kalerkantho

চলতে হবে সেই পথেই

অরুণ কর্মকার

৮ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



চলতে হবে সেই পথেই

বাঙালির জীবনে বোধ হয় এমন একটি দিনও নেই, যেদিন বঙ্গবন্ধু তাঁদের স্মরণে আসেন না। এর কারণ শুধু এই নয় যে বঙ্গবন্ধু বাংলাদশের প্রতিষ্ঠাতা এবং বাঙালি জাতির পিতা। বরং জাতির পিতা হয়ে ওঠার দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় এবং দেশকে গড়ে তোলার প্রত্যয়ে তিনি যা করেছেন তাই তাঁকে নিত্যস্মরণীয় করেছে।

আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদীদের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র এবং কিছু কুলাঙ্গার বাংলাদেশির জিঘাংসার শিকার বঙ্গবন্ধু দেশ গড়ার জন্য খুব কম সময়ই পেয়েছেন। তার মধ্যেই তিনি এমন কিছু কাজ করে গেছেন, যা এই দেশের ভিত্তি শক্ত করেছে। এমনই কিছু কাজ তিনি করেছেন দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য।

২০১০ সাল থেকে সরকারের উদ্যোগে পালিত হচ্ছে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা দিবস। সেই সুবাদে এখন সবাই জানেন যে বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫ সালের ৯ আগস্ট, তাঁর সপরিবারে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মাত্র ছয় দিন আগে শেল কম্পানির কাছ থেকে পাঁচটি গ্যাস ক্ষেত্রের শতভাগ মালিকানা কিনে রেখেছিলেন মাত্র ৪৫ লাখ পাউন্ডে।

দেশের সেই ক্রান্তিকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের মোট রিজার্ভ ৪৫ লাখ পাউন্ড ছিল কি না সন্দেহ। তা সত্ত্বেও তিনি সেই সাহসী ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কারণ ১৯৭২ সালে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের পটভূমিতে পৃথিবীব্যাপী যে জ্বালানি সংকট সৃষ্টি হয়েছিল তা থেকে তিনি বুঝেছিলেন যে জ্বালানি ছাড়া উন্নয়নের চাকা ঘুরবে না। আর নিজেদের জ্বালানি সম্পদ আহরণ  ও তার ব্যবহার বাড়ানো ছাড়া জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না।

সেদিন বঙ্গবন্ধু দেশকে যে পাঁচটি গ্যাস ক্ষেত্রের শতভাগ মালিক বানিয়েছিলেন সেগুলো হলো তিতাস, বাখরাবাদ, হবিগঞ্জ, কৈলাসটিলা ও রশিদপুর। ওই পাঁচটি ক্ষেত্রে গ্যাসের মোট মজুদ ছিল প্রায় ২১ টিসিএফ। এর মধ্যে উত্তোলনযোগ্য মজুদ ছিল সাড়ে ১৫ টিসিএফ, বর্তমান বাজারমূল্যে যার দাম প্রায় তিন লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। এখনো প্রতিদিন দেশে যে পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে তার প্রায় ৩৫ শতাংশ আসছে এই পাঁচটি ক্ষেত্র থেকে। ক্ষেত্রগুলোতে আরো প্রায় সাড়ে ছয় টিসিএফ গ্যাস মজুদ আছে, যার দাম প্রায় এক লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান পেট্রোলিয়ামের মালিকানাধীন সিলেট অঞ্চলের দুটি গ্যাস ক্ষেত্র জাতীয়করণও করেছিলেন।

আজ আমরা একবার ভেবে দেখতে পারি যে বঙ্গবন্ধু সেদিন এই সিদ্ধান্ত না নিলে কিংবা এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই ঘাতকের বুলেট তাঁর বিশাল হৃদয়কে বিদীর্ণ করে দিলে দেশের জ্বালানি খাতের অবস্থা কী হতো!

বঙ্গবন্ধু দেশের স্থলভাগে এবং বঙ্গোপসাগরে জ্বালানি অনুসন্ধানেরও উদ্যোগ নিয়েছিলেন। স্থলভাগে অনুসন্ধানের জন্য তিনি তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে চুক্তি করেছিলেন। সমাজতান্ত্রিক পশ্চিম জার্মানির কাছেও তিনি সহায়তা চেয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে পশ্চিম জার্মানি দীর্ঘদিন, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পরও বাংলাদেশে কাজ করেছে।

সদ্য স্বাধীন দেশের জ্বালানি খাতকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধু বর্তমান পেট্রোবাংলা এবং মিনারেল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন প্রতিষ্ঠা করেন। পেট্রোলিয়াম আইন সংশোধন করে যুগোপযোগী করেন। দক্ষ জনবল গড়ে তোলার জন্য তিনি এই খাতের কর্মকর্তাদের ইন্দোনেশিয়া ও আলজেরিয়ায় প্রশিক্ষণে পাঠাতে শুরু করেন।

তিনি জামালগঞ্জ কয়লাখনি, জয়পুরহাটের চুনাপাথর খনি এবং মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনি উন্নয়নের পদক্ষেপ নেন।

জ্বালানি সম্পদ আহরণের জন্য বঙ্গবন্ধু দেশের সমুদ্রসীমার দিকেও নজর দিয়েছিলেন। তিনি ১৯৭৪ সালে আটটি  বিদেশি কম্পানির মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে মোট ৩১ হাজার ৬০০ লাইন কিলোমিটার ভূকম্পন জরিপ করান। অগভীর সমুদ্রবক্ষে সাতটি অনুসন্ধান কূপ খনন করা হয়। ওই সময় জ্বালানি অনুসন্ধানের মূল লক্ষ্য ছিল তেল আবিষ্কার। তাই সব কূপই খনন করা হয়েছিল চার হাজার মিটারের বেশি গভীরতার।

ফলে উচ্চ চাপের কারণে কূপগুলোতে  যথাযথভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো সম্ভব হয়নি। তবে অপেক্ষাকৃত কম গভীরতার একটি কূপে গ্যাস পাওয়া যায়। সেটিই কুতুবদিয়া গ্যাস ক্ষেত্র।

এসব কর্মোদ্যোগের মাধ্যমে দেশকে জ্বালানি খাতে স্বনির্ভর হওয়ার পথ দেখিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর দেশের উন্নয়নমুখী এসব উদ্যোগই থেমে যায়। বাংলাদেশকে একটি বিভ্রান্ত, লক্ষ্যহীন রাষ্ট্রে পরিণত করা হয়। উন্নয়নের অগ্রযাত্রার পরিবর্তে বাংলাদেশ স্বাধীনতার চেতনার বিপরীতে পিছু হাঁটতে শুরু করে। নব্বইয়ের দশকে কিছুটা স্থিতাবস্থা ফিরে এলে জ্বালানি খাতেও কিছু কার্যক্রম শুরু হয়।

তবে বাংলাদেশ উন্নয়নের মহাসড়কে ওঠে ২০০৯ সালের পর। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বিগত ১০ বছরে দেশের জ্বালানি সম্পদ উন্নয়ন ও আহরণের কাজটি যথেষ্ট মনোযোগ পায়নি। স্থলভাগ কিংবা সমুদ্রবক্ষ কোথাও জ্বালানি সম্পদ আহরণের জন্য প্রয়োজনীয়  উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

২০১৭ সালে পাঁচ বছরে ১০৮টি কূপ খননের যে অবাস্তব পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, স্বাভাবিক কারণেই তা মুখ থুবড়ে পড়েছে। ভূতাত্ত্বিক বিবেচনায় দেশের সমুদ্রবক্ষ ও এর তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা সম্ভাবনাময় হলেও সেখানে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান এখনো তেমন অগ্রগতি নেই।

বিগত ১০ বছরে দেশে মোট গ্যাস ব্যবহৃত হয়েছে প্রায় ৯ টিসিএফ। আর নতুন আবিষ্কার হয়েছে এক টিসিএফের মতো। এ সময় দেশের ক্ষেত্রগুলো থেকে গ্যাসের  উৎপাদন বেড়েছে দৈনিক এক কোটি ঘনফুট হিসেবে। এর প্রায় পুরোটাই এসেছে শেভরন পরিচালিত বিবিয়ানা ক্ষেত্র থেকে।

দেশের  অন্য  বিদ্যমান  ক্ষেত্রগুলোর  মধ্যে  একমাত্র  ভোলা  ছাড়া  প্রতিটিতে  গ্যাসের  চাপ  কমছে। ফলে উৎপাদন অব্যাহত  রাখার  জন্য  কম্প্রেসর  বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিগত এক দশকে নতুন যে গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কার হয়েছে তার  মধ্যে  একমাত্র  ভোলা  উত্তর  ছাড়া অন্যগুলোকে  গ্যাস ক্ষেত্র  না বলাই ভালো। যেমন—ঢাকার পাশের রূপগঞ্জ, নোয়াখালীর সুন্দলপুর       প্রভৃতি।

স্থলভাগের মতো সমুদ্রবক্ষের চিত্রও করুণ। মিয়ানমার এবং ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমাসংক্রান্ত বিরোধ মীমাংসার পর এখনো কাজ তেমন কিছুই হয়নি।

দেশের সমুদ্রসীমায় ২৬টি ব্লকের মধ্যে বর্তমানে চারটিতে পিএসসির অধীনে পাঁচটি বিদেশি কম্পানি কাজ করছে। এর মধ্যে তিনটি অগভীর ও একটি গভীর সমুদ্রের। অথচ মিয়ানমার বাংলাদেশের সীমানাসংলগ্ন এলাকা থেকে বিপুল গ্যাস তুলে নিচ্ছে।

বঙ্গবন্ধু জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে স্বনির্ভর জ্বালানি খাত গড়ার প্রত্যয়ে কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু এখন তা আমদানিনির্ভরতায় পরিণত হতে চলেছে। জ্বালানি তেলের বার্ষিক আমদানি ব্যয় ৩০০ কোটি (৩ বিলিয়ন) ডলার ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এলপি গ্যাস আমদানি ক্রমাগতভাবে বাড়ছে। এলএনজি আমদানি শুরু হয়েছে এবং তার পরিমাণও ক্রমাগতভাবে বাড়বে। আগামী বছর থেকে শুরু হবে কয়লা আমদানি। কয়লার পরিমাণও হবে বিপুল এবং তার আমদানিও ক্রমাগতভাবে বাড়বে। ২০২৫-২৬ সাল থেকে কিনতে হবে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি ইউরেনিয়াম।

হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে এই খাতের আমদানিনির্ভরতা হবে প্রায় ৮০ শতাংশ। আর বছরে আমদানি ব্যয় দুই হাজার কোটি (২০ বিলিয়ন) ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এই বিপুল আমদানির দায়ভার বহন করা মোটেই সহজ হবে না।

বাংলাদেশ জ্বালানিশূন্য দেশ নয়। এ দেশের সমুদ্রসীমায় তো বটেই, স্থলভাগেও আরো গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা আছে বলে বিশেষজ্ঞদের বিশ্বাস। গ্যাস ছাড়াও বাংলাদেশে রয়েছে প্রায় ৩০০ কোটি (তিন বিলিয়ন) টন অতি উন্নতমানের কয়লা।

এসব সম্পদ ব্যবহারে দেশের অগ্রগতি দ্রুততর হতে পারে। স্বাধীনতা-পরবর্তী বিধ্বস্ত ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যেও বঙ্গবন্ধু সেই স্বনির্ভরতার পথে হেঁটেছিলেন। বাংলাদেশের প্রকৃত উন্নতির পথ সেটাই। আমাদেরও হাঁটতে হবে সেই পথেই।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক

মন্তব্য