kalerkantho

শনিবার । ২০ জুলাই ২০১৯। ৫ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৬ জিলকদ ১৪৪০

দিল্লির চিঠি

মমতা কি ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন

জয়ন্ত ঘোষাল

১৭ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



মমতা কি ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন

কলকাতায় কী হচ্ছে রে?

এ কি ছিল বিড়াল হয়ে গেল নরেন্দ্র মোদি?

ভাবাই যায় না। এবার ২০২১ বিধানসভা ভোটেই নাকি বিজেপি নবান্ন দখল করে নেবে? বাঙালি ছিল বামপন্থী, হয়ে গেল রামপন্থী? কাফকার মেটোমরফোসিস! বাঙালি ডিএনএর সাংঘাতিক রূপান্তর।

অনেক বছর পর দেখা ছোটবেলার বন্ধু নিখিলেশের সঙ্গে। অধুনা মার্কিন মুলুকে বসবাসকারী প্রবাসী। দেখা হয়ে গেল বিমানবন্দরের লাউঞ্জে। কলকাতায় এসেছিল মায়ের সঙ্গে দেখা করতে। ফেরত যাচ্ছে এক অভূতপূর্ব রহস্য-রোমাঞ্চভরা জিজ্ঞাসা নিয়ে—তবে কি সত্যিই দিদি এবার গেল?

নিখিলেশকে বললাম, দ্যাখ, কেন এমন হলো সেটা আগে ঠিকমতো বিশ্লেষণ হওয়া উচিত। সেই কাজটা সুষ্ঠুভাবে করা হলে দুই বছর পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভবিষ্যৎ আলোচনাটা সহজ হবে।

নিখিলেশ গরম ক্যাপিচিনোতে এক চুমুক লাগিয়ে বলল, এ তো খুব সহজ ব্যাপার। মমতার অত্যধিক মুসলিম তোষণ নীতির জন্য রাজ্যের প্রায় ৭০ শতাংশ হিন্দু আজ রুষ্ট। তাই ধর্মীয় মেরুকরণের জন্য রাজ্যে জয় শ্রীরাম স্লোগান ক্ষুব্ধ হিন্দু বাঙালির স্লোগান হয়ে গেল। অতএব ১৮টি এমপি। হিংসাটিংসা না হলে আরো বেশি হতো।

আমি বললাম, এই ময়নাতদন্ত সরলীকরণ হচ্ছে। মানছি এ রাজ্যে হিন্দু জনসমাজের একাংশের মধ্যে মমতা সরকারের অতি সংখ্যালঘু প্রেমে বীতরাগ তৈরি হয়েছিল, আর মোদি-অমিত শাহর আজকের রাজনীতিতে এই মেরুকরণের এক জাতীয় প্রেক্ষাপট আছে। কিন্তু আসলে তৃণমূল শাসনের আট বছর পর গোটা রাজ্যে জেলায় জেলায় শাসকদল বিরোধী জনমতও খুব তীব্র হয়ে উঠেছিল। রাজ্যে মমতা বনাম সব্বাই এমন এক রাজনৈতিক মেরুকরণ খুব তীব্র হয়ে উঠেছে।

নিখিলেশ যাচ্ছে মুম্বাই। সেখান থেকে আজ রাতে নিউ ইয়র্ক ফিরে যাওয়া। স্ক্রিনে দেখাচ্ছে ওর ফ্লাইটটা এক ঘণ্টা ডিলেইড। নিখিলেশ বলল, কাকা, কেসটা কিন্তু জমে গেছে। বলো বলো, তাহলে মমতাবিরোধী অ্যান্টি ইনকমবান্সি এত হলো কেন? তোরা তো সাংবাদিক, তোরা তো সবই জানিস।

বললাম, নিখিল, তুই আমার নরেন্দ্রপুরের হাফপ্যান্টের বন্ধু। এত বড় একটা অসত্য তোকে বলি কী করে? আমরা সাংবাদিক। জ্যোতিষী নই, সেফোলজিস্টও নই। শুধু পরিস্থিতিটা ধরাতল থেকে দেখার একটা সুযোগ আছে। সেখান থেকে বলছি, রাজ্যের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিটা ভালো নয়। গোটা ভারতের কোথাও ভালো নয়। আর বাংলা তো চিরকালের বঞ্চিত, শোষিত রাজ্য।

সুতরাং বাঙালি অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে ব্যস্ত। সিন্ডিকেট, বালি মাফিয়া, গরুপাচার, জাল নোটচক্র, সরকারি প্রকল্প থেকে টাকা রোজগারের জন্য দলীয় মদদে এনজিও তৈরি, উত্তর সারদা অর্থনীতির আরো দুরবস্থা। সিরিয়াল-চলচ্চিত্র সেসব ব্যবসায়ও খরা। আর এই সংকটে বাঁচার জন্য দরকার শাসকদলের আনুকূল্য। তার জন্য দলতন্ত্রের প্রতি আনুগত্য। জেলায় জেলায় তৃণমূলের গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব, যা এখন বহু ক্ষেত্রে তৃণমূল বনাম বিজেপি বলে বর্ণিতে হচ্ছে সেটা আসলে এই ‘হ্যাভ’ আর ‘হ্যাভ নটে’র লড়াই।

আমি এবার নিখিলেশকে বললাম, বস পালাই, আমার কলকাতার ফ্লাইটের সিকিউরিটি চেক শুরু হয়ে গেছে। নিখিলেশ আমার হাতটা ধরে বলল, এবার তাহলে কী হবে সেটা তো বলে যা।

বললাম, আমাদের সাংবাদিক জীবনের আদি গুরু বরুণ সেনগুপ্ত ‘বর্তমান’ প্রতিষ্ঠার একদম শুরুর দিনে বলেছিলেন, রাজনীতির রিপোর্টিং কঠিন কেন জানো? ঘটনার একটা নিজস্ব গতি আছে। আজকের রাজনীতি নানা ঘাত-প্রতিঘাতে দুই বছর পর কোথায় গিয়ে পৌঁছবে তা আজই শেষ কথা হিসেবে বলে দেওয়া যায় না। প্রতিনিয়ত নজর রাখতে হয়। আমি আজকের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে পারি।

প্রথমত, বিধানসভা নির্বাচনে কিন্তু লড়াইটা মোদিকেন্দ্রিক নয়। মানে মোদি থাকবে না যাবে এই প্রশ্ন নিয়ে নয়। লড়াই হবে মমতাকেন্দ্রিক। পশ্চিমবঙ্গবাসী রাজ্যে নবান্নে মমতাকে ফিরিয়ে আনতে চান, না চান না? রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের ভোটব্যাংক আছে অনেকটাই। আগামী দুই বছরে বিজেপি আরো আক্রমণাত্মক হবে কোনো সন্দেহ নেই। কৈলাস বিজয়বর্গী এবং মুকুল রায়ের ভূমিকা সম্পর্কে দলের একটা বড় অংশের অসন্তোষ থাকলেও এখন লোকসভা ভোটের ফলাফল দেখার পর মুকুলের গুরুত্ব দলে আরো বেড়েছে। তাই কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার বিজেপি রাজনীতি অব্যাহত থাকবে।

তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনীতির ইতিহাস বলে তার মধ্যে ‘বাউন্স ব্যাক’ করার একটা ডিএনএ আছে। সে হলো মমতার রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য। মমতাকে সীতারাম কেশরি-সোমেন মিত্ররা একদা আন্ডার এস্টিমেট করেছিলেন, মমতা তৃণমূল কংগ্রেসকেই আসল কংগ্রেসে পরিণত করে প্রমাণ করেন কেশরি কংগ্রেস ভুল করেছিল। সিপিএম একদা মমতাকে আন্ডার এস্টিমেট করেছিল, মমতা কিন্তু দলটাকে রাজ্য থেকে সম্পূর্ণ উৎখাত করে দেখিয়ে দিয়েছিলেন। আজ কংগ্রেস সিপিএমের হিন্দু ভোট বিজেপিতে চলে গেছে, নানা কারণে তৃণমূল কংগ্রেসেও এসেছে অবক্ষয়। এখন মমতা কি পারবেন আবার ঘুরে দাঁড়াতে? বিজেপির বেশ কিছু শীর্ষ নেতার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, তাঁরাও কিন্তু মনে করছেন খেলাটা এখনো শেষ হয়নি। মমতা মমতাই।

তবে বিজেপি যেভাবে জয় শ্রীরাম এবং হিন্দিভাষী সামাজিক ও ধর্মীয় আচার-আচরণকে মোদি এবং অমিত শাহর নেতৃত্ব এই বাংলায় প্রবেশ করিয়েছেন তা অভূতপূর্ব। ১৯৫১ সালে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মতো এক বাঙালি জনসংঘের প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৫৩ সালে তাঁর মৃত্যুর পর কলকাতায় জনসংঘের বৈঠক করতে গিয়ে মেট্রোর নাইট শোতে ‘পথের পাঁচালি’ দেখেছিলেন বাজপেয়ি-আদবানি। আদবানি আমাকে বলেছিলেন, পথের পাঁচালি দেখে আমরা বুঝেছিলাম বাঙালি মননে ঢুকতে গেলে রামমন্দির নিয়ে ঢুকলে হবে না, সাংস্কৃতিক বাঙালি মনীষী জাতীয়তাবাদী বঙ্কিমচন্দ্র, স্বামী বিবেকানন্দ—এমনকি সুভাষ বোসের শরণাপন্ন হতে হবে। ১৯৭৭ সালে তথ্যমন্ত্রী হয়ে আদবানি মৃণাল সেন, মিঠুন আর মমতাশঙ্করকে নিয়ে মস্কো গিয়েছিলেন মৃগয়া ছবির পুরস্কারের জন্য। আদবানি ও মৃণাল সেনের মধ্যেও বন্ধুত্ব তৈরি হয়। আলাপ-আলোচনার একটা পরিসর বাংলার সঙ্গে হওয়া প্রয়োজন এমনটা ভেবেছিলেন বাজপেয়ি-আদবানি। বাজপেয়ি-আদবানি যা পারেননি, মোদি-অমিত শাহ তা পারলেন। ওসব বঙ্কিমচন্দ্র আর জয় মা কালী ঠাকুর পরমহংস নয় একেবারে সরাসরি হিন্দিবলয়ের রাজনৈতিক সংস্কৃতি গিলিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন। অনেকে বলছেন, আসলে সাংস্কৃতিক এবং ভাষাগত অভিগ্রহণ এখন অনেক বেড়ে যাওয়ায় বাঙালি নিজেই নিঃশব্দে পরিবর্তিত হয়েছে। ষাটের দশকের হিন্দিবিরোধী আন্দোলন আজ আর তাই সফল হবে না।

মূল প্রশ্নটা হলো তাই এই জয় শ্রীরামের যে স্লোগান কি অস্থায়ী ঝড় নাকি বাঙালির পরিবর্তিত ডিএনএ? সে ক্ষেত্রে জয় শ্রীরামের স্লোগানে মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং যাতে দমননীতি গ্রহণ করেন, গ্রেপ্তার করেন এমনটাই চাইছে বিজেপি। বিজেপির ধারণা, তাতে মেরুকরণের ভাবনা আরো তীব্র হবে। যেমন—বিজেপি চাইছে ৩০ শতাংশ মুসলমান সমাজের জন্য প্রকাশ্যে আরো উগ্র সমর্থনের পথে যায়, বিজেপি সে ব্যাপারে তৃণমূল নেত্রীকে আরো প্ররোচিত করবে। নিখিলেশ সব শেষে বলল, বাঙালির এই নিঃশব্দ পরিবর্তন বিশেষত কংগ্রেস ও সিপিএমের এহেন অপমৃত্যু মমতা টের পাননি, বোধ হয় তাই দেরি হয়ে গেছে। মাত্র দুই বছরে ভোটারের মন কি ইউটার্ন নিতে পারবে?

লাউঞ্জ থেকে ওঠার আগে বন্ধুবরকে বলে এলাম, মোদি আর মমতা দুজনের মধ্যেই এক প্রচণ্ড মিল আছে। দুজনেই মাটি থেকে উঠে আসা নেতা। দুজনেরই প্রখর কমনসেন্স। খুঁটিনাটি নজর। আর দুজনেই আনপ্রেডিকটেবল। 

মোদি দেশের প্রধানমন্ত্রী, তাঁর অভিজ্ঞতার এক্সপোজার ও ক্ষমতা আরো বেশি। কিন্তু নিখিলেশ, আমার মনে হয় মমতা এখনো হার স্বীকার করে বানপ্রস্থে যেতে কিন্তু রাজি নন। একটা এমপি শুধু মমতা জিতেছিলেন এমন ভোটও আমরা দেখেছি। তারপর আবার মমতার রেজারেকশনও দেখেছি। আপাতত আমার রায় ‘রিজার্ভড’ রাখলাম। বলতে পারি এমন লড়াই পশ্চিমবঙ্গ আগে কখনো দেখেনি।

লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠ’র বিশেষ প্রতিনিধি

মন্তব্য