kalerkantho

বুধবার । ১৬ অক্টোবর ২০১৯। ১ কাতির্ক ১৪২৬। ১৬ সফর ১৪৪১       

উন্নয়নের সঙ্গে গণতন্ত্র ও সুশাসনে গুরুত্ব দিন

এম হাফিজউদ্দিন খান

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



উন্নয়নের সঙ্গে গণতন্ত্র ও সুশাসনে গুরুত্ব দিন

নতুন সরকার গঠনের পর আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারের সব ধরনের কাজকর্মও শুরু হয়েছে। সংসদে অধিবেশন থেকে শুরু করে নতুন অনেক কাজের পরিকল্পনা, অনুমোদন ও যাত্রা শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও থেমে নেই। কিন্তু যে জিনিসটির সবচেয়ে বড় ঘাটতি দেখতে পাচ্ছি—গণতন্ত্র নেই। বিরোধী দল নেই। বিরোধী দলের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সুযোগ ও পরিবেশও দেখা যাচ্ছে না। রাজনীতি ও গণতন্ত্রের চর্চা—যা কিছুই বলি না কেন, সবকিছু একতরফা হচ্ছে আর কি। গণতন্ত্রও থেমে নেই। কিন্তু সেখানে বিরোধী কোনো পক্ষ নেই। ফলে একতরফা কোনো কিছু হলে যা হতে পারে, তা-ই হচ্ছে। দেশ ও সমাজ নিয়ে যাঁরা ভাবনাচিন্তা করেন, তাঁদের জন্য এটা এক হিসেবে অত্যন্ত হতাশার বিষয়।

গণতন্ত্র ছাড়া যে রাজনীতি, সেটাকে আমরা কোনো রাজনীতি বলতে চাই না। বলতে পারি না। কারণ সবই যদি একতরফা হয়, সেখানে গণতন্ত্র কিভাবে থাকবে? এটা তো হতে পারে না।

গণতন্ত্রের প্রাথমিক শর্তই হচ্ছে একটি নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। সেটা তো এখানে নেই। তেমন নির্বাচন তো হচ্ছে না। বিগত সময়ের নির্বাচনে তবুও কিছুটা জোরজবরদস্তি কম ছিল। পক্ষপাত ও প্রভাব ছিল, এখনকার মতো এত বিশাল আকারে ছিল না। ফলে নির্বাচন নিয়ে সুষ্ঠু ধারণাও এখন করা যায় না। তাহলে নির্বাচনই যদি সুষ্ঠু ও অবাধ না হয়, গণতন্ত্র কিভাবে থাকতে পারে?

যতই ঢাকঢোল পিটিয়ে গণতন্ত্রের কথা বলা হোক, গণতন্ত্র চর্চার পরিবেশ ও অনুকূল লক্ষণগুলো যদি বাস্তবায়ন না করা যায়, তাহলে কোনো লাভ হবে না।

নির্বাচনের পরে গণতন্ত্র ও রাজনীতির সুষ্ঠু চর্চা নিয়ে আমি অত্যন্ত হতাশ। একক নীতির সংস্কৃতি যদি চালু হয়ে যায়, তাহলে তো মুশকিল। তবে এরই মধ্যে একটা আশার আলো দেখতে পাচ্ছি—নির্বাচনের পরে, সম্প্রতি ঐক্যফন্টের ৭৪ জন নেতা তাঁদের নিজ নিজ আসনে নির্বাচনের অনিয়ম ও গোলযোগ নিয়ে মামলা করেছেন। এটা নিয়ে তাঁরা কত দূর যেতে পারবেন, কী হবে—কিছুই বলা যাচ্ছে না। কিন্তু এমন একটি উদ্যোগ শুরু হয়েছে, এটাকে আমি অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে দেখছি। এর একটা বিশেষ গুরুত্ব আছে। কোর্ট এ বিষয়ে কী বলেন এবং কী রায় দেন, তা আমরা দেখার অপেক্ষায় আছি। যদিও অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, যাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে, তাঁদের প্রায় সবাই সরকারদলীয় এমপি। ফলে নিরপেক্ষ এবং সুষ্ঠু বিচার পাওয়া নিয়ে দীর্ঘসূত্রতার ব্যাপার আছে। এটা ঘটতে পারে। এটা একটা বিশেষ পরীক্ষাও জুডিশিয়াল আদালতের জন্য। নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে আমরা খুবই আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি, নির্বাচন কমিশনের ট্রাইব্যুনাল কী ব্যবস্থা নেন তা দেখার জন্য।

আর একটি বিষয় সামনে এসেছে। উপজেলা নির্বাচন। নির্বাচনের তফসিলও ঘোষণা হয়েছে। সে জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি ও আয়োজন চলছে। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের পর উপজেলা নির্বাচন নিয়ে খুব একটা আশা করতে পারছি না। জাতীয় নির্বাচন কেমন হয়েছে, সেটা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। কাজেই উপজেলা নির্বাচন নিয়ে খুব একটা আশা দেখছি না। একতরফা নির্বাচনই হবে—সেটাই মনে হয়। তবুও আশা পোষণ করতে তো দোষ নেই। সেই হিসেবে আশা করে দেখতে চাই, নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু ও অবাধ হয়। আমাদের দেশে জাতীয় নির্বাচনের পর যেসব নির্বাচন হয়, সাধারণত সরকারদলীয় প্রতিনিধিরাই জয়লাভ করেন। কেন করেন? সেটা অন্য বিবেচনা। এ বিষয়ে বেশি কিছু বলার নেই। দেখা যাক, উপজেলা নির্বাচন কেমন হয়, নির্বাচন কমিশন কিভাবে তা পরিচালনা করে। এখানে তো বিরোধী দল থাকছে না। ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। বিএনপিও থাকছে না। আওয়ামী লীগ এককভাবে নির্বাচনে থাকছে, অবস্থাদৃষ্টে এমনটাই মনে হচ্ছে। দেখা যাক, সময় এলে বোঝা যাবে।

একটা সময় ছিল, যখন জাতীয় নির্বাচন যেমনই হোক, উপজেলায় খুব বেশি একটা প্রভাব পড়ত না। সে ক্ষেত্রে বিএনপি প্রার্থীও জয়লাভ করেছেন। ক্রমাগতভাবে সরকারি দল খারাপ করছিল, বিএনপি ভালো করছিল। পরে তো অবস্থা বদলে গেল। বিশেষ ব্যাপার ঘটতে লাগল। এখন আর সে পরিবেশটাও নেই। কাজেই বলা যাচ্ছে না, এটা কী রকম নির্বাচন হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হবে খুব সম্প্রতি। ছাত্ররাজনীতি তো অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। সুষ্ঠু ও সুশৃঙ্খল রাজনীতির চর্চায় অতীতেও ডাকসুর অনেক বড় ভূমিকা আমরা দেখেছি। ডাকসু থেকেই অনেক জাতীয় নেতা উঠে এসেছেন। বহু বছর পর ডাকসু নির্বাচন হতে যাচ্ছে। হোক। ছাত্ররাজনীতিতে প্রাণের সঞ্চার হোক। এটা খুবই ভালো বিষয়। কিন্তু এখানে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে—কেমন নির্বাচন হবে, কে জিতবে, কে হারবে—তা নিয়ে বলা শক্ত। তবে অবস্থাদৃষ্টে যা মনে হয়, নতুন কোনো দলের কারো পক্ষে এখানে আসন পাওয়া সহজ হবে না। সেই অবকাশ খুব একটা আছে বলে মনে হয় না। কাজেই সরকারি দলের কর্মীদের না এসে উপায় নেই। যারা এই নির্বাচনের কমিটিতে আছে, যারা নেতৃত্ব দিচ্ছে, নির্বাচন কমিশন এবং প্রশাসন—সবাই তো সরকারি দলের লোক। সরকারি দলের বাইরের যেসব ছাত্রসংগঠন, তারা কিছু দাবিদাওয়া পেশ করেছিল, সেসবের একটা দাবিও মানা হয়নি। ফলে অপেক্ষা করা ছাড়া এর ভালো-মন্দ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু বলার নেই। অনেক দিন পর ডাকসু নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্যভাবে অনুষ্ঠিত হলে পরে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই নয়, সব প্রতিষ্ঠানেই ছাত্ররাজনীতিতে যে প্রেরণা ও প্রাণের সঞ্চার হতে পারে বলে যে আশাবাদ ব্যক্ত করা হচ্ছে, তাতে হাওয়া লাগবে কি না বলতে পারছি না।

সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল থাকলে আন্দোলন করে অনেক কিছু আদায় করে নেওয়া যায়। এখন তো বিরোধী দলই নেই। আছে বটে, সেটাকে বলা যেতে পারে সরকারি বিরোধী দল। তারা নিয়মানুযায়ী বিরোধী দলের যে ভূমিকা সেই স্তরে যেতে পারবে বলে মনে হয় না। আশা করাও বৃথা। আর এখানে আসলে নির্বাচনী পরিবেশ ও গণতন্ত্রের ভিতটা এমনভাবে ভেঙে দেওয়া হয়েছে, বিরোধী শক্তিকে দাঁড়ানোর সুযোগই দেওয়া হচ্ছে না। এভাবে তো চলতে পারে না। এটাও সত্য, চলছে তো। বিরোধী জোটকে বড় কোনো আন্দোলন গড়ে তোলার সুযোগই দেওয়া হচ্ছে না। এটা গণতন্ত্রেরই ক্ষতি। বিরোধী দল হিসেবে যারা বর্তমান আছে, তারা কিন্তু সরকারের বিবেচনায় নেই। বিরোধী দল আছে তাদেরই মহাজোট থেকে। জাতীয় পার্টি থেকে। ফলে ঐক্যফ্রন্ট বা বিএনপির জন্য মানুষের কাছে যাওয়া এবং মানুষকে গণতন্ত্র বা তাদের সঙ্গে একীভূত করার যে একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া, তাতে ভেড়ানোটা সহজ হবে বলে মনে হয় না। এটা শুধু বাংলাদেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির ক্ষতি, এমন নয়। আগেও বলেছি, এটা সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের রাজনীতি ও গণতন্ত্রের জন্যই একটা মন্দ ব্যাপার আর কি। এতে তো বিরোধী দলের বলার বা করার কিছু নেই।

দেশের উন্নয়ন অবশ্যই দরকার। কিন্তু গণতন্ত্রও জরুরি প্রয়োজন। গণতন্ত্রহীন উন্নয়ন খুব একটা সুফল বয়ে আনে না। এ জন্য আমরা বারবার বলে আসছি কিংবা আমাদের চাওয়া তো এটাই—গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে আইনের শাসনও প্রতিষ্ঠিত হবে। দেশ এগিয়ে যাবে। তখন উন্নয়নটাও বিশেষ গুরুত্ব পাবে।

সবকিছু মিলিয়ে দেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে রাজনীতি, সামাজিক সুশাসন ও গণতন্ত্র নিয়ে আমি হতাশা ছাড়া কোনো আশার আলো দেখতে পাচ্ছি না। দেশের উন্নয়ন ও পরিকল্পনার অভিযাত্রাকে পাশে রেখেই গণতন্ত্র ও সুশাসনে জোর দিতে হবে। কী হবে সামনে, কিছুই জানি না। তবুও আশায় আছি, যদি আমাদের মন ও মত বদলায়। সুষ্ঠু ও শুদ্ধ চেতনার উন্মেষ ঘটে, তাহলে ভালো কিছুও ঘটতে পারে। আশা থাকাও ভালো। সেই আশায় আছি।

 

লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা