kalerkantho

সোমবার । ১৮ নভেম্বর ২০১৯। ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ভারত ও চীনকে মর্যাদার সম্পর্ক মেনে চলতে হবে

সুজন আর চিনয়

১৫ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



চেন্নাইয়ের অদূরে মামাল্লাপুরমে দ্বিতীয় অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে (১১-১২ অক্টোবর) চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্য গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রসঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে বেশ অস্বস্তি দেখা দিয়েছিল। কিছু কিছু বিষয়ে, যেমন মাসুদ আজহার, নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপে ভারতের সদস্য পদ, বিপুল বাণিজ্য-ব্যবধান ও দক্ষিণ এশিয়ায় সড়ক যোগাযোগ প্রভৃতি বিষয়ে চীনের ভূমিকায় এ অস্বস্তি দেখা দিয়েছিল। জম্মু ও কাশ্মীর প্রসঙ্গে পাকিস্তানের প্রতি চীনের সমর্থন নতুন এক সমস্যা তৈরি হয়। চীনা অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি হ্রাস এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভূ-কৌশলগত প্রতিযোগিতা আরো অনিশ্চয়তার ইঙ্গিতবাহী। এশিয়ায় চীনকেন্দ্রিক ব্যবস্থার ধারণাও আপত্তির মুখে পড়েছে। সম্প্রতি বেলারুশের মিনস্ক ডায়ালগ ফোরামে আপত্তির বিষয়টির প্রকাশ ঘটেছে।

কাশ্মীর প্রসঙ্গ

চীন মনে করে, জম্মু ও কাশ্মীর সমস্যার সমাধান জাতিসংঘ সনদ, নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবাবলি এবং দ্বিপক্ষীয় চুক্তি-সমঝোতার ভিত্তিতে হতে হবে। উল্লেখ্য, পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত চুক্তি (১৯৬৩) এবং চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (সিপিইসি) কার্যত চীনের অবস্থানকে বদলে দিয়েছে; নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবাবলির প্রাসঙ্গিকতা নাকচ করে দিয়েছে। ‘আকসাই চীন’-এ ৩৮ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা চীনের দখলে, এ ছাড়া ১৯৬৩ সালের চুক্তি অনুযায়ী পাকিস্তান বেআইনিভাবে পাঁচ হাজার ১৮০ বর্গকিলোমিটার এলাকা চীনকে ছেড়ে দিয়েছে। ১৯৬৩ সালের চুক্তিটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি, তাতে বলা হয়েছে, কাশ্মীর প্রসঙ্গের মীমাংসা হয়ে গেলে চীনকে সংশ্লিষ্ট সার্বভৌম কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা আবার শুরু করতে হবে।

সিপিইসি ভারত নাকচ করে দিয়েছে, কারণ তা পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরের ওপর দিয়ে গেছে। আঁচ করা যায়, চীন হয়তো বুঝতে পেরেছে সিপিইসিবিষয়ক সিদ্ধান্ত তড়িঘড়ি করে নেওয়া হয়েছে, ভারতের সঙ্গে যথাযথ পরামর্শ না করেই। যা হোক, যেহেতু এর উদ্যোক্তা চীন তাই তার পক্ষে এটি পুনর্বিবেচনা করা কঠিন; কৌশলগত মিত্র পাকিস্তান থেকে সরে দাঁড়ানোও সহজ নয়।

ভারত-চীন সম্পর্ক অনেক চড়াই-উতরাই দেখেছে। অনেকবার সমস্যা দেখা দিয়েছে, তবে বিপত্তিকালের ব্যাপ্তি কমেছে। ১৯৬২ সালের সীমান্ত যুদ্ধের পর কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে ১৪ বছর লেগেছিল। ১৯৯৮ সালে ভারতের পারমাণবিক পরীক্ষার পর সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে দুই বছর লেগেছিল। দোকলাম সংকট (২০১৭) দেখা দিলে দুই দেশের নেতারা দিন কয়েকের মধ্যেই ব্রিকস সম্মেলনের অবকাশে বৈঠকে বসেছিলেন। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে বেশ পরিপক্বতা রয়েছে। উভয় দেশই সম্পর্ক আরো গভীর, সংহত ও স্বচ্ছ করতে আন্তরিক।

মামাল্লাপুরম বৈঠকের গুরুত্ব

মামাল্লাপুরমে দুই নেতার জন্যই আরেকটি সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ভূ-কৌশলগত কূটনীতির এ যুগে সম্পর্ক পুনর্বিন্যস্ত করার সুযোগ। মামাল্লাপুরম গুরুত্বহীন জায়গা নয়। প্রথম অনানুষ্ঠানিক বৈঠকের স্থান উহানও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। এটি বিআরআই-এ কল্পিত ইউরোপের সঙ্গে রেল সংযোগের রুটে পড়ে। আর মামাল্লাপুরম দুই হাজার বছর আগে পল্লব সাম্রাজ্য ও চীনের সঙ্গে সামুদ্রিক যোগাযোগের কেন্দ্র ছিল। সেখানে বৈঠক করার ক্ষেত্রে ভারত-চীন অর্থনৈতিক অংশীদারির সুযোগের কথাই বিবেচনায় ছিল। ভারতে চীনের বিনিয়োগের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। ২০১৫ সাল থেকে চীনের সরাসরি বিনিয়োগকে স্বাগত জানানো হচ্ছে। চীনা সূত্র অনুযায়ী, ভারতে তাদের মোট বিনিয়োগ আট বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। পারস্পরিক বিনিয়োগ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে চাঙা করে।

বৈশ্বিক প্রেক্ষিত

শি-মোদি দ্বিতীয় বৈঠক এমন এক সময়ে হলো, যখন বিভিন্ন ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র-চীন বিরোধ বাড়ছে। বাণিজ্য থেকে সামরিক—সব ক্ষেত্রে। অস্বীকার করার উপায় নেই, এ সময় ভারত ও চীনকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে—দৃঢ় ও সংহত সম্পর্কের লক্ষ্যে, যেখানে প্রতিযোগিতা বিরোধে পরিণত হবে না; মতভেদ ঝগড়ায় পরিণত হবে না। ভারত ও চীনকে মিলেমিশে থাকতে হবে, যেমনটা হাজার বছর ধরে থেকেছে। দুই দেশের জনগণের স্বার্থেই সব ক্ষেত্রে গভীর বন্ধুত্ব থাকতে হবে।

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে তৃতীয় পক্ষের প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে; বদ্ধমূল ধারণাগুলো মিডিয়ার সাহায্যে দূর করতে হবে; সর্বোচ্চ পর্যায়সহ বিভিন্ন পর্যায়ে যেমন যুবসমাজ, প্রতিরক্ষা প্রভৃতি ক্ষেত্রে মতবিনিময় ও সহযোগিতাকে উৎসাহিত করতে হবে; ভারতকে তার ৫৮ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি ঘোচাতে হবে এবং দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের বর্ধমান প্রভাবের ব্যাপারে আরো স্পষ্টতা আনতে হবে।

বিশ্বের কাছে চীন আশা করে, তার উত্থান এবং তিব্বত, শিনচিয়াং, তাইওয়ান ও হংকংয়ের বিষয়ে তার অবস্থানকে স্বীকার করা হোক। একইভাবে চীনকে ভারতের উন্নয়ন-অগ্রগতি, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার বিষয়টিকে স্বীকার করতে হবে। এটা হলে ভারত-চীন প্লাস ফ্রেমওয়ার্কে আরো সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।

লেখক : সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক ও চীন বিশেষজ্ঞ

সূত্র : দ্য হিন্দু অনলাইন

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা