kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৪ অক্টোবর ২০১৯। ৮ কাতির্ক ১৪২৬। ২৪ সফর ১৪৪১       

এবারের সংগ্রাম সমৃদ্ধির উন্নতির

ড. হারুন রশীদ

১৫ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



এবারের সংগ্রাম সমৃদ্ধির উন্নতির

মার্চ বাঙালির জীবনে এক অনন্য চেতনাদীপ্ত মাস। ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় মার্চের প্রতিটি দিনই অত্যন্ত ঘটনাবহুল এবং তাৎপর্যময়। রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন সংগঠন মাসজুড়েই নানা কর্মসূচি পালন করে। গণমাধ্যমও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে অগ্নিঝরা মার্চের মহিমাকীর্তন করে। তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ, ২৫শে মার্চে পাকিস্তানি জান্তার সার্চলাইট অপারেশন চালিয়ে নির্বিচারে বাঙালি নিধন, বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া, গ্রেপ্তার হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা—সর্বোপরি মুক্তিকামী জনতা একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের জন্য আনুষ্ঠানিক রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে এই মার্চ থেকেই।

উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাঙালি যে তার অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীনতা আন্দোলনের পথে এগোচ্ছিল, তা স্পষ্ট হয়ে যায় এই মার্চেই। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে ঐতিহাসিক ভাষণ দেন, তাতেই স্পষ্ট হয়ে যায় অনেক কিছু—যে ভাষণে বঙ্গবন্ধু তাঁর কণ্ঠে বজ্রনিনাদে ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এই ঘোষণার পর বাঙালির মধ্যে দেখা গেল এক নতুন উজ্জীবন। তাদের আর বুঝতে বাকি রইল না, স্বাধীনতার লাল সূর্য ছিনিয়ে আনতে এবার একটা কিছু করতেই হবে। ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণেই বঙ্গবন্ধু ‘যার হাতে যা আছে’ তা-ই নিয়ে প্রস্তুত থাকতে বললেন। ‘আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি’ বলে তিনি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার আহ্বান জানালেন। এই দুর্গ গড়ে তোলার অর্থ যে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশনা, তা বুঝতে কারো বাকি রইল না। শত্রুর মোকাবেলা করার দৃপ্ত আহ্বানও ভেসে উঠল তাঁর বজ্রকণ্ঠে। সেনাবাহিনীর প্রতিও তিনি উচ্চারণ করলেন সতর্কবাণী। প্রয়োজনে খাজনা-ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়ার কথাও বললেন তিনি। সত্তরের নির্বাচনে যে ম্যান্ডেট তিনি পেয়েছিলেন, বস্তুত সেই ম্যান্ডেটই তাঁকে প্রচণ্ডরূপে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছিল। এ কারণে বাঙালি জাতিকে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম ভূখণ্ড উপহার দিতে সক্ষম হয়েছিলেন ইতিহাসের এই মহানায়ক।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ভাষণকে ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে ইউনেসকোর স্বীকৃতিও আমাদের জন্য এক অনন্য পাওয়া। ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর প্যারিসে ইউনেসকোর প্রধান কার্যালয়ে স্বীকৃতির এ ঘোষণা দেন মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণকে ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ‘মেমরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টার’-এ তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

এবারের মার্চ এসেছে এমন এক সময়ে, যখন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো বাংলাদেশের শাসনক্ষমতায়। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু হচ্ছে। স্বপ্নের পদ্মা সেতু এখন দৃশ্যমান বাস্তবতা। অথচ পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক ঋণচুক্তি বাতিল করেছিল। একই পথ অনুসরণ করেছিল অন্য উন্নয়ন সহযোগীরাও। পদ্মা সেতু প্রকল্পে সম্ভাব্য দুর্নীতির পরিপ্রেক্ষিতে মামলা হয় কানাডার একটি আদালতেও। এরই মধ্যে সে মামলার রায়ে আদালত একে নিছকই ‘অনুমান ও গুজব’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। দুর্নীতির অভিযোগটি শুধু কিছু ব্যক্তি, সরকারের বিরুদ্ধে ছিল না। ছিল বাংলাদেশের বিরুদ্ধেও। এ কারণে চরম অস্বস্তির মধ্যে পড়তে হয় সরকারকে। তখনকার যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে সরে যেতে হয়। একজন সচিব ও একজন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল।

বিশ্বব্যাংক ঋণচুক্তি বাতিল করার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজস্ব অর্থায়নেই পদ্মা সেতু করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। এতে দেশে এক অভূতপূর্ব জনজাগরণের সৃষ্টি হয়। সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে এক অভিনব দেশাত্মবোধের উন্মেষ ঘটে।

বিশ্বব্যাংকের হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে মাসুল গুনতে হচ্ছে দেশের মানুষকে, যদিও নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু হচ্ছে। নানামুখী অসুবিধা ও প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও পড়তে হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের আচরণ ছিল স্পষ্টতই অপেশাদারি। এর পেছনে দেশে-বিদেশে অনেকেই কলকাঠি নেড়েছে—এমন অভিযোগও আছে। এই সেতু এখন আর স্বপ্ন নয়, বিশ্ববাসীর সামনে দৃশ্যমান এক বাস্তবতা। বাংলাদেশ যে অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে, তার প্রমাণ পদ্মা সেতু।

ভুলে গেলে চলবে না, এটি মার্চ মাস। এবং এই মাসেই বাঙালি তার চেতনাকে নতুন করে শাণিত করে। নতুন শপথে বলীয়ান হয়। অত্যাচার, নিপীড়ন আর নির্যাতনের বিরুদ্ধে স্মারক মাস হিসেবে মার্চ প্রতিবারই আমাদের নতুন করে পথ দেখায়। তাই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি, গণতন্ত্রে বিশ্বাসী সব মানুষ, দেশপ্রেমিক দলকে চেতনাদীপ্ত মার্চে নতুন করে শপথ নিতে হবে।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

[email protected]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা