বয়সের কিশোরদের মধ্যে একধরনের উন্মাদনা কাজ করে। তারা অন্য কারো দ্বারা প্রভাবিতও হতে পারে। কোনো প্রকার ভৌত অবকাঠামো ছাড়াই তথ্য-প্রযুক্তির মাধ্যমে এক জায়গায় একত্র হয়ে অপরাধমূলক কাজের পরিকল্পনা এবং খুন ও হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ তারা করছে।

বিপরীতে সমাজে এমন গ্রুপও রয়েছে, যারা বয়সে তাদের মতোই কিশোর, পড়াশোনা করছে কোনো না কোনো কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে, এমনকি পড়াশোনাও হয়তো করছে না; কিন্তু নিজেদের টাকা খরচ করে বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কাজের জন্য গ্রুপ গঠন করছে। তারা শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে, রাস্তাঘাট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশ রক্ষায় কাজ করছে, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো কিংবা স্বেচ্ছায় রক্ত দিয়ে মানুষের জীবন বাঁচাচ্ছে। এমন কিশোর-কিশোরীরাও আমাদের সামাজেরই মানুষ। তাদের বেড়ে ওঠা ও বড় হওয়ার ভিন্নতার জন্য, পরিবার ও সমাজের ভিন্নতার জন্য এবং খারাপ কোনো কিছুর সঙ্গে যুক্ত হওয়া কিংবা সুযোগ গ্রহণ না করার জন্য তারা প্রশংসিত। সমাজে যখন আমরা ভালো-মন্দ উভয় দিক খেয়াল করি, তখন খারাপ গ্রুপকে ভালো করার কাজটি আমাদেরই করতে হবে। এমন সব কাজ করতে হবে, যেখানে খারাপ হওয়ার সুযোগ তৈরি না হয়।

কিশোরদের মাঝে বড় বিষয় হলো অল্প বয়স ও পরিপক্বতার অভাব, যার কারণে কোনটি সঠিক আর কোনটি সঠিক নয়, তা বুঝতে না পারা। ফলে অনেক সময়ই গ্যাংকালচারকে বড় বিষয় মনে হয়। এখানে বড় এটাচমেন্ট খুঁজে পায়। শারীরিক পরিবর্তন এবং এর সঙ্গে মানসিক অবস্থার পরিবর্তনের পাশাপাশি পরিবার ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশ তাদের সংঘবদ্ধ হতে এবং গ্রুপ গঠন করতে সহায়তা করে। সংঘবদ্ধতা যদি কোনো ইতিবাচক সমাজসেবামূলক কাজে ব্যয় করা যায়, তাহলে তাদের মধ্যে ভিন্ন পরিবেশ তৈরি হবে। আর যদি তাদের সংঘবদ্ধতা কোনো খারাপ কাজের দিকে মোড় নেয়; তা সমাজের জন্য বড় ক্ষতির কারণই নয়, সমাজের অগ্রগতির জন্য বড় হুমকিস্বরূপ।

কিশোরদের নিয়ে ইতিবাচক গ্রুপ গঠনের পেছনে পরিবার ও সমাজের ভূমিকা বরাবরের মতোই অগ্রগণ্য। আমাদের দরকার শিশু-কিশোরদের ঘরে বন্দি না রেখে তাদের পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া এবং উদ্বুদ্ধ করা। মা-বাবাকেই এমন উদ্যোগ নিতে হবে। এতে কিশোরদের মধ্যে মানবতাবাদী, সহমর্মিতাবোধ ও সহানুভূতির বীজ রোপিত হবে। সরকার কর্তৃক স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কাউট, কাব, গালর্স গাইড, বিএনসিসি, রোভার স্কাউটসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ড বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।  শিক্ষার্থীদের ডিগ্রি প্রদানের ক্ষেত্রে সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকাও বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। আর কারো ক্ষেত্রে অসংগত আচরণ পরিলক্ষিত হলে, শাস্তি প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় নয়। কিশোরদের শারীরিক গঠন ও মানসিক শক্তি অর্জনের জন্য এমনকি সামরিক শিক্ষাও বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।

আমাদের পুলিশ ও প্রশাসনের গতানুগতিক ভূমিকার বাইরে সামাজিক ভূমিকাও সামনে নিয়ে আসতে হবে। নির্দিষ্ট আইন-কানুনের বাইরেও পুলিশের ভূমিকা চিন্তা করতে হবে। পুলিশ সমাজের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। সমাজ ও পুলিশ উভয়কেই তা ভাবতে হবে। তাদের কাজ সমাজের মানুষের জন্য যেন কোনো আতঙ্কের কারণ হয়ে না দাঁড়ায়। এর জন্য প্রয়োজন পুলিশ-জনগণ সহযোগিতা ও সম্পর্ক উন্নয়ন। আরো বড় বিষয় কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থার উন্নয়ন, কার্যকরকরণ এবং সম্প্রসারণ। সমাজের ভিত্তি যদি ভালো হয়, সেখানে ইতিবাচক গ্রুপ বা বিভিন্ন বিগ্রেড তৈরি হবে, যারা সমাজে কোনো অন্যায় দেখলে প্রতিরোধ করতে এগিয়ে আসবে। আমরা এমন সমাজের ভিত্তি চাই, যেখানে অকল্যাণ নয়; কল্যাণের জন্য, অমঙ্গল নয়; মঙ্গলের জন্য, অপকার নয়; মানুষের উপকারের জন্য বেশি বেশি গ্রুপ তৈরি হবে। 

লেখক: অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা