kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

নাছিমা বেগম

শেখ রাসেল : একটি সম্ভাবনার অকালপ্রয়াণ

১৮ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



শেখ রাসেল : একটি সম্ভাবনার অকালপ্রয়াণ

শেখ রাসেল। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কনিষ্ঠ পুত্র। ১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়িতে রাত দেড়টায় রাসেলের জন্ম। শেখ রাসেলের জন্ম নিয়ে ভাই-বোনদের মধ্যে সে কী উত্তেজনা! সে সময় আজকের মতো আগে থেকেই আগত শিশুটি ছেলে না মেয়ে, তা জানার কোনো উপায় ছিল না। রাসেলের জন্মের আগে দুই বোন ভেবেছিলেন, বোন হলে তাঁরা দলে ভারী হবেন। আর ভাইয়েরা ভেবেছিলেন ভাই হলে তাঁদের দল ভারী হবে। এই নিয়ে ভাই-বোনদের মধ্যে যেন পাল্লা লেগে গিয়েছিল। সবাই ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখে জেগে থাকে নতুন অতিথির আশায়। অপেক্ষার পালা শেষ হলো। খবর এলো তাঁদের ভাই হয়েছে, তখন সব কিছু ভুলে সবাই আনন্দে আত্মহারা। মাথাভরা কালো চুল, তুলতুলে শরীর, অপূর্ব মুখচ্ছবি। অনেক বছর পর ছোট্ট একটি শিশু তাঁদের ঘর আলো করে এসেছে। সবার মধ্যে যেন খুশির জোয়ার বইতে থাকে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বার্ট্রান্ড রাসেলের খুব ভক্ত ছিলেন। রাসেলের বই পড়ে তিনি তাঁর ছায়াসঙ্গী প্রিয়তমা স্ত্রী শেখ ফজিলাতুন্নেছা রেণুকে বাংলায় ব্যাখ্যা করে শোনাতেন। এই ফিলোসফি শুনে শুনে রেণু এতটাই বার্ট্রান্ড রাসেলের ভক্ত হয়ে পড়েছিলেন যে তাঁর নাম অনুসারে নিজের ছোট ছেলে জন্মের পর তার নাম রাখলেন রাসেল। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে রাসেল সবার ছোট। মা-বাবা-ভাই-বোন সবার বড় আদরের এই রাসেল সোনার চোখের তারায় যেন অন্য রকম আলো ছিল। বুদ্ধিদীপ্ত চোখের চাওয়া আর মিষ্টি হাসি নিয়ে দিনে দিনে রাসেল বড় হতে থাকে।

ভালো মানুষ হয়ে বেড়ে ওঠার পেছনে পরিবার একটি বড় ভূমিকা পালন করে। বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ছিলেন একজন আদর্শ মাতা। তিনি তাঁর সন্তানদের নৈতিক শিক্ষায় মানুষ করেছেন। শিক্ষা দিয়েছেন মানবিক গুণাবলি। আজকে যার বড় অভাব। মানবিক মূল্যবোধের অভাবে দানবীয় চরিত্রগুলোর ছত্রচ্ছায়ায় শান্ত সমাজ প্রায়ই অশান্ত হয়ে উঠছে।

আনন্দময় শৈশবে রাসেলের দুরন্তপনার মাঝেও মায়ের শিক্ষায় তার মানবীয় গুণাবলির দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ে। সেই অল্প বয়সেই রাসেল মানুষকে মানুষ হিসেবে সম্মান দিতে শেখে। বাড়ির কাজের ছেলে আব্দুল মিয়াকে ‘ভাই’ বলে ডাকত। তার কাছ থেকে কিসসা শুনে হেসে কুটিকুটি হতো। তাদের সঙ্গে খুব মজা করে সময় কাটাত। বাসায় আম্বিয়ার মা নামে একজন কাজের বুয়া ছিলেন। তিনি রাসেলকে খুব আদর করতেন। ছোটবেলায় তাকে কোলে নিয়ে ঘুরে ঘুরে খাবার খাওয়াতেন। রাসেল যখন একটু বড় হলো, তখন রান্নাঘরে লাল ফুল আঁকা থালায় করে পিঁড়ি পেতে বসে এই কাজের লোকদের সঙ্গে ভাত খেতে খুব পছন্দ করত।

উড়ে বেড়াতে, ঘুরে বেড়াতে রাসেলের খুব ভালো লাগত। টুংটাং বেল বাজিয়ে সাইকেল চালাতে তার কোনো জুড়ি ছিল না। ছোট রাসেলের কোলে চড়ার বয়স থেকেই কবুতর খুব পছন্দ ছিল। সে যখন সবে হাঁটতে শিখেছে, তখনই কবুতরের পেছনে পেছনে ছুটেছে। একটু বড় হলে নিজের হাতে কবুতরের খাবার দিয়েছে। টুঙ্গিপাড়ায় তাদের গ্রামের বাড়িতেও কবুতর ছিল। সকালে নাশতার জন্য পরোটা ও কবুতরের মাংস ভুনা পরিবারের সবার প্রিয় খাবার হলেও রাসেল কোনো দিন কবুতরের মাংস খেত না। কবুতরের প্রতি তার সে কী মায়া! অনেকে অনেক চেষ্টা করেও তার মুখে এক টুকরা কবুতরের মাংস দিতে পারেনি। রাসেলের মাছ ধরারও খুব শখ ছিল। তবে মাছ ধরার পর আবার তা ছেড়ে দিতেই সে বেশি মজা পেত। এটাই ছিল তার মাছ ধরার খেলা। একবার পরিবারের সবার সঙ্গে রাসেল নাটোরে উত্তরা গণভবনে গিয়েছিল। সেখানেও সারা দিন সে মাছ ধরা আর ছাড়াতেই ব্যস্ত ছিল।

রাসেলের খুব ইচ্ছা ছিল সে বড় হয়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দেবে। তাকে কেউ যদি জিজ্ঞেস করত, ‘বড় হয়ে তুমি কী হবে?’ সে নির্দ্বিধায় বলত, ‘আমি আর্মি অফিসার হব।’

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে রাসেলের এই ইচ্ছা মনের কোণে দানা বাঁধতে শুরু করে। এ থেকেই বড় দুই ভাই মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পর তাঁদের কাছ থেকে খুব আগ্রহ নিয়ে যুদ্ধের গল্প শুনত রাসেল। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে যখন অসহযোগ আন্দোলন চলছিল, তখন পুলিশের গাড়ি দেখলেই বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে রাসেল চিৎকার করে বলত, ‘ও পুলিশ-হরতাল।’ হরতাল হরতাল বলে চিৎকার করে স্লোগান দিত ‘জয় বাংলা, জয় বাংলা।’ আন্দোলনের রক্ত যে তার শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পরিবারের সবার সঙ্গে ছোট্ট রাসেলকেও বন্দি জীবন যাপন করতে হয়। ঠিকমতো খাবারদাবার নেই। কোনো খেলনা নেই, বইপত্র নেই। কী কষ্টে যে দিন কেটেছে রাসেলের! চোখের কোণে সব সময় পানি। যদি জিজ্ঞেস করা হতো, কী হয়েছে রাসেল? জবাব দিত, চোখে ময়লা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘আমাদের ছোট রাসেল সোনা’ স্মৃতিচারণামূলক গ্রন্থে শেখ রাসেল সম্পর্কে বলতে গিয়ে লিখেছেন, ‘অবাক লাগত এতটুকু শিশু কিভাবে নিজের কষ্ট লুকাতে শিখল।’ তিনি লিখেছেন, “রাসেল অত্যন্ত মেধাবী ছিল। পাকসেনারা তাদের অস্ত্র পরিষ্কার করত, ও জানালায় দাঁড়িয়ে সব দেখত। অনেক অস্ত্রের নামও শিখেছিল। যখন এয়ার রেইড হতো, তখন পাকসেনারা বাংকারে ঢুকে যেত আর আমরা তখন বারান্দায় বের হওয়ার সুযোগ পেতাম। আকাশের যুদ্ধবিমানের ‘ডগ ফাইট’ দেখারও সুযোগ পেতাম। প্লেন দেখা গেলেই রাসেল খুব খুশি হয়ে হাতে তালি দিত।” শৈশবেই তার মধ্যে দেশপ্রেম জাগ্রত ছিল।

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী যুদ্ধে হেরে যাওয়ার পর বাংলাদেশ মুক্ত হলেও বঙ্গমাতার পরিবার সেদিনও মুক্ত হতে পারেনি। তাঁরা মুক্তি পেয়েছিলেন ১৭ ডিসেম্বর সকালে। বাসার পাকিস্তানি সৈনিকদের ভারতীয় মিত্রবাহিনী বন্দি করার পর পরই রাসেল আর তার খেলার সাথি টিটো দুজনেই তাদের মাথায় হেলমেট পরে যুদ্ধের সাজে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা শুরু করে। বিজয়ের উল্লাসে উদ্বেলিত শিশু রাসেল। কিন্তু এত কিছুর পরও তার দুই চোখ যেন ব্যথায় ভরা। ওই দুটি চোখ যেন সব সময় তার বাবাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। যেদিন বঙ্গবন্ধু ফিরে এলেন, রাসেলের আনন্দ যেন আর ধরে না। সে এক মুহূর্তের জন্যও বাবাকে কাছ ছাড়া করতে চাইছিল না। কী যে আনন্দ তার চোখে-মুখে!

১৯৭৫ সালের ১৪ জুলাই বড় ভাই শেখ কামালের এবং ১৭ জুলাই শেখ জামালের বিয়ে হয়। এই বিয়েতে বাইরের চাকচিক্য না থাকলেও আত্মীয়-স্বজনে মিলে সবাই খুব আনন্দ করে। বিশেষ করে রাসেল সমবয়সীদের সঙ্গে মিলে রং খেলে, খুব মজা করে।

ছোটবেলায় রাসেল দেখেছে যুদ্ধ। দেখেছে স্বাধীন দেশের জন্য বাঙালিপ্রাণ কিভাবে লড়াই করেছে শত্রুপক্ষের সঙ্গে। রাসেল ছোটবেলা থেকেই বুঝতে শিখেছে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী আমাদের অধিকার কেড়ে নিতে চায়; কিন্তু পারেনি। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে বীর বাঙালি যুদ্ধ করে বাংলার স্বাধীনতা এনেছে। আমরা পেয়েছি প্রিয় লাল-সবুজের পতাকা। বাঙালির এই স্বাধীনতার ইতিহাসে জড়িয়ে আছে রাসেল। একবার রাসেলকে একটি বড় কালো পিঁপড়া কামড়ে দিলে তার আঙুল কেটে রক্ত বের হয়। সে খুব কষ্ট পায়।  এরপর ওই কালো পিঁপড়া দেখলেই রাসেল তাকে ভুট্টো ডাকত। সম্ভবত পাকিস্তানিদের অত্যাচারের কথা মনে করেই এই নাম দেওয়া।

রাসেলের স্বপ্ন ছিল বড় হওয়ার; কিন্তু সব কিছুই স্তব্ধ হয়ে যায় মানবরূপী দানবের হাতে। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট তাকেও প্রাণ দিতে হলো। বড় বোন ‘হাসুপা’র সঙ্গে রাসেল যদি জার্মানিতে যেতে পারত, হয়তো ইতিহাস অন্য রকম হতো। এই নিষ্ঠুর জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড তাকে দেখতে হতো না। কোমল মনের এই শিশুটিকে মা-বাবা-ভাই-ভাবি-চাচা সবার নিথর দেহের পাশ দিয়ে হাঁটিয়ে দোতলায় নিয়ে যায় নরপশুরা। কী করেছিল রাসেল তখন! কতটা কষ্ট পেয়েছিল! তার চোখের পানি কেমন করে ঝরছিল! ভাবতেও কষ্ট হয়, কেমন করে এ রকম একটি ফুলের মতো শিশুকে হত্যা করল ঘাতকরা। ঘাতকের হাত একটুও কাঁপেনি সেদিন। বুলেটের আঘাতে শৈশবের দুরন্ত রাসেলের দেহ নিথর হয়ে পড়েছিল। যে শিশুর চোখের তারায় ছিল অপার সম্ভাবনা, অন্য রকম আলো। বিকশিত হওয়ার আগেই যাকে ঝরে যেতে হলো। সেই রাসেল আমাদের ভালোবাসা, আমাদের অন্তরজুড়ে যে থাকে। সেই ছোট্ট রাসেল সোনাকে কেমন করে ভুলি?

 

লেখক: চেয়ারম্যান, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও সাবেক সিনিয়র সচিব

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা