kalerkantho

মঙ্গলবার । ১২ নভেম্বর ২০১৯। ২৭ কার্তিক ১৪২৬। ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

দিল্লির চিঠি

বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ভারতীয় গণতন্ত্র

জয়ন্ত ঘোষাল

৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ভারতীয় গণতন্ত্র

ভারতে গণতন্ত্রের চরিত্র কি দ্রুত বদলাচ্ছে? ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম। সে স্বাধীনতায় দেশ ভাগের যন্ত্রণা ছিল। তবু আমরা ব্রিটিশ শাসকদের বিতাড়িত করে স্বাধীন সার্বভৌম এক রাষ্ট্র গঠন করেছিলাম। ভারত তার নিজের সংবিধান রচনা করল। তারপর ৭০ বছর ধরে গণতন্ত্রের এক দীর্ঘ পথচলা। প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ভারতীয় সংবিধানের সংশোধন করে ভারতকে সমাজতান্ত্রিক এবং ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ঘোষণা করেন। সেই সংবিধানের অভিমুখে কোনো নাটকীয় পরিবর্তন হয়নি। কিন্তু ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতাসীন হওয়ার পর এই ছয় বছরে ভারতীয় গণতন্ত্রের চরিত্রে এক প্রকৃতিগত রূপান্তর চোখে পড়ছে। এত দিন গণতন্ত্র মানেই আমরা জানতাম উদারবাদ। সেই অ্যাডাম স্মিথের লেসি ফেয়ার অর্থনীতি অর্থাত্ অবাধ বাণিজ্যনীতির সঙ্গে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ বিকশিত হয় পশ্চিমি দুনিয়ায়। আমরা পুঁজিবাদের বিকাশের সঙ্গে এই উদার গণতন্ত্রকে বারবার সংযোগ স্থাপন করে এসেছি।

কিন্তু শুধু ভারত নয়, শুধু নরেন্দ্র মোদি বলে নয়, দুনিয়াজুড়েই গণতন্ত্রের ধারণায় এসেছে এক ব্যাপক পরিবর্তন। ২০১৭ সালে পিউ গ্লোবাল অ্যাটিচিউড সমীক্ষা হয়। এই সমীক্ষা থেকে জানা যাচ্ছে, শতকরা ৫৫ ভাগ ভারতীয় মনে করছে, ভারতের সমস্যা দূর করার জন্য প্রয়োজন একজন শক্তিশালী নেতা, যিনি নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নেবেন। সংসদ ও আদালত এই নেতাকে পদে পদে সিদ্ধান্ত নিতে বাধা দেবে না। আবার শতকরা ৫৩ ভাগ ভারতীয় মনে করে যে সামরিক শাসন দেশের জন্য ভালো। এমনটা কিছুদিন আগেও আমরা ভাবতে পারতাম না।

আসলে উদারবাদী গণতন্ত্রের পরীক্ষা-নিরীক্ষা দীর্ঘদিন ধরে হওয়ার পর দেখা যাচ্ছে, আজও ভারতীয় গণতন্ত্র খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে। এত বছর পরও ভারতে আর্থ-সামাজিক বৈষম্য বেড়েছে বৈ কমেনি। মানবাধিকার রক্ষা করতে গিয়ে সন্ত্রাস বেড়েছে দেশের নানা প্রান্তে। কাশ্মীর থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চল—সর্বত্র নাশকতামূলক কাজকর্ম বাড়ছে বৈ কমছে না। এ অবস্থায় নরেন্দ্র মোদি কাশ্মীরের ৩৭০ ধারা অবলুপ্ত করার মতো এক জবরদস্ত সিদ্ধান্ত নিলেন। দেশজুড়ে এর প্রতিবাদ কোথায়? বিরোধী দলগুলো এখনো কেন এ ব্যাপারে সোচ্চার হতে পারল না? সমীক্ষা বলছে, বেশির ভাগ ভারতীয় দেশের নানা প্রান্তে বসবাসকারী মনে করছে, কাশ্মীরে নাগরিক অধিকার সাময়িকভাবে ‘সাসপেন্ড’ করে দেওয়াটা কাশ্মীর সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য জরুরি। ভারতের কাশ্মীর সীমান্ত তথা উত্তর সীমান্তকে নিরাপদ ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা রক্ষা করার জন্য এই সিদ্ধান্ত বিশেষভাবে জরুরি। এই যে মোবাইল ফোনের সংযোগ কিছু দিনের জন্য বন্ধ করে রাখা হলো, তা নিরাপত্তার জন্য স্মল প্রাইস। গোটা দেশের মানুষ এই মূল্যটুকু দিতে প্রস্তুত।

আসলে গণতন্ত্র ক্রমে পরোক্ষ থেকে প্রত্যক্ষ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া। মানুষ মনে করছে, নানা নাগরিক, জাতীয় ও স্থানীয় বিষয়ে তারা সরাসরি সিদ্ধান্ত নেবে, একেই বলা যায় প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের প্রবণতা। আসলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যে রকম রাষ্ট্রপতি শাসনের মডেল, পৃথিবীর আরো বেশ কিছু দেশে আছে, ভারত কি ধীরে ধীরে নিঃশব্দে সে রকম এক ব্যক্তিনির্ভর প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের পথে হাঁটছে?

আসলে গণতন্ত্র যখন ভিড়ের শাসনে পরিণত হয়, মানে যাকে বলা হয় মবোক্রেসি, তখন মানুষ সেই গণতন্ত্রের মডেল সম্পর্কে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। দেখা যায় গণতন্ত্রের নামাবলিতে আসলে রাজ্যে তৈরি হচ্ছে দলতন্ত্র। আবার দলতন্ত্র নামে শাসকদলের এক অভিজাততন্ত্র। কোনো একটা সিদ্ধান্ত নিতে গেলেই সংসদে বিরোধীরা তার বিরোধিতা করে ভোটের রাজনীতির ফায়দা নিতে চায়। তাই রিটেল ব্যবসায় কংগ্রেস যখন বিলগ্নীকরণ করে, কংগ্রেস শাসকদল হিসেবে যখন জিএসটির কথা বলেছিল তখন বিজেপি তার বিরোধিতা করে। আবার বিজেপি শাসকদল ক্ষমতাসীন হয়ে জিএসটি থেকে রিটেল ব্যবসার বিলগ্নীকরণ করার উদ্যোগ নেয়। যেমন—জমি অধিগ্রহণ বিল। সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে।

পৃথিবীজুড়েই অবশ্য গণতন্ত্রের ভবিষ্যত্ নিয়ে আলাপ-আলোচনা চলছে। ডেভিড রাঞ্চমানের (David Ranchman) ‘How democracy ends’ নামক বইটি অধুনা খুব জনপ্রিয় হয়েছে। এই বইয়ে তিনি অবশ্য উদারবাদী সাবেকি গণতন্ত্রের পক্ষেই সওয়াল করেছেন। তাঁর শঙ্কা, দুনিয়াজুড়ে আব্রাহাম লিংকনের সেই গণতন্ত্র আজ ধুলায় লুণ্ঠিত। কিন্তু একটা জিনিস তিনি দেখেছেন, আসলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে যে অগণতান্ত্রিক মৌরসি পাট্টা প্রতিষ্ঠা হয়, সেটাই আসলে আজকের গণতন্ত্রের ক্ষয়ের কারণ। তাই সামরিক শাসনের উত্থান ভারতের গণতন্ত্রের অবক্ষয়ের কারণ তা নয়। ভারতের গণতন্ত্রের ব্যবস্থার ভেতর থেকেই এই গণতন্ত্রের অবক্ষয় শুরু হয়েছে। পিউর জরিপ থেকেই এ ধারণা আরো স্পষ্ট হয়েছে।

মানবাধিকার রক্ষার নামে সমাজবিরোধী আর সন্ত্রাসবাদীদের জীবন সুরক্ষিত হবে—এটা ভারতবাসীর অনেকেই চাইছে না। তাই কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা অবলুপ্তির পর হুরিয়ত নেতা শুধু নন, মেহবুবা মুফতি বা আবদুল্লাহ পরিবারের সদস্যদের গৃহবন্দি করে রাখার পরও দেশে বিরোধীদের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া কোথায়? ৩৫ হাজার সেনা আধাসামরিক বাহিনী উপত্যকায় পাঠানো হয়েছে। এখনো পর্যন্ত কোনো আইন-শৃঙ্খলার অবনতির ঘটনাও হয়নি। সে রকম উল্লেখযোগ্য দেশের সর্বোচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে প্রতিপক্ষ; কিন্তু সুপ্রিম কোর্টও সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেননি, কিছু সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন মাত্র।

আসলে প্রাচীন গ্রিক দর্শনেও গণতন্ত্র সম্পর্কে বলা হয়েছিল, নাগরিক সাংবিধানিক আইনের মাধ্যমে তার চাহিদার রাজনৈতিক সমাধান ঘটাবে। আমরা গণতন্ত্র বলতে সব সময় বুঝেছি যে সেটা হবে non-autocratic সরকার, অর্থাত্ সে সরকার স্বৈরতন্ত্রী হবে না।

demos কথাটার অর্থই তো ছিল জনগণ। তাই মানুষ একটা  public authority তৈরি করবে, এটাই তো ছিল গণতন্ত্রের লক্ষ্য। কিন্তু দেখা গেল গণতন্ত্রের নামে শাসকদলের অত্যাচারই সহজ-স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে গেছে।

Non-tyranny নয়, tyranny এসেছে গণতন্ত্রের ছদ্মবেশে। আর সে কারণেই নাগরিক তার স্বার্থ পূরণের জন্য চাইছে একজন প্রত্যক্ষ শক্তিশালী রাষ্ট্রনায়ককে। এই লোকটার ওপর মানুষ আস্থা রাখছে। আজিজ প্রেমজি লোকনীতি ২০১৮ সালের সমীক্ষা বলছে, শতকরা ৭৭ জন ব্যক্তি তাদের সমীক্ষায় বলছে, ভারতীয় এই মানুষরা সামরিক শক্তির ওপরও আস্থা রাখছে। শতকরা ৫৪ জন সুপ্রিম কোর্ট এবং শতকরা ৪০ জন হাইকোর্টের ওপর আস্থা রাখছে। আর এই কারণেই কাশ্মীর নিয়ে মোদির সিদ্ধান্ত যতই আকস্মিক হোক, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ তাঁকে মেনে নিয়েছে। অবশ্য কাশ্মীর উপত্যকায় বসবাসকারীদের মধ্যে কতজন মোদির ওপর আস্থা রাখছে, তা নিয়ে সন্দেহ তো আছেই। এই এত বছর ধরে কাশ্মীরিদের বিচ্ছিন্নতা দিল্লি নামক রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে। তাই তারা সবাই হঠাত্ মোদিভক্ত হয়ে উঠবেন, এমন নয়। তা ছাড়া যদি বিজেপি জম্মু বনাম কাশ্মীর অর্থাত্ হিন্দু-মুসলমান মেরুকরণের রাজনীতি করে ভোটের সময়, তখন শ্রীনগরে তার কী প্রতিক্রিয়া হবে, সেটা দেখার বিষয়। একমাত্র সমাধান হলো, কাশ্মীর উপত্যকায় যদি মোদি সরকার দ্রুত কাশ্মীরিদের জন্য চাকরির ব্যবস্থা করতে পারে। যদি সত্যি সত্যি সেখানে হোটেল ব্যবসা চালু হয়, যদি সত্যি সত্যি সেখানে পর্যটন ব্যবসা মাথা তুলে দাঁড়ায়, তবে নিশ্চয়ই মোদি কাশ্মীর উপত্যকায়ও মহানায়ক হয়ে উঠতে পারেন। মোদির গণতন্ত্রের এক নয়া আখ্যান দেখা যাবে।

অনেকে বলছেন, গোটা দুনিয়ায় এখন দক্ষিণপন্থী পপুলিস্ট নেতাদের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। আর্থ-সামাজিক সংকট, পারস্পরিক দ্বেষ-শত্রুতা বাড়ছে, আর সে সময়ে ট্রাম্প বা পুতিনের মতো নেতারা জনপ্রিয় হয়ে উঠছেন। একদা সোভিয়েত ইউনিয়নে স্টালিন জাতীয়তানির্ভর শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠন করেন। পরে স্টালিন বিরোধিতাকে আমরা বলেছিলাম ডিস্টালিনাইজেশন। এখন কিন্তু পুতিন যেটা করছেন সেটা একদিক থেকে

Re-stalinization, আবার শক্তিশালী রাষ্ট্র পুতিনের নেতৃত্বে। পুতিনও এখন Expansionist। অনেকে বলছেন, ইন্টারনেট আমাদের সাবেকি গণতন্ত্রকে আরো হত্যা করছে। কারণ ইন্টারনেট ছোট ছোট গোষ্ঠী তৈরি করে একজনের সঙ্গে অন্যের শত্রুতা বাড়াচ্ছে।

(The people versus tech-how the internet is killing democracy) লেখক জ্যামি বারলেটের এই বক্তব্য হয়তো আংশিকভাবে সত্য।

বামপন্থী উদারবাদীরা অবশ্য গণতন্ত্রের স্বরূপের এই রূপান্তরকে মানতে রাজি নন। তাদের বক্তব্য মোদি-ট্রাম্প বা পুতিনের এই নয়া গণতন্ত্র আসলে বাস্তব মাটির রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন। এ একধরনের মিডিয়ার সৃষ্ট অভ্যাস (appearance ), বাস্তব (reality) নয়। এই পরাবাস্তব রাজনীতি অস্থায়ী, স্থায়ী হতে পারে না।

গণতন্ত্র নিয়ে এ বিতর্ক হোক। কিন্তু মানতেই হবে ভারতীয় প্রবীণ গণতন্ত্র এই বুড়ো বয়সে বেশ বড় চ্যালেঞ্জের মুখে।

 

লেখক: নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠ’র বিশেষ প্রতিনিধি

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা