kalerkantho

১৫ই আগস্ট কিছু মিশ্র চেতনা

গোলাম কবির

১১ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



১৫ই আগস্ট কিছু মিশ্র চেতনা

মহাবিশ্ব একটি কেন্দ্রের বলয়ে আবর্তিত। এটি সৃষ্টির বিধান। মানুষ সেই সৃষ্টির বিধানের স্বার্থপর অনুসারী। তাই দেখা যায়, বৈধ-অবৈধ ক্ষমতাধরের অনুসারীর অভাব হয় না। ‘ক্ষমতা চলে গেলে স্বার্থপররা নতুন ক্ষমতা দখলকারীর পদলেহনে ভূলুণ্ঠিত হয়।’ হায়! মনুষ্যত্বের কী অপমান!

বঙ্গবন্ধুর ক্ষমতায় অধিষ্ঠান তল্পিবাহকের মজুরিপ্রাপ্ত নয়। ‘সারা জীবনের অক্লান্ত ত্যাগ ও সাধনার ফসল। সাগর পরিমাণ রক্তের মূল্যে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হলেও দৃশ্য-অদৃশ্য বিরোধিতা কম হয়নি। একদিকে ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশ গড়া, অন্যদিকে নানা কিসিমের হঠকারিতা, গুপ্তহত্যা, অগ্নিসংযোগ, অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি, প্রাকৃতিক কারণ ও মানবসৃষ্ট কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি—সব মিলিয়ে দেশের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে সর্বোচ্চ নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হয়েছে বঙ্গবন্ধুকে। পঁচাত্তরের জাতীয় ট্র্যাজেডির অব্যবহিত আগে দেশের অবস্থা দৃশ্যত যখন স্বাভাবিকতার দিকে অগ্রসর হতে থাকে। তখনই ঘটে গেল মানব-ইতিহাসের অন্য একটি কলঙ্কলেখা। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে দৃশ্যপট থেকে পৈশাচিক কায়দায় সরিয়ে দেওয়া হলো।

স্তম্ভিত জাতি বিমূঢ় দৃষ্টিতে প্রত্যক্ষ করল, ঘাতককুল ময়ূরপুচ্ছ পরিধান করে জননেতা সেজে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর ইতিহাসকে বিপরীত খাতে প্রবাহিত করার প্রকল্প হাতে নিল। সেই প্রকল্পের বলয়ে কিছু তথাকথিত শিক্ষিত ব্যক্তি (যারা বাংলাদেশের সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান ছিল) স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাস গ্রন্থমালার ১৪ নম্বর স্তম্ভটি আমূল পরিবর্তন করে ফেলল। এসব মূঢ় ব্যক্তি ও তাদের চালক স্বাধীনতাবিরোধীরা ভাবল, এবার বুঝি বিস্মৃতিপ্রবণ বলে কথিত বাঙালিচিত্ত থেকে বঙ্গবন্ধুর অসামান্য কর্মযজ্ঞকে মুছে ফেলা গেল। তাই বাঙালির আত্মপরিচয় পদদলিত করে সেনা সদস্যের বংশীবাদনকে প্রাধান্য দেওয়ার আয়োজন শুরু করল। দেখা গেল, খলনায়কের নামে নানা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। দেশের সর্বত্র আগাছা গজানোর অশুভ প্রতিযোগিতা! ইতিহাসের সাক্ষ্য, অবৈধ ক্ষমতা দখলকারীরা চিরকালই মিথ্যার জঞ্জাল দিয়ে ইতিহাসের কাঁধে সওয়ার হয়। সেই দুঃসময়ে বঙ্গবন্ধুর রক্তের যথার্থ উত্তরাধিকার সত্যিকার সর্বহারা শেখ হাসিনা, আজকের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী (১৯৮১ সালের ১৭ এপ্রিল) দেশে ফিরে না এলে সেই সব মিথ্যার ভোজবাজি কোথায় গিয়ে ঠেকত কে জানে!

ইতিহাসের ধারা আবার ফিরে আসা শুরু হয়েছে। মনে এতটুকু দেশপ্রেম বা বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নেই, অথচ দেখাতে চায়, তাদের মতো বঙ্গবন্ধুভক্ত বোধ হয় আর কেউ হয় না। বাইরের শ্রদ্ধা-ভক্তির কৃত্রিম প্রদর্শনীর শেষ নেই। অবশ্য ক্ষমতার ভাগও তারা পেয়ে যাচ্ছে। প্রতাপ খাটিয়ে সাতপুুরুষের ভবিষ্যৎও তারা জোগাড় করছে। জনগণ ছিটেফোঁটা পেয়েই সন্তুষ্টি দেখাতে বাধ্য থাকছে। জনসংখ্যার ভার আমাদের কল্পনাতীত, তবে বোঝা হয়নি। জাতীয় উন্নতির দৃশ্যমানতা তার প্রমাণ। শ্রদ্ধা-ভালোবাসাহীন কৃত্রিম ভক্তরা তা দেখভালের ভার পেয়ে যাচ্ছে। ফলে যে জনগণের জন্য বঙ্গবন্ধু প্রাণপাত করলেন, তারা পূর্ণ আলোকিত হলো না। সর্বত্রই কৃত্রিমদের দৌরাত্ম্য। বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় কিছু মতবাদী মানুষ বন্ধু সেজে মানুষের কল্যাণ আর সাম্যের মুখস্থ করা কথা আউড়িয়ে যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিতে ইন্ধন জুগিয়েছিল, বঙ্গবন্ধুকন্যাকে জনগণ ভালোবেসে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করলে তারাই ভোল পাল্টে বঙ্গবন্ধু নামের পুষ্পবৃষ্টির প্রতিযোগিতা শুরু করল। বঙ্গবন্ধুর অপরিহার্যতা প্রত্যক্ষ করে, তাঁর সৃষ্ট দলের ছায়াতলে অনেকেই সমবেত হলো। ভেতরে কোনো পরিবর্তন হয়নি। হবেও না কোনো দিন। আরবিতে একটা প্রবাদ আছে ‘আল খাসলাতো লা ইয়ারুদ্দু ইল্লাল কাজা।’ বাংলায় আমরা বলি খাসলত যায় না মলে। সংস্কৃত বলে অঙ্গারংশতধৌতং মলিনান্ত। ইংরেজি প্রবাদ অনুরূপ, ‘ব্ল্যাক উইল টেক নো আদার হিউ’। তাই তো দেখা গেল তাদের অনেকে বড় চেয়ার পেয়ে, চেয়ার রক্ষায় বুঁদ হয়ে থাকল। বিগত ১০ বছরে রাষ্ট্র পরিচালনায় কিছু বিচ্যুতি দেখা গেছে, যা অস্বাভাবিক নয়। নতুন সুবিধাপ্রাপ্তরা দেখেও দেখল না। ভয় পাচ্ছে পেছন থেকে চেয়ার সরে যায় কি না। এখন তাদের কেউ কেউ মুখ খুলতে শুরু করেছে।

দুঃখের বিষয়, মানবসভ্যতার ইতিহাসে নিঃস্বার্থ খাঁটি মানুষ বেশি জন্মায় না। চিরকালই মানুষ সম্পদে মদমত্ত। তাদের বাইরের খোলস বদল হয়, অন্তরের কদর্যতা অপরিবর্তিত থাকে।

ইদানীং বঙ্গবন্ধুর নামে নানা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। মতলববাজরা সেই সুবাদে ওপরে ওঠার সিঁড়ি তৈরি করছে। যাঁরা জীবনপণ করে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ আঁকড়ে ধরে আছেন, তাঁরা প্রায় অপাঙেক্তয়। অনেকে, যাঁরা একদা বঙ্গবন্ধুর নাম বিকৃত উচ্চারণ করে উল্লাস করেছেন, তাঁরাই গলাবাজির জোরে দেশের সর্বোচ্চ পদক বগলদাবা করছেন। স্তাবকতা আর কৃত্রিমতার জয় হচ্ছে।

জাতীয় ট্র্যাজেডির আজকের অতীতচারিতার দিনে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন, সত্যিকার বঙ্গবন্ধু-প্রেমিক তথা দেশপ্রেমিক ত্যাগী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা। তবেই বোধ করি, ১৫ই আগস্ট উদ্‌যাপন যথার্থ হবে।

 

লেখক : সাবেক শিক্ষক

রাজশাহী কলেজ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা