kalerkantho

দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা

ফজলুল করিম

৮ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা’ জি বাংলা গ্র্যান্ড ফিনালে বাংলাদেশের উদীয়মান তরুণ শিল্পী মাইনুল আহসান নোবেল গানটি যখন গাইছিলেন ঠিক তখন বাংলাদেশের চ্যানেলে খবর প্রচারিত হচ্ছিল—ডিআইজি প্রিজনের বাসায় দুদকের অপারেশন টিম দেখতে পায় ঘরের বিভিন্ন স্থানে কাপড়ে পেঁচিয়ে লুকিয়ে রাখা বাংলাদেশি ৮০ লাখ মুদ্রা। এর মধ্যে কিছু টাকা ব্যাগে করে জানালা দিয়ে পাশের বিল্ডিংয়ের ছাদে ফেলে দেওয়া হয়। সে টাকাও টিমের সদস্যদের নজর এড়ায়নি।

জিজ্ঞাসাবাদের উত্তরে তারা নানা যুক্তি দেখায়। কিন্তু কোনো যুক্তি গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। সত্যতা যাচাই করে দুদক প্রমাণ পেয়েছে আয়বহির্ভূত সে টাকা। সব টাকা জব্দ করে ডিআইজি প্রিজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরের দিন জামিনের আবেদনে আইনজীবী অনেক যুক্তি দেখিয়েও জামিন নিতে পারেননি। কারণ আইন নিজস্ব গতিতে চলে। জনমতের কথা ভেবে, আইনের কথা ভেবে মাননীয় বিচারক সে কাজটি করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

শুধু ডিআইজি প্রিজন নয়, এমন অসংখ্য দুর্নীতিবাজের বাসায়, তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে, ব্যাংকের ভল্টে, আত্মীয়-স্বজনের নামে-বেনামে মূল্যবান স্বর্ণালংকার, ফ্ল্যাট, জমি, সেকেন্ড হোম আর সুইস ব্যাংক অনুসন্ধান করলেই বেরিয়ে আসবে থলের কালো বিড়াল। এই লেখাটি কারো বিরুদ্ধে নয়, সমাজের একটি চিত্র।

দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা, কারো দানে পাওয়া নয়—গীতিকার এ গানটি যখন লেখেন তখন তাঁর চিন্তাধারা, মানসিক অবস্থা কেমন ছিল তা যদি গভীরভাবে কেউ ভাবেন, তাহলে বুঝবেন এই গানটি অর্থের জন্য লেখেননি। লিখেছেন দেশকে ভালোবেসে, মানুষকে ভালোবেসে, সৃষ্টিকে ভালোবেসে। লিখেছেন স্বাধীনতার কথা ভেবে।

১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদ আর দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির বদৌলতে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। যারা জীবন দিয়ে, সম্ভ্রমহানি করে দেশ স্বাধীন করেছে তারা সম্পদের কথা ভাবেনি, ভেবেছে দেশের কথা। তাদের ইতিহাস যারা ভুলে গেছে তারাই দুনীতির অতল জলে অবগাহন করছে।

এখন যে কৃষক মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফসল ফলিয়ে ন্যায্য দাম পাচ্ছে না, যেসব চাকরিজীবী সৎ পথে উপার্জন করে জীবন যাপন করছে, যেসব ব্যবসায়ী সৎ পথে ব্যবসা করছে তারা প্রতিনিয়ত কষ্ট করে যাচ্ছে। সেই কষ্ট যখন প্রকট আকার ধারণ করে তখন তারা অন্যের দুর্নীতি দেখে নিজেরাও দুর্নীতির মোহে আকৃষ্ট হয়। এভাবেই দুর্নীতিবাজদের সংখ্যা বাড়ছে। দুর্নীতি বন্ধ করতে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে কিন্তু কোনো পদক্ষেপই কাজে আসছে না। যারা আদর্শকে আঁকড়ে ধরে আছে, দুর্নীতির মোহ যাদের আকৃষ্ট করতে পারছে না তাদের বিবেক এখনো জাগ্রত।

আদর্শকে বাঁচিয়ে রাখার বুদ্ধি কী? অনেক কঠিন প্রশ্ন। এ প্রশ্নের উত্তর রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা দিয়ে গেছেন। বাস্তবে সেটি প্রয়োগ হচ্ছে না। এখন সবার আগে সেই শাশ্বত বাণীগুলো নতুন করে শোনাতে হবে। প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা এসব বাণী জানতে পারলে তারা অন্যায়, অপরাধ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করে দেশকে সত্যিকারের সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলবে।

প্রায় চার হাজার বছর পরাধীন থেকে যে জাতি স্বাধীনতা এনেছে তারা সেই স্বাধীনতার সুফলকে হেলায় হারাতে দেবে না। ওরা সুইস ব্যাংকে রাখা সবার টাকা ফিরিয়ে আনবে। লকার খুলে মূল্যবান স্বর্ণ, ডায়মন্ড উদ্ধার করবে। নামে-বেনামে অবৈধ উপার্জনে কেনা ফ্ল্যাট উদ্ধার করবে। অবৈধ উপার্জিত অর্থে কেনা জমি শনাক্ত করে সেখানে গড়ে তুলবে সাধারণ মানুষের বসবাসের জন্য ফ্ল্যাট। যেসব কৃষকের আবাদি জমি জোরপূর্বক দখল হয়েছে সেসব জমি পুনরুদ্ধার করে ফের আবাদের জমি কৃষকদের ফিরিয়ে দেবে। আদর্শবাদীরা সে সময়ের অপেক্ষা আছে। হয়তো বিলম্ব হচ্ছে; কিন্তু ভালো কিছু পেতে হলে অপেক্ষা করতে হয়।

সম্প্রতি ফেনী মাদরাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান, বরগুনার রিফাত হত্যা, রিফাতের স্ত্রী মিন্নির পরিণতির কথা আমরা জানি। তাই বলে মিন্নিকে নিয়ে, নুসরাতকে নিয়ে লেখা থেমে থাকেনি। মিন্নির পাশে কেউ নেই সে কথা কালের কণ্ঠ’র নির্বাহী সম্পাদক বাধ্য হয়েই তার ওপর দীর্ঘ আর্টিকল লিখেছিলেন—‘মিন্নির পাশে এখন কেউ নেই’ শিরোনামে। প্রতিবাদের ভাষা পত্রিকায়, টক শোতে, মিছিলে, ইন্টারনেটে, মানববন্ধনে জানান দেওয়া হচ্ছে। কেউ থেমে নেই। তবু দুর্নীতি, হত্যা, ধর্ষণ বন্ধ হচ্ছে না। প্রতিদিনের পত্রিকায় চোখ রাখলেই সেটা নজরে আসে। প্রতিদিন দুর্ঘটনা ঘটছেই। এর পেছনে একমাত্র কারণ অবৈধভাবে অর্জিত অর্থসম্পদ, ক্ষমতার অপব্যবহার, বিচারিক কাজে বিলম্ব, সামাজিক বৈষম্য।

সময়ের স্রোতে সুযোগের সদ্ব্যবহার করে যারা কালো টাকার পাহাড় গড়েছে আমরা তাদের ইতিহাস লিখব না। লিখব কবিগুরুর সেই কথা—‘যা ঘটে সত্য নয়, সেই সত্য যা রচিবে তুমি’। লিখব এই কারণে, দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা, কারো দানে পাওয়া নয়।

 

লেখক : প্রবীণ নাট্যকার

 

মন্তব্য