kalerkantho

বুধবার । ১৬ অক্টোবর ২০১৯। ১ কাতির্ক ১৪২৬। ১৬ সফর ১৪৪১       

নাৎসিবাদ ইইউ এবং আগ্রাসন

অ্যালেস্টেয়ার ক্রুক

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নাৎসিবাদ ইইউ এবং আগ্রাসন

‘ইউরোপীয় ব্যবস্থা’র খুঁটি হিসেবে পরিচিত ফ্রাংকফুর্টের পত্রিকা আলগেমেইনার গত মাসে একটি উপসম্পাদকীয়তে প্রশ্ন তুলেছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন কি নাৎসি হয়ে উঠছে? ইইউ কি ক্রমেই জার্মান জাতীয় সমাজতন্ত্রের সম্প্রসারিত রূপ হয়ে উঠছে? এর আগে জার্মান গণমাধ্যমে এমন আলোচনা আর হয়নি। বোঝা গেল, ইউরোপে ভিন্নমতের যে প্রসার ঘটেছে তার কারণ শুধু মানুষের ক্ষোভ-হতাশা নয়, অন্য কারণও রয়েছে।

উপসম্পাদকীয়র লেখক ইয়াসপার ফন আলটেনবকুম দলীয় সম্মেলনে এএফডিয়ের (অল্টারনেটিভ ফর ডয়েচেল্যান্ড) নেতা আলেকজান্ডার গাওল্যান্ডের বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। গাওল্যান্ড বলেছেন, ইইউর দুর্নীতিপুষ্ট, ফাঁপা, অগণতান্ত্রিক কর্তৃত্বপরায়ণ প্রবণতার কোনো ভবিষ্যৎ থাকা উচিত নয়। ইউরোপীয় অধিজাতিক (সুপ্রান্যাশনাল) প্রতিষ্ঠানগুলোতে গণতান্ত্রিকতার অভাব নিপীড়নমূলক প্রশাসনের জন্ম হয়েছে। অন্যদিকে ইউরোপের একীভূতকরণের শীর্ষ বিরোধীরা ইইউর চিন্তাধারাকে জাতীয় সমাজতন্ত্রের ইউরোপীয় চিন্তাধারার সমরূপ মনে করেন।

আলটেনবকুম বলেছেন, শুধু গাওল্যান্ড ও এএফডি নয়, জাতীয় সমাজতন্ত্রী (নাৎসি) যুগের ধারণার সঙ্গে ইউরোপীয় প্রকল্পের ধারণার সংযোগ ইতিহাসবিদরাও দেখতে পেয়েছেন। ২০০২ সালে হিটলারের জীবনী-রচয়িতা টমাস স্যান্ডকুহলার বলেছিলেন, ইউরোপের রাজনৈতিক ত্রুটিবিচ্যুতির বিষয়ে তর্ক না করে বরং ঐক্যের বিষয়ে প্রচুর আলোচনা করা উচিত।

হিটলার জার্মান ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট পার্টি নামের দল প্রতিষ্ঠা করার পর ‘ন্যাশনাল’ শব্দটি আলোচনায় এলেও তিনি জাতীয়তাবাদের একনিষ্ঠ সমর্থক ছিলেন না। তিনি শুধু প্রটেস্টান্ট ওয়েস্টফালিয়ান ধারণার বড় সমালোচকই ছিলেন না, জাতিরাষ্ট্রের ধারণারও বড় সমালোচক ছিলেন। এসব ধারণাকে তিনি জার্মান সাম্রাজ্যের মূল্যবোধের তুলনায় নিকৃষ্ট মনে করতেন। জাতিরাষ্ট্রের পরিবর্তে তিনি জার্মান নিয়ন্ত্রিত ‘পবিত্র রোমীয় সাম্রাজ্য’-এর ‘ফার্স্ট রাইখ’-এর আদলে ‘থার্ড রাইখ’ প্রতিষ্ঠা করেন। হিটলারের জার্মানি সব অর্থেই ছিল সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র।

ইউরোপের রাজনীতির ইতিহাসের নিরিখে পশ্চিমা দেশগুলোকে দুটি ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। একটি ব্যবস্থা স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতিগুলোর, যাদের প্রত্যেকের নিজস্ব ঐতিহ্য ও রাজনীতি রয়েছে। অন্যটি একক কর্তৃত্বাধীন সরকারব্যবস্থা, যা অধিজাতিক কর্তৃপক্ষের দ্বারা পরিচালিত। জার্মানি ছিল দ্বিতীয় ব্যবস্থার অনুসারী। এমন ব্যবস্থা প্রাচীন বেবিলনীয় সাম্রাজ্য থেকে শুরু করে রোমীয় সাম্রাজ্যেও ছিল।

‘উদার ইইউ’-এর ভিত্তি জন লকের ‘সেকেন্ড ট্রিটিজ অন গভর্মেন্ট’ নামের প্রবন্ধ। তাঁর মতে, বৈধ রাজনৈতিক ব্যবস্থার একটি মাত্র মূলনীতি—ব্যক্তির স্বাধীনতা। তাঁর ধারণা প্রটেস্টান্ট মতবাদপ্রসূত। তাঁর ভাষ্য, মানুষ জন্মগতভাবে সম্পূর্ণ মুক্ত এবং সমান। এ ধারণার ভিত্তিতেই তিনি রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও সরকারবিষয়ক তত্ত্ব হাজির করেন। এর ভিত্তিতেই আধুনিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।

কখনো স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক তত্ত্ব এবং আন্তর্জাতিক আইন অন্যদের স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠতে পারে। আলটেনবকুম বলেছেন, এএফডিতে গাওল্যান্ডের মতো অনেক নেতা আছেন, যাঁরা প্রাচীন ঐতিহ্য অনুসারে ভারসাম্য ফিরে পেতে চান। কিন্তু এটা কখনো সম্ভব নয়। ইইউ প্রকল্পকে টিকিয়ে রাখতে অনেক বিনিয়োগ এরই মধ্যে হয়ে গেছে।

গাওল্যান্ডের কাছে ব্রেক্সিট বিষয়টি বেশ অর্থবহ। এটা শুধু এ কারণে নয় যে ইউরোপে জার্মানির প্রভাবের বিষয়ে ব্রিটিশরা বিরক্ত। কারণ এটাও—ব্রিটেন সর্বদা জার্মানির বিরুদ্ধাচরণ করেছে। লক জাতিরাষ্ট্রকে শক্তিশালী দেখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মানবসমাজের বৈশিষ্ট্যগুলোকে তিনি অবহেলা করেছেন বা এড়িয়ে গেছেন। মানুষের বংশানুক্রমিক বুদ্ধিবৃত্তি এবং আত্মিক ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের বিষয়গুলোকে তিনি এড়িয়ে গেছেন। ফলে সমাজকে বেঁধে রাখে এমন বিষয়গুলো ক্ষয় পেতে থাকে।

ইউরোপের পররাষ্ট্রনীতি বুঝতে গেলে এই কাঠামো বুঝতে হবে। লিবিয়ায় অভিযান চালিয়ে কী পরিণতি হয়েছে তা দেখার পরও ইউরোপীয় নেতারা কী করে ভেনিজুয়েলায় হামলা চালানোর কথা ভাবতে পারে অথবা অভিযানে সহায়তা করতে পারে? অথবা সিরিয়ার পুনর্গঠনে আর্থিক সহায়তা বন্ধ করার আগ্রহ প্রকাশ করতে পারে? সে কথা এ কাঠামোর নিরিখেই বোঝা সম্ভব।

ইইউকে ‘প্রছন্ন কর্তৃত্ববাদী’ বলে গাওল্যান্ড বাড়াবাড়ি করে ফেলেছেন কি? এ ব্যাপারে ওয়ানিস ভারৌফাকিস ভালো বলতে পারবেন। গ্রিসের অর্থমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি বলেছিলেন, ‘আমি ও আমার সহকর্মীরা কঠোর পরিশ্রম করে কয়েকটি প্রস্তাব তৈরি করি। ব্রাসেলসে গিয়ে গ্রিস যাদের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছে, তাদের সামনে এগুলো উপস্থাপন করি। লক্ষ করলাম, তারা শ্যেনদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে—আমি যেন কোনো কথাই তাদের জানাইনি। বিষয়টি স্পষ্ট, তাঁদের সামনে যে কাগজপত্র আছে সেসবের অস্তিত্ব তাঁরা স্বীকার করেন না। আমার কথা তাঁদের কাছে কোনো গুরুত্ব বহন করে না।’

লেখক : সাবেক ব্রিটিশ কূটনীতিক, বৈরুতভিত্তিক কনফ্লিক্ট ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক

সূত্র : স্ট্র্যাটেজিক কালচার জার্নাল (অনলাইন)

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা