kalerkantho

রবিবার। ১৮ আগস্ট ২০১৯। ৩ ভাদ্র ১৪২৬। ১৬ জিলহজ ১৪৪০

দিল্লির চিঠি

শেখ হাসিনার চীন সফর আঞ্চলিক ভারসাম্য ও শান্তি রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ

জয়ন্ত ঘোষাল

২২ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



শেখ হাসিনার চীন সফর আঞ্চলিক  ভারসাম্য ও শান্তি রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১ থেকে ৫ জুলাই পর্যন্ত পাঁচ দিনের জন্য সফর সেরে এলেন চীন থেকে। ঢাকায় এবার হাসিনার সরকার গঠনের পর এটাই ছিল তাঁর প্রথম চীন সফর। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের স্ট্র্যাটেজিক সম্পর্ক স্থাপনের ফলে এই সফর গোটা দুনিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এই স্ট্র্যাটেজিক সম্পর্ক অবশ্য আজ যে হঠাত্ হয়েছে এমন নয়, এটি হয়েছিল ২০১৬ সালে। তবে এবার চীনে শেখ হাসিনাকে যেভাবে এক বিশেষ কূটনৈতিক মর্যাদা দেওয়া হয়েছে তাতে ভারতের ও নানা মহলে নানা প্রশ্ন উঠেছে। ঢাকার কিছু সংবাদমাধ্যমেও দেখেছি অনেকে এমনও বিশ্লেষণ করছেন যে হাসিনার এই চীন সফরের ফলে বাংলাদেশ ভারতনির্ভরশীলতা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। সোজা কথায় ভারতের ‘দাদাগিরি’ হাসিনার চীন সফরে এবার কমবে। এমন কথাও কেউ কেউ বলেছেন এই সফরে ভারতের ভ্রুকুঞ্চিত। ভারত উদ্বিগ্ন।

এসব লেখা পড়ার পর সাংবাদিক হিসেবে ভারতীয় সরকারের প্রতিক্রিয়া জানার চেষ্টা শুরু করলাম। নরেন্দ্র মোদি ও তাঁর বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্কর কি হাসিনার এ সফরে ক্ষুব্ধ? বেশ কয়েক দিন কূটনৈতিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে যা বুঝলাম, তা আজ আপনাদেরও জানাতে চাই। এককথায় বক্তব্য হলো, এই সফরকে ভারত খুব ইতিবাচক অবস্থান থেকেই দেখছে। বরং বিদেশমন্ত্রক সূত্রে বলা হচ্ছে, চীন ও বাংলাদেশের সম্পর্কের উন্নতির ফলে সবচেয়ে বেশি লাভ ভারতেরই। ভারত চাইছে ঢাকা ও বেইজিংয়ের সম্পর্কে যাতে কোনো ভুল-বোঝাবুঝি না থাকে।

আসলে বিশ্বরাজনীতি দ্রুত পরিবর্তনশীল। আজ আধুনিক মনন দিয়ে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, আমরা ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনের পটভূমি থেকে অনেকটাই দূরে সরে এসেছি। বাংলাদেশ নামে নতুন রাষ্ট্র গঠনের পেছনে প্রধান কারণ হলো মুক্তিযুদ্ধ। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে বসবাসকারী বাঙালিদের লড়াই ছিল ঐতিহাসিক। হতে পারে, পাকিস্তান এই মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশ নামক পৃথক সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনকে আজও মেনে নিতে পারেনি। মুক্তিযুদ্ধকে খাটো করে ১৯৭১ সালের যুদ্ধকে ভারত বনাম পাকিস্তান যুদ্ধ হিসেবে দেখানো, সেও ছিল রাজনীতি। কিন্তু আজ এত বছর পর ইতিহাসের সেই বোঝা বহন করা বোধ হয় পাকিস্তানের জন্য অনুচিত। আর পাকিস্তানের সঙ্গে অন্য কারণে বন্ধুত্ব রক্ষার জন্য চীনও যদি বাংলাদেশ সম্পর্কে একই রকম উদাসীনতা এবং বিরোধিতার মানসিকতা নিয়ে চলে, তবে সেটা বোধ হয় অনুচিত। এই পুরনো মানসিকতার বিশাল বাধা, প্রাচীর যদি ভাঙতে হয়, তবে তার শ্রেষ্ঠ উপায় হলো কথোপকথন। বাংলাদেশ মানেই ভারতের বন্ধু, আর পাকিস্তানের অভিভাবক হলো চীন। অতএব চীন বাংলাদেশবিরোধী এমন ভাবনাটা হলো অতি সরলীকরণ। এই অতি সরলীকরণ তখনই দূর হতে পারে যদি সব রাষ্ট্র সবার সঙ্গে কথা বলে। শেখ হাসিনা প্রেসিডেন্ট শি-র সঙ্গে দেখা করেন বারবার, আবার আমি তো চাই ভারতও চীনের সঙ্গে বারবার কথা বলুক, যেমনটা করছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

জানেন আমাদের কলেজে আমার এক প্রিয় শিক্ষক মশাই সত্যব্রত চক্রবর্তী বুঝিয়েছিলেন তথাকথিত জাতিরাষ্ট্রের মাথার ওপর কার ছাদ কিভাবে আজ উড়ে গেছে। সবার সঙ্গে সবার সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। তা ছাড়া ঠাণ্ডা যুদ্ধের কাল অতিবাহিত। এখন তো পৃথিবীটা এক বহুকেন্দ্রিক সমাজ। ইংরেজিতে বলে poly-centric society. বরং ঢাকার সঙ্গে যদি চীনের সম্পর্ক মধুর হয়, তবে ভারতেরও টেনশন কমে যাবে। কারণ এবার মোদি তাঁর দ্বিতীয় ইনিংসে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু করেছেন। ভুটানের ডোকলামে যে ঘটনা হয়েছিল, ভারত সেই ঘটনাকে পেছনে ফেলে আজ এগিয়ে যেতে চাইছে। সেই সময় বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক নেতিবাচক হওয়াও উচিত নয়।

এবার শেখ হাসিনাকে যেভাবে চীনা নেতৃত্ব লাল কার্পেট অভ্যর্থনা জানিয়েছে, সেটাও তো কম নয়। চীনা প্রিমিয়ার লি শেখ হাসিনার জন্য এক বিশেষ নৈশভোজের আয়োজন করেন। এই সফরে ৯টি দ্বিপক্ষীয় চুক্তিও হয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা হলো রোহিঙ্গার সমস্যা নিয়ে চীনের সাহায্য। দুই দেশ সব চুক্তি ও আলোচনার ভিত্তিতে একটি যুগ্ম বিবৃতিও জারি করে।

শেখ হাসিনার এই সফরের মাস্টার স্ট্রোক হলো রোহিঙ্গা নিয়ে চীনের সঙ্গে আলোচনা। রোহিঙ্গাদের জন্য চীনের বিপুল আর্থিক অনুদান, এ তো খুবই জরুরি। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে টাকার চেয়েও বড় কথা হলো মিয়ানমারের ওপর চীনের প্রভাব বাড়ানোর কৌশল। এক ঢিলে হাসিনা অনেক পাখি মেরেছেন। নির্যাতনের মুখে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে চাপ সৃষ্টি করতে হাসিনা যে আন্তরিক, দেশের মানুষের কাছে হাসিনা সে বার্তা দিয়েছেন। আবার মিয়ানমার চীনের ওপর আজ আর্থিক দিক থেকেও বিশেষভাবে নির্ভরশীল। তাই চীনকে দিয়ে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করাও হাসিনার অসাধারণ কূটনীতি। চীনকে রোহিঙ্গার বিষয়ে সক্রিয় করার কূটনীতি ভারতবিরোধিতা নয়।

তাই যাঁরা ভাবছেন চীনে হাসিনা যাওয়ায় ভারত অখুশি, তাঁরা ভুল করছেন। কূটনীতি সরল রেখায় চলে না। ১৯৭১ সালের পর থেকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কটিও কিন্তু একরৈখিক নয়। এই দুই দেশের মধ্যে একজন আয়তনে বড় আর অন্যজন ছোট বলে সম্পর্কটা একমুখী হয় না। কূটনৈতিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উভয়মুখী। নরেন্দ্র মোদি এই সত্যটি বোঝেন। এই দুই দেশের সম্পর্ক অটুট রাখতে গেলে সম্পর্কটা যাতে টেকেন ফর গ্রান্টেড না হয়ে যায় সেটা বিশেষভাবে দেখা দরকার। বিশ্বায়নের এই যুগে কোনো রাষ্ট্রই একা চলো নীতি গ্রহণ করে চলতে পারে না। বাংলাদেশের মোট সীমান্তের ৭৬.৮৬ শতাংশ ভারতের সঙ্গে আর মাত্র ৬.০৫ শতাংশ মিয়ানমারের সঙ্গে। আয়তনের দিক থেকে ভারত বাংলাদেশের তুলনায় ২৩ গুণ, পাকিস্তানের তুলনায় চার গুণেরও বেশি বড়। তবু মোদি বুঝেছেন বাংলাদেশ আজ ভারতের কাছে কতখানি জরুরি। বাংলাদেশেও মৌলবাদী ও কায়েমি স্বার্থান্বেষী কিছু মানুষ আওয়ামী লীগ চীনের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে কেন ভারতের বিরুদ্ধে চাপের রাজনীতি করছে না, এ প্রশ্ন তুলেছেন। আসলে শুধু আওয়ামী লীগ কেন খালেদা জিয়ার বিএনপিও আজ মুখে যা-ই বলুক, ভারতবিরোধী রাজনীতি করতে চাইছে না। উল্টো বিএনপির প্রতিনিধিদল এসে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। মুজিব হত্যার পর থেকেই ভারতবিরোধিতার তাস ঢাকায় সক্রিয় হয়েছে। যেমন—ভারতেও কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষ আজও বাংলাদেশ সম্পর্কে কঠোর মনোভাব নিয়ে ঢাকাকে চাপের মুখে রাখতে চায়। এই দুটি দৃষ্টিভঙ্গিই ভুল।

মুজিব হত্যার পরবর্তী সময়ে ভারতের রাজনীতিতেও সে সময় অনেক চড়াই-উতরাই গেছে। স্থায়িত্বের অভাব পরিলক্ষিত হয়েছিল। ভারতে মোরারজি দেশাইয়ের নেতৃত্বে সরকার গঠন হয়। সীমান্ত সমস্যা, ফারাক্কা সমস্যা, সীমান্তপথে অবৈধ অভিবাসন সমস্যা, নিউমুর দ্বীপের মালিকানা নিয়ে বিরোধ—এ ধরনের নানা বিষয় নিয়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে নানা বিবাদ উপস্থিত হয়। পরবর্তী সময় দুই দেশই এই সংক্ষিপ্ত বিবাদের সময় থেকে বেরিয়ে আসে। এরপর দুই দেশই দুই দেশের দ্বারা প্রভাবিত হয়। কিন্তু কখনোই সম্পর্কে কূটতা আসেনি। শওকত হাসানের

 Indo Bangladesh political Relations during The Awami League Government, ১৯৭২-১৯৭৫, অস্ট্রেলিয়া ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ১৯৭৮ সালের পিএইচডি থিসিসের বিষয় ছিল মোরারজি রাজত্বে এবং মুজিব হত্যার পর দুই দেশের মধ্যে অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক কী ছিল। একে বলা হয়েছিল  Influence Theory| আবার ১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭—এই দীর্ঘ সময় হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতের পটভূমিকেও ভুললে চলবে না।

আজ আমরা এই সময়টা পেরিয়ে চলে এসেছি। ভারত-বাংলাদেশ এরপর দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করেছে। ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তি স্থাপন করে ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী চুক্তি সম্পর্কে ভারতীয় আরএসএস সংঘ পরিবার খুশি ছিল না। অনুপ্রবেশ ও জঙ্গি তত্পরতায় পাকিস্তানের  ভূমিকা নিয়ে তারা প্রশ্ন তুলেছিল। আবার বাংলাদেশ মওলানা ভাসানীর সাতদলীয় অ্যাকশন কমিটি, মহম্মদ তোয়াহার কমিউনিস্ট পার্টি অব বাংলাদেশ (এমএল) মাওপন্থীর মতো গোষ্ঠী বিরোধিতা করে; যেমন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশ ডেমোক্রেটিক লীগ বিরোধিতা করে।

দেখুন, সেই সময়ে চীনপন্থী সাংবাদিক এনায়েত উল্লাহ খানের ইংরেজি সাপ্তাহিক হলিডে এই চুক্তির বিষয়ে নেতিবাচক অবস্থান নেয়। আবার মওদুদ আহমদের গ্রন্থ Bangladesh : An Era of Sheikh Mujibur Rahman-এও মৈত্রী চুক্তির সমালোচনা করা হয়।

আজ এ সবই অতীত। হাসিনার সফরের পর চীনা সংবাদমাধ্যম বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাফল্য শুধু তুলে ধরে না, একইভাবে এই সফর যে এই অঞ্চলের ভারসাম্য ও শান্তি রক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক ভূমিকা নেবে—সে প্রত্যাশা করা হয়েছে।

 

লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠ’র বিশেষ প্রতিনিধি

মন্তব্য