kalerkantho

শনিবার । ১৫ মাঘ ১৪২৮। ২৯ জানুয়ারি ২০২২। ২৫ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

গভীর সিন্ধুর ধ্বনি...

ইমতিয়ার শামীম

১৯ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



নতুন এক ডাঙার দিকে যাত্রা করেছিলেন তিনি ভারতবিভক্তির তিক্ত আস্বাদে নীলকণ্ঠ হয়ে ওঠার মধ্য দিয়ে, আর সে জন্যই বোধকরি বাংলাদেশের কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে একমাত্র তাঁর কলমেই দেখি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের অপ্রাপ্তিটুকু গভীর হয়ে ফুটে উঠতে। বিশেষত ‘নামহীন গোত্রহীন’ বইয়ের গল্পগুলোয় দেখি মুক্তিযুদ্ধেও নিয়তিহীন হয়ে থাকা, হয়ে পড়া মানুষগুলোকে ঘন হয়ে সন্নিবেশিত হতে—যেমন ‘ঘরগেরস্থি’তে দেখা মেলে আমাদের সঙ্গে রামশরণের, মুক্তিযুদ্ধ শেষে শরণার্থী ক্যাম্প থেকে দেশে ফিরে এসে গন্তব্যহীন হয়ে পড়ে সে তার পুরো পরিবার নিয়ে, আবার গন্তব্যহীন হলে কী হবে, লঞ্চ ধরে কোথাও যাওয়ার মতো জায়গা না থাকলে কী হবে, ‘তবে কোথাও সে নিশ্চয়ই যাবে। ’ বড় নির্দয় হাসানের মুক্তিযুদ্ধের এই গল্পগুলো। তিনি নিজে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্পে জীবন ও পারিপার্শ্বিকতার নির্দয়তা, রূঢ়তা দেখতে পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে বলেছিলেন, কাঁচা ধানি লঙ্কার মতো ইলিয়াসের গল্প; বলেছিলেন ইলিয়াসের নির্দয় চোখের দিকে ইঙ্গিত করে, চোখের নিচে সামান্য একটু কোমলতা থাকা ভালো; অথচ ‘নামহীন গোত্রহীন’—মুক্তিযুদ্ধের এই ছোটগল্পের বই পড়তে পড়তে আমরা দেখি, একই নির্লিপ্ত নির্দয়তা তাঁর চোখেও জ্বল জ্বল করছে, কোনো কোমলতা অবশিষ্ট নেই সেখানে।

বিজ্ঞাপন

যাঁরা হাসানের দেশভাগের আখ্যানে ঘুরপাক খেতে খেতে চেষ্টা করেন বাংলাদেশে তাঁকে উন্মূল এক মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে, তাঁদের আসলে কখনোই বোঝানো সম্ভব নয়, তিনি যে গোত্রের মানুষদের সুলুকসন্ধান করে গেছেন, তাদের কোনো দেশ-রাষ্ট্র নেই, তাদের জন্য শুধু পথটাই খোলা আছে, তাঁর বিরুদ্ধে আমরা বড়জোর এইটুকু অভিযোগ আনতে পারি, তিনি তাদের মুখপাত্র।

এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, তাঁর মৃত্যুর জন্য অজান্তে হলেও খানিকটা প্রস্তুতি হয়তো আমরা অনেকেই নিয়ে ফেলেছিলাম। তার পরও ব্যক্তিগতভাবে এটুকু বলতে পারি, এমন প্রত্যয়ই গভীর ছিল আমার যে আরো কয়েক বছর আমাদের মধ্যে নিশ্চয়ই থাকবেন তিনি। আর সে কারণেই বোধকরি অসুস্থ হয়ে তিনি চিকিৎসার জন্য ঢাকায় এলেও তাঁর সঙ্গে দেখা করার কোনো চেষ্টাই করিনি। এখন তাঁর মৃত্যু হওয়ার পর, যখন পেছনের দিকে ফিরে তাকাচ্ছি, তখন মনে হচ্ছে নিজেই নিজের অতৃপ্তিকে গভীর থেকে গভীরতর করে ফেলেছি, নিজের হাহাকারকে খুঁড়ে এনেছি নিজের হাতে। এখন তাঁকে নিয়ে লিখতে বসে মনে হচ্ছে, আমাদের সম্পর্ক একাধিকবার তিক্ত হয়ে উঠেছে, কিন্তু প্রচণ্ড নির্লিপ্ততা দিয়ে শেষ পর্যন্ত আমরা উভয়েই ফের উষ্ণ নৈকট্যে ফিরতে পেরেছি। কিন্তু এটি নিশ্চয়ই কোনো তিক্ত স্মৃতি মনে করার সময় নয়; বিশেষত তখন—যখন জীবন শুকিয়ে পড়ায় আমরা প্রত্যেকেই প্রত্যাশা করি প্রত্যেকের করুণাধারায় প্রত্যাবর্তনের।

আমরা যারা আশির দশকে কিংবা তারও আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছি, তাদের অনেকেরই নিশ্চয়ই মনে আছে একটি হলুদ রঙের সাইকেলকে; মনে আছে সেই হাসান আজিজুল হককে, শিক্ষকদের আবাসিক এলাকা পশ্চিমপাড়া থেকে যিনি সেই হলুদ রঙের সাইকেল চালাতে চালাতে আসতেন মাঠ পেরিয়ে কলা ভবনের দর্শন বিভাগে, কিংবা চলে যেতেন নারকেল সারির পাশ দিয়ে কাজলা বাজারের দিকে; অথবা হয়তো বা তাড়িয়ে তাড়িয়ে সাইকেল চালানোর আস্বাদ নিতেই ধীরগতিতে পেডাল মারতে মারতে চলে যেতেন অবারিত গগনশিরিষের পথটি দিয়ে—যে পথ খ্যাতি পেয়েছে প্যারিস রোড নামে। দূর থেকে কিংবা কাছ থেকে দেখেছি মানুষটিকে—প্রথম কথা একদিন তিনিই বলেছিলেন আমাকে। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের রেশনের দোকানটা ছিল বিশ্ববিদ্যালয় স্টেডিয়ামের এক পাশে, শহীদ মিনারের দিকে চলে যাওয়া রাস্তাটার উল্টো দিকে। তিনি রেশন তুলতে গেছেন, আমিও গেছি আমার বড় ভাইয়ের কার্ড নিয়ে গম কিনতে। আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসি ফুটিয়ে, যতদূর মনে পড়ে, তিনি বললেন, ‘ভালো আছো?’

যখন তাঁর মৃত্যুসংবাদ জানতে পারলাম, এ রকম অসংখ্য উজ্জ্বল স্মৃতি যেন মুহূর্তে তীব্র আলোর গতি নিয়ে ঘূর্ণি তুলে কোথায় যেন হারিয়ে গেল আমার ভেতরে। তাঁর সাহিত্যের কথা আজ থাক—মানুষ হিসেবে তিনি কেমন ছিলেন, সেটাই বরং মনে করি একবার। আমাদের এক বয়োজ্যেষ্ঠ বন্ধু, কুষ্টিয়ার লিটল ম্যাগ ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’র সম্পাদক, গল্পকার নূরুল কবির একবার আমাকে বলেছিলেন, “আমরা মানে আমি, তারিক (কবি ও সাংবাদিক তারিক-উল ইসলাম), মুসা (আবু মুসা বিশ্বাস) কোনো কোনো দিন দুপুরে হোটেলে খেয়েদেয়েই চলে যেতাম তার বাসাতে; বিশ্ববিদ্যালয়ের টিচাররা কেমন একটু আরামপ্রিয়, তা তো জানেনই ইমতিয়ার—তার ওপর রাজশাহীর দুপুরবেলা... ওই সময়টা, বোঝেনই তো, তাদের খেয়েদেয়ে বিশ্রাম নেয়ার সময়। কিন্তু একদিনও তাকে অপ্রস্তুত হতে দেখিনি, বিরক্ত হতে দেখিনি। দরজা খুলেই ‘ও, তোমরা?...এসো, এসো বলে ডেকে নিতেন ড্রয়িংরুমে। তাঁর কত দুপুরের ঘুম যে আমরা নষ্ট করেছি...’

এমনই মানুষ হাসান আজিজুল হক—আমাদের হাসান আজিজুল হক স্যার। নিজেকে তিনি গড়ে তুলেছেন, আবার হয়েও উঠেছেন। কেউ কেউ তাঁকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন তাঁর লেখায় রাঢ়বঙ্গের অস্তিত্বের প্রসঙ্গ তুলে; কিন্তু শুরুতেই বলেছি, তাঁরা বুঝতেও পারবেন না সাহিত্যে দেশভাগের স্মৃতির মর্মস্পর্শিতার ভাষ্য তৈরি করার আগেই তিনি তাঁর একটি সামগ্রিক দর্শনগত অস্তিত্ব তৈরি করে ফেলেছেন, মানুষের গন্তব্যহীনতার নিয়তিকে তিনি চেয়েছেন স্পর্শ করতে—কী ‘আগুনপাখি’, কী ‘নামহীন গোত্রহীন’, কী ‘বিধবাদের কথা’ সবখানেই এই গন্তব্যে যাওয়ার অনিবার্যতার সঙ্গে গন্তব্যহীনতার দ্বন্দ্বই তাঁকে মহৎ এক শিল্পীতে পরিণত করেছে। মানুষের মুক্তির জন্য তিনি বাম রাজনীতির কথা বলেছেন, সাম্য ও মুক্তির কথা বলেছেন; কিন্তু নিজের অবচেতনে স্থান করে নেওয়া সার্ত্রের সেই ‘অস্তিত্ববাদ’ও তাঁকে ঘিরে রেখেছে সব সময়। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর গদ্য ও কাহিনিরীতি নিয়ে তিনি যে সূক্ষ্ম সমালোচনা রেখে গেছেন আমাদের জন্য, তা যেন তাঁর নিজেরই নিয়তি হয়ে উঠেছে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে, ভিন্ন রীতিতে।

আমাদের যে কয়েক প্রজন্মের কথাসাহিত্যিকের চোখের সামনে এই মৃত্যু ঘটল, তাঁরা তো বটেই, ভবিষ্যতের কোনো প্রজন্মও তাঁকে ভুলতে পারবে না। যে গীতসুধারস তিনি ঢেলে দিয়ে গেলেন আমাদের জন্য তা তো অনিঃশেষ, অফুরান। তাঁর চলে যাওয়ার পর বিশেষ করে মনে পড়ছে একটি দিনের কথা—আমি তখন লন্ডনে। বোধ হয় ২০০৮ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বর হবে, একদিন দেশ থেকে এক বন্ধু খবর দিলো, হাসান স্যার আমাকে খুঁজছেন, কথা বলতে চান তিনি আমার সঙ্গে। তাঁকে টেলিফোন করতেই দু-একটি কথার পরপরই তিনি হঠাৎ বলে উঠলেন, ‘তুমি ওখানে কেন গেছো ইমতিয়ার? ও সব জায়গা তো তোমার জন্য না। ’ আমি কিছু একটা বললাম বা বলার চেষ্টা করলাম, তিনি সে কথার পিঠে আবারও বললেন, ‘ও সব জায়গা তো তোমার জন্য নয় ইমতিয়ার। আমিই টিকতে পারিনি, তুমি পারবে? আমি শুনেছি, তুমি বিধবাদের কথা নিয়ে লিখেছ, আগুনপাখি নিয়ে লিখেছ, আমি কিন্তু সেসব নিয়ে কথা বলার জন্য তোমাকে খুঁজছি না। আমি তোমাকে বলতে চাইছি, তুমি চলে এসো ইমতিয়ার। ’

‘তুমি চলে এসো ইমতিয়ার’—এই একটি বাক্য আমাকে যে কত শক্তি জুগিয়েছে দেশে ফিরতে, তা আমি কখনোই বলে বোঝাতে পারব না। এমন আহবান তো কুহকের মতো, একটা নিশ্চিত জীবনযাপনের ভিন দেশ ছেড়ে নিজের দেশে ফেরার মূল্যও কখনো কখনো হৃদয়কেই ছিঁড়ে ফেলার মতো। হয়তো স্যার না বললেও আমি ফিরে আসতাম; কিন্তু তাঁর সেই কণ্ঠস্বর ছিল যেন গভীর সিন্ধুর ধ্বনির মতো, গভীর তরঙ্গময় অথচ গভীর প্রশান্তময়। সব কিছু ছাপিয়ে সেই ধ্বনি আজীবন মগ্ন করে রাখবে আমাকে। আমি নিশ্চিত, আমাদের কালের প্রত্যেকেই সেই গভীর সিন্ধুর ধ্বনি শুনেছেন কোনো না কোনো একদিন।



সাতদিনের সেরা