kalerkantho

শনিবার । ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৬ রবিউস সানি               

বাংলাদেশ-চীন-ভারত সম্পর্ক প্রসঙ্গে

সি উদয় ভাস্কর

১২ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বাংলাদেশ-চীন-ভারত সম্পর্ক প্রসঙ্গে

মালাল্লাপুরমে একটি অনানুষ্ঠানিক শীর্ষ সম্মেলনে যোগদান উপলক্ষে চীনের প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। তাঁকে স্বাগত জানাবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া বাকি থাকলেও বিষয়টি বেশ স্পষ্ট যে মোদি-শি বৈঠক হচ্ছে। (প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং সকালে ভারতে পৌঁছেছেন এবং মধ্যাহ্নভোজের পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিতীয়বারের মতো অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করেছেন। শীর্ষ সম্মেলন গতকাল শুরু হয়েছে এবং আজ শেষ হবে—বি. স.)।

দুই নেতার মধ্যে প্রথম অনানুষ্ঠানিক বৈঠক হয়েছিল চীনের উহানে, ২০১৮ সালের এপ্রিলে। দোকলামে দুই দেশের সেনাদের মুখোমুখি অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে ওই বৈঠকের আবশ্যকতা দেখা দিয়েছিল। রাজনীতির সর্বোচ্চ পর্যায়ে ধৈর্য ও বিচক্ষণতার চর্চা এশিয়ার দুই বৃহৎ জাতিকে (উহানের বৈঠকে) বিরোধ এড়িয়ে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ব্যাপারে সমঝোতায় পৌঁছতে সাহায্য করে। অবশ্য এখনো সীমান্ত বিরোধ আছে এবং চার হাজার কিলোমিটারের বেশি লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোলের বিষয়টি অমীমাংসিত রয়ে গেছে।

মাত্রই শেষ হয়েছে (৬ অক্টোবর) বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর। এ সফরের মধ্য দিয়ে একটি নির্দেশনামূলক সূত্র পাওয়া গেছে; সেটি হলো—কী করে ভারত-চীন কৌশলগত সম্পর্ক বিবর্তিত হয়েছে তা ভালো করে বুঝতে হবে এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক থেকে ভবিষ্যতের করণীয় সম্পর্কে শিক্ষা নিতে হবে। বাংলাদেশ-ভারত-চীন ট্রায়াঙ্গল প্রায়ই দৃষ্টির আড়ালে থেকে যায়। কারণ এশিয়ার দুই বৃহৎ দেশের অস্বস্তিকর সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তানের দিকে বেশি নজর দেওয়া হয়।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের জন্মলাভে ভারত সহায়তা করেছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রাক্কালে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন পাকিস্তানের পক্ষে ছিল। তারা পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতাদের (শেখ মুজিবুর রহমান তাদের প্রতীকস্বরূপ) সহযোগিতা দেওয়ার ব্যাপারে ভারতের অবস্থানের বিরোধিতা করেছে। তার পরও মস্কোর অনানুষ্ঠানিক অথচ একান্ত ও দৃঢ় সমর্থনে ভারত বিস্ময়কর সামরিক বিজয় অর্জন করে। ঢাকা স্বাধীন হয় এবং মুজিবুর রহমান ক্ষমতাসীন হন।

ধারণা করা যেতে পারে, ১৯৭১ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনীর নিষ্কণ্টক বিজয় বেইজিংকে তার গণতান্ত্রিক প্রতিবেশীর ব্যাপারে কৌশলগত পুনর্বিবেচনার জন্য তাড়িত করে। আমার অভিমত, ভারতের ব্যাপারে চীনের কৌশলগত নিরাপত্তাবিষয়ক উদ্বেগের বীজ উপ্ত হয়েছে ওই সময়েই। একটি কমিউনিস্ট রাষ্ট্র। তারা অন্তরে এই বিশ্বাস ধারণ করে যে ক্ষমতা উৎসারিত হয় বন্দুকের নল থেকে। সেই রাষ্ট্রের কাছে সামরিকভাবে পরাজিত হয়ে পাকিস্তানের খণ্ডিত হওয়া এবং একটি নতুন জাতির (বাংলাদেশ) জন্ম হওয়ার বিষয়টি আরেকটি আঞ্চলিক অভ্যুত্থান বলে গণ্য হতে পারে না। তাদের বিবেচনায় এ বিষয়টিই আসে যে বিজয়ী শক্তিকে (ভারত) গণ্ডিতে আটকে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।

ওই ঘটনার (১৯৭১ সালের যুদ্ধ) সাপেক্ষে বেইজিংয়ের প্রতিক্রিয়া ছিল এ রকম—পাকিস্তানে বিনিয়োগ করতে হবে। পরবর্তী দশকগুলোতে চীন ও পাকিস্তানের মধ্যে গভীর অথচ অস্পষ্ট কৌশলগত ও নিরাপত্তাগত সম্পর্কের বিকাশ ঘটানো হয়েছে। এর ফলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদর দপ্তর রাওয়ালপিন্ডি বলবান হয়েছে। তারা জঙ্গিদের ব্যবহার করে ভারতের বিরুদ্ধে ছায়াযুদ্ধ চালাতে প্রবৃত্ত হয়েছে। ১৯৯০ সালে এ যুদ্ধের শুরু—এখন পর্যন্ত তা অব্যাহত আছে।

অতএব ভারতের জন্য বাধ্যতামূলক আঞ্চলিক কৌশলগত উদ্দেশ্য হতে হবে—বাংলাদেশ যেন আরেকটি পাকিস্তানে পরিণত না হয়; দিল্লির চেয়ে বেইজিংকে অগ্রাধিকার দিতে বাধ্য হয়ে দূরে সরে না যায় অথবা অভ্যন্তরে উগ্র ইসলামী আদর্শকে লালন-পালন না করে।

ঢাকা ও দিল্লি উভয়ের নেতৃত্বের কৃতিত্ব এটাই যে কিছু ভুল পদক্ষেপ ও দ্বিধার পরও বর্তমান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে সর্বকালের সেরা সম্পর্ক বলা হচ্ছে এবং অন্যান্য প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে উল্লিখিত হচ্ছে। বেইজিংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশেরও দৃঢ় বন্ধন রয়েছে। এই ত্রিকোণ সম্পর্ক অর্থাৎ বাংলাদেশ-ভারত-চীন সম্পর্ক যদি নিষ্ঠার সঙ্গে ও অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখা হয়, তাহলে বঙ্গোপসাগরীয় উপকূলে নিহিত ইতিবাচক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হতে পারে।

বাংলাদেশ শি চিনপিংয়ের নেতৃত্বাধীন বিআরআই (বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ) কর্মসূচির সক্রিয় সহযোগী। দিল্লি এখনো এতে নির্দ্বিধায় সম্মত হতে পারেনি, সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে স্বাক্ষর করেনি। নিরাপত্তা খাতে বাংলাদেশ চীনা সমরাস্ত্রেরও গ্রাহক; ওই সব সমরাস্ত্রের মধ্যে সাবমেরিনও রয়েছে।

ভারতকে বিবর্তনশীল আঞ্চলিক কৌশলগত বিষয়াদি ভালো করে খতিয়ে দেখতে হবে, বুঝতে হবে। সেই বোঝাপড়ার অংশ হিসেবে এ বাস্তবতা মেনে নিতে হবে। চীনের অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক ও আর্থিক প্রভাবে এ বাস্তবতার সৃষ্টি হয়েছে। অতএব ভারতকে ঢাকার সঙ্গে তার বন্ধনকে এমনভাবে বিন্যস্ত করতে হবে, যাতে তিন পক্ষের জন্যই লাভজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। সামুদ্রিক এলাকায়, বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরে ঢাকাকে নিয়ামক পক্ষ গণ্য করে ভারতকে পদক্ষেপ নিতে হবে। এ পদক্ষেপে তার দূরদৃষ্টির পরিচয় থাকতে হবে।

লেখক : নয়াদিল্লির সোসাইটি ফর পলিসি স্টাডিজের পরিচালক

সূত্র : দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অনলাইন

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা