kalerkantho

সোমবার । ২১ অক্টোবর ২০১৯। ৫ কাতির্ক ১৪২৬। ২১ সফর ১৪৪১       

বন্দুকযুদ্ধের চিত্রনাট্য ও কিছু হিতোপদেশ

মোফাজ্জল করিম

১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বন্দুকযুদ্ধের চিত্রনাট্য ও কিছু হিতোপদেশ

আদালতে প্রায় ১২ ইঞ্চি লম্বা ছুরিটা দেখিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী জানতে চাইলেন, ‘জিওভানি, এই ছুরিটা তোমার?’ জিওভানি বলল, ‘জি হ্যাঁ, এটা আমার ছুরি বটে।’ ‘তুমি এটা দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে পাওলোকে খুন করেছ?’ আইনজীবীর পরবর্তী প্রশ্ন। ‘যীশুর কসম, আমি খুন করিনি।’ চোখমুখ কাঁচুমাচু করে বলল জিওভানি। ‘তা হলে ও মরল কীভাবে?’ আইনজীবীর প্রশ্ন। ‘বিশ্বাস করুন’, ভেজা বিড়ালটি সেজে জিওভানি বলতে লাগল, ‘রাস্তায় দাঁড়িয়ে এই ছুরিটি দিয়ে আমি একটি আপেল কেটে খাচ্ছিলাম। এমন সময় পাওলো এসে হঠাৎ পড়ে যায় ছুরির আগায়। আর সঙ্গে সঙ্গে ছুরিটা ঢুকে যায় ওর বুকে। একবার দু’বার নয়, পুরো সতেরবার, হ্যাঁ, সতেরবার, ওভাবে পড়ে সে। তারপর কি আর বাঁচে, বলুন। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম ওটা অ্যাকসিডেন্ট। পরে বুঝলাম, ব্যাটা সুইসাইড করেছে।’ জিওভানির কণ্ঠে একসঙ্গে দৃঢ় প্রত্যয় ও সমবেদনার সুর। ‘কিন্তু এত বড় ছুরি দিয়ে কি কেউ আপেল কাটে?’ বিজ্ঞ আইনজীবী ফাঁদে ফেলতে চাইলেন তাকে। ‘ফল কাটার ছোট ছুরিটা আমার বড় ভাই নিয়ে গিয়েছিল আমাদের বুচার শপে মাংস কাটতে,’ জিওভানির ত্বরিত জবাব।

দুই.

গল্পটা বহুকাল আগে, সেই সত্তরের দশকের শেষভাগে, মেলবোর্নে থাকা অবস্থায় এক জম্পেশ আড্ডায় শুনেছিলাম অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী অনুজপ্রতিম মেহবুবের কাছে। সে তার ইটালিয়ান বন্ধুদের খেপানোর জন্য নিজেই বোধ করি গল্পটা ফেঁদেছিল। একটা ১২ ইঞ্চি লম্বা ছুরির মাথায় একনাগাড়ে পরপর সতেরবার কেউ এসে পড়তে পারে, এটা কোনো পাগলেও বিশ্বাস করার কথা নয়। কিন্তু আজ প্রায় চার দশক পর মনে হচ্ছে, যে-কোনো আজগুবি গল্প কেউ বিশ্বাস করুক আর না করুক বলতে তো আপত্তি নেই। বাংলাদেশের যেসব জিওভানি পাইকারি হারে ‘হার্ট অ্যাটাকে’ লোক মারা যাওয়ার কিস্সা যখন শুরু করলেন ২০০২ সালে, তখনই দেশের মানুষের বুক কাঁপা শুরু হলো। যাদের হার্ট জাপানের কোবে স্টিলের তৈরি তারা যেমন, তেমনি হার্টলেস বলে যারা রীতিমত প্রসিদ্ধি লাভ করেছে, তারাও তখন হৃিপণ্ড পরিষ্করণ (‘ক্লিন হার্ট’) অপারেশনের আতঙ্কে পারলে ইঁদুরের গর্তে লুকিয়ে প্রাণ বাঁচায়। মহামারী আকারের এই ‘হৃদরোগ’ চলল বছরখানেক। এরপর মঞ্চে আবির্ভূত হলো ‘ক্রসফায়ার’ নামক আরেকটি মরণব্যাধি। এটা দেখা দিল ২০০৪ সালে বিশেষভাবে বিশেষ উদ্দেশ্যে গঠিত একটি জবরদস্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাম ভাঙিয়ে। এবার আর হার্ট অ্যাটাক নয়; একজন সুস্থ-সবল ব্যক্তি দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি শুরু হলেই আর স্থির থাকতে পারে না, হয় ওই গুলিবৃষ্টির মধ্যে দৌড়ে পালাতে যায়, আর না হয় যেদিক থেকে গুলি আসছে সেদিকে বাপের ব্যাটা সেজে বুক চিতিয়ে বসে থাকে। এক ধরনের মস্তিষ্কবিকৃতি আর কি। অমন সহজ টার্গেট কি আর ‘মিস্’ হয়, যাকে বলে ‘সিটিং ডাক’! মুহূর্তে সঙ্গীসাথীদের শোক সাগরে ভাসিয়ে পরপারে পাড়ি দেয় সে। আর এমনি কপাল, যে গুলিতে সে ‘ক্রসফায়ারে’ বাজে খরচের খাতায় নাম লেখায়, সে গুলি কখনো তার ডানে-বাঁয়ে, সামনে-পেছনে অবস্থানকারী কারো কেশাগ্রও স্পর্শ করে না। কী দারুণ তেলেসমাতি সেই গুলি। সেটি রাতের অন্ধকারেই হোক, আর দিনের আলোতেই হোক, ঠিক তাকেই খুঁজে খুঁজে গিয়ে ‘হিট’ করবে। তার আশেপাশে যতজনই থাকুক, সেই জাদুর গুলি শুধু তাকেই চেনে, আর কাউকে না। এমনও হতে পারে, অন্যরা এ ব্যাপারে ট্রেনিং নেওয়ার সময় একটি বিশেষ মন্ত্রটন্ত্র শিখে নেয়, যা তাদের রক্ষা করে। অথবা এটা হয়ত অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরিতে স্পেশাল অর্ডার দিয়ে বানানো একটা ডিজিটাল গুলি!

২০০৪ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ক্রসফায়ারে ‘আত্মাহুতি’ (?) দেন ৭৩৬ জন। তখন চারদলীয় জোট সরকারের আমল। এরপর আসে তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তাদের দুই বছরের শাসনামলের স্কোর ছিল ২৫৬।

শুরুতে, অর্থাৎ ২০০৪ সালের গোড়াতে, যখন ক্রসফায়ারকে ময়দানে নামানো হয়, তখন টার্গেট ছিল চরমপন্থী, চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও জঙ্গিরা। বস্তুতপক্ষে দেশে তখন এদের দৌরাত্ম্যও ছিল মারাত্মক। সারা দেশে, বিশেষ করে মফস্বল অঞ্চলে, এরা এক ধরনের ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। ফলে শুরুর দিকে এদের পতন হলে লোকে এলাকায় মিষ্টিও বিতরণ করেছে। কিন্তু অচিরেই লোকের মনে প্রশ্ন জাগল : অপরাধীকে গ্রেপ্তার না করে, আইনের আওতায় না এনে, ক্রসফায়ারের নামে সরাসরি যমালয়ে কেন পাঠানো হচ্ছে? আর সব ক্ষেত্রে একটি গল্প বলেই জিওভানির মত কেন মনে করা হচ্ছে, বাংলাদেশের ১৬/১৭ কোটি মানুষ গল্পটি শুধু ‘খাবে’ না, বছরের পর বছর খেতেই থাকবে। মনে হয়, কাহিনী ও চিত্রনাট্যটি লেখার জন্য প্রযোজক একজন কুশলীকে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তিনি একটি দারুণ রোমাঞ্চকর চিত্রনাট্য উপহার দেওয়ার পর প্রথম প্রডাকশনটি ভালোই উের গেল। তার পরেরটির বেলায় চিত্রনাট্যকার বললেন, নতুন কাহিনীর জন্য নতুন চুক্তি লাগবে, টাকাও দিতে হবে বেশি। আগেরটি বক্স অফিস হিট করেছে, এবার আমার ডিমান্ড বেশি। প্রযোজক বললেন, কচু। পরিচালককে ডেকে বললেন, একটু দাড়ি-মোচ লাগিয়ে আগের কারেক্টারগুলোকেই নামিয়ে দিন। বাজেট শর্ট। নতুন করে মালপানি ঢালতে পারব না। পাবলিককে যা দেবেন তাই খাবে। ফলে সেই ষাটের দশকের রূপবান সিরিজের মত শুরু হলো ক্রসফায়ার সিরিজ। সেই রাতের বেলা আসামী র‌্যাব কিংবা পুলিশকে নিয়ে যায় গুপ্তস্থান থেকে অস্ত্র উদ্ধার করতে কিংবা তার দলের অন্যদের গ্রেপ্তার করতে। বাকি অংশ রুপালি পর্দায়, থুকিক, পরদিন বা তার পরদিন সংবাদপত্রের সচিত্র প্রতিবেদনে দেখা যায় : পথিমধ্যে ওঁৎ পেতে থাকা তার সঙ্গীরা তাকে ছিনিয়ে নিতে র‌্যাব/পুলিশের উদ্দেশে গুলি ছোড়ে। রেজাল্ট? রেজাল্ট অবশ্যম্ভাবীরূপে একটাই—কারো কিছু হয় না, শুধু সে লাশ হয়ে পড়ে থাকে রাস্তায় বা বনে-বাদাড়ে। একই ‘ইস্টোরি’ (ঢাকাই ফিল্মের সিনেমা হলের সামনের সারির দর্শকদের প্রিয় শব্দ) সব ছবিতে থাকায় দর্শকসংখ্যা হ্রাস পেতে পেতে হল খালি যেতে থাকে। অগত্যা প্রযোজক ‘ক্রসফায়ার’ সিরিজ বন্ধ করে নতুন সিরিজ শুরু করলেন ‘বন্দুকযুদ্ধ’। কিন্তু বাংলাদেশের বহুতই সমজদার দর্শকরা তত দিনে ঠিকই বুঝে ফেলেছে, এটাও যেই লাউ সেই কদু। সেই নায়ক গরিবের ছেলে, নায়িকা ধনীকন্যা, মাঝখানে মদ্যপ লম্পট ভিলেন তাদের দু’জনের নাকের জলে চোখের জলে করার পর শেষ পর্যন্ত ‘সত্যের’ জয় : নায়ক-নায়িকার মিলন। অতএব, দেশজুড়ে আওয়াজ উঠতেই থাকল : থামাও ক্রসফায়ার, থামাও বন্দুকযুদ্ধ। আইনের আওতায় আনো অপরাধীদের—সে সন্ত্রাসী, চরমপন্থী, মাদক ব্যবসায়ী যেই হোক। বিনা বিচারে কাউকে মেরে ফেলা, যার পোশাকি নাম বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড—মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। সভ্য সমাজে এটা চলতে দেওয়া যায় না। যে দেশে সাম্প্রতিককালে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের উল্লম্ফন হয়েছে ও আগামীতেও হওয়ার সম্ভাবনা আছে, সে দেশে মানবাধিকারের এহেন করুণ অবস্থা, সংবিধানে ঘোষিত মৌলিক অধিকারসমূহের লঙ্ঘন, ভোটাধিকার প্রয়োগে বাধা ইত্যাদি যদি সংঘটিত হয়, তা হলে দেশে একটি শান্তিময় পরিস্থিতি বিরাজ করবে এমন নিশ্চয়তা কী করে দেওয়া যায়? আর দেশে যদি শান্তিই না থাকে, মানুষ যদি সব সময় গুম, খুন, বন্দুকযুদ্ধ ইত্যাদির আতঙ্কে থাকে, তবে কিসের উন্নয়ন? কাদের জন্য উন্নয়ন?

তিন.

শেষ করার আগে ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধে যারা মারা যায়, তাদের উদ্দেশে দু’একটা কথা বলতে চাই। এক. এত মৃত্যুর পরও তোমাদের হুঁশ হয় না যে দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি শুরু হলে কখনো নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে পালাবার চেষ্টা করতে নেই। গত ১৬ বছরে (২০০২-২০১৮) ক্লিনহার্ট, ক্রসফায়ার ও বন্দুকযুদ্ধে যে ২,৩৯৩ জন নিহত হয়েছে, সেইসব ‘বেকুব’রা বেশির ভাগই মরেছে পালাতে গিয়ে। দুই. আজ পর্যন্ত যেখানে আসামী ছিনিয়ে নেওয়ার সাফল্য তোমাদের মোটামুটি ‘জিরো’, সেখানে এখনও তোমরা কেন ওঁৎ পেতে থেকে গোলাবর্ষণ শুরু করতে যাও? আমাদের মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তো সেদিন পরিষ্কারভাবে বলেছেন : বিচারবহির্ভূত হত্যা তো আমরা করি না। আমাদের ওপর অ্যাটাক হলে আমরা কাউন্টার অ্যাটাক করি। তার মানে ২০০৯ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত এই সরকারের আমলে যে ১,৩৫১ জন আসামী মারা গেছে, এরা সবাই প্রাণ হারিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাউন্টার অ্যাটাকে। এরকম একটি সুপ্রশিক্ষিত আধুনিক চৌকস বাহিনীর সঙ্গে তোমরা লড়তে যাওয়া মানে জেনেশুনে আগুনে ঝাঁপ দেওয়া। তিন. এসব বদখেয়াল বাদ দিয়ে বরং আপস-রফা করে সুস্থ রাজনীতি করো, যা বলার রাজনৈতিক অঙ্গনে গিয়ে বলো। দেখছ না, এখন কী সুন্দর পরিবেশ বিরাজ করছে সেখানে! চারদিকে চলছে শুধু ‘আমি আর মামু, ভাগ করি খামু’ অবস্থা। সেখানে তো আর তোমাদের মামু হওয়ার মুরোদ নেই, ভাগ্নে হয়ে ‘ইয়ে আলী’ বলে ঝাঁকের কৈ ঝাঁকে মিশে গেলে তো আর বেঘোরে সাত নয় পাঁচ নয় একটি মাত্র পৈতৃক প্রাণ খোয়াতে হবে না। উল্টো মামুর কৃপায় রুজি-রোজগার ভালই হবে, ইনশাআল্লাহ।

যাও, মাঘ মাসের রোদ ঝলমল সকালে সবাই আঙিনায় খড় শুকাচ্ছে, তুমিও শুকাও। রোদ চলে গেলে আর আফসোসের শেষ থাকবে না।

লেখক : সাবেক সচিব, কবি

[email protected]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা