kalerkantho

ঈদের ছুটিতেও যাঁরা দিনরাত সেবা দান করেছেন তাঁদের জন্য শ্রদ্ধা ভালোবাসা

১৮ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১২ মিনিটে



ঈদের ছুটিতেও যাঁরা দিনরাত সেবা দান করেছেন তাঁদের জন্য শ্রদ্ধা ভালোবাসা

আমাদের, মানে বাঙালিদের, একটা লজ্জাজনক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হলো, আমরা ‘অনুগ্রহ করে’, ‘দয়া করে’, ‘ধন্যবাদ’ ইত্যাদি সৌজন্যসূচক শব্দ ব্যবহারে ভীষণ কৃপণ। খুব আনুষ্ঠানিক কিছু না হলে এসব শব্দের ব্যবহারকে আমরা বাহুল্য মনে করি। শিক্ষিত শ্রেণীর লোকেদের মধ্যে এহেন আচরণ ঈষৎ কম হলেও গরিব খেটে-খাওয়া মানুষ তাদের কথাবার্তায় এমন সৌজন্য, বিনয় বা ভদ্রতা প্রকাশ করতে যেন জানেনই না। অথচ দেশের শতকরা আশি ভাগ মানুষই হচ্ছে ওই শ্রেণীর। আপনি খুশি হয়ে যখন একজন রিকশাওয়ালা বা দিনমজুরকে তার পাওনা থেকে দশটা টাকা বেশি দেন—হোক না তা বকশিশ বা আপনার উদারতা—তখন তার চোখে-মুখে হয়ত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ পায়, কিন্তু তাকে মুখে কখনো ধন্যবাদ কথাটি বলতে শুনেছেন কি? আমি বাজি ধরে বলতে পারি, আপনি জীবনেও তার মুখে এ ধরনের শব্দ শোনেননি। এর কারণ মূলত দু’টি। এক, আমাদের সংস্কৃতিতে এ ব্যাপারে যে অপূর্ণতা রয়েছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। বিশেষ প্রয়োজনে বা স্বার্থ-সিদ্ধির জন্য ক্ষেত্রবিশেষে অবশ্যই আমরা যৎপরোনাস্তি ‘বিনয়ে বৈষ্ণব’ হয়ে উঠি। দৈনন্দিন জীবনযাপনে গুরুজনদের প্রতি শ্রদ্ধাভক্তি প্রকাশের গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্যও আমাদের আছে। কার্পণ্য ও ঔদাসীন্য শুধু মুখের ভাষার ব্যবহারে। অথচ দেখুন, এই উপমহাদেশের বাকি সব ভাষাভাষী মানুষ এ ব্যাপারে কত সচেতন। ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত-নির্বিশেষে তারা সবাই উঠতে-বসতে তাদের পারিবারিক পরিমণ্ডলে যেমন, তেমনি সামাজিক মিথস্ক্রিয়াতে নিজ নিজ ভাষায় ‘মেহেরবানি’, ‘শুকরিয়া’ ইত্যাদি শব্দ বেশুমার ব্যবহার করে থাকে। অন্য কারণটি অবশ্যই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাদীক্ষার অভাব। তবে তার চেয়ে আমাদের কথ্য ভাষার অপূর্ণতা ও লোকাচারই বোধ হয় বেশি দায়ী।

এ প্রসঙ্গে একটা মজার ব্যাপার হলো, আমরা যারা নিজেদের শিক্ষিত বলে দাবি করি, তারা আমাদের কথাবার্তায় ইংরেজি ‘প্লিজ’ বা ‘থ্যাংক ইউ’ যতবার উচ্চারণ করি, তার একশ ভাগের এক ভাগও বোধ হয় অনুগ্রহপূর্বক, অনুগ্রহ করে বা ধন্যবাদজাতীয় বাংলা শব্দ বলি না। ফলে ব্যবহার না হতে হতে ওইসব শব্দে রীতিমত মরচে পড়ে গেছে, ক্রমশ তারা হয়ে উঠছে অপরিচিত। হঠাৎ ঈদে-চান্দে বাক্স থেকে বের করে গায়ে চাপানো শেরওয়ানি-আচকানের মত।

দুই.

আজকের এই লেখাটির শুরুতে এতক্ষণ যে মোটামুটি দীর্ঘাকৃতি ভূমিকা জুড়ে দিয়েছি, সেই ভূমিকারও একটা ভূমিকা আছে। আমরা আমাদের রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, এমনকি পারিবারিক জীবনে নানা অসংগতি-বিসংগতি দেখলেই সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠি। আর বিষয়টি যদি হয় জনজীবনসংক্রান্ত কোন কিছু, তা হলে তো আর কথাই নেই। চায়ের দোকানের আড্ডা ও চায়ের কাপে ঝড় তোলা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দলসমূহের ‘আমরা এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানাই’ মার্কা আন্দোলন, পত্র-পত্রিকায় ‘স্তম্ভনির্মাণ’, এমনকি হাসপাতাল আক্রমণ ও চিকিৎসক নিগ্রহের মত ঘটনাও ঘটে। অথচ ওই একই চিকিৎসকের হাতে সেবা পেয়ে যে শত শত রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি যাচ্ছে, তা বেমালুম ভুলে যান আইন হাতে তুলে নেওয়া তথাকথিত অধিকার সচেতন নাগরিকেরা। পুলিশের কর্তব্যে অবহেলা কিংবা তাদের সামনে দিয়ে অপরাধীরা দিব্যি গায়ে ফুঁ দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে—এসব অভিযোগ শুনে সব সময়ই আমরা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠি। কিন্তু কোনো চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলায় বা একটা বড় রকমের দুর্নীতির কেসে লক্ষ লক্ষ টাকা উেকাচের প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে যখন কোনো জাঁহাবাজ রাঘব বোয়ালকে একজন সৎ পুলিশ অফিসার পাকড়াও করেন, তখন আমরা সেই অফিসারটি বা তাঁর বাহিনীর জন্য দু’টো ভালো কথা বলতে এক ধরনের ‘ভারবাল কনস্টিপেশন’-এ ভুগি। এটা ঠিক না। অথচ রাজনৈতিক অঙ্গনসহ অন্যান্য অঙ্গনে স্বার্থ হাসিলের জন্য তৈলমর্দনের নামে যা করি, তা এক প্রকার ‘ভারবাল ডায়রিয়া’।

তিন.

আজকে হঠাৎ করে প্রসঙ্গটির কেন অবতারণা করলাম এবার তা হলে কালোয়াতি বাদ দিয়ে খুলে বলি। ব্যাপার আর কিছু না, ব্যাপার এবারের ঈদুল আযহা, যা অনুষ্ঠিত হল গত ১২ আগস্ট, সোমবার। ঈদ তো সব সময়ই খুশির বার্তা নিয়ে আসে। ধনী-গরিব, ছোট-বড় সবাই থাকে এই দিনটির প্রতীক্ষায়। ধনীরা তো বটেই, এমনকি গরিবস্য গরিব যে রাস্তার ফকির-মিসকিন তারাও ওই দিন অন্য দিনের তুলনায় তাদের স্ট্যান্ডার্ডে রীতিমত ‘বড়লোক’ বনে যায়। ওই দিন দু’টাকার একটা ছেঁড়া-খোঁড়া ময়লা নোটের পরিবর্তে তার চলটে ওঠা ট্যাপ খাওয়া এলুমিনিয়ামের বর্তনে পাঁচ টাকা দশ টাকার কড়কড়ে নোটও পড়ে বেহেশত-প্রত্যাশী মুসল্লিদের হাত থেকে। আর কুরবানির গোশ্ত সংগ্রহ করে করে ছালাভর্তি গোশ্ত হোটেল-রেস্টুরেন্টে বিক্রি করে ফকির সাহেব সেদিন তো রীতিমত একদিনের বাদশা! তবে ঈদ সবচেয়ে বেশি খুশি বয়ে আনে ছোট ছোট শিশু-কিশোরদের জন্য। কত রকমের আনন্দ তাদের : নতুন জামা পরার আনন্দ, সেমাই-পায়েস খাওয়া, দল বেঁধে হৈচৈ করে ঘুরে বেড়ানো, মুরব্বিদের সালাম করে সেলামি আদায়ের আনন্দ, বড়লোকের সন্তানদের বাপ-মায়ের কাছ থেকে দামি ‘গিফট্’ পাওয়া, আরও কত কী।

কিন্তু এবারের কুরবানির ঈদ বাংলাদেশের জন্য যতটা না খুশি তার চাইতে বেশি কষ্ট, যন্ত্রণা ও দুঃখের বার্তা বয়ে নিয়ে এসেছে। দেশের এক-চতুর্থাংশ এলাকার মানুষ তাদের ঘরবাড়ি, গবাদি পশু, ক্ষেত-খামারসহ দীর্ঘদিন ধরে জলমগ্ন হয়ে আছে। তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। তাদের আশ্রয়স্থল হয়েছে এখন উঁচু বাঁধ, বৃক্ষতল অথবা রিলিফ ক্যাম্প।

আর মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মত এবার সারা দেশে মহামারির মত ছড়িয়ে পড়েছে ডেঙ্গু। এটা এমন একটা রোগ, যার নামটাও দেশবাসী এই সেদিন পর্যন্ত জানত না। মনে পড়ে, সেই ১৯৫২ সালে ক্লাস সেভেনে পড়তে আমাদের স্বাস্থ্য বইয়ের পাতায় ম্যালেরিয়া, টাইফয়েড, কলেরা, বসন্ত ইত্যাদি সুপরিচিত রোগ সম্বন্ধে বিস্তারিত আলোচনার পাশাপাশি কয়েকটি বিরল রোগের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দেওয়া ছিল। তাতে প্লেগ, ফাইলেরিয়া, বেরিবেরি প্রভৃতি রোগের সঙ্গে ডেঙ্গুর নামও ছিল। সেই প্রথম ও সেই শেষ। প্রায় অর্ধশতাব্দী পর এডিস বিবি তার চণ্ডমূর্তি নিয়ে এই দেশে আবির্ভূত হলেন নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে। হ্যাঁ, ডেঙ্গু রোগ বিস্তারকারী এডিস বিবিকে এখন আমরা সবাই চিনি। সেই যে স্ত্রীজাতীয় এক ভয়ঙ্করী উড়ুক্কু প্রাণী, তা আমরা প্রথমে চামড়ায় চামড়ায়, পরে হাড়ে হাড়ে এবং সব শেষে সর্বাঙ্গে বুঝতে পারি। ইতিমধ্যে গত এক মাসে প্রায় ৮০ হাজার আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা আক্রান্ত হয়েছেন এই মারাত্মক ব্যাধিতে। আর এর মধ্যে মারা গেছেন ৮০ জনেরও বেশি। হাসপাতালগুলোতে ন তিল ধারণম অবস্থা। ডাক্তার-নার্সরা এই ঈদ উৎসবের ছুটিতেও ‘সমাজ-সংসার মিছে সব’ মনে করে হাসপাতালেই পড়ে থাকছেন রাতদিন। যেন ‘কা তব কান্তা কস্তে পুত্র’ মন্ত্রে দীক্ষা নিয়েছেন তাঁরা। এঁদের ঈদ হাসপাতালেই। আর স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই চিকিৎসক হলে তো আর কথাই নেই। কুরবানির গরু-ছাগল ও সেই সঙ্গে সন্তানদের আল্লাহর হাওলায় রেখে তাঁরা নিজেরা কুরবানি হতে প্রস্তুত হাসপাতালের চার দেয়ালের ভেতর। আর এতে করেই প্রাণে বেঁচে যাচ্ছেন অগণিত রোগী। এই রোগীরা কেউ হয়ত সমাজের কেউকেটা কেউটে সাপ—একটু উনিশ-বিশ হলেই ফোঁস করে ছোবল দেবেন তিনি অথবা তাঁর অমুক নেতা, অমুক মামা-চাচা, আবার কেউ হয়ত সমাজের একেবারে নিচু তলার মানুষ, দু’টো প্যারাসিটামল কিনে খাওয়ারও পয়সা নেই যাঁর। তাতে কী? ডাক্তারের কাছে রোগীর একমাত্র পরিচয়, তিনি রোগী। অন্য সব পরিচয় গৌণ। তাঁর রোগ সারিয়ে তোলাই ডাক্তারের একমাত্র লক্ষ্য। ডাক্তারি জীবনের শুরুতে তাঁর পাঠ্যসূচীতে যে শপথের কথা তিনি পাঠ করেছিলেন সেই মহামতি গ্রীক দার্শনিক-চিকিৎসক, চিকিৎসাবিজ্ঞানের জনক হিপোক্রেটিসের অমর বাণীই তাঁর জীবনের একমাত্র পাথেয়। সেখানে কে শত্রু, কে মিত্র, কে ধনী, কে গরিব, কে স্বাচিপ, কে ড্যাব তা বিচারের প্রশ্নই আসে না। রোগী রোগীই। প্রত্যেক রোগীকে নিজের সাধ্যমত মেধা দিয়ে, শ্রম দিয়ে সারিয়ে তোলাই একজন ডাক্তারের লক্ষ্য। সেখানে কোনো গাফিলতি করা চলবে না। তবে হ্যাঁ, ‘টু আর ইজ হিউম্যান’, মানুষ মাত্রই ভুল হয়। চিকিৎসা দিতে গিয়ে হঠাৎ কখনো-সখনো এক-আধটা অনিচ্ছাকৃত ভুল, ইংরেজিতে যাকে বলে ‘বোনাফাইডি মিসটেক’, হতেই পারে। তার জন্য কখনোই তুলকালাম কাণ্ড বাঁধানো উচিত নয়।

যে কোনো কাজেই আপনি দেখবেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রচেষ্টাতে আন্তরিকতা আছে কি না। নাকি তিনি দায়সারাভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। চৌরাস্তায় ট্রাফিক জ্যাম সামলাতে যদি দেখেন, একজন কনস্টেবল বা সার্জেন্ট ছোটাছুটি-দৌড়াদৌড়ি করতে করতে গলদঘর্ম হচ্ছেন, তা হলে আপনি তাঁর প্রচেষ্টায় নিশ্চয়ই সন্তুষ্ট থাকবেন। কিন্তু তিনি যদি ডিউটি বাদ দিয়ে পাশের রেলিংয়ে ভর দিয়ে ত্রিভঙ্গ মুরারি হয়ে সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে মোবাইল ফোনে রসালাপে ব্যস্ত থাকেন, তা হলে অবশ্যই আপনি কুপিত হয়ে তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে নালিশ করতে পারেন। (জানি, পাঠক আপনি মুচকি হেসে বলছেন, ওসব নালিশ-সালিশে কোনো দিন কোনো কাজ হয় নাকি? মানলাম। তবু তো আর কিছু না পেয়ে পাষাণেই মাথা কুটতে হবে!)

তবে এটাও তো ঠিক, আপনি-আমি যখন কুরবানির গরু কিনতে গাবতলী-মহাখালীতে ছুটছি, তখন এই পুলিশ কর্মচারীরাই আমাদের যাতায়াত সুগম করতে, টাঙ্গাইল রোড-আরিচা ঘাট-যমুনা ব্রীজের যানজট ছুটাতে, চোর-বাটপাড়-ছিনতাইকারীদের হাত থেকে আমাদের সুরক্ষা দিতে, নিজের পরিবার-পরিজন বাদ দিয়ে, ঈদের খুশি ভুলে গিয়ে, রোদবৃষ্টি ঘাম তুচ্ছ করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিরলসভাবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। এঁদের তৎপরতা না থাকলে আমাদের অনেককেই হয়ত মহাসড়কে ঈদের নামায পড়তে হতো। আমরা শুধু কতিপয় অসাধু কর্মচারীর দায়িত্ব পালনে অবহেলা, দুর্নীতিই দেখব, তাঁদের সহকর্মীদের সুকৃতিগুলোর মূল্যায়ন করব না, এটা কেমন কথা। ফার্মগেইট বা বাংলামোটরের মোড়ে যখন একজন ট্রাফিক পুলিশকে কোনো বৃদ্ধ বা মহিলাকে রাস্তা পার করে দিতে দেখি, তখন এই দৃশ্যটিকে আমার কাছে স্বর্গীয় মনে হয়। হ্যাঁ, স্বর্গীয়। ওই পুলিশ কর্মচারীটি জানেন, এই কাজটি না করলে তাঁর বেতন বন্ধ হয়ে যাবে না, তাঁর ‘বস্’ তাঁকে গালমন্দ করবেন না, তবু তিনি তাঁর অন্তরের টানে, বিবেকের তাড়নায় কাজটি করেন। এটাই মনুষ্যত্ব। আমরা এটার মূল্যায়ন করি না, আমরা শুধু ছিদ্র খুঁজি তাঁর অপকর্মের।

ঢাকার মেয়র সাহেবরা তো ঘোষণা দিয়েছেন, এবার ঈদের পর চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই কুরবানির সব বর্জ্য পরিষ্কার করে সবগুলো এলাকাকে ঝকঝকে করে ফেলবেন। মাশাল্লাহ। তাঁদের মুখে ঈদের সেমাই-পায়েস-জর্দা পড়ুক। কিন্তু কাজটি করবে কারা? মেয়র সাহেবরা তো ঘোষণা দিয়েই খালাস। এই জঞ্জালের পাহাড় চব্বিশ ঘণ্টায় সাফ করতে তো সুলেমান নবীর জ্বীন বাহিনী লাগবে। মাননীয় সাঈদ খোকন বা মাননীয় আতিকুল ইসলাম সাহেব ঠিকই জানেন তাঁদেরও জ্বীন বাহিনী আছে, যারা প্রত্যেকটি এলাকায় কুরবানির পরপরই বেলচা-কোদাল-গাঁইতি-ঝুড়ি নিয়ে নেমে পড়বে কাজে। সুলেমান নবীর জ্বীনরা ঘুমাতে গেলেও এরা সারারাত এই ময়লা সাফ করার কাজ করবে পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় মহল্লায়, আমরা যখন টিভিতে বিনোদন অনুষ্ঠান অথবা লেট নাইট সিনেমা দেখতে ব্যস্ত তখন। পরদিন সকাল দশটা-এগারোটায় চোখ কচলাতে কচলাতে রাস্তায় বের হয়ে আমরা দেখব, বাহ্, রীতিমত সাফ-সুতরো হয়ে গেছে রাস্তাঘাট। নাকে লাগছে ব্লিচিং পাউডারের ঝাঁঝ। আর ওই পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা তখন হয়ত বাংলা সাবান দিয়ে নিজের শরীরের ময়লা সাফ করার ফুরসত পাচ্ছে। মাই হ্যাটস্ অফ টু দেম। মাই হ্যাটস অফ টু অল দোজ ডক্টরস অ্যান্ড পুলিশমেন হু স্যাকরিফাইসড দেয়ার লেজার ফর আওয়ার প্লেজার।

দেশের উন্নতি হচ্ছে দেখে আপনাদের মত আমিও আনন্দিত। তবে ভুলে যাবেন না, শুধু কথায় চিঁড়া ভিজে না (যদি ভিজত, তবে মৌলবীবাজার-ঠাটারিবাজারের আড়তের একটা চিঁড়াও শুকনো থাকত না!), চিঁড়া ভিজে আমার দেশের মেহনতি মানুষের রক্ত জল হয়ে বেরিয়ে আসা ঘামে। সে মানুষ কাজ করে ক্ষেতে-খামারে, কলকারখানায়, অফিস-আদালত-হাসপাতালে, রাস্তায় ট্রাফিক সামলাতে। যারা কাজ করে তাদের সবাইকে আমার ঈদের সালাম। সবাইকে জানাই ঈদ মুবারক।

চার.

মাত্র পাঁচ দিন আগে যে ঈদ গেল তার আমেজ বা হ্যাংওভার তো এখনো আমাদের সবার মধ্যেই আছে, যেমন আছে ফ্রিজ-ডীপ ফ্রিজ ভর্তি কুরবানির মাংস। এই সময়ে এতক্ষণ যে সিরিয়াস কথাবার্তা কপচালাম, তাতে অনেকে হয়ত ‘বোর ফিল’ করছেন। এবার তা হলে তাদের জন্য কুরবানির মাংস হজম হওয়ার একটুখানি ‘সস্’ পরিবেশন করি। মানে একটা চুটকি।

গ্রামের এক কৃষক তার মোটা তাজা করা গরুটি, নাম কালাপাহাড়, বিক্রি করতে নিয়ে গেছে হাটে। কিন্তু মনমত দাম না পেয়ে মন খারাপ করে রাতে গরুটা নিয়ে বাড়ি ফিরে এল। রাত দু’টোর দিকে তার দরজায় দমাদম আঘাত। সে ভাবল, বোধ হয় কোনো লোক ঠেকায় পড়ে এসেছে গরু কিনতে। কিন্তু দরজা খুলে তো সে অবাক। কালো মুখোশ পরা ৪/৫ জন দাঁড়িয়ে আছে লাঠিসোঁটা নিয়ে। তাদের একেকজন যেন একেকটা কালাপাহাড়। এর মধ্যে সর্দার গোছের একজন হাঁক দিল : ওই, গরু বেচার টাকা দে। শুনে তো কৃষকের আক্কেল গুড়ুম। সে মুখ কাঁচুমাচু করে বলল : টাকা পাব কোথায়? গরু তো ভাই বিক্রিই হয়নি। ‘কেন?’ ‘কেমনে বেচি ভাই বলেন। আমার পাঁচ লাখ টাকার গরুর দাম কয় এক লাখ। এত লস্ দিয়া কি বেচা যায় কন?’ শুনে সেই ষণ্ডামত লোকটা বলল, ‘কী বললি? লস্? ব্যাটা লস্ হলে তো আমাদের হতো, তোর কী? তোর কী? তুই বেচলি না কেন? আহাম্মক কোথাকার।’ বলেই হাতের লাঠি দিয়ে কৃষকের পিঠে দিল এক ঘা।...

শেষ করি এই প্রার্থনা দিয়ে। দেশ বন্যামুক্ত হোক, ডেঙ্গুমুক্ত হোক, সুখে থাকুক দেশের মানুষ। আর যারা কালো মুখোশ পরে রাতের অন্ধকারে (এমনকি দিনদুপুরেও) কেবল লাঠির জোরে নিরীহ মানুষের সহায়-সম্পদ লুণ্ঠন করে, তাদের হাত থেকে দেশকে, দেশের মানুষকে রক্ষা করুন আল্লাহপাক।

লেখক : সাবেক সচিব, কবি

[email protected]

মন্তব্য