kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

সময়ের প্রতিধ্বনি

ক্যাসিনো সংস্কৃতি, ঘুষ-দুর্নীতি এবং ঘুণেধরা রাজনীতি

মোস্তফা কামাল

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



ক্যাসিনো সংস্কৃতি, ঘুষ-দুর্নীতি এবং ঘুণেধরা রাজনীতি

রাজনীতির মাঠে হঠাৎ করেই একটা ভূমিকম্প হয়ে গেল। প্রচণ্ড এক ঝাঁকুনি খেলেন রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা। অন্যরাও যেন একটু নড়েচড়ে বসলেন। কেউ কেউ বিস্ময়ের সঙ্গে বললেন, এবার বুঝি তিনি (প্রধানমন্ত্রী) লাগামটা টেনে ধরবেন। কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না!

প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে ১৪ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে ভিন্নরূপে আবির্ভূত হলেন শেখ হাসিনা। সেদিন তাঁকে নতুনভাবে চিনলেন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। তাঁরা ভাবতেও পারেননি, এ রকম কঠিন এক সিদ্ধান্ত নেবেন তিনি। ছাত্রলীগের ইতিহাসে এমন ঘটনা কোনোকালেও ঘটেনি। দুর্নীতি-চাঁদাবাজির অভিযোগে সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে অপসারণ করে বুঝিয়ে দিলেন, অন্যায়-অনিয়ম করলে কেউ পার পাবে না।

ওই বৈঠকের পরদিনই শ্রমিক লীগের এক নেতা ছুটে এলেন কালের কণ্ঠ অফিসে। মলিন মুখ। মুখাবয়বে ভয়ের ছাপ। কিভাবে শুরু করবেন বুঝতে পারছেন না। আমি নিজেই উদ্যোগী হয়ে জানতে চাইলাম, কী বলবেন বলেন না! নিঃসংকোচে বলেন। কোনো অসুবিধা নেই।

শ্রমিক লীগের নেতা শুকনো গলায় বললেন—‘জি, মানে আপনার একজন রিপোর্টার আমার বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন। আমি কিভাবে এত টাকার মালিক হইলাম; আমার ব্যবসাপাতি কী আছে? কোথায় কী করেছি? আমার ছোট ভাইরে বলছেন, আমি নাকি ফ্রিডম পার্টি করতাম। ভাই! হঠাৎ আমার পেছনে কেন লাগল? আমি তো কোনো ক্ষতি করি নাই!’

আপনার বিরুদ্ধে কি কোনো রিপোর্ট হয়েছে?

না, ভাই! খোঁজখবর নিতেছেন। রিপোর্ট করবেন বলেই তো খোঁজ নিতে গেছেন! তা না হইলে কেন খোঁজ নিব?

আপনি যদি অবৈধভাবে টাকা-পয়সা না করে থাকেন, তাহলে আপনার ভয় কিসের?

মান-ইজ্জতের ভয় পাই। আমার পেছনে লোক লাগছে ভাই! তারাই রিপোর্টার লাগাইয়া দিছে!

শোনেন ভাই, আপনি কোনো চিন্তা করবেন না। সত্য না হলে আপনার বিরুদ্ধে এক অক্ষরও লেখা হবে না।

তার পরও ভাই একটু খেয়াল রাইখেন। প্রধানমন্ত্রী গতকাল যে হুংকার দিছেন! আমার বিরুদ্ধে পত্রিকায় রিপোর্ট হইলে আর রক্ষা নাই। সামনে ভাই সম্মেলন আছে। ওই সম্মেলনে আমি আরেকটু ভালো পদে যাইতে পারুম, আপনাগো দোয়ায়। রিপোর্ট হইলে আমার বড় ক্ষতি হইয়া যাইব, ভাই!

শ্রমিক লীগ নেতা চলে যাওয়ার পর অনেকক্ষণ ধরে বিষয়টি নিয়ে ভাবলাম। মনে মনে ভাবি, এখনো শেষ ভরসা শেখ হাসিনা। তিনিই পারবেন বেপরোয়া স্বভাবের মানুষগুলোকে সোজা করতে, দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে; অন্যায়-অনিয়ম রুখতে। তিনি ব্যর্থ হলে পুরো বাংলাদেশ ব্যর্থ হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এক বক্তব্যে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়েছে! দলের ব্যাপারে এ রকম আরো কয়েকটা কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারলে সারা দেশের নেতাকর্মীরা বেতের মতো সোজা হয়ে যাবেন। এরই মধ্যে যুবলীগের অনেক নেতা অস্বস্তিতে পড়েছেন। কেউ কেউ গ্রেপ্তার আতঙ্কে ভুগছেন। কেউ কেউ গাঢাকা দিয়েছেন বলেও শোনা যায়।

অনেকে বলছেন, এই আতঙ্ক সাময়িক। কয়েক দিনের মধ্যেই আবার তারা পুরনো চেহারায় ফিরে যাবে। প্রধানমন্ত্রী আরো কিছু নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারলে এবং এই প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখলে হয়তো অন্যায়-অপকর্ম কিছুটা কমবে। তবে পুরোপুরি সফল হতে হলে পুলিশ এবং সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়াতে হবে। অন্যায় করলে কেউ পার পাবে না—সেই বার্তা দিতে হবে।

টানা তৃতীয় মেয়াদে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হওয়ার পর দেশের অভ্যন্তরে যে পরিবর্তন আমরা লক্ষ করছি তা হচ্ছে, পুলিশের আচরণগত। তারা মনে করছে, তারাই এই সরকারকে ক্ষমতায় এনেছে এবং টিকিয়ে রাখছে। কাজেই তাদের ওপরে আর কে আছে? যদিও বারবার প্রধানমন্ত্রী বলে আসছেন, পুলিশ যেন জনগণের বন্ধু হয়। কিন্তু বাস্তবে এর উল্টোটা দেখা যায়। পুলিশের সামনে পড়াই যেন বড় বিপদের মুখোমুখি হওয়া। এটা কেন? কেউ বিপদে পড়লে প্রথমেই তো পুলিশের কাছে সহযোগিতা চাওয়ার কথা! অথচ আমাদের দেশের মানুষ পারতপক্ষে পুলিশমুখো হয় না।

দেশের বেশির ভাগ মানুষের ধারণা, পুলিশ যদি সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে, তাহলে দেশের ৮০ শতাংশ অপরাধ কমে যাবে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে দুর্বৃত্তায়ন কিংবা বেশির ভাগ অপরাধ-অপকর্মের সঙ্গে পুলিশই জড়িত। এই জায়গাটায় সরকারের অনেক কাজ করার আছে। নৈতিকতার শিক্ষা সবচেয়ে আগে দরকার পুলিশ বিভাগের।

আগে বলা হতো, পুলিশ বিভাগে বেতন কম, তাই বাধ্য হয়ে তারা অন্যায়-অপকর্মের পথ বেছে নেয়। এখন তো তাদের বেতন-ভাতাদি অনেক বেড়েছে। কিন্তু ঘুষ কি বন্ধ হয়েছে? বরং আরো বেড়েছে। সততা না থাকলে বেতন যতই বাড়ানো হোক, ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ হবে না। ভুক্তভোগীদের অনেকে বলেছেন, বেতন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুষের রেটও বেড়েছে। সরকারি পর্যায়ে যেকোনো কাজের জন্য ঘুষ লাগে। ঘুষ ছাড়া কেউ কথাও বলে না।

প্রসঙ্গক্রমে আমি অস্ট্রেলিয়ার একটি উদাহরণ দিতে চাই। সেখানে দেখেছি, পুলিশ বিভাগে যাঁরা নিয়োগ পান, তাঁরা সবাই অফিসার এবং উচ্চশিক্ষিত। পুলিশে ঢোকার পরপরই তাঁদের উচ্চতর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় দেশে ও দেশের বাইরে। প্রশিক্ষণের একটা বড় অংশ জুড়ে থাকে সততা ও নীতি-নৈতিকতা। মানবাধিকারের বিষয়টির ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়। তারপর শেখানো হয় তাঁদের আচার-ব্যবহার।

সেখানে কোনো আসামি দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত সর্বোচ্চ ভালো ব্যবহার করা হয়। হয়তো কেউ কোনো অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছে। তাকে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করবে। তবে অভিযুক্ত ব্যক্তির মানবাধিকার সম্পূর্ণভাবে অক্ষুণ্ন রাখতে পুলিশ তৎপর থাকে। আমাদের দেশে দোষী হোক আর না হোক—পুলিশ কাউকে কোনো অভিযোগে গ্রেপ্তার করেছে তো সে মরেছে। ‘পুলিশের ডলা’ সে তো চিরায়ত ব্যাপার। এই জায়গা থেকে পুলিশকে বের করতে না পারলে রাজনীতির ক্ষেত্রেও দুর্বৃত্তায়ন বন্ধ হবে না।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে বহিষ্কার করে যে বার্তা দিতে চেয়েছেন, সেটা কতটা কার্যকর হবে, তা সময়ই বলে দেবে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘সবার আমলনামা আমার হাতে। কাউকে ছাড়া হবে না।’ সেই আমলনামা ধরে এখনই প্রধানমন্ত্রীর অ্যাকশনে যাওয়া উচিত। তা না হলে অতি অল্পদিনের মধ্যেই আমরা দেখব, যেই লাউ সেই কদু।

শুধু রাজধানী নয়, জেলা-উপজেলায় ক্ষমতাসীন দল ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা কী করছেন, তা আমরা জানি। চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজি, দখলবাজি তো আছেই, নানা অপকর্মের সঙ্গেও জড়িত ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী মানেই সাত খুন মাফ। তাঁরা অপরাধ করলেও পুলিশ তাঁদের কিছু বলতে সাহস পায় না। তাঁদের অন্যায় কাজগুলো সাধারণ মানুষ নীরবে সহ্য করে। একই রীতি অতীতেও চালু ছিল। এ ধরনের প্রবণতা আইনের শাসনের অন্তরায়।

ঢাকা শহরের কাকরাইল-ফকিরাপুলসহ বিভিন্ন এলাকায় কারা জুয়ার আসর বসায়, কারা ক্যাসিনো চালায়, তা সবাই জানে। এখন শোনা যাচ্ছে, সারা দেশেই ক্যাসিনো সংস্কৃতি চালু রয়েছে। কারা এটা এখানে নিয়ে এলো? প্রতি রাতে সেখান থেকে কোটি টাকা আয় হয়। পুলিশও সেই টাকার ভাগ পায়। সংগত কারণেই কেউ টুঁ শব্দটি করে না। তবে ১৮ সেপ্টেম্বর ফকিরাপুলের ক্যাসিনোগুলোতে র‌্যাব অভিযান চালিয়ে যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে গ্রেপ্তার করেছে। মদ, অস্ত্র, ইয়াবাসহ আরো ১৮২ জনকে আটক করেছে। সারা দেশেই অভিযান চালানো দরকার।

দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ভয়ংকর অভিযোগ আসছে আমাদের কাছে। অভিযোগে বলা হয়, উঁচু বিল্ডিং, সেতু, কালভার্ট কিংবা যেকোনো প্রকল্পের কাজ শুরু হলেই ক্ষমতাসীন দলের বা অঙ্গসংগঠনের কোনো না কোনো নেতাকে চাঁদা দিতে হয়। অন্যথায় কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। সারা দেশেই নাকি এই চিত্র।

আরো অভিযোগ আছে, ছাত্রলীগকে চাঁদা না দিলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উন্নয়নকাজ হতে পারে না। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে চাঁদাবাজির ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে বহিষ্কার করা হয়েছে। তারা ৫-৬ শতাংশ চাঁদা দাবি করেছিল জাবি ভিসি অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের কাছে। তিনি নাকি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগকে একটা বড় অঙ্কের টাকা চাঁদা দিয়েছেন। সে খবর জানতে পেরে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকও ভিসির কাছে চাঁদা দাবি করেন। সে বিষয়ে পত্রিকায় লেখালেখি হচ্ছে। ভিসির বাসায়ই ভাগ-বাটোয়ারার বৈঠকের খবর আমরা পত্রিকায় দেখেছি। ভিসির স্বামী ও সন্তান এর সঙ্গে জড়িত বলেও খবর বেরিয়েছে। কিন্তু ভিসি তা পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন। অস্বীকার করলেই কি দায় এড়াতে পারবেন তিনি? কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বেরিয়ে আসবে না তো!

লেখক : সাহিত্যিক ও সাংবাদিক

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা