kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ নভেম্বর ২০১৯। ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

‘সিডও’ দিবস : বাংলাদেশ ও নারীর প্রতি সহিংসতা

ফওজিয়া মোসলেম

৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



‘সিডও’ দিবস : বাংলাদেশ ও নারীর প্রতি সহিংসতা

জাতিসংঘের উদ্যোগে প্রতিবছর ‘সিডও’ দিবস পালিত হয়। নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৭৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয়  Convention on the Elimination of All Forms of Discrimination against Women, সংক্ষেপে যা  CEDAW হিসেবে পরিচিত। বাংলায় এটিকে চিহ্নিত করা হয় ‘নারীর প্রতি সব বৈষম্য বিলোপ সনদ (সিডও)’। ১৯৭৯ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক সনদটি গৃহীত হলেও ১৯৮১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর থেকে তা কার্যকর করা শুরু হয়। সে কারণে ‘৩ সেপ্টেম্বর’ অর্থাৎ যে তারিখ থেকে এটি কার্যকর করা হয় সেই তারিখটিকে ‘সিডও’ দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

সিডওর তিনটি মৌলিক নীতি : ১. সমতার নীতি ২. বৈষম্যহীনতার নীতি ৩. শরিক রাষ্ট্রগুলোর দায়বদ্ধতার নীতির ওপর ভিত্তি করে রচিত সনদে রয়েছে ৩০টি ধারা। এক থেকে ১৬ পর্যন্ত ধারাগুলোতে ঘোষিত হয়েছে নারীর সমতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গৃহীত নীতিগুলো। ১৭ থেকে ২২ ধারায় বর্ণিত হয়েছে ‘সিডও’র কর্মপন্থা ও শরিক রাষ্ট্রগুলোর দায়বদ্ধতা পালনের পন্থাগুলো।

২৩ থেকে ৩০ ধারা ‘সিডও’ প্রশাসনসংক্রান্ত।

সিডও সনদের ১ থেকে ১৩ ধারা অর্থাৎ নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ঘোষিত সমতার নীতির ধারার ২ নম্বর ধারাটি অতি গুরুত্বপূর্ণ এবং এটিকে Heart of the Convention বলে চিহ্নিত করা হয়। ২ নম্বর ধারায় যে পাঁচটি উপধারা আছে, সেখানে বলা হয়েছে : রাষ্ট্রের সংবিধান ও আইনের মধ্যে নারীর প্রতি বৈষম্য দূরীকরণের নীতি ঘোষণা করতে হবে। আইন যথাযথ প্রয়োগের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়বদ্ধতা রাষ্ট্র কর্তৃক নিশ্চিত করতে হবে। যেসব আইন-বিধি-প্রথা নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক অবস্থান তৈরি করে তা দূরীকরণে উপযুক্ত আইন গ্রহণ ও বাস্তবায়নে পদক্ষেপ রাষ্ট্রকে গ্রহণ করতে হবে।

শতাব্দীব্যাপী নারী আন্দোলনের অভিযাত্রা ও বিংশ শতাব্দীর মানবাধিকার আন্দোলনের অনুকূল পরিবেশে জাতিসংঘ নারী আন্দোলনের অগ্রগতির নানা উদ্যোগের ফসল ‘সিডও সনদ’। এই সনদ প্রণয়ন বা কার্যকর করার লক্ষ্যে বিভিন্ন ওয়ার্কিং গ্রুপ নারী জাতির মর্যাদাবিষয়ক কমিশন ও সাধারণ পরিষদের মধ্যে পাঁচ বছর ধরে বিভিন্ন সময় আলোচনা ও পর্যালোচনার পর গৃহীত হয় ‘সিডও সনদ’। বিভিন্ন রাষ্ট্র সনদে স্বাক্ষর শুরু করে ১৯৮০ সালে। বাংলাদেশ এই দলিলে স্বাক্ষর করে ১৯৮৪ সালের ৬ নভেম্বর। এই স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ‘সিডও সনদ’ বাস্তবায়নের দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। যদিও বাংলাদেশ ‘সিডও সনদে’ স্বাক্ষর করার সময় চারটি ধারা সংরক্ষণ করে, অর্থাৎ এই চারটি ধারা বাস্তবায়নে সেই সময় অপারগতা প্রকাশ করে। নারী আন্দোলনের চাপের ফলে ১৯৯৬ সালে ১৫(ক), ১৬-১-এর (গ) ধারার সংরক্ষণ এখনো প্রত্যাহার করা হয়নি। ২ নম্বর ধারার কথা এর আগে বিস্তারিত বলা হয়েছে। ১৬-১(চ) ধারায় নারীর বৈষম্যের ক্ষেত্রে বিরাজমান পারিবারিক, বিবাহ ও নাগরিক অধিকারের নীতিগুলো উল্লেখ করা হয়েছে। সুতরাং নারীর মানবাধিকার অর্থাৎ সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সিডওর যে ধারাগুলো গুরুত্বপূর্ণ সেগুলো সংরক্ষণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার মূল প্রতিকূলতাকেই সংরক্ষণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৪৮ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর উদ্যাপন করার প্রস্তুতি নিচ্ছি। বাংলাদেশের জনগণের জীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। নারীশিক্ষার হার বেড়েছে। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ক্রীড়াঙ্গনে নারীর দৃপ্ত পদচারণ দেখা যাচ্ছে। প্রচলিত-অপ্রচলিত পেশায় নারী সাফল্যের চিহ্ন রাখছে। কিন্তু জনগণের জীবনের বিশেষ করে নারীর জীবনের নিরাপত্তা চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। প্রতিদিন নারীর প্রতি সহিংসতা, হত্যা, নিপীড়নের যে খবর পত্রিকায় আসে তা নারীর সব অর্জনকে ম্লান ও শূন্য করে দিচ্ছে।

নারীর প্রতি সহিংসতার একটি বড় কারণ নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি। বাংলাদেশের বর্তমান সমাজ নারীকে পুরুষের অধস্তন নয়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পণ্য হিসেবে বিবেচনা করে। নারী অধস্তন বলে পুরুষের শক্তির প্রমাণ দেওয়ার জন্য নারীর প্রতি সহিংস আচরণ করা হয়। এ ছাড়া আমরা দেখি যেকোনো জাতীয় অস্থিতিশীল পরিস্থিতি যেমন নির্বাচনোত্তর  পারিবারিক কলহ, জমিজমার দখলসহ নানা ঘটনায় নারীকে জিম্মি করে ধর্ষণসহ বিভিন্ন সহিংস আচরণ করা হয়।

‘সিডও’ সনদের ৫ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘পুরুষ ও নারীর মধ্যে কেউ উত্কৃষ্ট এই ধারণার ভিত্তিতে কিংবা পুরুষ নারীর চিরাচরিত ভূমিকার ভিত্তিতে যেসব কুসংস্কার, প্রথা ও অভ্যাস গড়ে উঠেছে সেগুলো দূর করার লক্ষ্যে পুরুষ ও নারীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আচরণের ধরন পরিবর্তন করতে হবে।’ আমরা জানি, এই পরিবর্তন খুব সহজসাধ্য নয়। রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার ও ব্যক্তি সবাই মিলে এই পরিবর্তন সাধন করতে পারে। আমাদের দেশে শুধু নারী অধিকারকর্মীরা এ বিষয়ে সোচ্চার। নাগরিক সমাজের একটি অংশও এ বিষয়ে সমর্থন দিয়ে থাকে। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের লক্ষ্যে কোনো কর্মসূচি দেখা যায় না। উপরন্তু সাম্প্রতিককালে শিক্ষানীতিতে যে পরিবর্তন করা হচ্ছে তাতে নারীকে আরো অধস্তনে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। ‘সিডও’ সনদ স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র বাংলাদেশের এই উদাসীন অবস্থান কখনো গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনায় বিচার পাওয়া প্রায় অসম্ভব। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি বাংলাদেশকে অপরাধীদের স্বর্গরাজ্য করে তুলছে। যদিও ‘সিডও সনদে’র মাধ্যমে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ যে আইনের সব সুযোগ নারীকে দিতে হবে। বিচারহীনতার এই দেশে অন্য অনেক অধিকারের সঙ্গে বিচার লাভের সুযোগ থেকেও নারী বঞ্চিত।

সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত নুসরাত হত্যা বা বরগুনার রিফাত হত্যার ঘটনায় সমাজের একটি ভয়াবহ চিত্র আমাদের সামনে এসেছে। এসব ঘটনায় অর্থ, রাজনৈতিক ক্ষমতা, প্রশাসনিক ক্ষমতাসহ সব ক্ষমতার একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যারা নারী নির্যাতনসহ সব ধরনের অপরাধের সঙ্গে যুক্ত। এই সিন্ডিকেট শক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কে নেবে? রাষ্ট্র এটাকে এখনই দৃঢ়ভাবে দমন না করতে পারলে নারীর জীবন আরো বিপন্ন হবে। সিডও সনদে স্বাক্ষরকারী বাংলাদেশে এটা মেনে নেওয়া অপমানজনক।

‘সিডও সনদ’ প্রণয়নকালে যেসব রাষ্ট্র এই সনদের বিরোধিতা করে তাদের যুক্তি ছিল—‘সিডও সনদ’ একটি নারীবান্ধব, উদার, সংস্কারমুক্ত সমাজ নির্মাণের জন্য প্রণীত হয়েছে। যেসব রক্ষণশীল সমাজ বা দেশ তাদের পক্ষে এই সনদ অনুমোদন করা সম্ভব নয়; বাংলাদেশ এই দলের বাইরে অবস্থান করেছে। নারীবান্ধব, উদার, সংস্কারমুক্ত সমাজ বিনির্মাণের প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেছে। নারীর সম-অধিকার অর্থাৎ নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় সমাজকে উদার, সংস্কারমুক্ত ও নারীবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলার বিকল্প নেই। তার জন্য আইন প্রণয়ন, প্রয়োগসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সব কর্মকাণ্ডে নারীক্ষমতার যথার্থ প্রতিফলন থাকতে হবে, যা এখনো অনুপস্থিত।

আজকের বাংলাদেশে নারী আন্দোলনের পাশাপাশি সব সামাজিক শক্তির সম্মিলিত অংশগ্রহণ সময়ের দাবি। এই বাংলাদেশ এখন স্থায়ী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার  (SDG) লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। যার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ করণীয় বলে উল্লেখ করা হচ্ছে ‘কাউকে পিছে ফেলে নয়’

(Nobody left behind) সবাইকে নিয়ে উন্নয়নের সোপানে উঠতে হবে।

‘সিডও সনদ’কে পাশে ফেলে রেখে জাতীয় এই অর্জন কখনো সম্ভব নয়। সিডও সনদের সব ধারার সংরক্ষণ প্রত্যাহার করে এবং এর প্রয়োগের মাধ্যমেই গড়ে উঠতে পারে ‘সমতাপূর্ণ, মানবিক, অসাম্প্রদায়িক ও যুক্তিবাদী’ সমাজ। যে সমাজের স্বপ্ন আমরা মুক্তিযুদ্ধের সময় লালন করেছিলাম ও সংবিধানের ২৮ ধারায় যা পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা আছে। জাতি, ধর্ম, লিঙ্গের কারণে কোনো বৈষম্য সৃষ্টি সংবিধানের লঙ্ঘন। ‘সিডও’ দিবসে এ কথাটি আমাদের সবাইকে স্মরণ রাখতে হবে।

 লেখক : সহসভাপতি, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা