kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

সাদাকালো

আবরার হত্যার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই

আহমদ রফিক

১৭ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



আবরার হত্যার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই

আবারও প্রচণ্ড ছাত্র বিক্ষোভে উত্তাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। স্লোগানে কম্পিত বিশেষভাবে বুয়েট। কারণ আর কিছু নয়, বুয়েটের একজন মেধাবী ছাত্রকে পিটিয়ে মারা, নিছক ফেসবুকের স্ট্যাটাসে ভিন্নমতের কারণে। এ যেন আরেক ব্লগার হত্যার মতোই ঘটনা—অভিজিত, দীপন তথা কয়েকটি নাম। তাদের ঘাতকরা ছিল ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠীর চরমপন্থী। অভিজিত হত্যা তো জনারণ্যে, কর্তব্যরত পুলিশের উপস্থিতিতে। সংস্কৃতিমনস্ক বাংলাদেশি মানুষের সামনে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে অভিজিত হত্যা সম্পন্ন করে দিব্যি হেঁটে চলে গেল জনাকয় ঘাতক। অভিজিতের স্ত্রীর চিৎকারে কেউ এগিয়ে আসেনি। এই ছিল হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট, বাংলাদেশি সংস্কৃতিচর্চার দৃশ্যপট। ঘাতকরা আজও ধরা পড়েনি, বিচার তো দূরের কথা।

ব্লগার নিয়ে অনেক বিতর্ক। বাদ দিই সে প্রসঙ্গ। কিন্তু বাংলাদেশে ছাত্ররাজনীতি এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে ক্ষমতাসীনদের ছাত্রসংগঠন চরম অসহিষ্ণু পর্যায়ে, ভিন্নমত শুনতে বা সহ্য করতে তারা রাজি নয়। আর এই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি ভারত-বাংলাদেশ স্মারক চুক্তি সম্পর্কে ফেসবুকে ভিন্ন মতামত প্রকাশের কারণে বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে মেরেছে, এ পর্যন্ত প্রাপ্ত সংবাদমাফিক স্থানীয় ছাত্রলীগ নেতারা।

তাদের বাধা দেওয়ার মতো কেউ ছিল না। না ছাত্র, না শিক্ষক-প্রশাসক, না পুলিশ। সংবাদ বিবরণে প্রকাশ, পুলিশ খবর পেয়ে ছাত্রাবাসে গেলেও ছাত্রলীগ তাদের ঢুকতে দেয়নি। এ যুক্তি কি মানা যায়? একটি আসন্ন মৃত্যু ঠেকাতে পুলিশ তার শক্তি প্রয়োগ করছে না, এ কেমন জননিরাপত্তা এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, এ কেমন নিরাপত্তাবিষয়ক দায়িত্ব পালন?

এরই মধ্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এ ঘটনায় তাঁর প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে বলেছেন, ভিন্নমত হলেই মেরে ফেলতে হবে এমন ঘটনা তো মানা যায় না। অপরাধীদের শাস্তি পেতে হবে। তাঁর এ বক্তব্যের সূত্র ধরে বলতে হয়, এই কি ষাটের দশকের ছাত্রলীগ? এ নৃশংসতা মেনে নেওয়া যায় না। আমরা এ ঘটনায় দুর্বৃত্তদের শাস্তি বিধানে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের দ্রুত ফলাফল দেখতে চাই।

বিচার চাই এ হত্যাকাণ্ডের, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকের ন্যায়নিষ্ঠ বিচার। সম্ভবত ক্ষুব্ধ, মর্মাহত প্রধানমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়ার কারণে উদাসীন পুলিশ এখন সক্রিয়।

অতি দ্রুততায় ১০ জন শিক্ষার্থী পাঁচ দিনের রিমান্ডে, মোট ১৩ জন গ্রেপ্তার। এর আগে আমরা পুলিশকে এতটা দ্রুততার সঙ্গে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মোকাবেলা করতে কমই দেখেছি।

এখন বড় প্রশ্ন, যা বরাবরই করে এসেছি, সঠিক বিচার এবং অপরাধীদের শাস্তি হলেও আবরার তো তার পরিবারে, তার মা-বাবার কাছে ফিরে আসবে না? তাই প্রশ্ন প্রবাদবাক্যে উচ্চারণে ‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ শ্রেয়’—এ হত্যাকাণ্ড কি ঠেকানো যেত না? বিশেষ করে যদি পুলিশ তার দায়িত্ব পালনে সক্রিয় ও পেশাদারিত্বের পরিচয় দিত?

যদি হলের প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্র না সেজে সক্রিয় হতেন, নিরপেক্ষ ছাত্রদের সঙ্গে নিয়ে দুর্বৃৃত্ত ছাত্রদের মোকাবেলায় দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসতেন? দীর্ঘ ছয় ঘণ্টা সময় ধরে নির্বিবাদে এ পৈশাচিক নির্যাতনকাণ্ড চলেছে। এত সময় কী করছিলেন হল কর্তৃপক্ষসহ বুয়েটের উপাচার্য? তাঁরা এ খবর পাননি—এমন কথাও কি বিশ্বাস করতে হবে? ছাত্রদের প্রশ্নের কী জবাব দেবেন উপাচার্য? তিনি কি পদত্যাগ করে দায়িত্ব পালনে অক্ষমতার দায়মুক্তির চেষ্টা করবেন? মনে হয় না।

বুয়েটের শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক এ কে মাসুদ বলেছেন, ‘উপাচার্যের ব্যর্থতায় আমরা মর্মাহত।’ তাঁর বক্তব্য হচ্ছে, ছাত্রাবাসে নিরাপত্তাহীনতা দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে; কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। আমাদের প্রশ্ন: দীর্ঘস্থায়ী এ অনাচারের বিরুদ্ধে শিক্ষক সমিতির কি করণীয় কিছু ছিল না? না কি তেমন সৎ সাহস, নৈতিক সাহস তাঁদের ছিল না।

আবরার হত্যাকাণ্ড উপলক্ষে আজ সংবাদ শিরোনাম প্রকাশিত হচ্ছে, ‘বুয়েটের তিন হলে সাত টর্চার সেল’, ‘স্টাম্প ও লাঠি সব সময়ই প্রস্তুত রাখে ছাত্রলীগ।’ ভয়ংকর এ খবরটি কি জানা ছিল না বুয়েটের প্রশাসন ও প্রত্যক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের? কী ব্যবস্থা নিয়েছেন তাঁরা? এক সূত্রমতে, পূর্ববর্তী ছাত্র হত্যার (আবুবকর হত্যার) বিচার হলে এ অবস্থা ঘটত না। নতুন করে প্রশ্ন তুলতে হয়, ওই ছাত্র হত্যার বিচার হয়নি কেন? বিচার না হওয়ার দায় কার?

ক্ষমতাসীন ছাত্ররাজনীতি অর্থ, ক্ষমতা, কৃতিত্ব-প্রভুত্বের দূষণে এতই দূষিত হয়েছে যে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্ষমতাসীন ছাত্র নেতৃত্ব নিশ্চিন্তে তাদের নিজস্ব শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। কেউ তাতে বাধা দেয়নি। দেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, দেয়নি মূল রাজনৈতিক সংগঠন।

একটি বর্বর হত্যাকাণ্ডের পর আজ যাঁরা বলছেন, অপরাধী কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না, তাঁরা যদি আগেই তাঁদের অঙ্গসংগঠনের অনাচারী নেতাদের সম্পর্কে, ছাত্রনেতা-যুবনেতাদের সম্পর্কে সতর্ক হতেন, তাহলে আজকের ঘটনা, এর পূর্ববর্তী হত্যাকাণ্ডের বর্বরতা ঘটত না কিংবা ক্যাসিনোকাণ্ডও ঘটত না, অভিযান চালাতে হতো না সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে।

ছাত্ররাজনীতির এ দূষণ তো আজ থেকে নয়। অনাচারী ছাত্রনেতা-উপনেতাদের ঘাতক মনোবৃত্তির প্রকাশ দেখলেই মনে পড়ে যায় অসহায় দরজি যুবকটির কথা, যার রাজনৈতিক আনুগত্যের বারংবার ঘোষণা সত্ত্বেও তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ঘাতক জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু তথাকথিত ছাত্রনেতা।

বিচারহীনতা সম্পর্কে একটি দৈনিকের সংবাদ শিরোনাম : ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে খুন হয়, বিচার হয় না’। তাদের সংবাদ পরিসংখ্যান জানাচ্ছে : ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন সাধারণ শিক্ষার্থী হত্যার একটিরও বিচার হয়নি।’ ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এক দশকে পাঁচ শিক্ষার্থী খুন, বিচার পায়নি পরিবার।’ ‘সিলেটে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের তিন কর্মী হত্যার বিচার হয়নি।’ কেন হয়নি? কে বা কারা দায়ী এ বিচারহীনতার জন্য?

শুধু কি বিচারহীনতাই ছাত্ররাজনীতি, যুব রাজনীতির বর্তমান অবস্থার জন্য দায়ী। এর সঙ্গে আরো বড় ধরনের, তাৎপর্যময় কারণ কি জড়িত নেই? শুধু বিশ্ববিদ্যালয় বা কারিগরি শিক্ষায়তনই নয়, কলেজ ও স্কুলের মতো শিক্ষায়তন এ দূষণের শিকার। রাজনৈতিক-সামাজিক দূষণ, দূষণ নৈতিকতাবোধের অভাবে।

এর দায় যেমন পারিবারিকভাবে অভিভাবকদের, তেমনি শিক্ষায়তনিক স্তরে দায় শিক্ষকদের, শিক্ষায়তনিক কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের। তাদের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, স্বার্থপরতা, সব কিছু দলাদলির দূষণে শিক্ষকতার আদর্শ থেকে বিচ্যুত। এতে জড়িত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরাও—পদমর্যাদা ও সুবর্ণ প্রাপ্তির অন্ধ আকর্ষণে। ব্যতিক্রমীরা সংখ্যালঘু, শক্তিহীন। কাজেই শুভবুদ্ধিসম্পন্নদের শুভ প্রচেষ্টা কাজে আসে না।

দুই.

বাংলাদেশে আদর্শবাদী ছাত্ররাজনীতি ও ছাত্র আন্দোলনের ঐতিহ্য গর্ব ও অহংকারের। আটচল্লিশ থেকে পঞ্চাশের দশকে ভাষা আন্দোলন, প্রগতিবাদী সাংস্কৃতিক আন্দোলন, ষাটের দশকে মূলত দুই ধারায় জাতীয়তাবাদী ও প্রগতি ছাত্র আন্দোলন—শিক্ষা আন্দোলন ও রাজনৈতিক আন্দোলন যে ঐতিহ্য সৃষ্টি করেছিল, আজ তা দূষণে ও আদর্শচ্যুতিতে, ক্ষমতা প্রদর্শনের দম্ভে-ঔদ্ধত্যে ও সংকীর্ণ স্বার্থপরতায় বিপথগামী ও আদর্শচ্যুত।

আগেই বলেছি এর দায় নিয়ন্ত্রক জাতীয় রাজনীতির। যে ছাত্ররা—যাদের আমরা সাধারণ ছাত্র বলি, যারা একুশের আন্দোলনকে সার্থক করে তুলেছিল, আজ হঠাৎ করে আবরার হত্যাকাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে তারা হাজার কণ্ঠে বলছে, আমরা চুপ করে থাকব না। যারা লাঠি, ছোরা, হকিস্টিকের ভয়ে স্তব্ধ হয়েছিল, তাদের কণ্ঠে প্রতিবাদী গর্জন—‘আমরা চুপ করে থাকব না।’ অর্থাৎ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে রুখে দাঁড়াব।

এই ছাত্রসাধারণের নিঃস্বার্থ ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ছাত্রলীগের দুর্বৃত্তপনা থেকে আক্রান্ত নিরীহ ছাত্রকে বা ছাত্রদের রক্ষা করতে পারে, রক্ষা করতে পারত আবরার ফাহাদকেও। ঐক্যবদ্ধ সে শক্তিমত্তা ও নৈতিক সাহস বুয়েটের এই প্রতিবাদী ছাত্ররা আগে দেখাতে পারেনি। পারলে অন্তত একটি অঘটন ঠেকানো যেত।

বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করছি, প্রতিবাদী ছাত্রদের অন্যতম প্রধান একটি দফা—ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা। যে ছাত্রদের বরাবর দেখেছি ছাত্ররাজনীতিতে প্রবল আগ্রহ, অন্তত সচেতনতা, তাদের কণ্ঠে এই যে বিপরীত ঘোষণা—এর মূল কারণ ছাত্ররাজনীতির দূষণ, অনৈতিকতা ও আদর্শহীনতা। তারা স্বধর্মচ্যুত বলেই এই বিপরীতমুখী যাত্রা।

পরিস্থিতির সামগ্রিক বিচার-বিশ্লেষণে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার বিকল্প হতে পারে শুদ্ধ আদর্শনিষ্ঠ, নীতিবাদী ছাত্ররাজনীতির ঐক্যবদ্ধ স্বাধীন সংগঠন, যারা আপন বিচার-বিবেচনায় ছাত্রদের শিক্ষাগত স্বার্থ ও জাতীয় স্বার্থের পক্ষে কাজ করবে। কারো তল্পিবাহক হয়ে নয়, কারো রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির ধারক-বাহক হয়ে নয়।

সব শেষে আলোচ্য বিষয়ের মূল কথা হলো, আবরার হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় ছাত্রদের প্রতিবাদী আন্দোলনের মুখে হত্যাকাণ্ডের নায়কদের যেন যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে বিচারাধীন করে শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়। পূর্বোক্ত একাধিক ঘটনার মতো এ ক্ষেত্রেও যেন কোনো ফাঁপা যুক্তি শাস্তির বিরুদ্ধে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়। আমরা মাদরাসাছাত্রী নুসরাত হত্যা মামলার সঠিক রায়ের অপেক্ষায়। আবরার হত্যার ক্ষেত্রেও একই কথা। ছাত্ররাও যেন তাদের তুমুল আবেগ শিকেয় তুলে না রাখে। চলমান রাখে তাদের প্রতিবাদ। শেষ কথা, বুয়েটের দায়িত্বহীন প্রশাসন কি তাদের দায় থেকে মুক্ত থাকবে?

লেখক : কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা