kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৯ নভেম্বর ২০২২ । ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ ।  ৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

কে পাচ্ছেন এবার সাহিত্যে নোবেল

দুলাল আল মনসুর

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



কে পাচ্ছেন এবার সাহিত্যে নোবেল

খুব নিকটে চলে এসেছে সাহিত্যের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার নোবেল ঘোষণার দিন। আগ্রহী পাঠকরা অধীর অপেক্ষায় আছেন কাঙ্ক্ষিত সাহিত্যিকের নাম শোনার জন্য। নোবেল পুরস্কার সম্পর্কে অনুমান করে কিছু বলা খুব কঠিন। অনেক সময় লেখকের ভাষা, লিঙ্গ, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও অবস্থান, ভৌগোলিক অবস্থান ইত্যাদি বিষয়ও বিবেচনায় রেখে অনুমান করা যায় কে পেতে যাচ্ছেন নোবেল।

বিজ্ঞাপন

২০২২ সালের পুরস্কারের জন্য প্রাসঙ্গিকভাবে অন্যবিধ ক্ষেত্রে আলোচনা ও প্রত্যাশা মাথায় রেখেও উল্লেখ করা যায় ব্রিটিশ জুয়াড়ি প্রতিষ্ঠান ল্যাডব্রক্সের কথা। সেখানে যাঁরা বাজি ধরেন, এবার তাঁদের বেশির ভাগেরই প্রথম পছন্দ ফরাসি কথাসাহিত্যিক মিশেল ওয়েলবেক। ওয়েলবেক উপন্যাস, কবিতা ও প্রবন্ধ লেখেন। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘হোয়াটএভার’ প্রকাশ করেন ১৯৯৪ সালে। একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকের মাঝামাঝি তাঁকে বহির্বিশ্বে ফরাসি সাহিত্যের প্রধান বাহক বলা হয়।    

এবার ল্যাডব্রক্সের তালিকার দ্বিতীয় স্থানে আছেন সালমান রুশদি। গত মাসের ১২ তারিখে নিউ ইয়র্কে জঘন্য হামলার শিকার হন রুশদি। তার পর থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও একাডেমিক মহল থেকে সুইডিশ একাডেমির নোবেল কমিটির প্রতি অনুরোধ আসছে রুশদিকে এ বছরের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দেওয়ার সমর্থনে। ‘মিডনাইটস চিলড্রেন’, ‘দ্য মুরস লাস্ট সাই’, ‘যোসেফ অ্যান্টন : আ মেমোইর’ রুশদির অন্যতম বিখ্যাত লেখা।   

বাজির তালিকার তৃতীয় স্থানে রয়েছেন কেনিয়ার কথাসাহিত্যিক গুগি ওয়া থিয়োঙ্গো। ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, প্রবন্ধকার, সম্পাদক ও শিক্ষাবিদ গুগির লেখায় প্রাধান্য পেয়েছে আফ্রিকার ঔপনিবেশিক অবস্থা থেকে উত্তর-ঔপনিবেশিক অবস্থায় স্থানান্তরকালের টানাপড়েন এবং আধুনিক মানুষের জীবন জটিলতার চিত্র। ‘আ গ্রেইন অব হুইট’, ‘দিস টাইম টুমরো’, ‘দ্য ট্রায়াল অব দেবান কিমাথি’, ‘ডিকলোনাইজিং দ্য মাইন্ড’ ইত্যাদি তাঁর গ্রন্থগুলোর অন্যতম।   

যুক্তরাষ্ট্রের কথাসাহিত্যিক স্টিফেন কিং চলে এসেছেন আলোচনার সামনের দিকে। তাঁকে বলা হয় ‘কিং অব হরর’। কল্পবিজ্ঞান, অপরাধবিষয়ক ও লোমহর্ষক কাহিনি লেখার কারণেই তাঁর এমন নাম।

যুক্তরাষ্ট্রের কবি ও কথাসাহিত্যিক গ্যারিয়েল লাজ নোবেল পুরস্কারের সম্ভাব্য আলোচিত ব্যক্তি হিসেবে পাঠকমনে আগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছেন। ‘স্টোরিস ইন দ্য ওর্স্ট ওয়ে’, ‘আই লুকড অ্যালাইভ’, ‘পার্শিয়াল লিস্ট অব পিপল টু ব্লিচ’ ও ‘ডিভোর্সার’ তাঁর বিখ্যাত গল্প সংকলনের নাম।

ব্রাউন ইউনিভার্সিটির সাহিত্যের অধ্যাপক যুক্তরাষ্ট্রের আরেক কথাসাহিত্যিক রবার্ট লোয়েল কুভারও আছেন সম্ভাব্য লেখকদের তালিকায়। প্রধানত মেটাফিকশন লেখক হিসেবে তাঁর পরিচিতি বেশি। ‘দি অরিজিন অব দ্য ব্রানিস্টস’, ‘দি ইউনিভার্সাল বেসবল অ্যাসোসিয়েশন ইনক. জে হেনরি ওয়াহ প্রপ’ ও ‘দ্য পাবলিক বানিং’ তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস।

পাঠকের ভালোবাসায় তাঁদের দেশের আরো আছেন জয়েস ক্যারল ওটস, ডন ডেলিলো, এন টাইলার, করমাক ম্যাককার্থি, রিচার্ড ফোর্ড, ডেভ এগারস, মেরিলিন রবিনসন প্রমুখ। আমেরিকার কথা কিংবা শুধু ইংরেজির কথা উঠলেও ডন ডেলিলোর নাম আসতেই পারে। সমসাময়িক মানুষের জটিল জীবনের বয়ান খুব নিচু স্বরে তুলে ধরেন তিনি।

কথাসাহিত্যিক জয়েস ক্যারল ওটস বহুলপ্রজ হলেও তাঁর লেখার মধ্যে প্রাণের উপস্থিতি বেশ জোরালো।

অ্যান্টিগুয়ান-আমেরিকান ঔপন্যাসিক, প্রবন্ধকার জ্যামেইকা কিনকেইডও নোবেল পুরস্কারের জন্য বিবেচ্য হতে পারেন। আফ্রিকান ও আফ্রিকান আমেরিকান স্টাডিজের হার্ভার্ড প্রফেসর কিনকেইড লিখে থাকেন উপনিবেশবাদ, ব্রিটিশ ও আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদ, বর্ণবাদ, ঔপনিবেশিক শিক্ষা, লিঙ্গবাদ, শ্রেণি, ক্ষমতা—এসব বিষয়ে।

সাহিত্যের অধ্যাপক ফরাসি কথাসাহিত্যিক আনি এরনো এবারের আলোচনায় একদম সামনের দিকে চলে এসেছেন। তাঁর লেখা প্রধানত আত্মজীবনীমূলক। ১৯৭৪ সালে প্রকাশ করেন তাঁর প্রথম আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ‘ক্লিনড আউট’।   

ফরাসি কথাসাহিত্যিক পিয়ারে মিশনও এবারের আলোচনায় এগিয়ে এসেছেন। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘স্মল লাইভস’কে ফরাসি সাহিত্যের মাস্টারপিস গণ্য করা হয়। ‘স্মল লাইভস’ ও ‘দি অরিজিন অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ উপন্যাসের জন্য তিনি বেশ কয়েকটি পুরস্কার পেয়েছেন। ইউরোপের প্রায় সব ভাষায় অনূদিত হয়েছে তাঁর লেখা।  

বেশ কয়েক বছর ধরে আলোচনার শীর্ষে থাকা জাপানি কথাসাহিত্যিক হারুকি মুরাকামিকে নিয়ে বাজির লোকেরা এবার বেশি আগ্রহ দেখায়নি। এবার কিছুটা পিছিয়েই রাখা হয়েছে তাঁকে।  

কানাডার কবি, কথাসাহিত্যিক, পরিবেশবাদী কর্মী ও সাহিত্য সমালোচক মার্গারেট অ্যাটউড বুকার পুরস্কার পাওয়ার অনেক আগে থেকেই আমাদের দেশসহ পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই পরিচিত। লিঙ্গ সম্পর্কিত বিষয়, ব্যক্তির পরিচয়, ধর্ম, পুরাণকথা, রাজনীতি, জলবায়ু পরিবর্তনসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয় তাঁর লেখায় প্রাধান্য পেয়ে থাকে।

কানাডার কবি, প্রবন্ধকার ও অনুবাদক এন কারসন এবারও আলোচনায় আছেন। কানাডার সাহিত্যে অবদানের জন্য দেশে ও বাইরের, বিশেষ করে ইউরোপ ও আমেরিকাসহ অনেক দেশের বড় বড় পুরস্কার পেয়েছেন।

ফরাসি কথাসাহিত্যিক, সমালোচক ও নাট্যকার মারিস কোন্দি বেশ সম্ভাবনাময় নাম এবারের নোবেলের জন্য। তাঁর লেখা কথাসাহিত্য ইউরোপের বিভিন্ন ভাষা ও এশিয়ার কতিপয় ভাষায় অনূদিত হয়েছে।  

বেশ কয়েক বছর রুশ কথাসাহিত্যিক লিউদমিলা উলিৎসকেয়ার নাম এসেছে আলোচনায়। যুদ্ধের ভয়াবহতা ও ধর্মীয় সহিংসতার বিপক্ষে জাতিগত ও ধর্মীয় সহনশীলতার কথা বলেন তিনি। সাহিত্যের মাধ্যমে রাশিয়ার চলমান রাজনৈতিক বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারছেন তিনি।

কয়েক দশকজুড়ে নোবেল পুরস্কার ঘোষণার মৌসুম এলে মিলান কুন্ডেরার নামটি পাঠকদের মুখে উচ্চারিত হয়েছে। আমাদের দেশের অনেক পাঠক খুশি হবেন সত্যি যদি তিনি এই বয়সে এসে নোবেল পুরস্কার পেয়ে যান।

আলবেনিয়ার বর্ষীয়ান কথাসাহিত্যিক ইসমাইল কাদারে এবার নোবেল পুরস্কার পেতে পারেন। তাঁর উপন্যাসের পটভূমি ইতিহাসের অতীত পৃষ্ঠায় স্থাপন করা হয়েছে। তাঁর বয়ানকৌশলের মধ্যে বিভিন্ন শৈলীর মিশ্রণ দেখা যায়। মূল ঘটনার পাশাপাশি চলে আসে প্রকৃতির বর্ণনা, চেতনাপ্রবাহ, লোককাহিনি কিংবা স্বপ্নপ্রয়াণের মতো বিষয়।

উপন্যাস, ছোটগল্প, স্মৃতিকথা, প্রবন্ধসহ সাহিত্যের বিশাল পরিসরে বিচরণ করেন বুকারজয়ী ব্রিটিশ লেখক হিলারি ম্যানেটেল। কিন্তু গত বছর আবদুর রাজ্জাক গুরনাহ নোবেল পুরস্কার পাওয়ার কারণে ম্যানটেল, এ এস বায়াট কিংবা মার্টিন এমিসের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে গেছে। অন্য ভাষার লেখকদের কথা বিবেচনা করলে স্প্যানিশ ঔপন্যাসিক হাভিয়ার মারিয়াস, আন্তনিও মলিনা কিংবা আন্তর্জাতিক পাঠকের বেশ প্রিয় কথাসাহিত্যিক ইসাবেল আইয়েন্দে—এঁদের কেউ পেয়ে যেতে পারেন এ পুরস্কার। চিলির লেখক ইসাবেল আইয়েন্দে বিশ্বপাঠকের কাছে স্প্যানিশভাষী সর্বাধিক পঠিত লেখকদের অন্যতম বলে বিবেচিত লেখায় জাদুবাস্তবতার ব্যবহার এবং গল্প বলার অসাধারণ ক্ষমতার জন্য।    

দক্ষিণ কোরিয়ার বর্ষীয়ান কবি কো উনের সম্ভাবনা একেবারে কমে গেছে তা নয়, বরং কথাসাহিত্যের নোবেল পুরস্কারের বিশাল কাতারের মাঝে কবিতার রং আরো একবার লাগতে পারে।  

বয়স কম হলেও নাইজেরিয়ার চিমামন্দা নগোজি আদিচি পাঠকদের কাছে এরই মধ্যে লেখার মানের জন্যই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন।  

আর্জেন্টিনার কথাসাহিত্যিক সিজার আয়রা, সোমালিয়ার ঔপন্যাসিক নুরুদ্দিন ফারাহ, চীনের কবি বেই দাও, স্পেনের ঔপন্যাসিক হুয়ান মারসে, ইরানের কথাসাহিত্যিক মোহাম্মদ দৌলতাবাদী, রুশ কথাসাহিত্যিক মিখাইল শিসকিন, বেলজিয়ামের কবি লিওনার্দ নোলেনস প্রমুখের যে কারো নাম উচ্চারিত হতেই পারে নোবেল পুরস্কারের প্রাপক হিসেবে। আর্জেন্টিনার কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক সিজার আয়রা বহুলপ্রজ লেখক। অনুবাদক হিসেবে তিনি সমান পরিচিত ও জনপ্রিয়। পূর্ব আফ্রিকার নুরুদ্দিন ফারাহ উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ ও নাটক লেখেন। নিরীক্ষাধর্মী শৈলীর লেখক নুরুদ্দিন ফারাহ ইউরোপ-আমেরিকার অনেক সম্মানজনক পুরস্কার এরই মধ্যে পেয়ে গেছেন।

২০১৮ ও ২০১৯ সালের নোবেল পুরস্কার খুব কাছাকাছি ভৌগোলিক অবস্থানের দুজন লেখককে দেওয়া হয়েছে। সে কারণে হাঙ্গেরির ঔপন্যাসিক, নাট্যকার পিটার নাদাসকে তাঁর লেখার গুণের কারণে বিবেচনায় রাখলেও জোর দিয়ে আর বলা যায় না, তিনি পেতে পারেন। হাঙ্গেরির আরেক আলোচিত লেখক হলেন লাজলো ক্রাজনাহরকাই। ঔপন্যাসিক ও নাট্যকার ক্রাজনাহরকাই বিষণ্নতার বিষয়বস্তুর জন্য বিশেষ এক শ্রেণির পাঠকের কাছে বেশ প্রিয়।

‘চীনের নিরীক্ষাধর্মী কথাসাহিত্যের অগ্রগণ্য লেখক’ বলা হয় ক্যান জুইকে। প্রথম পর্যায়ের আধুনিক চীনা সাহিত্যের বাস্তববাদী উপস্থাপনার বলয় থেকে বেরিয়ে এসে তিনি নিরীক্ষাধর্মী লেখা লিখছেন। আরেক লেখক ইয়ান লিয়াংকের নামও গুরুত্বপূর্ণ। ব্যঙ্গাত্মক সুর তাঁর লেখার প্রধান বৈশিষ্ট্য। চীনের কথাসাহিত্যের মেটাফিকশন ও উত্তরাধুনিক ধারার লেখকদের মধ্যে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় লেখক হিসেবে পরিচিতি পান ইউ হুয়া। কথাসাহিত্য ছাড়াও প্রবন্ধ লেখেন। ইংরেজি ভাষার দিক থেকে গুরুত্বের দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে নিলে চীনের সাহিত্যিকদের দিকে নজর দেওয়া যেতে পারে।

আইরিশ ঔপন্যাসিক জন বানভিল, নরওয়ের নাট্যকার জন ফসে, ভারতের অমিতাভ ঘোষ প্রমুখ অনেক দিন থেকেই পাঠকদের কাছে প্রিয়। তাঁদের কেউ এবার নোবেল পুরস্কার পেয়েও যেতে পারেন।

তবে সারা বিশ্বের পাঠক সবচেয়ে বেশি খুশি হবেন নব্বইয়ের দশকের নাদিন গর্ডিমার, ডেরেক ওয়ালকট, টনি মরিসন কিংবা সিমাস হিনির মতো মর্যাদার কোনো লেখক নোবেল পেয়ে গেলে।



সাতদিনের সেরা