kalerkantho

রবিবার । ২৬ জুন ২০২২ । ১২ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৫ জিলকদ ১৪৪৩

নজরুলের বিদ্রোহী চেতনায় আধ্যাত্মিকতার সংশ্লেষ

মোহীত উল আলম

২০ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



নজরুলের বিদ্রোহী চেতনায় আধ্যাত্মিকতার সংশ্লেষ

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহী কবি হিসেবে সমধিক পরিচিত হলেও আমি বলতে চাইছি, তাঁর বিদ্রোহী সত্তার অন্তরালে কাজ করেছে নিটোল একটি আধ্যাত্মিকতাবোধ যে একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন, যিনি সব অন্যায়ের প্রতিবিধান করবেন।

১৯২১ সালের ডিসেম্বরে লেখা এবং ১৯২২ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় ‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী, আর হাতে রণতূর্য’ পঙক্তিটির মাধ্যমে নজরুলের প্রেম ও দ্রোহের দ্বৈত সত্তার সহাবস্থান প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু ঠিক বৈপরীত্যের সম্মিলন এখানে ঘটেনি, যেটি ঘটেছে সেটি হলো একটি অপরিমেয় শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ।

নজরুল যখন দ্রোহসঞ্জাত রাজনীতির মধ্যে তাঁর আদর্শের পরিপ্রেক্ষিত খুঁজে পান না, পান না সামাজিক অর্থে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক আচরণের মধ্যেও, তখন তাঁর আত্মার শুচিতাবোধ ও সত্যপ্রিয়তা প্রবলভাবে একটি উদ্দেশ্যের দিকে ধাবিত হয়, যার একটিই নাম হতে পারে শুধু—আত্মসমর্পণ, একটি মহাশক্তির কাছে আত্মসমর্পণ।

বিজ্ঞাপন

বিদ্রোহের বেলায় সেটি প্রত্যক্ষ রাজনীতির ক্ষেত্র ছেড়ে দিয়ে নিমজ্জিত হয় এক অপরিসীম অধ্যাত্মবাদী নিশ্চয়তায় আর প্রেমের ক্ষেত্রে বিরহের অনুপম সাধনায়। নজরুলের বিদ্রোহী সত্তার মধ্যে আত্মত্যাগের মহিমা আর তাঁর প্রেমিক সত্তার মধ্যে আত্মত্যাগের প্রেরণা একই সূত্রে গাঁথা এবং এই জায়গায় এসে আমরা বলতে পারি যে পারস্য দার্শনিক মানির বৈপরীত্যতত্ত্বকে উত্তীর্ণ হয়ে নজরুল একটি পরিণতিবোধের মধ্যে পৌঁছেছিলেন নিজেকে একটি ঐশ্বরিক শক্তির কাছে বিলিয়ে দিয়ে।    

১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল অমৃতসরে জালিনওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ তাঁকে প্রদত্ত ‘স্যার’ উপাধি প্রত্যাখ্যান করেন ওই বছরেরই ৩১ মে আর নজরুল লেখেন বাংলা সাহিত্যে সম্ভবত সবচেয়ে উৎকর্ষসমৃদ্ধ বক্রকথনপূর্ণ রচনাটি, ‘ডায়ারের স্মৃতিস্তম্ভ’ শীর্ষক। নজরুল বলছেন, ডায়ার যদি উন্মাদের মতো এই আসুরিক হত্যাকাণ্ডটি না ঘটাত, তাহলে ভারতবাসী বুঝতে পারত না ঔপনিবেশিক শক্তির মদমত্ততা কাকে বলে এবং সে মার খেয়েই তাদের আত্মমর্যাদাবোধ জেগে উঠেছে। কাজেই ভারতীয়দের ঘা মেরে জাগানোর জন্য ডায়ারকে শুধু শ্রদ্ধা জানানো নয়, তার সম্মানে একটি স্মৃতিস্তম্ভও তৈরি করা দরকার বলে বক্রোক্তি করলেন নজরুল। এই রচনায় নজরুলের গদ্য প্রতিবাদী সাহিত্যের অনুপম দৃষ্টান্ত, বিশদ উদ্ধৃতি না দিলে তাঁর ঠাট্টা বোঝা যাবে না :

“এই ডায়ারের মতো দুর্দান্ত কসাই সেনানী যদি সেদিন আমাদিগকে এমন কুকুরের মতো করিয়া না মারিত, তাহা হইলে কি আজিকার মতো আমাদের এই হিম-নিরেট প্রাণ অভিমান-ক্ষোভে গুমরিয়া উঠিতে পারিত—না, আহত আত্মসম্মান আমাদের এমন দলিত সর্পের মতো গর্জিয়া উঠিতে পারিত? কখনই না। আজ আমাদের সত্যিকার শোচনীয় অবস্থা সাদা চোখে দেখিতে পারিয়াছি এই ডায়ারের জন্য। ডায়ারের প্রচণ্ড পদাঘাত, পৈশাচিক খুনখারাবি আমাদিগকে স্পষ্ট করিয়া আমাদের ঘৃণ্য হীন অবস্থা সম্বন্ধে সচেতন করিয়া দিয়াছে। আরো জানাইয়া দিয়াছে যে, —যে নিষ্ঠীবন মাথায় করিয়া প্রভুর দেওয়া যে চাপ্রাস পরিয়া, যে ছিন জুতার মালা গলায় দুলাইয়া আমরা আহমকের মতো দুনিয়ার স্বাধীন জাতিদের সামনে দাঁড়াইয়া গোলামির ঝুটা গৌরব দেখাইতে গিয়া শুধু হাস্যাস্পদ হইয়াছিলাম, তাহাতে কেহ আমাদের প্রশংসা তো করেই নাই, উল্টো আরো, ‘হট্ যাও গোলাম কা জাত’ বলিয়া অবলীলাক্রমে লাঠির গুঁতো, বুটের টক্কর লাগাইয়াছে। তাহারা স্বাধীন—আজাদ; তাহারা আমাদের এ-হীন নীচতা, এত হেয় ভীরুতা, এমন ঘৃণ্য কাপুরুষতাকে পা দিয়া মাড়াইয়া যাইবে না তো কি মাথায় তুলিয়া লইবে?”

নজরুলের ঠাট্টার প্রচ্ছন্নে এই তৃপ্তিবোধও সম্ভবত আছে যে, যে ডায়ারের কীর্তি না হলে ভারতবাসীর অভিমান জেগে উঠত না, সে অভিমানের বলয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘স্যার’ উপাধি প্রত্যাখ্যানের ব্যাপারটিও সংযোজিত হতে পারে।

তাহলে ডায়ারের কর্মের প্রতিবাদস্বরূপ কী করতে হবে? তার একটি ধারণা আমরা পাই নজরুল যখন কারান্তরিন হন। ধূমকেতুর নভেম্বর মাসের একটি সংখ্যায় প্রকাশিত তাঁর কবিতা ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ ও অন্যজনের একটি কবিতার জন্য রাজরোষে পড়েন নজরুল। ফলে তিনি ১৯২২ সালের ডিসেম্বরে কুমিল্লায় গ্রেপ্তার হন এবং ১৯২৩ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি এক বছরের জন্য কারান্তরিন হন। কিন্তু বিচারকের আদালতে তিনি আত্মপক্ষ সমর্থনের একটি দীর্ঘ আবেদন দাখিল করেন, যেটি ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ নামে জনপ্রিয় হয়।

নজরুলের ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ আমাদের ধন্দে ফেলার মতো একটি রচনা। দেখা যায়, নজরুলের বিদ্রোহী চেতনা যতটা না রাজনৈতিক তার চেয়ে বেশি নৈয়ায়িক। সে জন্য যে অর্থে সক্রিয় রাজনৈতিক কবি বলতে কাউকে বোঝায় সে অর্থে নজরুলের রচনা পাঠ করে তাঁর যে চিন্তা পাই, তাতে তাঁকে রাজনৈতিকভাবে বিদ্রোহী বলার চেয়ে ভাববাদী অর্থে বিদ্রোহী বলা সংগত। যে কারণে এ কথাটি বলছি, সেটি হলো ‘বিদ্রোহী’ কবিতার কবির মধ্যে কারাভাগ্য বরণ করে নেওয়ার বেলায় যে যুক্তিটি আত্মপক্ষ সমর্থনের ক্ষেত্রে বড় করে বলা হচ্ছে, সেটি কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রতিরোধের কথা নয়, বরং অ্যারিস্টটলের ধারণানুযায়ী সব কিছুর যেন একটি নৈয়ায়িক বা নৈতিক সমাধান হবে সে রকম একটি ধারণা, যেন কবি নজরুলকে অন্যায়ভাবে দণ্ডাদেশ দেওয়ার জন্য ইংরেজ শাসকবর্গ কোনো একটি ঐশ্বরিক শাস্তি পাবে। অ্যারিস্টটলের সময় প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় নির্দেশ অনুযায়ী ন্যায়-নীতির একজন প্রত্যক্ষ রক্ষক বা ঈশ্বর বা সৃষ্টিকর্তা ছিলেন না, কিন্তু পাপ-পুণ্য, অপরাধ ও শাস্তির বিধান করার জন্য দেবতাকুল সম্পর্কে তাঁদের স্পষ্ট ধারণা ছিল। অ্যারিস্টটলের নৈয়ায়িক ধারণা ও প্রচলিত ধর্মীয় চিন্তার আওতায় ক্রিয়াশীল নজরুলের বিদ্রোহভাবনার মধ্যে এই আস্থা বারবার প্রকাশিত হয়েছে যে কবির আত্মার মধ্যে যে ভগবান বিরাজ করেন, যিনি সত্যের বিধান করেন, যিনি সত্যের বীণা কবির হাতে সঁপে দিয়েছেন, তিনিই সব অবিচারের বিচার করবেন।

রচনাটির যেকোনো জায়গা থেকে উদ্ধৃতি দিলে ওপরের কথার সমর্থন মিলবে :

‘কেন না আমি যে ভগবানের প্রিয়, সত্যের হাতের বীণা; আমি যে কবি, আমার আত্মা যে স্বপ্নদ্রষ্টা ঋষির আত্মা। ...আমি অন্ধ-বিশ্বাসে, লাভের লোভে, রাজভয় বা লোকভয়ে মিথ্যাকে স্বীকার করতে পারি না। অত্যাচারকে মেনে নিতে পারি না। তা না হলে যে আমার দেবতা আমায় ত্যাগ করে যাবে।

...আমার ভয় নাই, দুঃখ নাই; কেন না ভগবান আমার সাথে আছেন। আমার অসমাপ্ত কর্তব্য অন্যের দ্বারা সমাপ্ত হবে। সত্যের প্রকাশ-পীড়া নিরুদ্ধ হবে না। আমার হাতের ধূমকেতু এবার ভগবানের হাতের অগ্নি-মশাল হয়ে অন্যায়-অত্যাচারকে দূর করবে। আমার বহ্নি-এরাপ্লেনের সারথি হবেন এবার স্বয়ং রুদ্র ভগবান। অতএব, মাভৈঃ, ভয় নাই। ’

উপরোক্ত উদ্ধৃতিগুলো থেকে বোঝা যায় মানিকিয়ানতত্ত্বের সরলীকৃত বৈপরীত্যের পরিপ্রেক্ষিতে নজরুলের দ্রোহের বিচার খানিকটা জটিল। কেননা লালন সাঁইয়ের মতো তাঁর মানবতাবোধ সব জাত-পাতের ঊর্ধ্বে, সব সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে এবং সৃষ্টিকর্তার কাছে সমর্পিত হওয়ার বাসনায় উন্মুখ। তার পরও সাম্যবাদী কবিতাগুলোর পর্বে নজরুল প্রত্যক্ষভাবে রাজনৈতিক : ‘গাহি সাম্যের গান—/যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান,/যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রীশ্চান। ’ (সাম্যবাদী)। আবার নজরুলের সমাজ-স্বপ্ন শ্রেণি-নির্বিশেষ, ধনী-গরিব ভেদাভেদবিহীন, এবং সে শ্রেণি-বিভাজিত সমাজের প্রতি তাঁর গর্জন : ‘তুমি শুয়ে রবে তেতালার ’পরে আমরা রহিব নিচে,/অথচ তোমারে দেবতা বলিব, সে-ভরসা আজ মিছে!’ (কুলি-মজুর) নজরুল রাজনৈতিক, এই পর্যন্ত তিনি ধূমকেতু, লাঙ্গল বা নবযুগ পত্রিকার সম্পাদক, কিন্তু রাজনৈতিক-সচেতনতা উদ্ভূত মানসিক উজ্জীবনের বাইরেও নজরুলের অন্তরস্থ যে সত্তার খবর আমরা পাই, সেটি রবীন্দ্রনাথের ১৩ মে ১৯৪১-এ ‘রূপ-নারানের কূলে’ শীর্ষক কবিতায় উচ্চারিত ‘সত্য যে কঠিন,/কঠিনেরে ভালোবাসিলাম—/সে কখনো করে না বঞ্চনা’ ধরনের। কারণ নজরুল ‘আমার পথ’ শীর্ষক নিবন্ধে বলছেন, ‘আমার কর্ণধার আমি। আমায় পথ দেখাবে আমার সত্য। ’

‘মানুষ’ কবিতার এক জায়গায় কবি বলছেন, যে ভিক্ষুককে মেরে দোরগোড়া থেকে ফিরিয়ে দিলে, দেবী সেটি ক্ষমা করেছেন কি না তা অনিশ্চিত : ‘সে মার রহিল জমা—/কে জানে তোমায় লাঞ্ছিতা দেবী করিয়াছে কিনা ক্ষমা!’ বা ‘নারী’ কবিতায় পাপ-পুণ্যবোধের ছবিটি আরো পরিষ্কার : ‘যুগের ধর্ম এই—/পীড়ন করিলে সে-পীড়ন এসে পীড়া দেবে তোমাকেই!’ মানিকিয়ান দর্শনে যে প্রতিপক্ষতা আছে, যেটির আলোকে রাজনৈতিক চেতনায় যে সাংঘর্ষিক প্রত্যক্ষতা থাকে, থাকে যে প্রতিপক্ষ শক্তিগুলোর মধ্যে আদর্শ নিয়ে দ্বন্দ্ব বা সংঘর্ষ, বা কার্যকারণ, বা কর্মকৌশলের পরম্পরা, নজরুলে সে জায়গায় দেখি আছে তেমন একটি অধ্যাত্মবাদ, যা আগেই বলেছি, অ্যারিস্টটলের টেলিওলজিক্যাল বা নৈতিকতাপুষ্ট দর্শন অনুযায়ী গঠিত, যে দর্শনে বিধাতা কর্তৃক পাপের শাস্তি বিধান নিশ্চিত, কিন্তু যে দর্শনে রাজনৈতিক বাস্তবতা অনুপস্থিত। অনেকটা গান্ধী যে কারণে রবীন্দ্রনাথের ওপর হতাশ হয়েছিলেন, সে কারণে নজরুলের ওপর রাজনৈতিক দার্শনিকরা হতাশ হবেন, সেটি নিশ্চিত।

এদিক থেকে আমি বলতে চেয়েছি যে ‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী, আর হাতে রণতূর্য’ প্রচলিত অর্থে প্রেম ও দ্রোহের মধ্যে যে দ্বান্দ্বিকতার ইঙ্গিত দেয় তার চরিত্রটি এ রকম আপাত মনে হতে পারে যে নজরুল বুঝি রণতূর্য বাজিয়ে ঔপনিবেশিকতা, পরাধীনতা, সাম্প্রদায়িকতা বা অমানবিকতার বিরুদ্ধে একটি রাষ্ট্রিক এবং সামাজিক আন্দোলনে নেমেছেন। কিন্তু আসলে প্রমাণিত হয় যে তিনি বেদ-বেদান্ত পঠিত, কোরআন-শিক্ষিত একটি ধর্মীয় আচার-কাঠামোর ভেতর দিয়ে আত্মার শুদ্ধি কামনা করেছেন। নজরুলের রণস্পৃহা তাই শেষ পর্যন্ত সমর্পিত হয় গভীর এক নৈতিকতাসমৃদ্ধ আত্মিক ঋদ্ধতার মধ্যে, যেখানে একদিন দেবতা বা সৃষ্টিকর্তা পাপের শাস্তির বিধান করবেন। নজরুলের বিদ্রোহী চেতনা তাই রাজনৈতিক নয়, বরং আধ্যাত্মিক।  



সাতদিনের সেরা