kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০২২ । ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

পঁচাত্তর বছরে লালসালু

এমরান কবির

৭ অক্টোবর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



পঁচাত্তর বছরে লালসালু

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ (জন্ম : ১৫ আগস্ট ১৯২২, মৃত্যু : ১০ অক্টোবর ১৯৭১)

মাত্র একটি উপন্যাস লিখে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাওয়া লেখক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ। বলার অপেক্ষা রাখে না যে সে উপন্যাসটি ‘লালসালু’। জনপ্রিয়তার বিচারে ‘লালসালু’ তাঁর অন্যান্য উপন্যাস (চাঁদের অমাবস্যা এবং কাঁদো নদী কাঁদো) থেকে এগিয়ে থাকলেও শিল্পমান বিচারে কোনটিকে এগিয়ে রাখা হবে, তা নিয়ে সমালোচকরা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগেন। এর কারণ উপন্যাসত্রয়ের ভেতরে সিমিলারিটি এবং সমান্তরালতা নেই।

বিজ্ঞাপন

একেকটি উপন্যাস ভিন্ন ধাঁচের। বিষয়ে এবং প্রকরণে।

প্রথম প্রকাশের পর প্রায় ১৩-১৪ বছর উপন্যাসটি পাঠকের নজর কাড়তে ব্যর্থ হয়। ‘লালসালু’ উপন্যাসের অনন্য দিক হলো এর বিষয়। এখানে প্রেম-ভালোবাসার কথা নেই। সরাসরি গরিবদের দুুঃখ-দুর্দশার কথাও নেই। বিষয় ধর্মীয় গোঁড়ামি। প্রধান চরিত্র একজন পীর। ভণ্ডপীর, যে কিনা তার অর্থনৈতিক দুর্দশা থেকে মুক্তির জন্য পুঁজি হিসেবে বেছে নেয় সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে। হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ধর্মীয় গোঁড়ামি। উপলক্ষ হিসেবে ব্যবহার করে বহুদিনের পরিত্যক্ত একটি ভাঙা কবর। এবং এগুলোর মিশেলে সে যে কৌশল ব্যবহার করে, তাতে সফল হয়। তার অর্থনৈতিক দুর্দশা কেটে যায়। তার প্রভাব বাড়ে। বাড়ে প্রতিপত্তি। দ্বিতীয় বিয়ে করে এক তরুণীকে।

প্রকাশের শুরুতেই ‘লালসালু’ প্রথম ধাক্কা খায়। প্রথম ধাক্কাটা আসে প্রকাশক নিয়ে। ‘লালসালু’র প্রকাশক পাওয়া যাচ্ছে না। তখন চাকরিসূত্রে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ অবস্থান করছিলেন কলকাতায়। চলছে দেশভাগের দামামা। মুসলমান লেখক। কলকাতার প্রকাশকরা ঝুঁকি নিতে চাননি। অগত্যা তিনি নিজেই প্রকাশের উদ্যোগ নেন। অগ্রজ সৈয়দ নসরুল্লাহর সঙ্গে যৌথভাবে গড়ে তোলেন প্রকাশনা সংস্থা কমরেড পাবলিশার্স। তাঁদের সহযোগিতা করেন তাঁর মামা খান বাহাদুর মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম। এই প্রকাশনার প্রথম প্রকাশনা ছিল ‘ডাব্লিউ ডাব্লিউ হান্টারের দি ইন্ডিয়ান মুসলমানস’-এর পুনর্মুদ্রণ। দ্বিতীয় প্রকাশনা ছিল কবি আহসান হাবীবের প্রথম কবিতার বই ‘রাত্রিশেষে’। দেশভাগের পরপরই ১৯৪৮ সালে প্রকাশিত হওয়ার কারণে ‘লালসালু’র প্রকাশনার সঙ্গে জড়িয়ে যায় দুই দেশের নাম। ঢাকার তখনকার নামকরা আধুনিক প্রেস নবাবপুরের নারায়ণ মেশিন প্রেসে ‘লালসালু’ ছাপা হয় মনোটাইপে। প্রকাশকের ঠিকানা হিসেবে ছাপা হয় কলকাতার সুভাষ এভিনিউ। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ চেয়েছিলেন ‘লালসালু’র কাভার ডিজাইন করবেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন। কালো রঙের ওপর প্রচ্ছদ করে দেন শিল্পাচার্য। প্রচ্ছদের ব্লক কলকাতা থেকে করিয়ে আনেন সৈয়দ নসরুল্লাহ।

প্রচ্ছদ করার পর আরেক সমস্যা দেখা দিল। দেশ ভাগ হওয়ার দরুন অনেক ক্রাইসিসের মধ্যে ছিল কাগজের ক্রাইসিসও। পরে অনেক চেষ্টা করে ভালো কাগজেই ছাপা হয় ‘লালসালু’। ছাপা হয় দুই হাজার ২০০ কপি। বাইন্ডিং করা হয় একসঙ্গেই। এতে বেশ টাকা খরচ হয়ে যায়।

ব্যবসায় অনভিজ্ঞ দুই ভাই প্রকাশের পরপরই বুঝতে পারেন এতগুলো বই ছাপানো ঠিক হয়নি। একসঙ্গে বাইন্ডিং করাও ছিল ভুল। বই বিক্রি হয় না। ভালো বিপণনব্যবস্থা না থাকায় দীর্ঘদিন অবহেলায় বইগুলো পড়ে থাকে বাইন্ডিংখানায়। ফলে ‘লালসালু’র পর কমরেড পাবলিশার্স চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ নিরুৎসাহিত হন ঠিকই, কিন্তু দমে যান না। তখনকার দিনের বিখ্যাত লেখক, উঠতি লেখক, সমালোচক, শিল্পবোদ্ধাদের তিনি উপহার দিতে থাকেন ‘লালসালু’। ভালো-মন্দ কেউ কিছুই বলে না। তিনি খুব হতাশ হয়ে পড়েন। অগ্রজের বন্ধু বিখ্যাত লেখক শওকত ওসমান মাঝেমধ্যে এসে ওয়ালীউল্লাহর খোঁজ নেন।

এভাবে কেটে যায় ১০-১২ বছর। পাকিস্তানের প্রভাবশালী পত্রিকা ডনের তৎকালীন সম্পাদক আলতাফ হোসেনের নজরে আসে ‘লালসালু’। সম্ভবত তিনিই এটি উর্দুতে অনুবাদ করার উদ্যোগী হন। লাহোরের গিল্ড পাবলিশিং হাউস থেকে প্রকাশিত হয় ‘লালসালু’র উর্দু অনুবাদ। অনুবাদ করেন বিখ্যাত উর্দু লেখক ইউনুস আহমার। ‘লালসালু’র উর্দু অনুবাদের নাম ছিল ‘লাল চাদর’। প্রকাশিত হয় ১৯৬১ সালে। পুরো পাকিস্তানে হৈচৈ পড়ে যায়। ‘লালসালু’ই সম্ভবত বাংলা সাহিত্যের একমাত্র উপন্যাস, যেটি দেশের বাইরে প্রথম বিখ্যাত হয়। ওই বছরই সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান। এরপর ‘লালসালু’ পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়।

বাংলায় মুদ্রিত ‘লালসালু’ বাজারে ছিল না। সঠিক বিতরণ, বিপণন এবং পাঠকহীনতার জন্য এ রকম হয়েছিল, যদিও ছাপা হয়েছিল বিপুলসংখ্যক; যার বেশির ভাগই বাইন্ডিংখানায় নষ্ট হয়ে যায়।

এরপর কবি আহসান হাবীব ‘লালসালু’ প্রকাশনার উদ্যোগ নেন। তাঁর প্রকাশনার নাম ছিল কথাবিতান, যদিও কথাবিতানের প্রকাশক হিসেবে নাম থাকত ফাতিমা মাসতুর। কবি আহসান হাবীব সৈয়দ নসরুল্লাহর মাধ্যমে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর কাছে ‘লালসালু’ প্রকাশের অনুমতি চান। ওয়ালীউল্লাহ তখন ফ্রান্সে থাকেন। খুব দ্রুত অনুমতি দিয়ে দেন।

‘লালসালু’র প্রথম প্রচ্ছদশিল্পী ছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন। কথাবিতান সংস্করণের প্রচ্ছদ করেন শিল্পী আবদুর রউফ। কবি আহসান হাবীব কেন জয়নুল আবেদিনের করা প্রচ্ছদ রাখেননি, তা এক রহস্য। ১৯৫৮ সালের ২৮ আগস্ট কথাবিতানের সঙ্গে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। দেড় টাকার স্ট্যাম্পে চুক্তিপত্রটি লেখেন কবি আহসান হাবীব নিজেই। লেখক হিসেবে স্বাক্ষর করেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ। সাক্ষী হয়েছিলেন সৈয়দ নসরুল্লাহ।

চুক্তিপত্রে ছয়টি ধারা ছিল। প্রথম ধারায় বলা হয়েছিল, “উক্ত ‘লালসালু’ ও ‘নয়নচারা’র স্বত্ব এর আগে আমি কাহাকেও অর্পণ করি নাই। এবং প্রথম সংস্করণের সমস্ত কপি বিক্রয় হইয়া গিয়াছে। ” দ্বিতীয় ধারায় বলা হয়েছিল, ‘কথিত দ্বিতীয় সংস্করণে কথাবিতান প্রত্যেকখানি বই মোট ২২৫০ কপি করিয়া ছাপিবেন এবং উক্ত সংস্করণের জন্য লভ্যাংশ হিসেবে আমি প্রত্যেকখানির জন্য মোট ৫০০ করিয়া সর্বমোট ১০০০ টাকা গ্রহণ করিব। ’ তৃতীয় ধারায় বলা হয়েছিল, “‘লালসালু’ প্রকাশের পর তিন মাসের মধ্যে ২৫০ টাকা এবং পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে ২৫০ টাকা, অতঃপর ‘নয়নচারা’ প্রকাশের পর ছয় মাসের মধ্যে ২৫০ টাকা এবং পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে ২৫০ টাকা পরিশোধ করিতে কথাবিতান অঙ্গীকৃত রহিল। ”

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ১৯৬১ সালে উপন্যাসের জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। এর পরপরই ‘লালসালু’র ব্যাপক চাহিদা বেড়ে যায়। ১৯৬৩ সালের সেপ্টেম্বরে বের হয়ে যায় তৃতীয় সংস্করণ। চতুর্থ সংস্করণ বের হয় ১৯৬৫ সালের এপ্রিলে। পঞ্চম সংস্করণ বের হয় ১৯৬৬ সালের সেপ্টেম্বরে। ষষ্ঠ সংস্করণ বের হয় ১৯৬৭ সালের সেপ্টেম্বরে। কথাবিতানে আর কোনো বইয়ের কোনো সংস্করণ হয়নি। তবে সংস্করণের সময়ের ব্যবধান দেখলেই বোঝা যায় ‘লালসালু’র কাটতি দিন দিন কতটা ঊর্ধ্বমুখী ছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয়, লেখক-প্রকাশকের চিরকালীন সম্পর্কের মতোই লেখক অতি সামান্যই রয়ালটি পেয়েছিলেন প্রকাশনের তরফ থেকে। কিন্তু সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ সান্ত্বনা খুঁজেছেন অন্য জায়গায়। বইটি অন্তত মানুষ পড়ছে তো। পরবর্তী সময়ে ‘লালসালু’র প্রকাশনার দায়িত্ব দেওয়া হয় নওরোজ কিতাবিস্তানকে।

১৯৭০ সালের জানুয়ারিতে পাকিস্তান ন্যাশনাল বুক সেন্টার সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহকে তাদের অফিসে সংবর্ধনা দেয়। পরিচালক ছিলেন আরেক প্রখ্যাত লেখক সরদার জয়েনউদ্দীন। কবি জসীমউদ্্দীন, শওকত ওসমান, মুনীর চৌধুরী প্রমুখ তাঁর লেখা নিয়ে বক্তৃতা করেন। তিনি ভেতরে ভেতরে খুবই পুলক অনুভব করেন। রাতে স্ত্রী আন-মারি তিবোকে খুব উচ্ছ্বাসের সঙ্গে সেই পুলকের কথা ব্যক্ত করেন। বলেন, লেখালেখিতে আরো মন দিতে হবে, কিন্তু সে সময় তিনি পাননি। ১৯৭১ সালের ১০ অক্টোবর গভীর রাতে অধ্যয়নরত অবস্থায় মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণের ফলে তিনি প্রয়াত হন।

১৯৫৩ সালে পরিচয় পত্রিকায় প্রকাশিত এক লেখায় সুশীল জানা লিখেছিলেন, ‘ওয়ালীউল্লাহ সাহেবের ঝোঁক মনঃসমীক্ষণের দিকেই বেশি। ...মুসলমান লেখকের আবির্ভাব বহুদিনের একটি মর্মান্তিক অভাব ক্রমে পরিপূর্ণ করে তুলবে, বাংলা সাহিত্য পাবে তার সমগ্ররূপ। ’ আজ এত দিনে সুশীল জানার কথাগুলো সত্য প্রমাণিত হচ্ছে।

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর মৃত্যুর পর শওকত ওসমানের উদ্যোগে কলকাতায় শোকসভার আয়োজন হয়েছিল। ওয়ালীউল্লাহ সম্পর্কে আলোচনা করেন কথাশিল্পী বনফুল (বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়), সৈয়দ আলী আহসান প্রমুখ। সভাপতিত্ব করেছিলেন অধ্যাপক দেবীপদ ভট্টাচার্য। শওকত ওসমান সেদিন বলেছিলেন, ‘সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ মানুষ যেমন ছিলেন অভিজাত, লেখক হিসেবেও ছিলেন একজন অভিজাত। ’ তাঁর এই বক্তব্যের সঙ্গে কেউ দ্বিমত পোষণ করেননি।

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ছাত্রজীবনের বন্ধু, পরে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী তাঁর মৃত্যুর সাত মাস পরে তাঁর স্ত্রীকে এক আধাসরকারি সান্ত্বনাবার্তা পাঠান। এতে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমাদের দুর্ভাগ্য যে মি. ওয়ালীউল্লাহর মাপের প্রতিভার সেবা গ্রহণ থেকে এক মুক্ত বাংলাদেশ বঞ্চিত হলো; আমাকে এটুকু বলার সুযোগ দিন যে আপনার ব্যক্তিগত ক্ষতি বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ক্ষতি। ’



সাতদিনের সেরা