kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ মে ২০১৯। ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৫ রমজান ১৪৪০

লম্বা থ্রোয়ে কোনো টেকনিক ছিল না ছিল শক্তি

আলমগীর হাসান বললে কেউ চিনবেনই না। কিন্তু যখন শুনবেন ‘লম্বা থ্রোয়ের আলমগীর’ তখন আর চিনতে অসুবিধা নেই। অন্তত নব্বইয়ের দশকের কারো ভোলার প্রশ্নই আসে না। ছিলেন আবাহনীর ঘরের ছেলে, হুট করে চলে গেলেন মোহামেডানে, এরপর হারিয়ে যাওয়া। অনেক বছর পর তাঁকে খুঁজে বের করে নোমান মোহাম্মদ চমকে গেলেন। বেশভূষায় একেবারেই অচেনা।

১৯ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৮ মিনিটে



লম্বা থ্রোয়ে কোনো টেকনিক ছিল না ছিল শক্তি

ছবি : মীর ফরিদ

প্রশ্ন : পুরনো দিনের ফুটবল দর্শকরা আপনাকে হঠাৎ দেখলে বিস্মিত হবেন। চেনাই তো যায় না!

আলমগীর হাসান : মাথা ভরা পাকা চুলের কারণেই বলছেন তো! বয়স পঞ্চাশ হয়নি, এখনই সব চুল সাদা হয়ে গেছে। এমনিতে খেলা ছাড়ার পর ফুটবলের সঙ্গে খুব একটা যোগাযোগ নেই। অনেকে তাই মনে করেন, আমি বোধ হয় বিদেশে থাকি। তার ওপর পাকা চুল। রাস্তাঘাটে খুব কম মানুষই তাই ফুটবলার আলমগীরকে চেনেন।

প্রশ্ন : চেনার পর নিশ্চয় গল্প শুরু হয় লম্বা থ্রো দিয়ে। এ সাক্ষাৎকারটিও শুরু করতে চাই তা দিয়ে। এ তো ফুটবলের প্রথাগত শ্যুটিং, হেডিং, পাসিং, ট্যাকলিং না। লম্বা থ্রো করার সেই অবিশ্বাস্য দক্ষতা কিভাবে অর্জন করেন আপনি?

আলমগীর : খুব সচেতন চেষ্টায় তা হয়েছে, সে দাবি করলে ভুল হবে। তবে এখন পিছু ফিরে তাকিয়ে দুটি ঘটনার কথা মনে পড়ে। মনে হয়, এ দুটি ব্যাপার আমার লম্বা থ্রোতে সাহায্য করেছে খুব। প্রথম ঘটনাটি স্কুলের। আমাদের বরিশালের নুরিয়া হাই স্কুলের ভবন পাঁচ তলার। দোতলায় একটা খোপমতো ফাঁকা জায়গা ছিল। ফাইভ-সিক্সে পড়ার সময় থেকেই তো বল নিয়ে পড়ে থাকি সারাক্ষণ। স্কুলের সামনের খালি জায়গা থেকে চেষ্টা করতাম থ্রো করে দোতলার ওই ফাঁকা জায়গায় বল পাঠাতে। নিচ থেকে দোতলায় বল পাঠানোর চেষ্টাতেই হয়তো লম্বা থ্রোয়ের শুরু।

প্রশ্ন : কিন্তু ফুটবল-পাগল একজনের পক্ষে কি বলে কিক করে দোতলার খোপে পাঠানোর চেষ্টাটাই স্বাভাবিক না?

আলমগীর : হয়তো বা। আমি যে কিক করিনি, তা নয়। কিক করেছি; আবার থ্রো করেও বল পাঠাতে চেয়েছি। পরবর্তী সময়ে লম্বা থ্রোয়ের কারণে পুরো দেশের মানুষ যে আমাকে চিনবে—ভাগ্যে সেটি লেখা ছিল বলেই হয়তো করি তা।

প্রশ্ন : আর দ্বিতীয় গল্পটি?

আলমগীর : এটি বরিশাল থেকে ঢাকায় আসার পর। আবাহনী ক্লাবে উঠেছি। ক্লাবের গেট পার হয়ে একটি দেয়াল ছিল; ভেতরে আরেক দেয়াল। আমি দৌড়ে গিয়ে এক দেয়াল থেকে আরেক দেয়ালে থ্রো করা অনুশীলন করতাম। একা একাই। সত্যি বলতে কী, আমার থ্রো গোলের বড় উৎস হতে পারে, তখনো বুঝিনি। অন্যান্য সব অনুশীলন শেষে একা একা থ্রো প্র্যাকটিস করতে ভালো লাগত বলেই তা করতাম।

প্রশ্ন : প্রথম কবে বোঝেন যে, এটি আপনার বড় অস্ত্র?

আলমগীর : আবাহনী ক্লাবের ভেতর দেয়াল থেকে দেয়ালে আমার থ্রো দেখে সতীর্থরা অনুশীলনে তা করতে বলে। তা করে বুঝি, সাইড লাইন থেকে করা আমার থ্রো কর্নার বা ফ্রি-কিকের মতো কাজ করছে। এরপর আবাহনীর জার্সিতে বদলি হিসেবে প্রথম খেলতে নেমেই আমার থ্রো থেকে যখন দল গোল পায়, এরপর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। দর্শকদের ভালোবাসা পেয়ে যাই শুরুতেই।

প্রশ্ন : আপনার থ্রো থেকে ওই প্রথম গোলটি করেছিলেন কে, মনে আছে?

আলমগীর : না, তা মনে নেই।

প্রশ্ন : তারপর তো এই থ্রো হয়ে যায় আপনার ট্রেডমার্ক। অনেক অনেক গোল হয় তা থেকে। এর মধ্যে সবচেয়ে স্মরণীয়?

আলমগীর : ফুটবলে স্ট্রাইকারদের গোলের হিসাব থাকে। কারো পাস থেকে গোল হলে সে হিসাবও থাকে। কিন্তু আমার থ্রো থেকে ঢাকার মাঠে কত কত গোল যে হয়েছে—এর কোনো হিসাব নেই। থ্রো থেকে হেডে গোল হয়েছে, শটে গোল হয়েছে, আবার এটি বিল্ড আপের অংশ হিসেবে কাজে লেগে গোল হয়েছে। পুরনো দিনের দর্শকরাই শুধু মনে রেখেছেন তা। আর থ্রো থেকে সবচেয়ে স্মরণীয় গোলের যে প্রশ্নটি করলেন, সে ক্ষেত্রে বিটিসি ক্লাব কাপ ফাইনালের কথা বলতে পারি। সেবার ঢাকা মোহামেডানকে আমরা ঢাকা আবাহনী হারাই ১-০ গোলে। আমার থ্রো থেকে হেড করে গাউস করে একমাত্র গোলটি।

প্রশ্ন : এত জোরে থ্রো করার কোনো টেকনিক ছিল?

আলমগীর : কোনো টেকনিক নেই, পুরোটাই শক্তি।

প্রশ্ন : আপনার হাতে অমন প্রচণ্ড শক্তি হয় কিভাবে? মানে, স্কুলের দোতলার খোপ আর আবাহনী ক্লাবের দেয়াল থেকে দেয়ালে থ্রো করার কথা তো বলেছেনই। জানতে চাইছিলাম, হাতের শক্তির জন্য আলাদা কোনো অনুশীলন কিংবা ব্যায়াম করতেন কি না?

আলমগীর : না। আলাদা ব্যায়ামের যে প্রয়োজন আছে, সেটাই জানতাম না। তবে একটা জিনিস হয়তো কাজে লেগেছে। আবাহনী ক্লাবে যখন আসি, আমি তখন এইটুকুন পিচ্চি। বয়স ১৬ বছর; ক্লাস টেনে পড়ি। ভালো খেলে ক্লাবের একাদশে সুযোগ পাওয়াই তো মূল লক্ষ্য। তবে সে জন্য আগে আমাকে লম্বা হতে হবে। ক্লাবের কোনার এক দিকে রড ঝোলানো ছিল। সকাল-দুপুর-বিকেল-সন্ধ্যা-রাত, সময় পেলেই আমি ওই রডে হাত দিয়ে ঝুলতাম। ঝুলতাম লম্বা হওয়ার জন্য কিন্তু তাতে হাতের শক্তি বেড়ে যায় খুব।

প্রশ্ন : আবার ক্যারিয়ারের গল্পে আসব নিশ্চয়ই। তার আগে একটু জীবনের গল্প শুনতে চাই। শৈশব-কৈশোরে খুব সংগ্রাম করে বড় হয়েছেন শুনেছি?

আলমগীর : আমাকে তিন মাস বয়সে রেখে বাবা আবদুল মান্নান মারা গেলে সংগ্রাম করাটাই তো স্বাভাবিক। ১৯৭০ সালে ভয়ংকর যে বন্যা হয়, সেখানে ভেসে যান বাবা। তাঁর লাশটাও পাওয়া যায়নি। বরিশাল বাবুগঞ্জের চাঁদপাশায় ছিল আমাদের বাড়ি। বাবা খুব সাধারণ সরকারি চাকরি করতেন। আমরা তিন ভাই, চার বোন। বাবা মারা যাওয়ার পর সন্তানদের নিয়ে আমাদের মা রিজিয়া বেগম খুব বিপদে পড়েন। বাবা কিচ্ছু রেখে যেতে পারেননি। তখন এমনও দিন গেছে, তিন বেলা খাওয়ার ব্যবস্থা হয় না। স্বাধীনতার পর পরের সে সময়টায় দেশেরও খুব খারাপ অবস্থা। চারিদিকে অভাব। স্কুলে ত্রাণের কার্যক্রম হিসেবে ছাতু দেওয়া হতো। আমরা ভাই-বোনরা স্কুলে গিয়ে যে ছাতু পেতাম, সেটিই তখন বাঁচিয়ে রাখে আমাদের পরিবারকে। আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে চেয়ে চেয়ে আর কত ধান-চাল নেওয়া যায়! পাঁচ-ছয় বছর অমন  কষ্টের পর মেজ ভাই জাহাঙ্গীর বরিশাল শহরে একটি চাকরি পেয়ে আমাদের সেখানে নিয়ে যান। পুরো পরিবার দেখাশোনার ভার নেন তিনি; বড় ভাই তা করেনি।

প্রশ্ন : ওই কঠিন সময়ে ফুটবলের সঙ্গে পরিচয় নিশ্চয়ই হয়নি?

আলমগীর : বরিশাল এলাম, আমাকে স্কুলে ভর্তি করানো হলো, এরপর ফুটবল খেলা শুরু। এখানে একটি কথা বলতে হয়, ফুটবলের আগে আমার নাম ফোটে অ্যাথলেটিকসে। স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ১০০ মিটার দৌড়, ২০০ মিটার দৌড়, লং জাম্প, হাই জাম্পে প্রথম হই। এরপর আমাদের নুরিয়া হাই স্কুলের পক্ষ থেকে ইন্টার স্কুল প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েও পুরস্কার জিতে আনি।

প্রশ্ন : পুরস্কার কী দিত, মনে আছে?

আলমগীর : পিতলের মেডেল। আর কাচের প্লেট, জগ—এসব। তিনটি ইভেন্টে প্রথম হলে দেওয়া হতো টিফিন কেরিয়ার। আমার বাসায় অমন বেশ কয়েকটি টিফিন কেরিয়ার জমা হয়ে যায়। তবে পুরস্কার যেন জিততে না পারি, সে জন্য প্রতিযোগিতার সময় আমাকে গুলি পর্যন্ত করা হয়।

প্রশ্ন : গুলি করা হয় মানে!

আলমগীর : ছর্রা গুলি। স্টার্টিং পয়েন্টে দাঁড়িয়েছি, হঠাৎ ভিড়ের ভেতর থেকে কী যেন এসে আমার ডান ঊরুতে লাগে। এরপর দেখি রক্ত। সবাই বুঝে যাই, যেন আমি দৌড়ে জিততে না পারি সে জন্য প্রতিদ্বন্দ্বী স্কুলের হয়ে কেউ ছর্রা গুলি করেছে। (ঊরু দেখিয়ে) এখানে হাত দিয়ে দেখুন, এখনো ভেতরে কিছু আছে বুঝতে পারবেন।

প্রশ্ন : তা বোঝা যাচ্ছে। তাই বলে ইন্টার স্কুলের প্রতিযোগিতায় ছর্রা গুলির ঘটনা তো অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে!

আলমগীর : তখন প্রতিদ্বন্দ্বীর মাত্রা ছিল অন্য রকম। আপনার কাছে যেমন অদ্ভুত লাগছে, আমাদের কাছে তখন তেমন মনে হয়নি। আবার পায়ে ছর্রা গুলি লাগলেও দমে যাইনি। আঘাতের জায়গা কাপড় দিয়ে মুছে, কেরাসিন না কী যেন দিয়ে ব্যথা কিছুটা কমিয়ে দৌড়েছি আমি। প্রথমও হয়েছি। পরে একটু একটু করে ঝুঁকে যাই ফুটবলে। চার ফুট ১০ ইঞ্চির ফুটবল টুর্নামেন্টের কথা আপনার মনে আছে?

প্রশ্ন : হ্যাঁ, সত্তর-আশির দশকে পুরো দেশে জনপ্রিয় ছিল তা। চার ফুট ১০ ইঞ্চির চেয়ে বেশি উচ্চতার কিশোররা তাতে খেলতে পারত না।

আলমগীর : অমন টুর্নামেন্টে খেলেই আমার নাম ছড়াতে থাকে। বরিশাল, ঝালকাঠি, পিরোজপুরে খেপ খেলতে যেতাম। বরিশাল মোহামেডান ক্লাবের সামনে নজরুল পাঠাগারের মাঠ ছিল। সেখানে চার ফুট ১০ ইঞ্চির টুর্নামেন্ট আয়োজন হতো নিয়মিত। ওখানে খেলতে খেলতেই সুযোগ আসে ‘এরশাদ কাপ’ খেলার জন্য ঢাকা যাওয়ার। টুর্নামেন্টে বরুণ, বখতিয়ার, রানা—এমন সব ফুটবলার ছিল। এই এরশাদ কাপ দেখে বিকেএসপির প্রথম ব্যাচের ফুটবলার নেওয়া হয়। আমাকেও পছন্দ করেছে জানিয়ে চিঠি পাঠায় বরিশাল জেলা ক্রীড়া সংস্থায়। আমি সে চিঠির কথা জানতেই পারিনি তখন। বড় কর্মকর্তার কোনো এক আত্মীয়কে বিকেএসপিতে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয় আমার বদলে।

প্রশ্ন : ওই সময় থেকেই কি রাইটব্যাকে খেলেন?

আলমগীর : ছোটবেলায় আবার পজিশন কী! বল যেখানে, সেখানেই সবাই। আবাহনীতে এসে আমি মিডফিল্ড পজিশনে খেলেছি। পরে থিতু হই রাইট ব্যাকে।

প্রশ্ন : চার ফুট ১০ ইঞ্চির টুর্নামেন্ট থেকে ঢাকা আবাহনীতে আসার গল্পটি যদি বলেন...

আলমগীর : অমন টুর্নামেন্টে ভালো করার পর আমাকে নেয় বরিশাল আবাহনী। ওদের হয়ে শুরু করি লিগ খেলা। বরিশাল লিগের এক ম্যাচ খেলার জন্য ঢাকা থেকে ‘হায়ার’-এ নিয়ে আসা হয় টুটুল ভাই  ও আনোয়ার ভাইকে। আমার খেলা দেখে মুগ্ধতার কথা ঢাকা আবাহনীতে ফিরে জানান আনোয়ার ভাই। পরে বরিশাল লিগের শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে বরিশাল আবাহনীর হয়ে খেলানোর জন্য ঢাকা আবাহনীর ১০ জনকে আনা হয়। বরিশাল মোহামেডানের বিপক্ষে সে ম্যাচে পাকির আলী, প্রেমলাল, মহসিন ভাই, মোস্তফা কামাল ভাই, ছোট কামাল ভাই, ইউসুফ ভাই, টুটুল ভাই, আনোয়ার ভাইসহ সবাই আসেন। ঢাকা আবাহনীর ১০ ফুটবলারের সঙ্গে একমাত্র আমিই বরিশালের। সে ম্যাচেও খুব ভালো খেলি। আমার খেলা পছন্দ হয় সবার। মোস্তফা কামাল ভাই বলে যান আমাকে ঢাকা আবাহনীতে পাঠানোর কথা। সুরুজ মামা ও খসরু ভাই আমাকে ঢাকা নিয়ে আসেন। আবাহনী ক্লাবে নিয়ে তুলে দেন মোস্তফা কামাল ভাইয়ের কাছে। উনি গোলাম রব্বানী হেলাল ভাইকে বলে ক্লাবে আমার জন্য সিটের ব্যবস্থা করেন। থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা হয়ে যাওয়ার পর শুরু খেলার সাধনা।

প্রশ্ন : এটি কবের ঘটনা?

আলমগীর : ১৯৮৭ সালের শেষের দিকে। ক্লাস টেনে পড়ি, গোঁফও ওঠেনি। ওই বয়সে আবাহনীতে খেলার জন্য বরিশাল থেকে ঢাকা চলে আসা আমার জন্য স্বপ্নের মতো ব্যাপার। বরিশাল থেকেই দেখতাম, কখনো ‘কিউট’, কখনো ‘কেএলএম’ লেখা ঢাকা আবাহনীর জার্সি। সে জার্সি আমাকে পরতেই হবে—এমন এক জেদ ছিল সব সময়; আবাহনী ক্লাবে থাকা শুরুর পর জেদটা বেড়ে যায়।

প্রশ্ন : সে সুযোগ আসে কবে?

আলমগীর : এক-দেড় বছর সময় লাগে। আগেই বলেছি না, আবাহনীতে আসার পর আমার প্রথম লক্ষ্য ছিল লম্বা হওয়া। রডে ঝুলতাম তাই। আর শুরুতে আমরা মামুন ভাইয়ের অধীনে জুনিয়র দলে অনুশীলন শুরু করি। সেখানে জুয়েল রানা, সাইফুল বারী টিটুরাও ছিল। পরে আবাহনীর মূল দলে প্রথম বদলি হিসেবে নেমে যে আমার থ্রো থেকে গোল হয়—তাও তো আগে বলেছি। এরপর মূল একাদশে নিয়মিত হতে সময় লাগেনি।

প্রশ্ন : টাকা-পয়সা...

আলমগীর : নাহ্, টাকা-পয়সা পাওয়া আরো অনেক পরে। ক্লাবে সারা বছর থাকছি, খাচ্ছি, অনুশীলন করছি, পরে মূল দলে খেলার সুযোগ পেলাম—এ নিয়েই খুশি। হেলাল ভাই হয়তো কখনো কখনো হাতখরচের জন্য দুই-চার হাজার টাকা দিয়েছেন। তাতেই কী আনন্দ! পরে যখন জাতীয় দলে খেলেছি, তখনো আমি আবাহনীর ঘরের ছেলে। পুল করে জাতীয় দলের সবাইকে দিয়েছে চার লাখ টাকা করে। আমাকে আড়াই লাখ। অবশ্য তা নিয়ে আমার কোনো রাগ-ক্ষোভ কখনো ছিল না।

প্রশ্ন : আবাহনীতে খেলার সুবাদে পুরো দেশ আপনাকে চেনে। সমর্থকদের ভালোবাসা নিশ্চয়ই উপভোগ করতেন খুব?

আলমগীর : লম্বা থ্রোর জন্য আমার প্রতি ভালোবাসা ছিল অন্য রকম। আর মোহামেডানের বিপক্ষে সব সময় ভালো খেলতাম বলে আরো বেশি। ওদের বিপক্ষে আমার থ্রো থেকে বেশ কিছু গোল হয়েছে। বিটিসি ক্লাব কাপ ফাইনালে গাউস, লিগে মুন্না ভাই, আসলাম ভাইরা গোল করেছেন। আরেকবার আমার পাস থেকে রুমীর গোলের কথা মনে আছে।  সত্যি আমি তখন আবাহনীর ঘরের ছেলে হয়ে গেছিলাম।

প্রশ্ন : সেই আপনি কিনা আবাহনী ছেড়ে দিলেন! ‘জেন্টলম্যান অ্যাগ্রিমেন্ট’-এর প্রতিবাদে শীর্ষ ফুটবলাররা একজোট হয়ে সবাই যখন মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্লাবে যায়, সেবার আপনি গেলেন মোহামেডানে। ব্যাপারটা একটু গোলমেলে হয়ে গেল না?

আলমগীর : এখানে বেশ কিছু বিষয় কাজ করেছে। প্রথমত আমাকে পুলে রাখেনি আবাহনী। আলমগীর তো থাকবেই, এর চেয়ে ‘তাড়াং-বাড়াং’ করে এমন কাউকে পুলে রাখলে ওকে আটকাতে পারব—এ ছিল মানসিকতা। আমার তাতে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু পরে দেখি, ক্লাব থেকে চুক্তির ব্যাপারে আমার সঙ্গে কোনো কথাও বলা হচ্ছে না। ম্যানেজার টুটুল ভাই খুব একটা পাত্তা দিচ্ছেন না। অভিমান হয় খানিকটা আর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ি অনেকটা। তখন মোহামেডান থেকে বাদল রায় দাদা যোগাযোগ করেন। খেলার প্রস্তাব দেন। তাঁকে বলি, আমাকে নিলে রেহান ও শাকিলকেও নিতে হবে। তাঁরা রাজি। আবাহনীর ঘরের ছেলে চলে যাই মোহামেডানে।

প্রশ্ন : আবাহনী থেকে এক ফুটবলার মোহামেডানে যাচ্ছে—তখনকার বাস্তবতায় এটি তো ভীষণ উত্তেজনাপূর্ণ দলবদল?

আলমগীর : তা আর বলতে! মোহামেডানের প্রবল সমর্থক ওসি হামিদকে দায়িত্ব দেওয়া হলো দলবদলের আগ পর্যন্ত আমাদের দেখভাল করার। উনি শুরুতে আমাদের নিয়ে দুই-তিন রাত রাখেন ডেমরা থানায়। আমাদের সঙ্গে মন্টু মামা নামে একজন সমর্থক ছিলেন। মোটাসোটা মানুষ। উনি দাড়ি কামানোর জন্য থানার বাইরে যেতে চান। আমরা কনস্টেবলদের বলি, ‘এ লোকটিই কিন্তু আসল ফুটবলার। এখন বেরিয়ে আবাহনী ক্লাবে চলে যাবেন। তখন ওসি সাহেব আপনাদের চাকরি খেয়ে দেবে।’ সঙ্গে সঙ্গে মন্টু মামাকে ধরে একেবারে লকআপ। খুব মজার স্মৃতি! এরপর গুলশানের এক বাসায় আমাদের রাখা হয় সপ্তাহখানেক। দলবদল শুরু হলে নাম লেখাই মোহামেডানে।

প্রশ্ন : কত টাকায়?

আলমগীর : লাখ দশেক।

প্রশ্ন : মোহামেডানে খেলেন কয় মৌসুম?

আলমগীর : তিন মৌসুম। আসলে দুই মৌসুম, তৃতীয় মৌসুমে কোনো ম্যাচ খেলানো হয়নি। দ্বিতীয় মৌসুমে আবাহনীর বিপক্ষে ম্যাচের আগে অনুশীলনে আমি ব্যথা পাই ডান হাঁটুতে। খেলার মতো অবস্থা নেই, কিন্তু না খেললে অনেক কথা হবে। মোহামেডান সমর্থকরা বলবেন, আবাহনীর ঘরের ছেলে বলেই ওদের বিপক্ষে খেলছে না আলমগীর। ইনজেকশন নিয়ে তাই ম্যাচটি খেলি। ফলে যা হওয়ার তা-ই হয়। ম্যাচে সাধারণ এক ট্যাকল করতে গিয়ে হাঁটুতে আবার ব্যথা পাই। উঠে যাই খেলা থেকে; পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি হাঁটু ফুলে ঢোল। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানতে পারি, লিগামেন্ট ছিঁড়ে গেছে। ব্যাংককে যাই চিকিৎসার জন্য, পরে বোম্বেতে ডাক্তার আনন্দ যোশী আমার হাঁটুতে অপারেশন করেন।

প্রশ্ন : অনেক খরচ হয়েছে নিশ্চয়ই?

আলমগীর : ব্যাংকক-দিল্লিতে চারবার যেতে হয়েছে আমার। সব মিলিয়ে সাত-আট লাখ টাকার মতো খরচ। সব আমি দিয়েছি; মোহামেডান ক্লাব কোনো টাকা দেয়নি।

প্রশ্ন : এই ইনজুরিই কি আপনার ক্যারিয়ার শেষ করে দিল?

আলমগীর : আরো কিছু দুর্ভাগ্য আছে। যেমন ব্যাংককে ডাক্তার দেখাতে গেলাম; ওখানে হেলাল ভাই, গাফফার ভাইরা ছিলেন। আবাহনীর জন্য দুজন ফুটবলার আনতে যান তাঁরা। ওই ফুটবলারসহ তাঁরা যে ফ্লাইটে ফেরেন, চিকিৎসা শেষে আমিও একই ফ্লাইটে। কিন্তু পত্রিকায় লেখা হয়, ‘খেলা বাদ দিয়ে মোহামেডানের আলমগীর আবাহনীর ফুটবলার আনতে ব্যাংকক গেছেন।’ এ নিয়ে সমর্থকরা মোহামেডান ক্লাবে গিয়ে আমার নামে তুমুল গালিগালাজ করে। নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে খুব কষ্ট হয়; নইলে ক্লাবে থাকা মুশকিল হয়ে যেত। তৃতীয় মৌসুমে মোহামেডানের সঙ্গে আমার কথা হয়, সুস্থ হয়ে খেলতে পারলে আগের মৌসুমের সমান ১০ লাখ টাকা দেবে। কিন্তু ইনজুরি সারিয়ে উঠলেও কোচ ইউসুফ ভাই আমাকে ম্যাচ খেলাননি। শুধু একটি প্রদর্শনী ম্যাচ খেলান সম্ভবত। কর্মকর্তারা হয়তো বলেছিলেন, আমাকে খেলালে ১০ লাখ টাকা দিতে হবে। সে কারণেই খেলাননি। রাগে-দুঃখে আমি ফুটবল ছেড়ে দিলাম। এটি ১৯৯৭ সালের ঘটনা।

প্রশ্ন : জাতীয় দলের কথা শোনা হলো না...

আলমগীর : অনূর্ধ্ব-১৬ জাতীয় দল দিয়ে শুরু। এরপর অনূর্ধ্ব-১৮, অনূর্ধ্ব-২৩ দলের পর মূল জাতীয় দলে। প্রেসিডেন্ট গোল্ডকাপ, সাফ গেমস, সার্ক ফুটবল, বিশ্বকাপ বাছাই পর্ব মিলিয়ে কম ম্যাচ খেলিনি।

প্রশ্ন : সাফ গেমস খেলেন কতটি?

আলমগীর : মাত্র একটি। তা-ও মাঠে খেলার সুযোগ হয়নি। এটি আমার জন্য খুব দুর্ভাগ্য। ১৯৯৩ সালে ঢাকা সাফ গেমসের আগে ১২টির মতো প্র্যাকটিস ম্যাচ খেলি। এর মধ্যে ১০টিতেই একাদশে আমি। কিন্তু সাফ গেমস শুরুর আগের দিন কোচ ওল্ডরিখ সোয়াব আমাকে ও টিটুকে বলেন, তোমরা খেলছ না। আমার বদলে কায়সার হামিদ ভাইকে খেলান রাইট ব্যাকে। ওই সাফে খেলতে না পারার কষ্টটা আজও আছে। আমাদের মধু-টধু খাইয়ে তৈরির পর একাদশে অমন উল্টাপাল্টা করলে শিরোপা জিতব কিভাবে!

প্রশ্ন : শেষ দিকে চলে এসেছি প্রায়। একটু যদি বলেন, রাইটব্যাক হিসেবে প্রতিপক্ষের কোন উইঙ্গারকে সামলানো সবচেয়ে কঠিন মনে হয়েছে?

আলমগীর : মোহামেডানের সাব্বির ভাই। উনি ডান দিকেই খেলতেন সাধারণত। আবার বাঁ দিক, মাঝেও চলে আসতেন। তাকে ঠেকানো খুব খুব কঠিন কাজ। মামুন জোয়ার্দার, গাউসরাও অসাধারণ। মাঝমাঠে জাকির খুব ভালো।

প্রশ্ন : আপনার সময়ের সেরা ডিফেন্ডার?

আলমগীর : জুয়েল রানা, মুন্না ভাই, কায়সার ভাই, রেহান, মাসুদ রানা।

প্রশ্ন : সেরা বিদেশি?

আলমগীর : জুকভ। ওর ধারেকাছে কেউ নেই।

প্রশ্ন : সেরা কোচ?

আলমগীর : জুকভের সময় আবাহনী এক বিদেশি কোচ এনেছিল, ওর নামটি ভুলে গেছি। ও-ই সেরা।

প্রশ্ন : বিয়ে করেন কবে?

আলমগীর : বিয়ে তো ফুটবলের সূত্রেই। (পাশে বসা স্ত্রীকে দেখিয়ে) তুমিই বলো, কিভাবে কী হলো। (আলমগীরের স্ত্রী ইয়াসমিন হাসান বলতে শুরু করেন, ‘আম্মার সঙ্গে আমরা তিন বোন চায়নিজ খেতে গিয়েছিলাম হেলাল ভাইয়ের বেইজিং-এ। ওখানেই প্রথম দেখি আলমগীরকে। তখন তো পুরো দেশেই ফুটবলাররা হিরো। আমি গিয়ে টিস্যু পেপারে ওর অটোগ্রাফ নিলাম; সেটি বাঁধিয়ে রেখে দিয়েছি এখনো। অটোগ্রাফ নেওয়ার পর ফোন নম্বর দেওয়া-নেওয়া। এরপর মন দেওয়া-নেওয়া করে দুজন বিয়ে করি ১৯৯৮ সালে। আমাদের তিন সন্তান। বড় ছেলে আনাফ হাসান ক্লাস টেনে পড়ে। মেয়ে মাহিয়া হাসান জোহা ক্লাস সেভেনে পড়ছে ভিকারুননিসায়। আর একটু আগে যে পিচ্চিকে দেখলেন ফুটবল জার্সি গায়ে, ও ছোট ছেলে আরশিল হাসান। বাবা ফুটবলার ছিলেন, এ নিয়ে ওদের অনেক গর্ব)।

প্রশ্ন : বাহ্, টিস্যু পেপারে নেওয়া অটোগ্রাফের প্রেমের গল্প শুনলাম। খেলা ছাড়ার পর তো ফুটবলের সঙ্গে আর জড়িয়ে নেই আপনি?

আলমগীর : নাহ্। গার্মেন্ট ব্যবসা শুরু করেছিলাম ১৯৯৪ সালে। আমি, নকীব, জাকির ও আতিক মিলে। সেটিতে ধরা খেলাম। এখন ঠিকাদারি ব্যবসা করছি। ভালোই আছি। লালবাগে ছিলাম এত দিন। বছর দুয়েক আগে আবাহনী ক্লাবের কাছে এসে এই ফ্ল্যাট কিনে উঠেছি। এটির খুব শখ ছিল। কারণ আমি মোহামেডানে খেললেও নিজেকে মনে করি ‘আবাহনীর আলমগীর’। এখন প্রতি সন্ধ্যায় ক্লাবে গিয়ে হারুন ভাই, ফোকলা ভাই, হেলাল ভাই, মন্টু ভাই, আনোয়ার ভাই, গোলকিপার মামুন সবার সঙ্গে আড্ডা দিই। খুব ভালো লাগে।

প্রশ্ন : শেষ প্রশ্ন। ক্যারিয়ার নিয়ে, জীবন নিয়ে তৃপ্তি কতটা? কোথাও কোনো আফসোস রয়েছে কি না?

আলমগীর : আমার জীবন পুরোটাই ফুটবলের জন্য। বরিশালে জন্ম হয়েছে, সেখান থেকে ঢাকায় এসেছি ফুটবলের কারণে। পুরো দেশের লোক আমাকে ভালোবেসেছে ফুটবলের কারণে। একটু আগে আমার স্ত্রী বললেন, বাবাকে নিয়ে আমাদের সন্তানরা খুব গর্বিত। আমি দুই ছেলেকেই তাই ফুটবলার বানাতে চাই। সে কারণেই আবাহনী ক্লাবের কাছে আসা। দুই ছেলে এখন আবাহনী ক্লাবে যায় অনুশীলন করার জন্য। ‘আলমগীরের ছেলে’ হিসেবে ওদের সবাই খুব আদর করে। কিন্তু আমি চাই, একদিন যেন আমাকে দেখিয়ে সবাই বলে, ‘ওই দেখ, আনাফের বাবা, ওই দেখ আরশিলের বাবা।’ ফুটবল আমাকে সব দিয়েছে। এখন আমার দুই সন্তান ফুটবলার হলে সে ঋণ কিছুটা হলেও শোধ হবে, তাই না?

মন্তব্য