kalerkantho

রবিবার । ২১ জুলাই ২০১৯। ৬ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৭ জিলকদ ১৪৪০

রাজনীতিতে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-সংঘাত

ড. সুলতান মাহমুদ রানা

১৭ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



রাজনীতিতে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-সংঘাত

গতানুগতিক ধারা থেকে কিছুটা বের হয়ে ভিন্ন রাস্তায় ধাবিত হচ্ছে বাংলাদেশের রাজনীতি। দীর্ঘদিন থেকেই আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রতিদ্বন্দ্বী দল থাকলেও এখন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাত্রা আগের মতো নেই। আওয়ামী লীগের একটানা দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকায় বিএনপির অবস্থা যথেষ্ট দুর্বল হয়ে পড়েছে। মাঠে বিএনপি না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা চোখে পড়ার মতো আকার ধারণ করেছে। রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ক্ষমতা পাশাপাশি অবস্থান করায় শক্ত প্রতিপক্ষ ক্রমেই দুর্বল হওয়ায় নিজের দলের মধ্যে দ্বন্দ্ব, সংঘাত ও কোন্দলের মাত্রা বেড়েছে যথেষ্ট। বিশেষ করে একই ব্যক্তি বারবার সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়ায় এবং দলের অন্য নিবেদিতরা বঞ্চিত হওয়ায় অন্তঃকোন্দলের মাত্রা বেড়েছে। এসব বঞ্চনা থেকে প্রতিপক্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার বেশ কিছু দৃশ্যমান পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে আওয়ামী লীগের মধ্যে। জাতীয় রাজনীতি থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজ অঙ্গসংগঠনগুলোতেও দ্বন্দ্ব ক্রমেই বেড়ে চলেছে।

গত মাসে রংপুরে আইনজীবী সমিতির নির্বাচন ঘিরে আওয়ামী লীগপন্থীদের মাঝে দ্বন্দ্বের কারণে সরকারি দল একক কোনো প্যানেল দিতে পারেনি। আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীদের তিনটি প্যানেল পৃথকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। গত ১৮ এপ্রিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক সমিতির নির্বাচনে সরকারপন্থী প্যানেলের সভাপতি পদসহ বেশ কয়েকটি পদে পরাজয়েরও অন্যতম কারণ অভ্যন্তরীণ কোন্দল। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা নিয়েও প্রকাশ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সরকারি দলের এমন সহযোগী সংগঠনগুলোর অন্তঃকোন্দলের মাত্রা যেমন বেড়েছে, মূল দলেও এই মাত্রা অনেক ক্ষেত্রে অধিকতর হয়েছে। জেলা পরিষদ, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সময় বিভিন্ন স্থানে দলের ভেতর বিরোধ তৈরি হয়েছে, যার জের এখনো রয়ে গেছে। তা ছাড়া এলাকায় প্রভাব বিস্তার ও বৈষয়িক স্বার্থসংশ্লিষ্ট কারণেও বিরোধ বা সংঘর্ষ হচ্ছে। কোনো ঘটনায় স্থানীয়ভাবে তাত্ক্ষণিক সাময়িক বহিষ্কার করা হলেও পরে তা চূড়ান্ত করার দীর্ঘ প্রক্রিয়া বাস্তবায়িত হয় না বললেই চলে।

এ ছাড়া বিএনপি ও জামায়াত থেকে অনেকেই বিভিন্নভাবে আওয়ামী লীগে এসে ভিড়ছে। স্থানীয় নেতাদের কেউ কেউ নিজেদের গ্রুপ ভারী করতে তাদের স্থান করে দিচ্ছেন এবং কাছে টানছেন। এতে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব আরো বাড়ছে। অনুপ্রবেশকারীরা আওয়ামী লীগে যোগ দিলেও আওয়ামী লীগের রাজনীতি ও আদর্শ ধারণ করছে না। পুরনো রাজনৈতিক আদর্শ ও অপকর্ম থেকেও বেরিয়ে আসেনি। এর ফলে নানা ধরনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে, যার দায়ভার আওয়ামী লীগের ওপরই পড়ছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে অনুপ্রবেশকারীরাই সরকারের নানা সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে মূল দলের নিবেদিতদের তুলনায়। এসব কারণে সরকারি দলের রাজনীতিতে যথেষ্ট চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়েছে। দলের নেতাকর্মীদের চাওয়া-পাওয়ার হিসাব-নিকাশে কিছুটা উদ্বেগ-উত্তেজনা, ক্ষোভ এবং নানা ধরনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সূত্রপাত হয়েছে। সরকারের আত্মবিশ্বাসের মাত্রা যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই এমন পরিস্থিতির সূত্রপাত এবং তা মোকাবেলা করার বিষয়ে চিন্তার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

সরকার পরিচালনায় প্রধানমন্ত্রীর আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে রয়েছে। সাম্প্রতিককালে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য-বিবৃতি, কার্যক্রম ও অর্জন আত্মবিশ্বাসের বিষয়টি প্রমাণ করছে বারবার। ইদানীং প্রধানমন্ত্রীর এমন আত্মবিশ্বাস বিএনপির জন্য ক্রমেই কাল হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আর সরকারের এই আত্মবিশ্বাসের বিষয়টিতে বিএনপির জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে। অর্থাৎ একদিকে আত্মবিশ্বাস বাড়ছে, অন্যদিকে নিজেদের যথাযথভাবে মজবুত করতে না পারার দীর্ঘশ্বাস হচ্ছে। বর্তমানে উন্নয়ন ও পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সুশাসনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ই বহির্বিশ্বের কাছে সরকারের অন্যতম প্লাস পয়েন্ট সৃষ্টি করেছে। কিন্তু দলের অভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা সচেতন মহলকে যথেষ্ট ভাবিয়ে তুলেছে। সংগত কারণেই আগামী দিনগুলোতে আওয়ামী লীগের রাজনীতির মাঠে নিজেরাই নিজেদের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ানোর শঙ্কা তৈরি করেছে।

এ ক্ষেত্রে উল্লেখ না করলেই নয় যে দ্বন্দ্ব-অবিশ্বাস আর সন্দেহের ঘূর্ণিপাক থেকে এখনো বিএনপি বের হতে পারেনি। দলের নেতাকর্মীরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ সৃষ্টি করেই যাচ্ছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন প্রতিহত করার কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে সাংগঠনিকভাবে যে বিধ্বস্ত অবস্থায় চলে গেছে, সেখান থেকে বের হয়ে আসার কোনো সুযোগ সর্বশেষ একাদশ সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে আনতে পারেনি। আন্দোলন-সংগ্রাম করে সরকারকে চাপে ফেলে বিএনপির দাবি আদায়ের স্বপ্ন অধরাই থেকে গেছে। রক্ষণশীল ইসলামী রাজনীতির ধারও অনেকটাই ভোঁতা হয়ে গেছে। এই মুহূর্তে বিএনপি জোটের পক্ষে সাংগঠনিকভাবে একটা ফলপ্রসূ আন্দোলন গড়ে তোলা অসম্ভব।

বিএনপির যে অবস্থা এখন বিরাজমান, তাতে দলটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে নানা নেতিবাচক শঙ্কা জাগছে। এর মধ্যে প্রধান প্রশ্ন হলো—বিএনপি কি পথ হারিয়ে ফেলেছে? সরকারবিরোধী আন্দোলন করা কিংবা ক্ষমতায় থেকে বিরোধী দলের আন্দোলন দমনে বারবার আওয়ামী লীগের কাছে ‘ধরাশায়ী’ হয়েছে বিএনপি। সাংগঠনিক দুর্বলতা, দলের শীর্ষপর্যায়ের নেতৃত্বে আমলা, ব্যবসায়ী, সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের প্রতি অতিনির্ভরশীলতা ও তৃণমূল নেতারা উপেক্ষিত হওয়ায় বিএনপির আজ এ অবস্থা বলে মনে হয়। আন্দোলন করার জন্য পরিস্থিতি ও পরিবেশ সব সময় এক থাকে না। বিশেষ করে রাজপথের আন্দোলন করতে হলে একটি দলের বা সংগঠনের একটি মজবুত সাংগঠনিক অবস্থা থাকতে হয়। সাংগঠনিকভাবে তাদের জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে হয়। কিন্তু বিএনপি তা করেনি কিংবা করতে পারেনি। এখনো সামনে অনেক সময় আছে, বিএনপি তাদের ভুল শোধরাতে পারে। সরকারের ব্যর্থতাগুলোকে জনগণের সামনে তুলে ধরে, সব নেতিবাচক কার্যক্রম পরিহার করে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে গেলে অনেক দূরে যাওয়া সম্ভব। এতে প্রয়োজনে জামায়াতের সঙ্গে স্থায়ী মৈত্রীর সম্পর্ক ত্যাগ করে ইতিবাচক গণতান্ত্রিক রাজনীতির ধারাবাহিকতায় এগিয়ে যাওয়া যেতে পারে। আর আওয়ামী লীগেরও নিজেদের রাজনৈতিক ভিত্তি মজবুত করার জন্য ক্ষমতায় থাকা উচিত। মনে রাখতে হবে, শুধু ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকাই প্রকৃত সাফল্য নয়। প্রকৃত সাফল্য হচ্ছে নিজ দলের সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত রেখে দেশের সার্বিক মঙ্গল তথা সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল মিটিয়ে আগামীর পথ চলার ক্ষেত্র সুপ্রসন্ন রাখা। তা না হলে দেশের গণতান্ত্রিক উৎকর্ষে নিজেরাই নিজেদের বাধা হিসেবে দেখা দিতে পারে।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 

 

মন্তব্য