kalerkantho

সাদাকালো

গণপিটুনি সামাজিক সন্ত্রাস : কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে এখনই

আহমদ রফিক

১ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



গণপিটুনি সামাজিক সন্ত্রাস : কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে এখনই

বাংলাদেশের সমাজটা যে কী ভয়ংকর রূপ ধারণ করতে যাচ্ছে, বহু নিষ্ঠুর ও নৃশংস ঘটনা তার আভাস-ইঙ্গিত দিচ্ছে। এতে ব্যক্তিমানসের অবচেতনে নিহিত ঘাতক প্রবৃত্তির কখনো ধর্ষকামিতা (স্যাডিস্ট চেতনার) প্রকাশ খুব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ঘটনাগুলো নানা চরিত্রের। বিশেষভাবে লক্ষণীয় শিশু ধর্ষণ, নারী ধর্ষণ ও হত্যা, ব্যক্তিগত আক্রোশে অতি চেনা ব্যক্তিকে পুড়িয়ে বা ধারালো অস্ত্রে কুপিয়ে মারার প্রবণতা। অতি বুদ্ধিমান কয়েকটি গুলি খরচে দ্রুত কাজ সেরে দ্রুত মোটরসাইকেলে চম্পট দেওয়ার পক্ষপাতী।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি সত্ত্বেও ভয়ংকর নিষ্ঠুর ঘটনাগুলো যে নিয়মিতই ঘটছে, দৈনিক পত্রিকাগুলোর সংবাদ-প্রতিবেদন তার প্রমাণ। এর মধ্যেই হঠাৎ হঠাৎ উপদ্রবের মতো দেখা দেয় গণপিটুনি নামক সামাজিক সন্ত্রাস, যা ওই ঘাতক চরিত্রেরই ভিন্নমাত্রিক প্রকাশ। মানুষের মধ্যে লুকিয়ে থাকা অমানুষের অস্তিত্বের প্রতিফলন। সম্প্রতি এ প্রবণতা হঠাৎ করেই ব্যাপক আকারে দেখা যাচ্ছে।

গত ২২ জুলাই একটি দৈনিকে সংবাদ-শিরোনাম : ‘গণপিটুনির শিকার প্রায় সবাই নিরীহ’। দুই দিন পরের অন্য একটি দৈনিকে প্রকাশিত খবর : ‘গণপিটুনিতে নিরপরাধ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে’। তৃতীয় শিরোনামটি হলো ‘আরো ৪ জেলায় গণপিটুনি/স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি’।

গণপিটুনির প্রধান কারণ গুজব রটনা। বিচিত্র সেসব গুজব। বলার অপেক্ষা রাখে না, সেসব রটনা উদ্দেশ্যমূলক। কে বা কারা ছড়াচ্ছে সেসব গুজব, কেন ছড়াচ্ছে? শেষোক্ত বিষয়টি সব সময় স্পষ্ট নয়। এ উপলক্ষে গ্রেপ্তারও করছে পুলিশ। কিন্তু গণপিটুনির নৈরাজ্য বন্ধ হচ্ছে না।

হঠাৎ করে কেন গণপিটুনির পরিবেশ তৈরি হয়ে গেল, তা নিয়ে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণও খুব স্পষ্ট নয়। তবে মানুষের মনোজগতের অসহিষ্ণুতা কিছুটা হলেও যে এ জন্য দায়ী, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সেটি সর্বজনীন সামাজিক-রাজনৈতিক কারণ।

এককালে ‘ডাইনি’র অভিযোগ ছড়িয়ে উদ্দেশ্যমূলকভাবে বা নিছক সংস্কারবশত বিশেষ কোনো নারীকে পিটিয়ে বা পুড়িয়ে মারার ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে। গুজবে উন্মাদ মানুষ, রটনায় উন্মাদ মানুষ চরম নিষ্ঠুরতার প্রকাশ ঘটিয়েছে একজন নিরীহ মানুষকে মেরে।

আর একালে ‘ছেলেধরা’ একটি বড়সড় গুজবের উৎস। আর বিষয়টি এমনই স্পর্শকাতর যে তা জনমনে উন্মাদনা সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট। সে ক্ষেত্রে যুক্তি, বিচারবোধ সব মুহূর্তে লোপ পায়, ভেতর থেকে একটি নরপিশাচ বেরিয়ে এসে চরম নৃশংসতার প্রকাশ ঘটায়। এক বা একাধিক নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের পর শান্তি।

যেমন দেখা গেছে স্বাধীন বাংলাদেশের সমাজে ভিনভাষী হত্যার এমন এক উন্মাদনা। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় লেখা রয়েছে অন্তত গোটা দুই নিরীহজনের মৃত্যুর ঘটনা। আর অসহিষ্ণুতা? তা হিংস্রতার পর্যায়ে পৌঁছে যায় যখন উদ্দেশ্যমূলকভাবে একজনকে ধরে ফেলে কয়েকজনে মিলে, ক্রুদ্ধ কণ্ঠস্বর শোনা যায় : ‘আগে চোখ দুইটা উপড়াইয়া ফ্যাল’। পরের ঘটনা বলার অপেক্ষা রাখে না। দৈনিক বাংলা অফিসের সামনে রাজপথের ঘটনা। শুনেছি সেখানকার এক সাংবাদিকের মুখে।

তখনকার মনস্তাত্ত্বিক অসহিষ্ণুতা ও হিংস্রতার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ আমাদের জানা। কিন্তু এখন? এইতো বছর কয় আগে উদ্দেশ্যমূলক ঘটনা ‘সাঈদীর মুখ দেখা গেছে চান্দে’ আর হামলা রামু থেকে উখিয়া এক বৌদ্ধ ও হিন্দু পল্লীতে। তদন্তে প্রকাশ পায় উদ্দেশ্যমূলক রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এবং তা একদলীয় নয়। ব্যক্তিস্বার্থ, স্থানীয় দলীয় স্বার্থ সেখানে সক্রিয়।

সেই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির বিচার কতটা হয়েছিল আমরা তা জানি না, সংবাদপত্রের ‘ফলোআপ’ সেখানে নীরব। হয়তো তাই বর্তমান ঘটনাবলির পরিপ্রেক্ষিতে আইন ও সালিশ কেন্দ্র অমানুষিক হিংস্রতার বিবরণ জানাচ্ছে আর মানবাধিকারকর্মীর মন্তব্য হলো, ‘এমন ঘটনার অন্যতম কারণ বিচারহীনতার সংস্কৃতি।’ অনুরূপ মতামত দেখা গেছে একাধিক অনুসন্ধানী সাংবাদিক বা মনস্তত্ত্ববোধের বিচার-বিশ্লেষণে।

দুই.

একজন অপরাধ বিজ্ঞান বিষয়ক গবেষক এসব ঘটনার দীর্ঘ ও জটিল মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছেন একে অপসংস্কৃতির প্রতিফলন হিসেবে। তিনি এ কথাও বলেছেন যে উন্নত বিশ্বের মানুষ গুজবে এতটা প্রভাবিত হয় না। তাহলে এ ক্ষেত্রে গলদটা তো গোড়ায়। অর্থাৎ সমাজে শিক্ষা ও মানবিক চেতনার অভাব ইত্যাদিতে।

গলদ যেমন শিক্ষাহীনতার, তেমন প্রকৃত শিক্ষার অভাব। সেই সঙ্গে ধর্মীয় সংস্কার ও রক্ষণশীলতার প্রভাব। ভাবা যায়, মুসলমান সমাজে এমন বিশ্বাসের কথা যে শিশুর ছিন্ন মাথা না হলে পদ্মা সেতু টেকসই হবে না। তা-ও সে ভাবনা এক যুবকের। এই গোড়ার গলদ দূর করার চেষ্টায় আমরা অনেক পিছিয়ে। দায়টা রাষ্ট্রযন্ত্রের পুরোপুরি, সেই সঙ্গে সমাজের। এককথায় রাজনীতির।

রাজনৈতিক দায়িত্বহীনতার দায় বর্তায় রাষ্ট্রের ওপর, সমাজের ওপর। সমাজের সুস্থ শিক্ষা ও অন্তর্নিহিত শক্তি এখন বিপরীতমুখী। একদিকে ধর্মীয় রক্ষণশীলতা, অন্যদিকে রাজনৈতিক বা সামাজিক উদ্দেশ্যপ্রবণতা মিলেমিশে সমাজটাকে যেভাবে দূষিত করা হচ্ছে, একমাত্র সমাজ চরিত্র বদল ভিন্ন এ অবস্থা থেকে মুক্তি মিলবে না।

পাশাপাশি তাত্ক্ষণিক প্রয়োজন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সে নিরাপত্তা যেমন ব্যক্তিক, তেমনি সমষ্টিগত। গুজব রটনা যেমন অপরাধ, তেমনি গুরুতর অপরাধ আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া এবং সন্দেহবশত কাউকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া। সে অধিকার কারো নেই। কিন্তু অনধিকার প্রয়োগই শুরু হয়ে গেছে হঠাৎ করে। এর তাত্ক্ষণিক প্রতিকার অপরাধীর কঠোর শাস্তি—ঢিলেঢালা দীর্ঘকালীন বিচার নয়।

তাসলিমা-তাসনিমা ট্র্যাজেডির কথা ভাবতে গিয়ে প্রথমেই মনে হচ্ছে, আমরা কোন সমাজে বাস করছি? সমাজটা মানুষের, না অমানুষের? অথচ এরা শিক্ষিত, সুবেশধারী, নামি স্কুলে সন্তানের শিক্ষাদানে সক্ষম বাংলাদেশের নাগরিক। আর এদের আচরণই কিনা দুর্বৃত্তের মতো, ঘাতকের মতো। না জেনে, শুধু একজনের চিৎকার শুনে ছেলেধরা সন্দেহে নিরীহ এক নারীকে ঘরের দরজা ভেঙে টেনে-হিঁচড়ে বের করে এনে পিটিয়ে হত্যা করা কোন শিক্ষা, কেমন শিক্ষার প্রমাণ দেয়। এতে কালো কালির দাগ পড়ে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ওপর, সর্বোপরি সমাজ চেতনা, মানবিক চেতনা নিয়ে প্রশ্ন জাগে মনে। একটি শিশুর মাতৃহারা হওয়ার চিরকালীন বেদনার নিরসন কি কোনো শাস্তিতে সম্ভব?

না, সম্ভব নয়। মাকে হারাল যে ছোট্ট তাসনিমা, সে কিভাবে বড় হবে, কার দয়ায় সুস্থভাবে বেঁচে থাকবে, তা আমরা জানি না; কিন্তু জানি সে বড় হয়েও মা হারানোর রক্তঝরা ক্ষত বুকে লালন করবে। তার জীবনের এই করুণ ভবিতব্য তৈরি করে দিল কয়েকটি মানুষ নামধারী অমানুষ, যারা চেহারায় ও পোশাক-পরিচ্ছদে মানুষেরই মতো।

তিন.

আমরা জানি উপমহাদেশে গুজব ছড়িয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মাধ্যমে অসংখ্য মানুষ হত্যার নির্মতার কথা। এর বিরুদ্ধে সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনে একদা যথেষ্ট প্রতিবাদ উচ্চারিত হলেও মানব-প্রবৃত্তির কালো চিহ্নটি বুঝি সহজে মুছে যাওয়ার নয়। এর জন্য দরকার উন্নত আদর্শে শিক্ষা, মানবিক চেতনার শিক্ষা, মনুষ্যত্ববোধে প্রবল আস্থা ও বিশ্বাসের শিক্ষা—সমাজটাকে সেই ধারায় শিক্ষিত করে তোলা। এ দায় রাষ্ট্রযন্ত্রকে পালন করতেই হবে নিশ্চিত সুশাসনের মাধ্যমে। দরকার সহিষ্ণুতার শিক্ষা।

এর পরও কথা থাকে সমাজের ছোট্ট একটা দুর্বৃত্ত অংশ নিয়ে, অপরাধপ্রবণতা যেখানে প্রবল। শাসনদণ্ডের আবশ্যিক কর্তব্য তাদের শক্ত হাতে দমন করা, অপরাধের কঠিন শাস্তি নিশ্চিত করা। তা না হলে পূর্বোক্ত দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম কোনো কাজে আসবে না। আমরা চাই, ইব্রাহিমসহ কথিত অপরাধী ১০ থেকে ১৫ জনের বিচারনির্ভর কঠিন শাস্তি। খুঁজে বের করতে হবে সেই নারীকে, যে অকারণে ‘ছেলেধরা’ বলে চিৎকার করে উঠেছিল, তাকে সুবিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে।

বন্ধ করতে হবে গণপিটুনি নামক সামাজিক সন্ত্রাস, যা কখনো অকারণ উন্মাদনা, কখনো উদ্দেশ্যমূলক গুজব নামক স্বার্থের পেছনে ছোটা। সমাজটাকে রক্ষা করতে হবে অমানবিক দূষণের কবল থেকে। না হলে এর বিস্তার ঘটবে নানা মাত্রায়। তখন তার শোধন অসম্ভব হয়ে উঠবে। কাজটা এখনই শুরু করতে হবে।

 

লেখক : কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী

মন্তব্য