বিশ্বকাপের নক আউট পর্বে অভিজ্ঞরাই সাধারণত পার্থক্য গড়ে দেন। চাপ, প্রত্যাশা আর মুহূর্তের গুরুত্ব—সব মিলিয়ে এই মঞ্চকে বলা হয় অভিজ্ঞতার পরীক্ষা। কিন্তু ব্রাজিলের হয়ে এবার সেই পরীক্ষার সামনে ১৯ বছর বয়সী দুই তরুণ। একজন রায়ান, অন্যজন এনদ্রিক। জাপানের বিপক্ষে শেষ ৩২-এর ম্যাচে তারা শুধু ব্রাজিলকে শেষ ষোলোয় তুলতেই সাহায্য করেননি, জানিয়ে দিয়েছেন সেলেসাওদের ভবিষ্যৎও তাঁরাই।
সেদিন ম্যাচের প্রথমার্ধে পিছিয়ে ছিল ব্রাজিল। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের আক্রমণ ছিল ধারহীন। বিরতির পর কোচ কার্লো আনচেলোত্তি বড় সিদ্ধান্ত নিলেন। চোট পাওয়া লুকাস পাকেতার জায়গায় নামিয়ে দিলেন এনদ্রিককে। অন্যদিকে রায়ান শুরু থেকেই মাঠে ছিলেন। এরপরই বদলে যেতে থাকে ম্যাচের চিত্র। ব্রাজিল ফিরে আসে, ম্যাচও জেতে ২-১ গোলে। স্কোরশিটে হয়তো এনদ্রিকের নাম ওঠেনি। কিন্তু ম্যাচের ছন্দ পাল্টে দেওয়ার পেছনে ছিল তাঁর বড় প্রভাব। বক্সের ভেতরে শারীরিক শক্তি, অবিরাম দৌড় আর ডিফেন্ডারদের ব্যস্ত রাখার ক্ষমতা জাপানের রক্ষণকে চাপে ফেলতে বাধ্য করে। ফলে প্রতিপক্ষের বক্সের আশপাশে তৈরি হয় বাড়তি জায়গা, যার সুযোগ নেয় ব্রাজিল। ম্যাচ শেষে আনচেলোত্তি বলেছিলেন, ‘আমরা জানতাম ম্যাচে ফিরতে হলে বক্সে আরো শক্তি দরকার। এনদ্রিক সেই শক্তিটাই দিয়েছে। সে অসাধারণ তীব্রতা নিয়ে খেলেছে এবং প্রতিপক্ষের জন্য সব সময় হুমকি ছিল।’
রায়ানের গল্পটা আরো নাটকীয়। বিশ্বকাপে ব্রাজিলের শুরুর আগে একাদশে তাঁর থাকা নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। ইউরোপে প্রথম মৌসুমেই বোর্নমাউথের হয়ে ভালো খেললেও জাতীয় দলে তিনি ছিলেন বিকল্প পরিকল্পনার অংশ। কিন্তু হাইতির বিপক্ষে রাফিনিয়ার হ্যামস্ট্রিং ইনজুরিই বদলে দেয় সবকিছু। সেই ম্যাচে বদলি হিসেবে নেমে কোচের মন জয় করেন রায়ান। এরপর স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে শুরু থেকেই সুযোগ পান। আনচেলোত্তি ম্যাচের আগে বলেছিলেন, ‘রাফিনিয়ার বদলি হিসেবে নেমে রায়ান দারুণ খেলেছিল। সে আমাদের খেলায় যা প্রয়োজন তা এনে দিতে পারে।’ সেই আস্থার প্রতিদানও দিয়েছেন তরুণ ফরোয়ার্ড। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে তাঁর হাই প্রেসিংয়ের চাপেই প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভুল করে, আর সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র গোল করেন। পরে জাপানের বিপক্ষেও একাদশে জায়গা ধরে রাখেন রায়ান। বিশ্বকাপে এনদ্রিক ও রায়ান; একসঙ্গে নেমে ইতিহাসে নাম লিখিয়েছেন। ১৯৫৮ সালের পর প্রথমবার কোনো বিশ্বকাপ ম্যাচে ব্রাজিলের হয়ে একসঙ্গে খেলেছেন দুই কিশোর। ১৯৫৮ সালই ছিল ব্রাজিলের প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের বছর। তখন ১৭ বছরের পেলে আর ১৯ বছরের মাজ্জোলা একসঙ্গে নেমেছিলেন ওয়েলসের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে। ছয় দশকেরও বেশি সময় পর আবার দুই কিশোরকে একসঙ্গে দেখেছে ব্রাজিল। ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমানের এই মিল তাই কাকতালীয় নয়, বরং নতুন এক সোনালি অধ্যায় রচনার পূর্বাভাসও।
এনদ্রিক এবং রায়ানের পরিচয় দীর্ঘদিনের। ২০২২ সালে অনূর্ধ্ব-১৭ কোপা দো ব্রাজিলের ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিলেন তাঁরা। পালমেইরাসের হয়ে এনদ্রিক করেছিলেন চার গোল, আর ভাস্কো দা গামার হয়ে গোল করেছিলেন রায়ানও। সেই সময় দুজনের বয়স ছিল মাত্র ১৫ বছর। বিভিন্ন বয়সভিত্তিক ক্যাম্পে একসঙ্গে থাকলেও বড় কোনো আন্তর্জাতিক আসরে দুজন মিলে নিজেদের মেলে ধরার সুযোগ হয়নি। অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটেছে ২০২৬ বিশ্বকাপে। এই বিশ্বকাপে ব্রাজিলের আলোচনায় ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, কুনিয়া, ব্রুনো গিমারেসদের মতো তারকারাই। কিন্তু জাপানের বিপক্ষে ম্যাচটি যেন অন্য এক গল্প লিখে দিল। এটি দুই কিশোরের গল্প, যাঁরা শুধু ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি নয়, বর্তমানেরও নির্ভরতা হয়ে উঠতে শুরু করেছেন।




