kalerkantho

বৃহস্পতিবার ।  ১৯ মে ২০২২ । ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৭ শাওয়াল ১৪৪৩  

সেবা প্রকাশনীর ‘মাসুদ রানা’ ও একজন কাজী আনোয়ার হোসেন

অদিতি ফাল্গুনী   

২১ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



১৯৮৯-৯০ নাগাদই সম্ভবত বিটিভিতে প্রয়াত অভিনেতা খালেদ খান অভিনীত একটি ধারাবাহিক নাটক চলছিল। নাটকটির নাম এখন মনে নেই। তবে সেই নাটকের একটি সংলাপ আমাদের সবাইকে বেশ ঝাঁকুনি দিয়েছিল, ‘আরে—মুক্তিযোদ্ধা বলতেই শুধু ক্র্যাচে ভর দেওয়া, পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধার কথা মনে হয় কেন? আমার মুক্তিযোদ্ধা তো মাসুদ রানার মতো ছয় ফুট লম্বা, কমান্ডো অপারেশন করে আর বিদেশিদের সাথে টেক্কা দিয়া এরোপ্লেন ছিনতাই করে। ’

বাস্তবতা যদিও বলে ভিন্ন কথা।

বিজ্ঞাপন

আমি নিজেই যুদ্ধাহত প্রায় বাইশ থেকে চব্বিশজন মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে দীর্ঘ আলাপচারিতা করেছি একটা সময়ে এবং জানি যে এই পোড়া দেশের জন্য উনিশ-কুড়ি-একুশের ছেলেরাও কিভাবে পা, হাত, চোখ, শ্রবণশক্তি বা কেউ কেউ এমনকি পৌরুষশক্তিও হারিয়েছে। তবু এই ভাবনাটাই অন্য রকম। মুক্তিযোদ্ধা শুধু দুর্বল হবে না, অসুস্থ বা অশক্ত হবে না। সে হবে মাসুদ রানার মতো বলশালী।

১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধে হেরে যাওয়ার পর এবং ব্রিটিশের বশীভূত হওয়ার পর উপনিবেশের নানা মন্দের পাশাপাশি পশ্চিমা শিক্ষাও পেলাম আমরা। ইংরেজি ভাষার হাত ধরে শেকসপিয়ার থেকে স্যার আর্থার কোনান ডয়েল...সবাই এলেন। প্রকৃতির অদ্ভুত নিয়ম এই যে দেবতা থেকে নায়ক, দেবী থেকে নায়িকা—সব কিছুই মানুষ নিজের চেহারার আদলে তৈরি করতে চায়। ভারতের বুদ্ধ তাই যেমন মঙ্গোলয়েড পৃথিবীতে ভুঁড়িওয়ালা, বোঁচা নাক ও ছোট চোখের ‘লাফিং বুড্ডা’ বা ‘হাস্যরত বুদ্ধ‘ হয়ে যান, ফিলিস্তিনের বাদামি যিশু যেমন তুষারাবৃত ইউরোপে নীল চোখ ও সোনালি চুলের যিশু হয়ে যান, উপনিবেশিত ভারত তথা বাংলায়ও দরকার পড়ে ইউরোপের গোয়েন্দা নায়কের মতোই নব বাঙালি গোয়েন্দার নির্মাণ। তাই ওপার বাংলায় যেমন ব্যোমকেশ বক্সী, জহর গোয়েন্দা, কিরিটী রায় বা প্রদোষ চন্দ  মিত্র ওরফে ফেলু মিত্তির সৃষ্টি হতে থাকে, আমাদের এপারেও জন্ম নেয় এক মাসুদ রানা।

আমার মা যেমন ছিলেন কিরিটী রায়ের ভক্ত। কিরিটী রায়ের নাম বলতে গেলে মায়ের চোখেমুখে যে আলো দেখেছি, তা আর এক নবম-দশম শ্রেণির বই পড়ুয়া বালিকার চোখেই দেখা যায়। অনতিসচ্ছল বরের ঘরে অনেক সন্তানের মাতৃত্ব, দিনরাতের সাংসারিক পরিশ্রমের ক্লান্তি উড়ে গিয়ে মাকে দেখেছি এক গোয়েন্দা যুবকের কথা তুলে ততটাই খুশি হতে যতটা খুশি হতেন আর কানন দেবীর গান বা অভিনয় কি প্রমথেশ বড়ুয়া অভিনীত সিনেমার কথা বলতে গেলে। ‘বাদশাহী আংটি’র ফেলুদা আমাদের বাসায় যখন প্রথম আসে, তখন আমার বয়স ছয় বছর। কিন্তু আমি সেই বই পড়তে পেরেছিলাম। লখনউ নগরীর সেই অবিশ্বাস্য সুন্দর বিবরণ, হরিদ্বার আর লছমনঝুলা বা ভুলভুলাইয়ার বিবৃতি, ফেলুদা ও তোপসের কথোপকথন মেশানো এক অসম্ভব সুন্দর ভুবন। সেই থেকে ফেলুদা হয়ে উঠল আমার ও আমার ওপরের বোন কাবেরীর শৈশব-কৈশোরের নিত্য সঙ্গী। আমাদের দুজনের মাঝখানের ভাইটি একাত্তরে উদ্বাস্তু শিশু হিসেবে মরে গিয়ে আমরা দুই বোনই হয়ে উঠেছি পিঠোপিঠি। কাজেই ‘বোম্বাইয়ের বোম্বেটে’ থেকে ‘তিনতোরেত্তোর যিশু’, ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ থেকে ‘সোনার কেল্লা’ আমাদের মুখস্থ হয়ে যায়। নিজের দেশের ‘মাসুদ রাণা’ বাসায় ঢোকার অনুমতি পায় না। কারণ কী ছিল? এখন মনে হয় যে ফেলুদা পড়া বাড়ির অভিভাবকদের বিবেচনায় নিশ্চিত ‘নিরাপদ’ও ছিল। সাতাশের ঝকঝকে সুদর্শন ফেলুদা অবিবাহিত। তার ত্রিসীমানায় কোনো নায়িকা বা নারী চরিত্র নেই। আছে বয়সে বারো-তেরো বছরের ছোট, কাকাতো ভাই তোপসে আর এক মধ্যবয়সী লালমোহন বাবু। বাড়ির ‘ছেলেমেয়ে’দের ভালো রাখার এটাও আরেক ধরনের ‘গীতবিতানী’য় ব্যবস্থাপত্র। তবু মাসুদ রাণা ও সোহানার অ্যাকশন-থ্রিলার-রোমান্সের পুষ্পরেণুর কথা স্কুলে গেলে বিশেষত অষ্টম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণির বান্ধবীদের কাছে জানা যেতে থাকে। এ যেন মার্কেজের ‘অটাম অব দ্য প্যার্ট্রিয়ার্ক’ বা শহীদুল জহিরের ‘সেই সময়’ গল্পে নগরীতে ফুলের মৌসুমে শহরজুড়ে ফুলের রেণু ছড়িয়ে পড়ার গল্প। সেই পুষ্পদাহ আপনি কিভাবে এড়াবেন? কাজেই মাসুদ রাণা না পড়লেও মাসুদ রাণা ও সোহানাকে নিয়ে সহপাঠিনীদের নানা গল্প তো কানে আসেই।

আচ্ছা, সত্যি কি বাংলাদেশের কোনো গোয়েন্দা যুবক অতটাই দৈহিক শক্তি, ক্ষিপ্রতা ও সামর্থ্য নিয়ে, অতখানি কৌশল ও রণনৈপুণ্যের সঙ্গে গোটা পশ্চিমা ভুবনে পশ্চিমা গোয়েন্দাদেরও হারিয়ে দিয়ে এত কিছু করেছেন? না, আমরা নিশ্চিত যে সেটা সম্ভব হয়নি। সেটা করা সম্ভব না। যে কারণে দুই শ কোটিরও বেশি মানুষের ভারত উপমহাদেশ থেকে গুণে পাঁচটাও অলিম্পিকের স্বর্ণপদক আসে না, সে কারণেই আমাদের মাসুদ রাণা-কিরিটী রায়-প্রদোষ চন্দ্র মিত্র-ব্যোমকেশ বক্সীরা কখনোই পশ্চিমে গিয়ে বিজয় অর্জনে সক্ষম হবে না। তবু স্বপ্ন দেখতে দোষ কী? 

হুমায়ূন আহমেদের লেখা একটি সায়েন্স ফিকশনেও পড়া হয়েছিল যে ‘একটি রোবট এক মানুষকে বলছে যে তোমরা যেকোনো কঠিন অবস্থাতেও যেকোনো আনন্দের ভাবনা কল্পনা করতে পারো। এটাই তোমাদের বড় গুণ। ’ কাজেই ‘মাসুদ রানা’ কল্পনা হিসেবে শুরু হলেও আজ যখন বাংলাদেশের ছেলেরা শুধু নয়, মেয়েরাও জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর কাজে পৃথিবীর নানা দেশে টহল দেয়, মানবিক অভিযানে অংশ নেয়—তখন বুঝতে পারি যে ‘মাসুদ রানা’ মিথ্যা ছিল না। ছিল না শুধুই কল্পনা। ‘মাসুদ রানা’ ছিল রবীন্দ্রনাথের ‘লিপিকা’র না ‘সত্য’, না ‘মিথ্যা’—মাসুদ রানা ছিল ‘লিপিকা’র ‘আরো সত্য’।  

এবারে শেষ প্রশ্ন : কাজী আনোয়ার হোসেনের মৃত্যুর কিছুদিন আগে তাঁরই প্রকাশনা সংস্থার অনুবাদক শেখ আব্দুল হাকিমই ‘সেবা’র বেশির ভাগ বইয়ের ‘নেপথ্য লেখক/অনুবাদক’ বলে যে দুঃখজনক বিতর্ক উঠেছিল এবং যে অভিযোগ আদালতে সত্য হিসেবে প্রমাণিতও হয়েছিল, সেই বেদনার কাঁটা আমাদের মনে বহুদিন থাকবে। তবু হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান এন্ডারসনের গল্পে যেমন তুষারঝড়ের রাতে বুকে কাঁটা বিঁধিয়ে ছোট্ট নাইটিঙ্গেল ফুটিয়েছিল একটি রক্ত রুধির গোলাপ, বেদনাদায়ক এই বিতর্কের পরও বাংলাদেশের কল্পনার চিরতরুণ ‘মাসুদ রানা’ বেঁচে থাকবেন অসংখ্য পাঠকের হৃদয়ে। এখানেই যাবতীয় পুষ্পময়তা নিহিত।



সাতদিনের সেরা