kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

সৌদিদের উচিত শিক্ষা দিয়েছে হুতি বাহিনী

ফেদেরিকো পিয়েরাচ্চিনি

৩ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সৌদিদের উচিত শিক্ষা দিয়েছে হুতি বাহিনী

অনেকেই হয়তো মনে করতেন, হুতি বাহিনী একটা অগোছালো বাহিনী, যার সুদক্ষ সমরাস্ত্রের অভাব রয়েছে। সৌদি তেলক্ষেত্রে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর অনেকে হয়তো বলেছেন, এটা একটা ফলস-ফ্ল্যাগ অপারেশন, সৌদিরাই করেছে, অথবা ওই হামলা চালিয়েছে ইরান; ইসরায়েলও করে থাকতে পারে। শনিবার (২৮ সেপ্টেম্বর) হুতিরা এসব আন্দাজপ্রসূত কথাবার্তার জবাব দিয়েছে। তারা যা নিশ্চিত করেছে, তা হলো তাদের অপ্রথাগত কৌশল ও ইয়েমেনি সেনাবাহিনীর প্রথাগত সক্ষমতা মিলে মোহাম্মদ বিন সালমানের সৌদি রাজ্যকে হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করতে পারে।

ইয়েমেনি সেনাবাহিনীর মিসাইল ফোর্স খুবই সূক্ষ্ম ও সমন্বিত হামলা চালাতে সক্ষম। এ কাজে তাদের গোয়েন্দা সহায়তা জোগায় সৌদি শিয়ারা, যারা সৌদ বংশের স্বৈরশাসনের বিরোধী। সৌদি আরবের এই হুতি-অনুরাগীরা লক্ষ্য স্থিরকরণে সহায়তা করেছে। ইয়েমেনি বাহিনী ভয়ানক হামলায় সৌদি আরবের তেল উত্পাদনক্ষমতা অর্ধেকে নামিয়ে দিয়েছে। ইয়েমেনে গণহত্যা বন্ধ করা না হলে সৌদি আরবের অন্যান্য লক্ষ্যবস্তুতে হামলার হুমকি দিয়েছে তারা।

হুতি বাহিনী ও ইয়েমেনি সেনাবাহিনী অবিশ্বাস্য এক প্রথাগত হামলা চালিয়েছে। ইয়েমেনি সীমান্ত থেকে সৌদি আরবের  ভেতরে ওই অভিযান তিন দিন আগে শুরু হয়। আরামকোর তেলক্ষেত্রে হামলার চেয়ে এ অভিযান অনেক বেশি জটিল। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, সৌদি কোয়ালিশন বাহিনীকে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে যেতে প্ররোচিত করা হয়েছিল; অতঃপর ঝটিকা আক্রমণ চালানো হয়েছিল সৌদি ভূখণ্ডেই। হুতিরা নাজরান শহর ও আশপাশের এলাকা ঘিরে ফেলেছিল। ভালো ফলই পেয়েছে তারা, হাজার হাজার সৈন্য ও কয়েক ডজন কমান্ডারসহ তিনটি সৌদি ব্রিগেড আটক করে তারা; প্রচুর যুদ্ধযানও দখল করেছে। এটি একটি মোড় পরিবর্তক অভিযান—যুক্তরাষ্ট্র, মাইক পম্পেও, ইসরায়েল ও সৌদিদের কোনো উপায়ই নেই এর দায় ইরানের ওপর চাপানোর। কারণ ইরান অনেক অনেক দূরে।

অভিযানের আগে ইয়েমেনি আর্টিলারি হামলায় জিজান বিমানবন্দর নিশ্চল হয়ে পড়েছিল। ফলে সেখান থেকে ঘিরে ফেলা সৌদি বাহিনীকে সহায়তার জন্য যুদ্ধবিমান পাঠানো সম্ভব হয়নি। হুতিরা রিয়াদে কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও বড় হামলা চালিয়েছিল অ্যাপাচি হেলিকপ্টার লক্ষ করে; সেগুলো অন্যত্র সরে যেতে বাধ্য হয়। নিকটবর্তী সামরিক ঘাঁটিগুলোতেও হামলা চালানো হয়েছিল, যাতে সহায়ক বাহিনী পাঠানো সম্ভব না হয় এবং সেখানকার সামরিক চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ে। নাজরানের কাছের এক উপত্যকায় সৌদি বাহিনীর কী দশা হয়েছিল, তা হতাহতের সংখ্যা এবং যুদ্ধবন্দির সংখ্যা দেখে বোঝা যায়। এ অভিযান অবশ্যই ব্যতিক্রমী; সৌদি বাহিনী, যারা বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম সমরাস্ত্র ক্রেতা, নাকানিচুবানি খেয়েছে বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র একটি দেশের হাতে। বোঝা যায়, হুতিরা সীমান্ত থেকে সৌদি আরবের ভেতরে সাড়ে ৩০০ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকায় অভিযান চালাতে সক্ষম।

সৌদি বাহিনী যাতে আটকেপড়া সহযোদ্ধাদের সহায়তায় এগিয়ে আসতে না পারে সে জন্য হুতিরা ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান প্রতিরোধী ব্যবস্থা এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম মোতায়েন করে। হুতি ও ইয়েমেনি বাহিনী মার্কিন প্রতিরক্ষা সরঞ্জামাদি ও সৌদি বাহিনীর মর্যাদা প্রায় গুঁড়িয়ে দিয়েছে। তারা আগে সৌদি বাহিনীর দুর্বলতা ভালো করে জেনে নিয়েছে তাদের সহযোগীদের মাধ্যমে। সৌদি ভূমিতে তাদের গোয়েন্দা-অভিগম্যতা কত, তা স্পষ্ট। তারা মার্কিন প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষাব্যবস্থার রাডার অকেজো রাখার জন্য নানা ধরনের ড্রোন ও ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা এবং সাইবার সিস্টেম ব্যবহারে সক্ষমতার পরিচয়ও দিয়েছে।

রিয়াদকে বার্তা দেওয়া হয়েছিল, তারা সৌদি আরবের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে আনতে পারে; সৌদ বংশকেই গদিচ্যুত করতে পারে। তেলক্ষেত্রে হামলার পর ইয়েমেনি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র বলেছিলেন, সৌদি আরব হামলা বন্ধ করে আলোচনায় রাজি হলে তারা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বন্ধ করবে। না হলে সৌদিদের এভাবেই সমাদৃত করা হবে। মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিনদের কাছ থেকে প্রচুর আশ্বাস পেয়েছিলেন নিঃসন্দেহে। তাই তারা হুতিদের সঙ্গে সমঝোতার কথা ভাবেনি। ফল যা হওয়ার তা হয়েছে, সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শরমে মরে যাওয়ার অবস্থা হয়েছে।

সাম্প্রতিক ড্রোন হামলা ও সামরিক অভিযানের পর বিন সালমান ও মার্কিন মিত্রদের অবশ্যই বাস্তবতার দিকে নজর দিতে হবে। তিনটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে, এক. সৌদি আরবের ভেতরেই হুতিদের প্রচুর সমর্থক, অনুরাগী রয়েছে; ইয়েমেন বা ইরানের সঙ্গে সর্বাত্মক যুদ্ধে তারা সক্রিয় হবে; দুই. সৌদি তেলক্ষেত্রগুলো স্তব্ধ করে দেওয়ার সামর্থ্য তাদের রয়েছে এবং তিন. ইয়েমেনের প্রথাগত বাহিনীর নিজেদের অনুকূলে সৌদি-ইয়েমেনি সীমান্তরেখা বদলে ফেলার সক্ষমতা রয়েছে। সৌদি আরব দরিদ্র ইয়েমেনির হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে অক্ষম। হুতিরা বিশ্বকে দেখাচ্ছে, দরিদ্র হলেও সুসংগঠিত ও অনুপ্রাণিত কোনো বাহিনী উত্তম সমরাস্ত্রে সজ্জিত বাহিনীকে হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করতে পারে। বিন সালমান ও তার পরিবার যদি সৌদি আরবকে রক্ষা করতে চায়, তাহলে হুতিদের সঙ্গে দ্রুত আলোচনা শুরু করা উচিত।

 

লেখক : আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, সংঘাত ও রাজনীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ

সূত্র : স্ট্র্যাটেজিক কালচার জার্নাল অনলাইন

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা